ফেনী    সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক ফেনী

প্রাথমিক শিক্ষার হালচাল

ফেনী সদরে বদলির হিড়িক, বঞ্চিত স্থানীয়রা



ফেনী সদরে বদলির হিড়িক, বঞ্চিত স্থানীয়রা

ফেনী সদর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অন্য উপজেলা থেকে শিক্ষক বদলি হয়ে আসার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষক সমিতির নেতারা বলছেন, অন্য উপজেলা থেকে শিক্ষক বদলি হয়ে আসতে থাকলে ফেনী সদরের শূন্য পদ কমে যাবে। এতে উপজেলাভিত্তিক নিয়োগে ভবিষ্যতে স্থানীয় চাকরিপ্রার্থীদের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়তে পারে। এখন শুরু হয়েছে আন্তঃউপজেলা বদলি। সদরে বদলি হয়ে আসতে শিক্ষকদের মাঝে অনেকটা প্রতিযোগিতা ও দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ১০ জন বদলির জন্য আবেদন করেছেন।

ফেনী সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ১৫১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট অনুমোদিত শিক্ষক পদ ১ হাজার ৪৬টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৮৪৫ জন শিক্ষক। উপজেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, ফেনী সদরে অন্য উপজেলা থেকে বদলি হয়ে এসেছেন ৩৭৬ জন শিক্ষক। তবে এ নিয়ে শিক্ষক সমিতি ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যে গরমিল রয়েছে।

শিক্ষক বদলি নীতিমালায় ভিন্ন উপজেলা থেকে বদলির ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমা হচ্ছে ১০ শতাংশ। বর্তমানে সদরে ৪৩ শতাংশ শিক্ষক বদলি হয়ে এসেছেন বলে শিক্ষক সমিতির নেতারা দাবি করছেন। তাদের মতে, বর্তমানে ফেনী সদরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অন্য উপজেলা থেকে বদলি হয়ে আসা শিক্ষকের হার ওই সীমার তুলনায় অনেক বেশি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফেনী সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খালেদা পারভীন দৈনিক ফেনীকে বলেন, ফেনী সদর উপজেলার ৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৫০টি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। এরই মধ্যে উপজেলার এক বিদ্যালয় থেকে অন্য বিদ্যালয়ে ১১ জন সহকারী শিক্ষক বদলি হয়েছেন। এখন আন্তঃউপজেলা বদলি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি জানান, ফেনী সদরে বহিরাগত শিক্ষকের হার প্রায় ১৪ শতাংশ। এতে সদর উপজেলার শূন্য পদ কমলে ওই উপজেলার প্রার্থীদের নিয়োগের সুযোগও কমে যাবে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হৃষীকেশ শীল বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী সদরে অন্য উপজেলা থেকে শিক্ষক বদলি করতে হবে। সদরে অন্য উপজেলা থেকে শিক্ষক বদলির বিষয়ে জেলাপর্যায়ে শিক্ষকদের পদায়ন ও বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়। সামনে সহকারি শিক্ষক পদে বিশাল নিয়োগ আসছে। সেখানে স্থানীয়রা চাকুরির সুযোগ পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সদরের ৪৩ শতাংশ শিক্ষকই বাইরের

প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় মহাসচিব ও গোহাডুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহি উদ্দিন খোন্দকার বলেন, আগে অনলাইনে সহকারি শিক্ষক বদলি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হত। এখন অফলাইনে সেটি করা হচ্ছে। এর ফলে সদরে অন্য উপজেলা থেকে শিক্ষকরা সহজে বদলি হতে পারছেন। ইতোমধ্যে ফেনী সদরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে অন্য উপজেলা থেকে বদলি হয়ে আসা শিক্ষকের সংখ্যা মোট শিক্ষকের প্রায় ৪৩ শতাংশ।

তার দাবি, ২০০৫ সালের বদলি নীতিমালায় ভিন্ন উপজেলা থেকে বদলির হার ১০ শতাংশ, কিন্তু সদরে তা মানা হচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, জুলাই মাসে শহরের একটি বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার জন্য ৭০ জন শিক্ষক আবেদন করেছেন। পৌরসভার ফেনী সেন্ট্রাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মধ্য চাড়িপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ শহরের স্কুলগুলোতে শূন্য পদ পূরণ হলেও গ্রামের স্কুলগুলোতে রয়েছে শিক্ষক সংকট। এর ফলে গ্রামীণ এলাকাগুলোতে প্রাথমিকে শিক্ষার মান যেমন কমছে, তেমনি শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে ফেনী সদর সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ফেনী সদরে অন্য পাঁচ উপজেলা থেকে নিয়মিত শিক্ষক বদলি হয়ে আসছেন। এতে ভবিষ্যতে স্থানীয় চাকরিপ্রার্থীদের জন্য শূন্য পদ কমে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, স্বামী বা স্ত্রীর স্থায়ী ঠিকানায় বদলির একবার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এই সুযোগের অপব্যবহার করা হচ্ছে। অনেকে শহরে ফ্ল্যাট বা দোকান কিনে স্থায়ী ঠিকানা দেখিয়ে বদলির সুযোগ নিচ্ছেন। অনেকে আবার কাবিননামা জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে। মিজানুর রহমানের দাবি, স্থায়ী ঠিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন।

শিক্ষক সমিতির নেতারা বলছেন, নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি শিক্ষক ফেনী সদরে কর্মরত থাকলে নতুন করে অন্য উপজেলা থেকে শিক্ষক বদলি করার আগে বিষয়টি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁদের আশঙ্কা, নতুন করে বদলি হলে স্থানীয় শূন্য পদ আরও কমে যাবে। ফলে পরবর্তী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ফেনী সদরের জন্য পদসংখ্যাও কমতে পারে।

সুযোগ কমছে স্থানীয় প্রার্থীদের

ফেনী সদর উপজেলার চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফেনী সদরের ১৫১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদসংখ্যা ১ হাজার ৪৬টি। এ উপজেলার জনসংখ্যা ও প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শূন্য পদের সংখ্যা সীমিত। ফলে নিয়োগ পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করেও অনেক চাকরিপ্রার্থী কাক্সিক্ষত সুযোগ পাচ্ছেন না।

চাকরিপ্রার্থীরা বলছেন, উপজেলা-ভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থায় একটি উপজেলার শূন্য পদ অন্য উপজেলার তুলনায় কম হলে ওই উপজেলার প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এর সঙ্গে বদলির মাধ্যমে অন্য উপজেলার শিক্ষক এসে শূন্য পদ পূরণ করলে স্থানীয় প্রার্থীদের জন্য সুযোগ আরও সংকুচিত হয়।

এ ব্যাপারে জিয়াউল হক সাদ্দাম নামে এক চাকরিপ্রার্থী ফেসবুকে মন্তব্য করেন, এই বদলির কারণে সদরের পদ কমে মাত্র ৮ জন হয়ে যায়, যেখানে অন্য উপজেলায় ৩৫ থেকে ৪০টি শুন্য পদ ছিল। তাই পদ কমে যাওয়ায় সর্বোচ্চ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমি এই সম্মানজনক পেশায় যেতে পারিনি। লিখিত নম্বর ভালো ছিল, ভাইভা ভালো হওয়া সত্ত্বেও সদরের ভাগ্যবান ৮ জনের এক জন হতে পারিনি।


খোন্দকার মারুফ হোসেন নামে আরেকজন মন্তব্য করেন, আমাদের ফেনী সদরকে বাঁচাতে হবে। ভিন্ন উপজেলা, জেলার চাকুরিরত ব্যক্তিরা ফেনী সদর উপজেলায় এসে ভিড় করছে। যার ফলে সদরের স্থানীয় চাকুরিপ্রার্থীরা নিয়োগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ফেনী সদর তার স্বকীয়তা হারাবে। নিয়োগ ও বদলিতে স্থানীয়দের প্রাধান্য দিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে সদরের বিজয়সিংহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম বলেন, আমাদের সন্তানদের জন্য আগামীতে চাকরির সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। সদরে চাকরির কোটা কমে যাচ্ছে। এ বিষয়ে আমাদের সজাগ থাকতে হবে, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম যেন এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর মেধাক্রম, শূন্য পদ ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধিই চূড়ান্ত বিষয়। তাই বদলি ও নিয়োগের বিষয় দুটি আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দুই বছরে নিয়োগ পেয়েছেন ২৪ জন

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সদরে ১৫১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে-এ দুই বছরে নিয়োগ পেয়েছেন ২৪ জন শিক্ষক। চলতি বছরে গত ৯ জানুয়ারি প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

ফেনীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের ৯২টি শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। এর মধ্যে ফেনী সদর উপজেলায় ১৭টি, দাগনভূঞা উপজেলায় ১৬টি, সোনাগাজী উপজেলায় ৩১টি, ছাগলনাইয়া উপজেলায় ১৪টি, ফুলগাজী উপজেলায় ১২টি এবং পরশুরাম উপজেলায় ২টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে সোনাগাজীতে শূন্য পদ সবচেয়ে বেশি এবং পরশুরামে সবচেয়ে কম।


এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৩ মার্চ নিয়োগপ্রাপ্ত ১২৪ জন সহকারী শিক্ষকের মধ্যে ফেনী সদরে নিয়োগ পেয়েছেন মাত্র ৭ জন। এর মধ্যে দাগনভূঞায় ২২ জন, সোনাগাজীতে ৪৫ জন, ছাগলনাইয়ায় ১৫ জন, ফুলগাজীতে ২০ জন এবং পরশুরামে ১৫ জন নিয়োগ পেয়েছেন।

স্থানীয় চাকরিপ্রার্থীরা বলছেন, বদলির মাধ্যমে ফেনী সদরের শূন্য পদগুলো অন্য উপজেলার শিক্ষক দিয়ে পূরণ করা হলে ভবিষ্যৎ নিয়োগে স্থানীয় প্রার্থীদের জন্য পদসংখ্যা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থগিত বদলি কমিটির বৈঠক

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জেলা পর্যায়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পদায়ন ও বদলির জন্য গত ১৭ আগস্ট ৫ সদস্যের আবেদন যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি হচ্ছেন জেলা প্রশাসক মনিরা হক, সদস্য সচিব জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হৃষীকেশ শীল। সদস্যরা হলেনÑ জেলা শিক্ষা অফিসার মো. শফি উল্লাহ, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার ও জাতীয়বাদী কর আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি আরিফুল হাসান রবিন। গতকাল রোববার (২৩ আগস্ট) এ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। পরে জেলা প্রশাসক ও কমিটির সভাপতি মনিরা হক বৈঠকটি স্থগিত করেন।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হৃষীকেশ শীল জানান, বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। কবে তা করা হবে সেটি এখনো ঠিক করা হয়নি। বদলির জন্য ৬-৭টি আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মনসুর মেহেদী জানান, ইতিমধ্যে অন্য উপজেলা থেকে বদলি হয়ে আসা শিক্ষকের সংখ্যা তাঁদের হিসাবে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় নতুন করে বদলির আবেদন অনুমোদনের আগে নীতিমালায় নির্ধারিত সীমা, আবেদনকারীর প্রকৃত স্থায়ী ঠিকানা এবং বদলির কারণ যাচাই করা প্রয়োজন। আমরা চাই না নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো শিক্ষককে ফেনী সদরে বদলি করা হোক। নীতিমালা অনুযায়ী বদলি হলে আমাদের আপত্তি নেই।

বদলিতে অনিয়ম ও তথ্য গোপনের অভিযোগ

বদলিতে অনিয়ম ও তথ্য গোপনের অভিযোগ করেছেন শিক্ষক সমিতির নেতারা। তাদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের আগস্টে নৈরাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক তাহমিনা আক্তার রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলির আবেদন করেন। একই বিদ্যালয়ের যোগদানের জন্য আবেদন করেন পূর্ব ছনুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক জিন্নাত আরা বেগম, সুবলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক রত্না চক্রবর্তী। তখন অনলাইনে বদলির সর্বোচ্চ ৫২ দশমিক ১৬ স্কোর পান রত্না চক্রবর্তী, জিন্নাত আরা বেগম পান ৫১ দশমিক ১১ ও তাহমিনা আক্তার পান ৪৮ দশমিক ৫৪। অদৃশ্য কারণে উপজেলা শিক্ষা অফিসার খালেদা পারভীন তাহমিনা আক্তারে ওই বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেন। জানা গেছে, তাহমিনা আক্তারের গ্রামের বাড়ি দাগনভূঞা হলেও স্বামীর স্থায়ী ঠিকানায় একবার বদলি হওয়ার নীতিমালা থাকলেও তিনি দুইবার বদলি হয়েছে। তার বদলির আবেদনে স্কুল থেকে বাসার দুরুত্ব দেখানো হয়েছে ২২ কিলোমিটার, প্রকৃতপক্ষে যা হবে ১৬ কিলোমিটার।

একইভাবে ফুলগাজীর বাসিন্দা কাজী মেহেরুন্নেসার স্বামী প্রবাসী। তিনি মিথ্যা তথ্যে সদরের দক্ষিণ কাশিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়েছেন। ২০২০ সালে পাইলট স্কুলে বদলি হন তাকিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মিনাক্ষী দেবী। তাকে যোগদান করতে না গিয়ে সোনাগাজীর আমিরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ওই স্কুলে যোগ দেন অর্জুন কুমার নাথ। চলতি বছরের ২১ এপ্রিল স্বামীর কর্মস্থল নোয়াখালীর মাইজদী থেকে ফেনী পাইলট আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন ফারহানা ইয়াসমিন। একই বিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের ৭ এপ্রিল যোগদান করেন বিবি আয়েশা। তাদের গ্রামের বাড়ি সোনাগাজীর মোহাম্মদপুরে। তার বোন বিবি ফাতেমা যোগদান করেন বটতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তার আরেক বোন বিবি আয়েশা সোনাগাজীতে থেকে সদরে বদলি হতে জোর তদবির করছেন। একইভাবে সোনাগাজী থেকে পাঁচগাছিয়ার ডুমুরুয়া সরকারি প্রাথমিকে বিদ্যালয়ে বদলি হয়েছেন জয়নাল আবেদীন।


বদলি প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার দাবি

শিক্ষক সমিতি ও স্থানীয় চাকরিপ্রার্থীদের দাবি, বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি আবেদন যথাযথভাবে যাচাই করা দরকার। বিশেষ করে স্বামী বা স্ত্রীর স্থায়ী ঠিকানার ভিত্তিতে বদলির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও স্থায়ী ঠিকানার সত্যতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাদের দাবি, একদিকে কর্মরত শিক্ষকদের বদলি ও পদায়নের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে, অন্যদিকে স্থানীয় প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়োগের সুযোগ যাতে অযথা সংকুচিত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ফেনী সদরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত শূন্য পদ, কর্মরত শিক্ষকদের উপজেলাভিত্তিক অবস্থান এবং বদলি নীতিমালায় নির্ধারিত সীমাÑএই তিনটি বিষয় সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করলেই পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।

দৈনিক ফেনী

সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬


ফেনী সদরে বদলির হিড়িক, বঞ্চিত স্থানীয়রা

প্রকাশের তারিখ : ২৪ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ফেনী সদর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অন্য উপজেলা থেকে শিক্ষক বদলি হয়ে আসার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষক সমিতির নেতারা বলছেন, অন্য উপজেলা থেকে শিক্ষক বদলি হয়ে আসতে থাকলে ফেনী সদরের শূন্য পদ কমে যাবে। এতে উপজেলাভিত্তিক নিয়োগে ভবিষ্যতে স্থানীয় চাকরিপ্রার্থীদের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়তে পারে। এখন শুরু হয়েছে আন্তঃউপজেলা বদলি। সদরে বদলি হয়ে আসতে শিক্ষকদের মাঝে অনেকটা প্রতিযোগিতা ও দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ১০ জন বদলির জন্য আবেদন করেছেন।

ফেনী সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ১৫১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট অনুমোদিত শিক্ষক পদ ১ হাজার ৪৬টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৮৪৫ জন শিক্ষক। উপজেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, ফেনী সদরে অন্য উপজেলা থেকে বদলি হয়ে এসেছেন ৩৭৬ জন শিক্ষক। তবে এ নিয়ে শিক্ষক সমিতি ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যে গরমিল রয়েছে।

শিক্ষক বদলি নীতিমালায় ভিন্ন উপজেলা থেকে বদলির ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমা হচ্ছে ১০ শতাংশ। বর্তমানে সদরে ৪৩ শতাংশ শিক্ষক বদলি হয়ে এসেছেন বলে শিক্ষক সমিতির নেতারা দাবি করছেন। তাদের মতে, বর্তমানে ফেনী সদরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অন্য উপজেলা থেকে বদলি হয়ে আসা শিক্ষকের হার ওই সীমার তুলনায় অনেক বেশি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফেনী সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খালেদা পারভীন দৈনিক ফেনীকে বলেন, ফেনী সদর উপজেলার ৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৫০টি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। এরই মধ্যে উপজেলার এক বিদ্যালয় থেকে অন্য বিদ্যালয়ে ১১ জন সহকারী শিক্ষক বদলি হয়েছেন। এখন আন্তঃউপজেলা বদলি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি জানান, ফেনী সদরে বহিরাগত শিক্ষকের হার প্রায় ১৪ শতাংশ। এতে সদর উপজেলার শূন্য পদ কমলে ওই উপজেলার প্রার্থীদের নিয়োগের সুযোগও কমে যাবে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হৃষীকেশ শীল বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী সদরে অন্য উপজেলা থেকে শিক্ষক বদলি করতে হবে। সদরে অন্য উপজেলা থেকে শিক্ষক বদলির বিষয়ে জেলাপর্যায়ে শিক্ষকদের পদায়ন ও বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়। সামনে সহকারি শিক্ষক পদে বিশাল নিয়োগ আসছে। সেখানে স্থানীয়রা চাকুরির সুযোগ পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সদরের ৪৩ শতাংশ শিক্ষকই বাইরের

প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় মহাসচিব ও গোহাডুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহি উদ্দিন খোন্দকার বলেন, আগে অনলাইনে সহকারি শিক্ষক বদলি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হত। এখন অফলাইনে সেটি করা হচ্ছে। এর ফলে সদরে অন্য উপজেলা থেকে শিক্ষকরা সহজে বদলি হতে পারছেন। ইতোমধ্যে ফেনী সদরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে অন্য উপজেলা থেকে বদলি হয়ে আসা শিক্ষকের সংখ্যা মোট শিক্ষকের প্রায় ৪৩ শতাংশ।

তার দাবি, ২০০৫ সালের বদলি নীতিমালায় ভিন্ন উপজেলা থেকে বদলির হার ১০ শতাংশ, কিন্তু সদরে তা মানা হচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, জুলাই মাসে শহরের একটি বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার জন্য ৭০ জন শিক্ষক আবেদন করেছেন। পৌরসভার ফেনী সেন্ট্রাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মধ্য চাড়িপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ শহরের স্কুলগুলোতে শূন্য পদ পূরণ হলেও গ্রামের স্কুলগুলোতে রয়েছে শিক্ষক সংকট। এর ফলে গ্রামীণ এলাকাগুলোতে প্রাথমিকে শিক্ষার মান যেমন কমছে, তেমনি শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে ফেনী সদর সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ফেনী সদরে অন্য পাঁচ উপজেলা থেকে নিয়মিত শিক্ষক বদলি হয়ে আসছেন। এতে ভবিষ্যতে স্থানীয় চাকরিপ্রার্থীদের জন্য শূন্য পদ কমে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, স্বামী বা স্ত্রীর স্থায়ী ঠিকানায় বদলির একবার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এই সুযোগের অপব্যবহার করা হচ্ছে। অনেকে শহরে ফ্ল্যাট বা দোকান কিনে স্থায়ী ঠিকানা দেখিয়ে বদলির সুযোগ নিচ্ছেন। অনেকে আবার কাবিননামা জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে। মিজানুর রহমানের দাবি, স্থায়ী ঠিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন।

শিক্ষক সমিতির নেতারা বলছেন, নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি শিক্ষক ফেনী সদরে কর্মরত থাকলে নতুন করে অন্য উপজেলা থেকে শিক্ষক বদলি করার আগে বিষয়টি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁদের আশঙ্কা, নতুন করে বদলি হলে স্থানীয় শূন্য পদ আরও কমে যাবে। ফলে পরবর্তী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ফেনী সদরের জন্য পদসংখ্যাও কমতে পারে।

সুযোগ কমছে স্থানীয় প্রার্থীদের

ফেনী সদর উপজেলার চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফেনী সদরের ১৫১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদসংখ্যা ১ হাজার ৪৬টি। এ উপজেলার জনসংখ্যা ও প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শূন্য পদের সংখ্যা সীমিত। ফলে নিয়োগ পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করেও অনেক চাকরিপ্রার্থী কাক্সিক্ষত সুযোগ পাচ্ছেন না।

চাকরিপ্রার্থীরা বলছেন, উপজেলা-ভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থায় একটি উপজেলার শূন্য পদ অন্য উপজেলার তুলনায় কম হলে ওই উপজেলার প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এর সঙ্গে বদলির মাধ্যমে অন্য উপজেলার শিক্ষক এসে শূন্য পদ পূরণ করলে স্থানীয় প্রার্থীদের জন্য সুযোগ আরও সংকুচিত হয়।

এ ব্যাপারে জিয়াউল হক সাদ্দাম নামে এক চাকরিপ্রার্থী ফেসবুকে মন্তব্য করেন, এই বদলির কারণে সদরের পদ কমে মাত্র ৮ জন হয়ে যায়, যেখানে অন্য উপজেলায় ৩৫ থেকে ৪০টি শুন্য পদ ছিল। তাই পদ কমে যাওয়ায় সর্বোচ্চ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমি এই সম্মানজনক পেশায় যেতে পারিনি। লিখিত নম্বর ভালো ছিল, ভাইভা ভালো হওয়া সত্ত্বেও সদরের ভাগ্যবান ৮ জনের এক জন হতে পারিনি।


খোন্দকার মারুফ হোসেন নামে আরেকজন মন্তব্য করেন, আমাদের ফেনী সদরকে বাঁচাতে হবে। ভিন্ন উপজেলা, জেলার চাকুরিরত ব্যক্তিরা ফেনী সদর উপজেলায় এসে ভিড় করছে। যার ফলে সদরের স্থানীয় চাকুরিপ্রার্থীরা নিয়োগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ফেনী সদর তার স্বকীয়তা হারাবে। নিয়োগ ও বদলিতে স্থানীয়দের প্রাধান্য দিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে সদরের বিজয়সিংহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম বলেন, আমাদের সন্তানদের জন্য আগামীতে চাকরির সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। সদরে চাকরির কোটা কমে যাচ্ছে। এ বিষয়ে আমাদের সজাগ থাকতে হবে, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম যেন এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর মেধাক্রম, শূন্য পদ ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধিই চূড়ান্ত বিষয়। তাই বদলি ও নিয়োগের বিষয় দুটি আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দুই বছরে নিয়োগ পেয়েছেন ২৪ জন

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সদরে ১৫১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে-এ দুই বছরে নিয়োগ পেয়েছেন ২৪ জন শিক্ষক। চলতি বছরে গত ৯ জানুয়ারি প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

ফেনীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের ৯২টি শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। এর মধ্যে ফেনী সদর উপজেলায় ১৭টি, দাগনভূঞা উপজেলায় ১৬টি, সোনাগাজী উপজেলায় ৩১টি, ছাগলনাইয়া উপজেলায় ১৪টি, ফুলগাজী উপজেলায় ১২টি এবং পরশুরাম উপজেলায় ২টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে সোনাগাজীতে শূন্য পদ সবচেয়ে বেশি এবং পরশুরামে সবচেয়ে কম।


এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৩ মার্চ নিয়োগপ্রাপ্ত ১২৪ জন সহকারী শিক্ষকের মধ্যে ফেনী সদরে নিয়োগ পেয়েছেন মাত্র ৭ জন। এর মধ্যে দাগনভূঞায় ২২ জন, সোনাগাজীতে ৪৫ জন, ছাগলনাইয়ায় ১৫ জন, ফুলগাজীতে ২০ জন এবং পরশুরামে ১৫ জন নিয়োগ পেয়েছেন।

স্থানীয় চাকরিপ্রার্থীরা বলছেন, বদলির মাধ্যমে ফেনী সদরের শূন্য পদগুলো অন্য উপজেলার শিক্ষক দিয়ে পূরণ করা হলে ভবিষ্যৎ নিয়োগে স্থানীয় প্রার্থীদের জন্য পদসংখ্যা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থগিত বদলি কমিটির বৈঠক

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জেলা পর্যায়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পদায়ন ও বদলির জন্য গত ১৭ আগস্ট ৫ সদস্যের আবেদন যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি হচ্ছেন জেলা প্রশাসক মনিরা হক, সদস্য সচিব জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হৃষীকেশ শীল। সদস্যরা হলেনÑ জেলা শিক্ষা অফিসার মো. শফি উল্লাহ, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার ও জাতীয়বাদী কর আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি আরিফুল হাসান রবিন। গতকাল রোববার (২৩ আগস্ট) এ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। পরে জেলা প্রশাসক ও কমিটির সভাপতি মনিরা হক বৈঠকটি স্থগিত করেন।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হৃষীকেশ শীল জানান, বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। কবে তা করা হবে সেটি এখনো ঠিক করা হয়নি। বদলির জন্য ৬-৭টি আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মনসুর মেহেদী জানান, ইতিমধ্যে অন্য উপজেলা থেকে বদলি হয়ে আসা শিক্ষকের সংখ্যা তাঁদের হিসাবে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় নতুন করে বদলির আবেদন অনুমোদনের আগে নীতিমালায় নির্ধারিত সীমা, আবেদনকারীর প্রকৃত স্থায়ী ঠিকানা এবং বদলির কারণ যাচাই করা প্রয়োজন। আমরা চাই না নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো শিক্ষককে ফেনী সদরে বদলি করা হোক। নীতিমালা অনুযায়ী বদলি হলে আমাদের আপত্তি নেই।

বদলিতে অনিয়ম ও তথ্য গোপনের অভিযোগ

বদলিতে অনিয়ম ও তথ্য গোপনের অভিযোগ করেছেন শিক্ষক সমিতির নেতারা। তাদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের আগস্টে নৈরাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক তাহমিনা আক্তার রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলির আবেদন করেন। একই বিদ্যালয়ের যোগদানের জন্য আবেদন করেন পূর্ব ছনুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক জিন্নাত আরা বেগম, সুবলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক রত্না চক্রবর্তী। তখন অনলাইনে বদলির সর্বোচ্চ ৫২ দশমিক ১৬ স্কোর পান রত্না চক্রবর্তী, জিন্নাত আরা বেগম পান ৫১ দশমিক ১১ ও তাহমিনা আক্তার পান ৪৮ দশমিক ৫৪। অদৃশ্য কারণে উপজেলা শিক্ষা অফিসার খালেদা পারভীন তাহমিনা আক্তারে ওই বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেন। জানা গেছে, তাহমিনা আক্তারের গ্রামের বাড়ি দাগনভূঞা হলেও স্বামীর স্থায়ী ঠিকানায় একবার বদলি হওয়ার নীতিমালা থাকলেও তিনি দুইবার বদলি হয়েছে। তার বদলির আবেদনে স্কুল থেকে বাসার দুরুত্ব দেখানো হয়েছে ২২ কিলোমিটার, প্রকৃতপক্ষে যা হবে ১৬ কিলোমিটার।

একইভাবে ফুলগাজীর বাসিন্দা কাজী মেহেরুন্নেসার স্বামী প্রবাসী। তিনি মিথ্যা তথ্যে সদরের দক্ষিণ কাশিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়েছেন। ২০২০ সালে পাইলট স্কুলে বদলি হন তাকিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মিনাক্ষী দেবী। তাকে যোগদান করতে না গিয়ে সোনাগাজীর আমিরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ওই স্কুলে যোগ দেন অর্জুন কুমার নাথ। চলতি বছরের ২১ এপ্রিল স্বামীর কর্মস্থল নোয়াখালীর মাইজদী থেকে ফেনী পাইলট আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন ফারহানা ইয়াসমিন। একই বিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের ৭ এপ্রিল যোগদান করেন বিবি আয়েশা। তাদের গ্রামের বাড়ি সোনাগাজীর মোহাম্মদপুরে। তার বোন বিবি ফাতেমা যোগদান করেন বটতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তার আরেক বোন বিবি আয়েশা সোনাগাজীতে থেকে সদরে বদলি হতে জোর তদবির করছেন। একইভাবে সোনাগাজী থেকে পাঁচগাছিয়ার ডুমুরুয়া সরকারি প্রাথমিকে বিদ্যালয়ে বদলি হয়েছেন জয়নাল আবেদীন।


বদলি প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার দাবি

শিক্ষক সমিতি ও স্থানীয় চাকরিপ্রার্থীদের দাবি, বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি আবেদন যথাযথভাবে যাচাই করা দরকার। বিশেষ করে স্বামী বা স্ত্রীর স্থায়ী ঠিকানার ভিত্তিতে বদলির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও স্থায়ী ঠিকানার সত্যতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাদের দাবি, একদিকে কর্মরত শিক্ষকদের বদলি ও পদায়নের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে, অন্যদিকে স্থানীয় প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়োগের সুযোগ যাতে অযথা সংকুচিত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ফেনী সদরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত শূন্য পদ, কর্মরত শিক্ষকদের উপজেলাভিত্তিক অবস্থান এবং বদলি নীতিমালায় নির্ধারিত সীমাÑএই তিনটি বিষয় সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করলেই পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।


দৈনিক ফেনী

সম্পাদক ও প্রকাশক: আরিফুল আমীন রিজভী কর্তৃক পপুলার অফসেট প্রেস, মিজান রোড, ফেনী-৩৯০০ থেকে মুদ্রিত এবং ৪৩৪, আমিন টাওয়ার (৬ষ্ঠ তলা), ট্রাংক রোড, ফেনী হতে প্রকাশিত।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী
ফেনী সদরে বদলির হিড়িক, বঞ্চিত স্থানীয়রা
0:00 0:00
1.0x