দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর ২৭ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে দুর্ঘটনার মাত্রা ব্যাপক হারে বেড়েছে। পরিবহন চালকরা বলছেন, বৃষ্টিতে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে মহাসড়কের পরিস্থিতি। মহাসড়কের ২৭ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় খানাখন্দ। কোথাও রাস্তার গর্তে জমে আছে বৃষ্টির পানি, কোথাও উঠে গেছে কার্পেটিং। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি প্রায়ই মহাসড়কের ফেনী অংশে ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এতে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ, আহতদের সংখ্যাও অগণিত। তবে সড়ক ও জনপথ বিভাগ মহাসড়ক সংস্কারে কাজ করছে বললেও সরেজমিনে দেখা গেছে মহাসড়কের বেহাল পরিস্থিতির চিত্র।
গতকাল শনিবার (১৮ জুলাই) মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে, মহাসড়কের ফেনীর নতুন সমিতি বাজার থেকে মুহুরীগঞ্জ, কসকা থেকে লেমুয়া সেতু এবং লেমুয়া সেতু থেকে লালপোল পর্যন্ত রাস্তা জুড়ে এখনো রয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ। বৃষ্টির পানিতে গর্তগুলো ডুবে থাকায় হিমশিম খেতে হচ্ছে চালকদের। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও ছোট যানবাহনের চালকরা সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছেন। গর্ত এড়াতে গিয়ে অনেক চালক হঠাৎ দিক পরিবর্তন করছেন, এতে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের শঙ্কা বেড়েছে। মহাসড়ক সংস্কারে মুহুরী সেতু থেকে কসকা পর্যন্ত কয়েকটি স্থানে ইট ও কার্পেটিং করেছে সড়ক বিভাগ। কিন্তু ভরাট করা অংশগুলো সমতল না হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
মহাসড়কে চলাচলকারী বেশ কয়েকটি পরিবহনের চালকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, খানাখন্দ সৃষ্টি হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দিয়ে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করায় প্রায়ই যানজট তৈরি হচ্ছে। এতে যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে সময় লাগছে বেশি। পাশাপাশি বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যানবাহনের যন্ত্রাংশ। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, নারী, শিশু ও দূরপাল্লার যাত্রীরা।
চালক ও যাত্রীদের অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা এলেই বিশেষ করে ঢাকামুখী লেনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ে। এরপর সাময়িক মেরামত করা হলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে বছর ঘুরে আবারও একই দুর্ভোগে পড়তে হয়।
সরেজমিনে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে, সংস্কারে সড়ক বিভাগের কাজের গতি ধীর। সড়ক সংস্কারে কোথাও ইট ও কার্পেটিং করে সাময়িকভাবে গর্ত ভরাট করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
রেজাউল করিম নামে একজন বাসচালক বলেন, বারৈয়ারহাট থেকে মহিপাল পর্যন্ত আসতে এখন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে। খানাখন্দের কারণে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। সাবধানে না চালালে দুর্ঘটনা অনিবার্য।
সায়েম চৌধুরী নামে একজন মোটরসাইকেল চালক বলেন, সড়কে দুই-একটা গর্ত হলে সমস্যা ছিল না। মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী লেনজুড়েই ছোট-বড় গর্ত। অনেক জায়গায় পানি জমে থাকায় বোঝাই যায় না। মোটরসাইকেল চালকদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে সড়কটি।
বাংলাদেশ নিরাপদ সড়ক আন্দোলন (নিসআ) ফেনী জেলা কমিটির সভাপতি জিয়া উদ্দিন বলেন, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কটির অবস্থা খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সাময়িক সংস্কার নয়, টেকসইভাবে মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো পুনর্নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও নিয়মিত তদারকি করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ফেনী জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান দারা বলেন, সড়কে চলাচলরত গাড়ি চালকদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাবে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এছাড়া ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও গাড়িতে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের কারণে মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ফেনীর আয়তনের তুলনায় সড়কে যানবাহনের সংখ্যা অনেক বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে সড়কে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের যথাযথ নজরদারি থাকলে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব হত।
সাত মাসে মহাসড়কে ঝরল ৩৭ প্রাণ
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী, পুরুষ, শিশু ও বিভিন্ন বয়সী মানুষ রয়েছেন। এই পরিসংখ্যান কেবল পুলিশের, এর বাইরেও দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। গত ৭ মাসে মহাসড়কের সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫টি মামলা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানো, সার্ভিস লেনের অভাব, চালকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা এবং বর্ষাকালে মহাসড়কে খানাখন্দ সৃষ্টিÑ এসব কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে।
ফাজিলপুর হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মহাসড়কের ফাজিলপুর অংশে দুর্ঘটনায় ১১টি মামলা হয়েছে। দুর্ঘটনায় ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯ জন এবং আহত হয়েছেন আরও ৭ জন।
মহিপাল হাইওয়ে পুলিশের তথ্যমতে, একই সময়ে তাদের আওতাধীন অংশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪টি মামলা হয়েছে। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৮ জন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফাজিলপুর হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক শহিদুল ইসলাম বলেন, বেপরোয়া গতি ও সার্ভিস লেন না থাকাই দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। সার্ভিস লেন থাকলে ছোট যানবাহনগুলো আলাদা পথে চলাচল করতে পারত। এছাড়া বৃষ্টিতে মহাসড়কে খানাখন্দ সৃষ্টি হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং যানজটও তৈরি হয়।
মহিপাল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আছাদুল ইসলাম বলেন, বেশিরভাগ দুর্ঘটনাই বেপরোয়া গতির কারণে ঘটে। পাশাপাশি অনেক চালক একদিনে শারীরিক সক্ষমতার চেয়ে বেশি সময় গাড়ি চালান। দীর্ঘসময় গাড়ি চালানোর ফলে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। তিনি আরও বলেন, মহিপাল হাইওয়ে এলাকার যেসব স্থানে বর্ষায় খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছিল, সেগুলোর বিষয়ে সড়ক ও জনপদ বিভাগকে জানানো হয়। পরে তারা দ্রুত সংস্কারকাজ সম্পন্ন করেছে। এতে ওই অংশে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও অনেকটাই কমেছে।
যা বলছে সড়ক বিভাগ
সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়ক সংস্কারের কাজ চলমান রয়েছে। বৃষ্টি না হলে আগামী দুইদিনের মধ্যে সম্পূর্ণ কাজ শেষ করবে তারা। তবে সংস্কার কাজের ধীরগতি ও টেকসই না হওয়ায় প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে হাজারো যানবাহনকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ (সওজ) ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীতি চাকমা দৈনিক ফেনীকে বলেন, টানা বৃষ্টিতে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি স্থানে সংস্কার করা হয়েছে এবং বাকি অংশেও সংস্কার চলছে। আগামী দুই দিন বৃষ্টি না হলে সংস্কার কাজ পুরোপুরি শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নির্বাহী প্রকৌশলী আরও জানান, মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনেই মূলত সমস্যা বেশি হয়। কারণ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ভারী পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ এই লেনেই বেশি থাকে। টানা বৃষ্টির সময় ভারী যানবাহনের চলাচলের কারণেই গর্তের সৃষ্টি হয়। তবে চট্টগ্রামমুখী লেনে তুলনামূলক সমস্যা কম।