ফেনীর মহিপালে প্রবাসীর বাসায় ঢুকে গৃহবধূকে বাথরুমে আটকে রেখে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুটের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় থানায় মামলা করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। তবে ঘটনার তিনদিন পেরিয়ে গেছে। সেই দস্যুদের ছবি পাওয়া গেলেও যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে তারা। গতকাল শুক্রবার (২০ আগস্ট) রাতে এ প্রতিবেদন লিখা পর্যন্ত তাদের শনাক্ত করা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ফেনীতে চাঞ্চল্যকর এমন ঘটনার পর তাদের ধরতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মু. সাইফুল ইসলাম দৈনিক ফেনীকে জানান, তাদের দুইজনের পরিচয়ের ব্যাপারে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। তবে পুলিশ তাদের ব্যাপারে কিছু সূত্র পেয়েছে, যেগুলো ধরে তদন্তের কাজ এগোচ্ছে। তাদের ধরতে পারলে এ ঘটনার নেপথ্যে বিস্তারিত জানা যাবে।
এ ঘটনার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ঘটনার ভিডিও ও ছবি ভাইরাল হয়েছে। তাদের ছবি ঘুরছে ফেসবুকের নিউজফিড জুড়ে। ফেসবুকে নেটিজেনরা প্রশাসনকে তাদের অবশ্যই খুঁজে বের করার জোর দাবি তুলছেন।
ফেসবুকে নূর নামে একজন মন্তব্য করেছেন, আমাদের ফেনীতে ৩০ শতাংশ লোক বাইরের জেলার মানুষ। ফেনীতে এসে ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতিসহ নানা অপরাধ করে লাপাত্তা হয়ে যায়। এজন্য আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনকেও বেগ পেতে হয়।
এ ব্যাপারে ফেনী মডেল থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) অলি আহাদ জানান, দেশে আসার পর বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন প্রবাসী প্রকৌশলী মো. নুরুজ্জামান।
ওরা আসলে কারা?
মহিপালে ১৫ মিনিটের ব্যবধানে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনায় সেই দুইজন ব্যক্তি ছাড়া নেপথ্যে আর কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা, এমনটাই প্রশ্ন ঘুরছে স্থানীয়দের মনে। স্থানীয়রা বলছেন, কেউ না কেউ ওই পরিবারে সম্পর্কে ও আর্থিক বিষয়াদি সম্পর্কে জানিয়েছে আগে। নাহলে এমন ‘নিখুঁত’ ভাবে কোন প্রকার সাড়া শব্দ ছাড়াই বিশাল পরিমাণ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যেতে পারতো না। এর পেছনে অবশ্যই অন্য কারণ রয়েছে। যে বা যারাই এ ঘটনায় জড়িত, তারা অবশ্যই পেশাদার।
গত বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে শহরের মহিপাল মুসলিম ভূঁইয়া বাড়ির রেহান ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় প্রবাসী প্রকৌশলী মো. নুরুজ্জামানের বাসায় এ চুরির ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে জড়িত দুই ব্যক্তির ছবি পাওয়া গেলেও এখনো তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
ভুক্তভোগী গৃহবধূ শাহানা আক্তারের দাবি, দুই অজ্ঞাত ব্যক্তি বাসায় ঢুকে ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে তাকে জিম্মি করেন। পরে মুখ চেপে ধরে তাকে বাথরুমে আটকে রেখে বাসায় থাকা নগদ ১০ লাখ ৬০ হাজার টাকা ও ১২-১৩ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যান।
বাসার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে টি-শার্ট ও নীল ক্যাপ পরিহিত একজন এবং কাঁধে ব্যাগ নিয়ে সাদা টুপি ও শার্ট পরিহিত আরেকজন রেহান ম্যানশনের সিঁড়ি দিয়ে দ্বিতীয় তলায় ওঠেন। ফুটেজের সময় অনুযায়ী, সকাল ৮টা ৩৮ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে তারা দ্বিতীয় তলায় উঠে বাসার কলিংবেল চাপ দেন। শাহানা আক্তার দরজা খুললে টুপি পরিহিত ব্যক্তি তাকে মুখ চেপে ধরে ভেতরের একটি কক্ষে নিয়ে যান।
ফুটেজে তাদের দুজনকে বাসায় প্রবেশ ও বের হতে দেখা যায়। পরে সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে তারা বাসার দরজা খুলে বের হয়ে যান। সকাল ৮টা ৫৫ মিনিট ২১ সেকেন্ডে তাদের ওই ভবন থেকে বের হতে দেখা যায়।
শাহানা আক্তার বলেন, দুই ব্যক্তি বাসায় ঢুকে ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে মুখ চেপে ধরে তাকে বাথরুমে বন্দী করে রাখেন। তখন তার ছেলে স্কুলে থাকায় তিনি বাসায় একা ছিলেন। ওই ব্যক্তিরা তার সন্তানকে বাসার নিচে জিম্মি করা হয়েছে বলে জানান। পরে ঘরে থাকা টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে তারা চলে যান। বাথরুমে বন্দী অবস্থায় তার চিৎকার শুনে পাশের বাসার এক প্রতিবেশী এগিয়ে এসে দরজা খুলে তাকে বের করেন।
তিনি বলেন, বাড়ির নির্মাণকাজের জন্য মাসখানেক আগে ব্যাংক থেকে ১০ লাখ ৬০ হাজার টাকা তুলে বাসায় রাখা হয়েছিল। এছাড়া ঘরে তার বোনের ১০ ভরি স্বর্ণালংকার একটি কাঁথায় মোড়ানো ছিল। সেগুলো অভিযুক্তরা দেখতে না পাওয়ায় পরে পুলিশ এসে উদ্ধার করে তার হাতে তুলে দেয়।
শাহানা আক্তার আরও জানান, তার স্বামী সৌদি প্রবাসী। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার তিনি দেশে আসেন।
নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন মানুষ
ফেনী শহরের মহিপালে দিনের বেলায় একটি বাসায় ঢুকে গৃহবধূকে জিম্মি করে টাকা ও স্বর্ণালংকার লুটের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জনবহুল এলাকায় দিনের বেলায় এমন ঘটনায় নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও আবাসিক এলাকাগুলোতে দিনের বিভিন্ন সময়ে অপরিচিত মানুষের চলাচল থাকলেও নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। বাসাবাড়িতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা, সন্দেহজনক ব্যক্তিদের চলাচল নজরদারির আওতায় আনা এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় টহল বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বাসায় সদস্যরা একা থাকার সুযোগ নিয়ে দুর্বৃত্তরা এমন ঘটনা ঘটালে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়ে। বিশেষ করে প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের অনেক সময় দিনের বেলায় বাসায় একা থাকতে হয়। তাই আবাসিক এলাকাগুলোতে পুলিশের টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
মহিপালের এ ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে দুই সন্দেহভাজনের ছবি পাওয়া গেলেও তাদের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি। দ্রুত জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা গেলে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার বিষয়ে আস্থা ফিরবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।