ফেনী    রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক ফেনী

প্রাথমিক

‘গুণী শিক্ষক’ নির্বাচনে বিতর্ক, বাদ পড়লেন ফেনীর প্রাথমিক শিক্ষকরা

বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের জেরে ফেনীতে এবার জেলা পর্যায়ে প্রাথমিকে গুণী শিক্ষক নির্বাচন করা হয়নি। ফলে বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ের গুণী শিক্ষক নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন জেলার প্রাথমিক শিক্ষকরা। এ ঘটনায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন তারা।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ফেনীর ছয় উপজেলায় তিনজন করে গুণী শিক্ষক নির্বাচন করা হয়। এর মধ্যে ফেনী সদর উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচিত তিন শিক্ষককে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ করেন বাছাইয়ে বাদ পড়া শিক্ষকরা। এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় জেলা পর্যায়ে গুণী শিক্ষক নির্বাচন প্রক্রিয়া আর এগোয়নি। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিভাগীয় পর্যায়ে কোনো শিক্ষকের নাম পাঠাতে পারেনি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।এ ব্যাপারে সদ্য বিদায়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হৃষীকেশ শীল বলেন, বিতর্কের অভিযোগের কারণে ফেনীতে গুণী শিক্ষক নির্বাচন করা হয়নি। নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ায় জেলা পর্যায়ে নির্বাচন করে বিভাগীয় পর্যায়ে নাম পাঠানো সম্ভব হয়নি। যারা গুণী শিক্ষক বাছাই প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করেছেন, তাদের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা নাসরীন কান্তা বলেন, স্বচ্ছভাবে ফেনী সদর উপজেলায় তিনজন গুণী শিক্ষক বাছাই করা হয়েছে। বাছাই নিয়ে বাদ পড়া তিন শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রচার করেন। তাদের কারণে গুণী শিক্ষক নির্বাচিত হওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন অন্য শিক্ষকরা।তিনি আরও বলেন, ওই তিন শিক্ষককে তার কার্যালয়ে ডেকে বাছাই প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জবাব দিতে বলা হয়েছিল। জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) বলা হয়েছে।এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) রিফাত আসমা দৈনিক ফেনীকে বলেন, ফেনী প্রাথমিকে উপজেলা পর্যায়ে গুণী শিক্ষক বাছাইয়ের নাম কেন পাঠানো হয়নি সেটি খতিয়ে দেখা হবে।এই নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষকরা বলছেন, ফেনীতে জেলা পর্যায়ে গুণী শিক্ষক নির্বাচন না হওয়ায় প্রকৃত যোগ্য শিক্ষকরা সম্মাননা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।নির্বাচিত হওয়ার পরও অংশ নিতে না পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন বিজয়সিংহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম বলেন, তিনি ২০২৫ সালেও জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিভাগীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। এবারও তিনি সদরে গুণী শিক্ষক নির্বাচিত হলেও জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বাছাইয়ে বাদ পড়া কিছু শিক্ষকের কারণে বঞ্চিত হয়েছি আমরা।এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব বলেন, ফেনীর ৬ উপজেলা থেকে গুণী শিক্ষক বাছাই করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে পাঠানো হয়েছে। সদরে বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে বাদ পড়া শিক্ষকদের অভিযোগের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে জেলা পর্যায়ে গুণী শিক্ষক বাছাই করেনি জেলা কমিটি। তিনি আরও বলেন, সদর বাদ দিয়ে বাকী উপজেলা থেকে বাছাই করে জেলা পর্যায়ে গুণী শিক্ষক নির্বাচন করে বিভাগীয় পর্যায়ে পাঠাতে পারত শিক্ষা অফিস।প্রসঙ্গত, ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে ১২ জনের পরিবর্তে এই বছর ১০০ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। নির্বাচিত প্রত্যেক শিক্ষক এক লাখ টাকা করে অর্থ পুরস্কার পাবেন। গুণী শিক্ষক বাছাইয়ের জন্য গত ১৭ সেপ্টেম্বর সময়সূচি নির্ধারণ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এজন্য উপজেলা পর্যায়ে ২০ সেপ্টেম্বর, জেলা পর্যায়ে ২১ সেপ্টেম্বর, বিভাগীয় পর্যায়ে ২২ সেপ্টেম্বর এবং জাতীয় পর্যায়ে ২৪ সেপ্টেম্বর গুণী শিক্ষক বাছাইয়ের জন্য তারিখ নির্ধারিত ছিল।শিক্ষা কর্মকর্তারা বললেন-বাছাইয়ে অনিয়ম হয়নিগত ২১ সেপ্টেম্বর সকালে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে গুণী শিক্ষক বাছাই প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কাশেম, বিপুল চন্দ্র দাস ও আক্তার জাহান মুনমুন এবং সহকারী শিক্ষক সহদেব চন্দ্র দাস, নজরুল ইসলাম ভূঁঞা ও কাজী মেহেরুন নেসা অংশ নেন।বাছাই শেষে বিজয়সিংহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম, দক্ষিণ কাশিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আক্তার জাহান মুনমুন এবং সুলতানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সহদেব চন্দ্র দাসের নাম চূড়ান্ত করে জেলা কমিটির কাছে পাঠানো হয়।তবে বাছাই প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এনে গত ২২ সেপ্টেম্বর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন বাছাইয়ে বাদ পড়া কাজিরবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিপুল চন্দ্র দাস, দক্ষিণ কাশিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কাজী মেহেরুন নেসা এবং উত্তর ধলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নজরুল ইসলাম ভূঁঞা।তবে বাছাই প্রক্রিয়া কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করছেন শিক্ষা কর্মকর্তারা। এ প্রসঙ্গে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খালেদা পারভীন বলেন, তিনজন প্রধান শিক্ষকের মধ্যে কাজিরবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিপুল চন্দ্র দাস তদবির করার কারণে বাদ পড়েন। অপর দুই প্রধান শিক্ষক ও একজন সহকারী শিক্ষকের মধ্যে সহকারী শিক্ষক সহদেব চন্দ্র দাসের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, সঠিকভাবেই গুণী শিক্ষক নির্বাচন করা হয়েছে। কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়নি। অভিযোগকারী তিন শিক্ষক ফেনীর সুনাম নষ্ট করেছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

‘গুণী শিক্ষক’ নির্বাচনে বিতর্ক, বাদ পড়লেন ফেনীর প্রাথমিক শিক্ষকরা