ফেনী    রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক ফেনী

ভয়াবহ বন্যার দুই বছর পরও ফেরেনি স্বস্তি

এখনো ঝুঁকিতে নদীতীরের জনপদ



এখনো ঝুঁকিতে নদীতীরের জনপদ
ছবি: দৈনিক ফেনী

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দে ঘুম ভেঙে যায় পরিবারের সবার। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরের ভেতর ঢুকতে শুরু করে হু হু করে পানি। প্রথমে পা, এরপর হাঁটু, একসময় গলা সমান পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ছকিনা বেগমকে। নিজের রোজগারের অবলম্বন গরুগুলোকে গোয়ালঘর থেকে বের করে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার সেই দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম অলকা গ্রামের ছকিনা বেগমকে।

দৈনিক ফেনীকে তিনি বলেন, সেদিন রাতে হঠাৎ করে পানি বাড়তে শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরে পানি ঢুকে যায়। গরুগুলো নিয়ে কোথায় যাব, কী করব কিছুই বুঝতে পারিনি। সেই রাতের কথা মনে পড়লে এখনো ভয় লাগে।

তার বাড়ির পশ্চিম পাশে মুহুরী নদীর আলতাফ আলী চৌধুরী বাড়ির সংলগ্ন বেড়িবাঁধের প্রায় ২০০ মিটার অংশ সেইবার ভেঙে যায়। স্থানীয়দের মতে, মুহুরী নদীর ভাঙনগুলোর মধ্যে এটি ছিল অন্যতম বড় ভাঙন।

নদীতীরের আরেক বাসিন্দা শাহেনা বেগম বলেন, বাঁধ ভাঙার পর পানি এত দ্রুত ঢুকেছিল যে অনেকেই ঘর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করার সময় পাননি। এখনো বর্ষা এলে মনে হয় আবার যদি বাঁধ ভেঙে যায়।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে তিন দফা বন্যায় পরশুরাম-ফুলগাজীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বেড়িবাঁধের শতাধিক স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরবর্তী হিসাবে ভাঙনস্থলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০২টি। এর মধ্যে জুলাইয়ের প্রথম দফাতেই মুহুরী নদীর ১২টি স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছিল।

মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে শুরুতে তৃতীয় দফায় ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছিল জেলার পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ। টানা বৃষ্টি ও ভারতের উজানের পানিতে ১৯ আগস্ট দুপুর থেকে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙন স্থান দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। এতে তিন উপজেলার রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে যায়। লোকালয়ে পানি ঢুকে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক সড়ক ও উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়কে বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল বিদ্যুৎ সংযোগও। ভয়াবহ এই বন্যায় বানভাসি মানুষদের উদ্ধারে ২১ আগস্ট দুপুর আড়াইটা থেকে কাজ শুরু করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিজিবি।

স্মরণকালের ভয়াবহ এ বন্যায় জেলায় প্রাণ হারান ২৯ জন। এছাড়াও বন্যায় সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মোটরযান, ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ প্রায় প্রত্যেক খাতেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে শত কোটি টাকা। ১৯ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এ বন্যায় গ্রাম ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে ডুবেছে জেলা শহরসহ প্রায় ছয় উপজেলাই। পানিবন্দি ছিলেন জেলার ১০ লাখের বেশি মানুষ। বন্যার্ত মানুষদের উদ্ধার ও সহায়তায় এগিয়ে আসেন সারা দেশের হাজারো মানুষ। স্থানীয়দের কাছে সেই বন্যার সবচেয়ে ভয়াবহ স্মৃতির নাম বল্লামুখা বাঁধের ভাঙন। সেই বাঁধের ভাঙনে লোকালয়ে এক রাতেই বদলে যায় চেনা জনপদের চিত্র।

সাতকুচিয়া গ্রামের বাসিন্দা নুরুল হক বলেন, রাতের মধ্যে চারদিক পানি হয়ে গিয়েছিল। ঘর থেকে বের হওয়ার রাস্তা ছিল না। পরে নৌকা নিয়ে এসে মানুষকে উদ্ধার করতে হয়েছে। ওই সময় মনে হয়েছিল, আর হয়তো ঘরে ফিরতে পারব না।

বন্যায় পানিবন্দী ছিলেন দক্ষিণ শালধরের আজরের নেছা। তিনি বলেন, কয়েক দিন ঘরের মধ্যে আটকা ছিলাম। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট ছিল। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ছিলাম।

আলমগীর নামে এক মৎস্যচাষি বলেন, পুকুরের সব মাছ ভেসে গিয়েছিল। ওই মাছের আয়ের ওপরই সংসার চলত। বন্যার পর আবার নতুন করে শুরু করতে হয়েছে।

বন্যার ধাক্কা লাগে স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থাতেও। এলজিইডির উপজেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মির্জানগর, চিথলিয়া, বক্সমাহমুদ ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় প্রায় ৯৫ কিলোমিটার সড়ক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়ক একপর্যায়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পরে এসব সড়কের বিভিন্ন অংশ মেরামত করা হয়েছে।

উত্তর কাউতলীর বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, সড়ক এখন অনেকটা ঠিক হয়েছে। কিন্তু বন্যার পানি আবার বাড়লে সড়কের পাশাপাশি বাঁধও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শুধু সড়ক মেরামত নয়, নদীর দিকও দেখতে হবে।

এখনো কাটেনি আতঙ্ক

স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার দুই বছর পার হলেও এখনো বর্ষা ও উজানের ঢল নামলেই নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়। এর প্রমাণও মিলেছে ২০২৫ সালের জুনে। ওই সময় মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীর বাঁধের কয়েকটি স্থানে ফের ভাঙন দেখা দেয়।

উত্তর কোলাপাড়ার কহুয়া নদীতীরের বাসিন্দা আবুল হো বলেন, বাঁধ মেরামত হয়েছে শুনলেও আমাদের ভয় যায়নি। কারণ বর্ষা এলেই নদীর পানি বাড়ে। কোথায় আবার ভাঙন দেখা দেয়, সেই চিন্তায় থাকতে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু বাঁধ ভেঙে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন টেকসইভাবে বাঁধ নির্মাণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নদী খনন, পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

পশ্চিম অলকা গ্রামের মাসুম চৌধুরীর বাড়ির পাশে ভেঙে ছিল মুহুরী নদীর বাঁধ। তিনি বলেন, প্রতিবার বন্যার পর বাঁধ মেরামত করা হয়। কিন্তু কয়েক বছর পর আবার সমস্যা দেখা দেয়। স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণ ও নদীর নাব্যতা ঠিক করা হলে আমাদের দুর্ভোগ অনেক কমবে। নিরাপদে থাকার নিশ্চয়তা চাই। এমন ব্যবস্থা চাই, যাতে বর্ষা এলেই ঘর ছেড়ে পালানোর চিন্তা করতে না হয়।

সরকারি বিভিন্ন তথ্যেও ২০২৪ সালের বন্যায় ফেনীর পরশুরাম ও ফুলগাজীর ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতার চিত্রও উঠে এসেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের মধ্যে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর প্রায় ২৪ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার অংশ পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরে বেশির ভাগ অংশ মেরামত করা হলেও ১০ থেকে ১২টি অংশে কাজ না হওয়ার তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। বর্তমানে পাউবোর বক্তব্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো ইতিমধ্যে মেরামত করা হয়েছে।

তবে বাঁধের স্থায়ী সমাধানের প্রশ্নে এখনো অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ২০২৪ সালের বন্যার পর চলতি বছরের ১৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেকের এক সভায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ এখনো শুরু হয়নি। এ প্রকল্পটির মাধ্যমে ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন, ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণ করা হবে।

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো ইতোমধ্যে মেরামত করা হয়েছে। এরপরও নদীর পানির স্তর ওঠানামার ওপর বাঁধের ঝুঁকির বিষয়টি নির্ভর করছে।

বন্যার পরপরই ২৪ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেগুলোর কোনো অগ্রগতি আছে কি না-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের মাধ্যমে মূলত স্থায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ তৈরি হবে।

কৃষিজমিতে ৫-৭ ফুট বালু

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে তিন দফা বন্যায় পরশুরামের মির্জানগর, চিথলিয়া, বক্সমাহমুদ ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার কৃষিজমি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেড়িবাঁধের ভাঙন দিয়ে তীব্র স্রোতে আসা বন্যার পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বালু ঢুকে পড়ে আবাদি জমিতে। স্থানীয় কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, পরশুরামের বিভিন্ন এলাকায় কোথাও কোথাও ৫ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত বালু জমে যায়।

নিজ কালিকাপুর গ্রামের কৃষক সোহরাব হোসেন বলেন, জমিতে এত বালু পড়েছে যে এখন আর আগের মতো ফসল হচ্ছে না। জমি পরিষ্কার করতে অনেক টাকা লাগে। নিজের পক্ষে সেই খরচ বহন করা কঠিন।

পশ্চিম অলকার কৃষক কবির আহমেদ বলেন, জমি আছে, কিন্তু ঠিকমতো চাষ করতে পারছি না। বালুর কারণে ফলন কমে গেছে। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা না নিলে আমাদের এই ক্ষতি থেকেই যাবে।

কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে অনেক জমি বালুমুক্ত করে চাষাবাদের উপযোগী করার কথা বলা হলেও স্থানীয় কৃষকদের দাবি, পশ্চিম অলকা, নিজ কালিকাপুরসহ কয়েকটি এলাকায় এখনো জমিতে বালুর স্তর রয়েছে। ফলে বন্যার পানি নেমে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটি অংশ এখনো স্বাভাবিক চাষাবাদে পুরোপুরি ফিরতে পারেনি।

স্বাভাবিক হয়নি জীবিকা

ভয়াবহ সেই বন্যার পর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো হয়। পরশুরাম উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরশুরামে সরকারি উদ্যোগে ১৪০ বান্ডিল এবং বেসরকারিভাবে ১৩০ বান্ডিল ঢেউটিন বিতরণ করা হয়। সরকারি উদ্যোগে ৩০টি আধাপাকা ঘর এবং বেসরকারিভাবে প্রায় ৮০০টি টিনের ঘর নির্মাণ বা সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রায় পাঁচ হাজার খাবার প্যাকেট বিতরণ করা হয়।

এছাড়া উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ইউনিসেফের অর্থায়নে ৪০টি ইমপ্রুভড টয়লেট, ৪০টি টিউবওয়েল, উঁচু পাটাতনবিশিষ্ট ২০টি গভীর নলকূপ ও তিনটি সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়। কমিউনিটি পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রায় ১০০ পরিবারকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থাও করা হয়।

চারিগ্রামের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, বন্যার পর সহযোগিতা পাওয়ায় অনেকটা উপকার হয়েছে। কিন্তু ক্ষতি ছিল অনেক বেশি। ঘর-সংসার ও আয়-রোজগার পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন।

উত্তর শালধরের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিমল পাল বলেন, সহায়তা পেয়েছি, কিন্তু ঘর-সংসার ও আয়-রোজগার আগের অবস্থায় ফিরতে অনেক সময় লেগেছে। এখনো আগের মতো স্বচ্ছল হতে পারিনি।

এখনো ক্ষতিগ্রস্ত কিছু সড়ক

২০২৪ সালের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় পরশুরামের মির্জানগর, চিথলিয়া, বক্সমাহমুদ ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। পানি ঢুকে বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় একপর্যায়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। অনেক এলাকায় বন্যার পানিতে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পানিবন্দী মানুষের পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে চলাচলকারী মানুষকেও দুর্ভোগে পড়তে হয়।

এলজিইডির উপজেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় উপজেলায় মোট প্রায় ৯৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের বিভিন্ন অংশ মেরামত করা হয়।

স্থানীয়দের মতে, নদীর পানি বাড়লে শুধু বাঁধ নয়, সড়ক যোগাযোগও নতুন করে ঝুঁকিতে পড়ে। তাই বন্যা মোকাবিলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নদী ও বাঁধের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর স্থায়িত্বও নিশ্চিত করা জরুরি।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মির্জানগর ইউনিয়নের উত্তর কাউতলির বেশ কয়েকটি সড়ক, মধ্যম মনিপুর, বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের জমিয়ারগাঁও বাগমারা গ্রামের রাজেন্দ্র বৈদ্ধ সড়ক, চিথলিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম অলকা, পূর্ব অলকা, নোয়াপুর, দূর্গাপুরসহ উপজেলার বেশ কয়েকটি সড়কে এখনো বেহাল দশা। দীর্ঘ সময়েও সংস্কার না হওয়ায় ভোগান্তি নিয়ে যাতায়াত করছে স্থানীয় মানুষজন।

উত্তর কাউতলীর বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, সড়ক এখন অনেকটা ঠিক হয়েছে। কিন্তু বন্যার পানি আবার বাড়লে সড়কের পাশাপাশি বাঁধও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শুধু সড়ক মেরামত নয়, নদীর দিকটাও দেখতে হবে।

পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতনু বড়ুয়া জানান, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় যেসব সড়ক এখনো ক্ষতিগ্রস্ত রয়ে গেছে, সেগুলোর তালিকা তৈরি করে মেরামত ও সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

দৈনিক ফেনী

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬


এখনো ঝুঁকিতে নদীতীরের জনপদ

প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬

featured Image

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দে ঘুম ভেঙে যায় পরিবারের সবার। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরের ভেতর ঢুকতে শুরু করে হু হু করে পানি। প্রথমে পা, এরপর হাঁটু, একসময় গলা সমান পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ছকিনা বেগমকে। নিজের রোজগারের অবলম্বন গরুগুলোকে গোয়ালঘর থেকে বের করে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার সেই দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম অলকা গ্রামের ছকিনা বেগমকে।

দৈনিক ফেনীকে তিনি বলেন, সেদিন রাতে হঠাৎ করে পানি বাড়তে শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরে পানি ঢুকে যায়। গরুগুলো নিয়ে কোথায় যাব, কী করব কিছুই বুঝতে পারিনি। সেই রাতের কথা মনে পড়লে এখনো ভয় লাগে।

তার বাড়ির পশ্চিম পাশে মুহুরী নদীর আলতাফ আলী চৌধুরী বাড়ির সংলগ্ন বেড়িবাঁধের প্রায় ২০০ মিটার অংশ সেইবার ভেঙে যায়। স্থানীয়দের মতে, মুহুরী নদীর ভাঙনগুলোর মধ্যে এটি ছিল অন্যতম বড় ভাঙন।

নদীতীরের আরেক বাসিন্দা শাহেনা বেগম বলেন, বাঁধ ভাঙার পর পানি এত দ্রুত ঢুকেছিল যে অনেকেই ঘর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করার সময় পাননি। এখনো বর্ষা এলে মনে হয় আবার যদি বাঁধ ভেঙে যায়।


২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে তিন দফা বন্যায় পরশুরাম-ফুলগাজীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বেড়িবাঁধের শতাধিক স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরবর্তী হিসাবে ভাঙনস্থলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০২টি। এর মধ্যে জুলাইয়ের প্রথম দফাতেই মুহুরী নদীর ১২টি স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছিল।

মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে শুরুতে তৃতীয় দফায় ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছিল জেলার পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ। টানা বৃষ্টি ও ভারতের উজানের পানিতে ১৯ আগস্ট দুপুর থেকে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙন স্থান দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। এতে তিন উপজেলার রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে যায়। লোকালয়ে পানি ঢুকে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক সড়ক ও উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়কে বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল বিদ্যুৎ সংযোগও। ভয়াবহ এই বন্যায় বানভাসি মানুষদের উদ্ধারে ২১ আগস্ট দুপুর আড়াইটা থেকে কাজ শুরু করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিজিবি।

স্মরণকালের ভয়াবহ এ বন্যায় জেলায় প্রাণ হারান ২৯ জন। এছাড়াও বন্যায় সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মোটরযান, ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ প্রায় প্রত্যেক খাতেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে শত কোটি টাকা। ১৯ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এ বন্যায় গ্রাম ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে ডুবেছে জেলা শহরসহ প্রায় ছয় উপজেলাই। পানিবন্দি ছিলেন জেলার ১০ লাখের বেশি মানুষ। বন্যার্ত মানুষদের উদ্ধার ও সহায়তায় এগিয়ে আসেন সারা দেশের হাজারো মানুষ। স্থানীয়দের কাছে সেই বন্যার সবচেয়ে ভয়াবহ স্মৃতির নাম বল্লামুখা বাঁধের ভাঙন। সেই বাঁধের ভাঙনে লোকালয়ে এক রাতেই বদলে যায় চেনা জনপদের চিত্র।

সাতকুচিয়া গ্রামের বাসিন্দা নুরুল হক বলেন, রাতের মধ্যে চারদিক পানি হয়ে গিয়েছিল। ঘর থেকে বের হওয়ার রাস্তা ছিল না। পরে নৌকা নিয়ে এসে মানুষকে উদ্ধার করতে হয়েছে। ওই সময় মনে হয়েছিল, আর হয়তো ঘরে ফিরতে পারব না।

বন্যায় পানিবন্দী ছিলেন দক্ষিণ শালধরের আজরের নেছা। তিনি বলেন, কয়েক দিন ঘরের মধ্যে আটকা ছিলাম। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট ছিল। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ছিলাম।

আলমগীর নামে এক মৎস্যচাষি বলেন, পুকুরের সব মাছ ভেসে গিয়েছিল। ওই মাছের আয়ের ওপরই সংসার চলত। বন্যার পর আবার নতুন করে শুরু করতে হয়েছে।

বন্যার ধাক্কা লাগে স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থাতেও। এলজিইডির উপজেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মির্জানগর, চিথলিয়া, বক্সমাহমুদ ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় প্রায় ৯৫ কিলোমিটার সড়ক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়ক একপর্যায়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পরে এসব সড়কের বিভিন্ন অংশ মেরামত করা হয়েছে।

উত্তর কাউতলীর বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, সড়ক এখন অনেকটা ঠিক হয়েছে। কিন্তু বন্যার পানি আবার বাড়লে সড়কের পাশাপাশি বাঁধও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শুধু সড়ক মেরামত নয়, নদীর দিকও দেখতে হবে।

এখনো কাটেনি আতঙ্ক

স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার দুই বছর পার হলেও এখনো বর্ষা ও উজানের ঢল নামলেই নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়। এর প্রমাণও মিলেছে ২০২৫ সালের জুনে। ওই সময় মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীর বাঁধের কয়েকটি স্থানে ফের ভাঙন দেখা দেয়।

উত্তর কোলাপাড়ার কহুয়া নদীতীরের বাসিন্দা আবুল হো বলেন, বাঁধ মেরামত হয়েছে শুনলেও আমাদের ভয় যায়নি। কারণ বর্ষা এলেই নদীর পানি বাড়ে। কোথায় আবার ভাঙন দেখা দেয়, সেই চিন্তায় থাকতে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু বাঁধ ভেঙে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন টেকসইভাবে বাঁধ নির্মাণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নদী খনন, পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

পশ্চিম অলকা গ্রামের মাসুম চৌধুরীর বাড়ির পাশে ভেঙে ছিল মুহুরী নদীর বাঁধ। তিনি বলেন, প্রতিবার বন্যার পর বাঁধ মেরামত করা হয়। কিন্তু কয়েক বছর পর আবার সমস্যা দেখা দেয়। স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণ ও নদীর নাব্যতা ঠিক করা হলে আমাদের দুর্ভোগ অনেক কমবে। নিরাপদে থাকার নিশ্চয়তা চাই। এমন ব্যবস্থা চাই, যাতে বর্ষা এলেই ঘর ছেড়ে পালানোর চিন্তা করতে না হয়।

সরকারি বিভিন্ন তথ্যেও ২০২৪ সালের বন্যায় ফেনীর পরশুরাম ও ফুলগাজীর ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতার চিত্রও উঠে এসেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের মধ্যে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর প্রায় ২৪ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার অংশ পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরে বেশির ভাগ অংশ মেরামত করা হলেও ১০ থেকে ১২টি অংশে কাজ না হওয়ার তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। বর্তমানে পাউবোর বক্তব্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো ইতিমধ্যে মেরামত করা হয়েছে।

তবে বাঁধের স্থায়ী সমাধানের প্রশ্নে এখনো অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ২০২৪ সালের বন্যার পর চলতি বছরের ১৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেকের এক সভায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ এখনো শুরু হয়নি। এ প্রকল্পটির মাধ্যমে ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন, ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণ করা হবে।

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো ইতোমধ্যে মেরামত করা হয়েছে। এরপরও নদীর পানির স্তর ওঠানামার ওপর বাঁধের ঝুঁকির বিষয়টি নির্ভর করছে।

বন্যার পরপরই ২৪ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেগুলোর কোনো অগ্রগতি আছে কি না-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের মাধ্যমে মূলত স্থায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ তৈরি হবে।

কৃষিজমিতে ৫-৭ ফুট বালু

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে তিন দফা বন্যায় পরশুরামের মির্জানগর, চিথলিয়া, বক্সমাহমুদ ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার কৃষিজমি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেড়িবাঁধের ভাঙন দিয়ে তীব্র স্রোতে আসা বন্যার পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বালু ঢুকে পড়ে আবাদি জমিতে। স্থানীয় কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, পরশুরামের বিভিন্ন এলাকায় কোথাও কোথাও ৫ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত বালু জমে যায়।

নিজ কালিকাপুর গ্রামের কৃষক সোহরাব হোসেন বলেন, জমিতে এত বালু পড়েছে যে এখন আর আগের মতো ফসল হচ্ছে না। জমি পরিষ্কার করতে অনেক টাকা লাগে। নিজের পক্ষে সেই খরচ বহন করা কঠিন।

পশ্চিম অলকার কৃষক কবির আহমেদ বলেন, জমি আছে, কিন্তু ঠিকমতো চাষ করতে পারছি না। বালুর কারণে ফলন কমে গেছে। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা না নিলে আমাদের এই ক্ষতি থেকেই যাবে।

কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে অনেক জমি বালুমুক্ত করে চাষাবাদের উপযোগী করার কথা বলা হলেও স্থানীয় কৃষকদের দাবি, পশ্চিম অলকা, নিজ কালিকাপুরসহ কয়েকটি এলাকায় এখনো জমিতে বালুর স্তর রয়েছে। ফলে বন্যার পানি নেমে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটি অংশ এখনো স্বাভাবিক চাষাবাদে পুরোপুরি ফিরতে পারেনি।

স্বাভাবিক হয়নি জীবিকা

ভয়াবহ সেই বন্যার পর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো হয়। পরশুরাম উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরশুরামে সরকারি উদ্যোগে ১৪০ বান্ডিল এবং বেসরকারিভাবে ১৩০ বান্ডিল ঢেউটিন বিতরণ করা হয়। সরকারি উদ্যোগে ৩০টি আধাপাকা ঘর এবং বেসরকারিভাবে প্রায় ৮০০টি টিনের ঘর নির্মাণ বা সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রায় পাঁচ হাজার খাবার প্যাকেট বিতরণ করা হয়।

এছাড়া উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ইউনিসেফের অর্থায়নে ৪০টি ইমপ্রুভড টয়লেট, ৪০টি টিউবওয়েল, উঁচু পাটাতনবিশিষ্ট ২০টি গভীর নলকূপ ও তিনটি সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়। কমিউনিটি পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রায় ১০০ পরিবারকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থাও করা হয়।

চারিগ্রামের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, বন্যার পর সহযোগিতা পাওয়ায় অনেকটা উপকার হয়েছে। কিন্তু ক্ষতি ছিল অনেক বেশি। ঘর-সংসার ও আয়-রোজগার পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন।

উত্তর শালধরের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিমল পাল বলেন, সহায়তা পেয়েছি, কিন্তু ঘর-সংসার ও আয়-রোজগার আগের অবস্থায় ফিরতে অনেক সময় লেগেছে। এখনো আগের মতো স্বচ্ছল হতে পারিনি।

এখনো ক্ষতিগ্রস্ত কিছু সড়ক

২০২৪ সালের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় পরশুরামের মির্জানগর, চিথলিয়া, বক্সমাহমুদ ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। পানি ঢুকে বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় একপর্যায়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। অনেক এলাকায় বন্যার পানিতে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পানিবন্দী মানুষের পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে চলাচলকারী মানুষকেও দুর্ভোগে পড়তে হয়।

এলজিইডির উপজেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় উপজেলায় মোট প্রায় ৯৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের বিভিন্ন অংশ মেরামত করা হয়।

স্থানীয়দের মতে, নদীর পানি বাড়লে শুধু বাঁধ নয়, সড়ক যোগাযোগও নতুন করে ঝুঁকিতে পড়ে। তাই বন্যা মোকাবিলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নদী ও বাঁধের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর স্থায়িত্বও নিশ্চিত করা জরুরি।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মির্জানগর ইউনিয়নের উত্তর কাউতলির বেশ কয়েকটি সড়ক, মধ্যম মনিপুর, বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের জমিয়ারগাঁও বাগমারা গ্রামের রাজেন্দ্র বৈদ্ধ সড়ক, চিথলিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম অলকা, পূর্ব অলকা, নোয়াপুর, দূর্গাপুরসহ উপজেলার বেশ কয়েকটি সড়কে এখনো বেহাল দশা। দীর্ঘ সময়েও সংস্কার না হওয়ায় ভোগান্তি নিয়ে যাতায়াত করছে স্থানীয় মানুষজন।

উত্তর কাউতলীর বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, সড়ক এখন অনেকটা ঠিক হয়েছে। কিন্তু বন্যার পানি আবার বাড়লে সড়কের পাশাপাশি বাঁধও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শুধু সড়ক মেরামত নয়, নদীর দিকটাও দেখতে হবে।

পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতনু বড়ুয়া জানান, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় যেসব সড়ক এখনো ক্ষতিগ্রস্ত রয়ে গেছে, সেগুলোর তালিকা তৈরি করে মেরামত ও সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।


দৈনিক ফেনী

সম্পাদক ও প্রকাশক: আরিফুল আমীন রিজভী কর্তৃক পপুলার অফসেট প্রেস, মিজান রোড, ফেনী-৩৯০০ থেকে মুদ্রিত এবং ৪৩৪, আমিন টাওয়ার (৬ষ্ঠ তলা), ট্রাংক রোড, ফেনী হতে প্রকাশিত।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী
এখনো ঝুঁকিতে নদীতীরের জনপদ
0:00 0:00
1.0x