জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল রক্তাক্ত অধ্যায়। বৈষম্য ও অন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকল অন্যায়কে হটিয়ে জন্ম নেয় নতুন আরেক বাংলাদেশ। অসংখ্য ছাত্র-জনতার প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এ গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পার হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন ও বাস্তবতা এবং নতুন বাংলাদেশ নিয়ে তরুণদের ভাবনা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন দৈনিক ফেনীর নিজস্ব প্রতিবেদক এমএ আরাফাত
জুলাই রাষ্ট্র কাঠামোয় পরিবর্তন এনেছে
ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়কে নয়, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ চিন্তাকেও বদলে দেয়। বাংলাদেশের জন্য জুলাই তেমনই এক প্রতীক-যেখানে মানুষের আকাক্সক্ষা ছিল একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার। সেই সময়ের আন্দোলন ও আত্মত্যাগ শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের আহ্বান ছিল না বরং রাষ্ট্র পরিচালনার ধরণে একটি মৌলিক পরিবর্তনের প্রত্যাশাও ছিল।
এক বছর পর ফিরে তাকালে প্রশ্ন জাগে-সেই স্বপ্নের কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
অস্বীকার করার উপায় নেই, দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়েছে। তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে, নাগরিক অধিকার ও জবাবদিহিতা নিয়ে জনমত আরও শক্তিশালী হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাতে সংস্কারের দাবি আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। এসব পরিবর্তন একটি সচেতন সমাজ গঠনের ইঙ্গিত বহন করে।
তবে অর্জনের পাশাপাশি বাস্তবতার কঠিন চিত্রও সামনে রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক চাপ এবং জনসেবায় কাক্সিক্ষত দক্ষতার অভাব এখনও সাধারণ মানুষের জীবনে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তব ফলাফলে পরিণত হতে সময় নিচ্ছে। ফলে মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
তবে এটিও সত্য যে রাষ্ট্র সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। শুধু সরকার নয়, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত দায়িত্ব ও অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। পরিবর্তনের জন্য যেমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দায়িত্বশীল নাগরিক চর্চা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ।
জুলাই আমাদের শিখিয়েছে যে মানুষের ঐক্য পরিবর্তনের শক্তি হতে পারে। এখন প্রয়োজন সেই শক্তিকে ইতিবাচক রাষ্ট্রগঠনের কাজে ব্যবহার করা। কারণ একটি উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন এখনও শেষ হয়ে যায়নি; বরং সেটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব আজ আরও বেশি।
জুলাইয়ের স্বপ্নের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন সেই স্বপ্ন সাধারণ মানুষের জীবনে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং সমান সুযোগের বাস্তব রূপ এনে দিতে পারবে। সেই প্রত্যাশাই আজ বাংলাদেশের কোটি মানুষের।
লেখক : মুমতাহিনা আলম মুনিরা, সহকারী প্রচার সম্পাদক, ফেনী ইউনিভার্সিটি ল স্টুডেন্টস’ ফোরাম
জুলাই প্রশ্ন করার সাহস যুগিয়েছে
ইতিহাসে কিছু মাস থাকে, যেগুলো শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় থাকে না মানুষের স্মৃতি, আবেগ আর ভবিষ্যৎ ভাবনায় স্থায়ী জায়গা করে নেয়। আমাদের জন্য জুলাই তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই মাস আমাদের সামনে শুধু কিছু ঘটনা এনে দেয়নি, বরং নতুন আশা আর নতুন সাহসের জন্ম দিয়েছিল। সেই সাহসের কেন্দ্রে ছিল পরিবর্তনের ইচ্ছা। আমরা এমন একটা রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে নাগরিকের মর্যাদা শুধু সংবিধানের কথায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনে সত্যি সত্যিই দেখা যাবে।
তবে স্বপ্নেরও একটা বাস্তব দিক থাকে। সময় এগোলে আবেগের জায়গা নেয় বাস্তবতা স্লোগানের জায়গায় আসে হিসাব-নিকাশ, আর প্রত্যাশার জায়গায় আসে মূল্যায়ন। তাই আজ প্রশ্নটা শুধু আবেগের না, বরং নৈতিক আর বাস্তবতারওÑজুলাইয়ের স্বপ্ন থেকে আমরা আসলে কী পেলাম?
জুলাইয়ের স্বপ্ন কোনো একক দাবি বা নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটা ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে আনার একটা সম্মিলিত চেষ্টা। তরুণরা বিশ্বাস করেছিল, রাষ্ট্র তাদেরও, প্রতিষ্ঠানগুলো আরও জবাবদিহিমূলক হবে, মেধা, পরিশ্রম আর সততা নতুনভাবে মূল্য পাবে। মানুষ বেশি কিছু চায়নি তারা চেয়েছিল ন্যায্য সুযোগ, নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন, আর এমন একটা পরিবেশ যেখানে কেউ নিজেকে অসহায় মনে করবে না।
সময়ের একটা কঠিন শিক্ষা হলোÑপরিবর্তন চাওয়া যতটা সহজ, সেটা ধরে রাখা ততটাই কঠিন। জুলাইয়ের সেই উত্তেজনা অনেকের ব্যক্তিগত জীবনে আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অনেকের জীবন আবার আগের মতোই বাস্তবতায় ফিরে গেছে। চাকরির অনিশ্চয়তা, পড়াশোনার চাপ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা এখনো অনেক তরুণের নিত্যসঙ্গী। এখানেই স্বপ্ন আর বাস্তবতার ফারাকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আমরা রাজনৈতিক ভাষায় পরিবর্তনের কথা বললেও, অর্থনৈতিক বাস্তবতা সাধারণ মানুষের জীবনে তেমন স্বস্তি আনতে পারেনি। মূল্যস্ফীতির চাপ, চাকরির সীমাবদ্ধতা আর তরুণদের দীর্ঘ অপেক্ষা এখনো আমাদের বড় বাস্তবতা। একজন শিক্ষিত তরুণ যখন ডিগ্রি শেষ করেও অনিশ্চয়তায় থাকে, তখন সে শুধু একটা চাকরি নাÑবরং নিজের স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনাটাকেও খুঁজে ফেরে।
তবুও জুলাইকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলা যায় না। কারণ সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সবসময় চোখে দেখা যায় না সেটা মানুষের চিন্তা আর দৃষ্টিভঙ্গিতে ধীরে ধীরে তৈরি হয়। জুলাই আমাদের একটা নতুন নাগরিক সচেতনতা দিয়েছে। তরুণরা প্রশ্ন করতে শিখেছে। তারা রাষ্ট্র, সংবিধান, অধিকার, জবাবদিহি আর অংশগ্রহণ নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। এই পরিবর্তন সংখ্যায় মাপা যায় না, কিন্তু ভবিষ্যৎ গঠনে এর গুরুত্ব অনেক।
যে স্বপ্ন মানুষের জীবনমান বদলাতে পারে না, তা দীর্ঘদিন টেকে না। তাই অর্থনীতি এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের স্বপ্ন দ্রুত কমিয়ে দেয়। আয় আর ব্যয়ের ব্যবধান বাড়তে থাকলে বড় বড় আদর্শও অনেক সময় বাস্তবতার চাপে দুর্বল হয়ে পড়ে। তরুণদের জন্য চাকরি, দক্ষতা উন্নয়ন আর উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এখনো যথেষ্ট নয়। জুলাইয়ের স্বপ্ন বাস্তব করতে হলে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
শিক্ষাব্যবস্থা একটি জাতির ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু সেই প্রতিচ্ছবিতে এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। ফলাফল ভালো হলেও দক্ষতা কি সত্যিই বাড়ছে? ডিগ্রি বাড়লেও কাজের সক্ষমতা কি তৈরি হচ্ছে? জুলাইয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু সনদনির্ভর না করে চিন্তা, দক্ষতা আর সৃজনশীলতার ভিত্তিতে নতুনভাবে সাজানো দরকার।
আমার মতে, আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো প্রশ্ন করার সাহস পাওয়া। আমরা বুঝতে পেরেছি, রাষ্ট্র নাগরিকের জন্য; নাগরিক রাষ্ট্রের জন্য না। আমরা এটাও বুঝেছি, পরিবর্তন কোনো একদিনে হয় না; এটা দীর্ঘ, জটিল এবং অনেক সময় হতাশাজনক একটা প্রক্রিয়া। আমরা সচেতনতা, অংশগ্রহণ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুনভাবে ভাবার ক্ষমতা অর্জন করেছি। তবে আমরা এখনো সেই ন্যায়ভিত্তিক সমাজ পুরোপুরি পাইনি, যেখানে স্বপ্ন আর বাস্তবতার দূরত্ব এত বেশি না।
জুলাই আমাদের সামনে একটা আয়নার মতো দাঁড় করিয়েছে। সেই আয়নায় আমরা রাষ্ট্রকে যেমন দেখেছি, তেমনি নিজেদেরও দেখেছি। আমরা আমাদের সম্ভাবনা, সীমাবদ্ধতা আর দায়িত্ব সম্পর্কে নতুনভাবে সচেতন হয়েছি। ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সময় শেষে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়Ñআমরা কি সেই সময়ের যোগ্য হতে পেরেছি?
জুলাইয়ের উত্তর এখনো পুরোপুরি লেখা হয়নি। সেই উত্তর তৈরি হবে আমাদের প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, অর্থনীতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে। জুলাইয়ের স্বপ্নের আসল মূল্যায়ন তখনই হবে, যখন তা সাধারণ মানুষের জীবনে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, আর্থিক স্বস্তি এবং সমান সুযোগ এনে দিতে পারবে। কারণ স্বপ্ন তখনই সত্যি অর্থবহ হয়, যখন তা বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়। সেই ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব আমাদেরই।
লেখক : তাসনুভা বিনতে কামাল, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ফেনী ইউনিভার্সিটি
প্রত্যাশার তুলনায় বাস্তবতার পথ দীর্ঘ
ইতিহাসের প্রতিটি গণঅভ্যুত্থান মানুষের মনে এক ধরনের অদৃশ্য ঋণ তৈরি করে- একটি নতুন রাষ্ট্রের ঋণ, একটি নতুন সমাজের ঋণ। রাজপথে ঝরে পড়া রক্ত কেবল কোনো শাসকের পতনের জন্য নয়; বরং এমন একটি ভবিষ্যতের জন্য, যেখানে মানুষ বিশ্বাস করতে পারে-এই রাষ্ট্র তারও। কিন্তু ইতিহাস একই সঙ্গে আরেকটি নির্মম সত্যও শেখায়-বিপ্লবের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় শুরু হয় বিজয়ের পর। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ আলেক্সিস বিপ্লব-পরবর্তী সমাজ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছিলেন, বিপ্লব সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তে পৌঁছায় তখনই, যখন জনগণের প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া হয় অথচ বাস্তবতা মাটিতে হামাগুড়ি দেয়। কারণ তখন মানুষের ক্ষোভের জায়গা দখল করে নেয় হতাশা, আর স্বপ্নের জায়গা নেয় সংশয়। দুই বছর পর বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দিকে ফিরে তাকালে টকভিলের সেই পর্যবেক্ষণ নতুন করে ভাবায়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে মানুষ রাজপথে নেমেছিল কেবল একটি সরকারের বিরুদ্ধে নয়, একটি রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে জমে থাকা গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ভোটাধিকার হরণ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, দলীয়করণ এবং ভয়ের রাজনীতির বিরুদ্ধে সেটি ছিল এক নৈতিক বিদ্রোহ। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন মুহূর্তেই রূপ নেয় রাষ্ট্র পুনর্গঠনের গণদাবিতে। সেদিন মানুষের হাতে কোনো রাজনৈতিক ইশতেহার ছিল না; ছিল একটি মাত্র বিশ্বাস” রাষ্ট্র বদলাতে হবে।
সেই বিশ্বাসের ভেতরে ছিল অসংখ্য ছোট ছোট স্বপ্ন। একজন তরুণ চেয়েছিল যোগ্যতার মূল্যায়ন; একজন মা চেয়েছিলেন সন্তানের নিরাপত্তা; একজন সাংবাদিক চেয়েছিলেন নির্ভয়ে সত্য লেখার অধিকার; একজন সাধারণ নাগরিক চেয়েছিলেন ঘুষ ছাড়া সরকারি সেবা, ভয় ছাড়া ভোট দেওয়ার নিশ্চয়তা এবং বিচার পাওয়ার অধিকার। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এখানেই, এটি ছিল মানুষের জীবনের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্লিখনের আন্দোলন।
জ্যাঁ জ্যাক রুশো বলেছিলেন, রাষ্ট্রের বৈধতা জনগণের সম্মতি থেকেই জন্ম নেয়। রাষ্ট্র যখন সেই জনগণের অধিকারই রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন তার নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে। জুলাইয়ের রাজপথে উচ্চারিত প্রতিটি স্লোগান, প্রতিটি রক্তাক্ত বিকেল এবং প্রতিটি আত্মত্যাগ মূলত সেই নৈতিক বৈধতার পুনর্দাবি ছিল। মানুষ কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন চায়নি; তারা চেয়েছিল ক্ষমতার চরিত্রের পরিবর্তন। তাই জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতিও ছিল রাষ্ট্রকে নতুন করে নির্মাণ করা। এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি থেকে বড় হবে, সংবিধান দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকবে, আইন সবার জন্য সমান হবে এবং নাগরিকের মর্যাদা আর রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করবে না। সেই স্বপ্নই লাখো মানুষকে বিশ্বাস করিয়েছিল,এই আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না। কিন্তু ইতিহাসের এখানেই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। স্বৈরাচারের পতন ঘটানো যত কঠিন, তার চেয়েও কঠিন সেই বিপ্লবী চেতনাকে টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপ দেওয়া। হান্না আরেন্ট তাঁর ঙহ জবাড়ষঁঃরড়হ গ্রন্থে যে সতর্কতার কথা বলেছিলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতা যেন আজ তারই প্রতিধ্বনি।
দুই বছর পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, পরিবর্তনের কিছু আলামত দৃশ্যমান হলেও মানুষের প্রত্যাশার উচ্চতার তুলনায় বাস্তবতার পথ এখনো দীর্ঘ। রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে আলোচনা বেড়েছে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে; কিন্তু সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রকে বিচার করে অন্যভাবে। তারা বিচার করে বাজারের দামে, কর্মসংস্থানের সুযোগে, সন্তানের নিরাপত্তায়, বিচারপ্রাপ্তির নিশ্চয়তায় এবং প্রতিদিনের জীবনের অভিজ্ঞতায়। সেই জায়গাতেই জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতি সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
জুলাইয়ের পর মানুষ বিশ্বাস করেছিল, এবার হয়তো রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে উঠবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অতীত হবে, প্রশাসন দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে সাংবিধানিক দায়বদ্ধতায় পরিচালিত হবে, আর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হবে জনগণের আস্থা। সবচেয়ে বড় কথা, একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হবে-যেখানে মতভিন্নতা শত্রুতা নয়, বিতর্ক হবে গণতন্ত্রের শক্তি এবং রাষ্ট্র সমালোচনাকে ভয় পাবে না। বাস্তবতা অবশ্য এত সরল ছিল না। রাষ্ট্র পুনর্গঠন কখনোই রাতারাতি সম্ভব নয়। ইতিহাসের প্রতিটি বড় রূপান্তরের মতো বাংলাদেশকেও একটি দীর্ঘ ও জটিল পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। তবু মানুষের প্রত্যাশা ছিল, অন্তত পরিবর্তনের দিকটি স্পষ্ট হবে। কিন্তু দুই বছর পর এসে সেই প্রত্যাশার জায়গায় অনেকের মনে প্রশ্ন জমেছে-রাষ্ট্র কি সত্যিই বদলাচ্ছে, নাকি কেবল ক্ষমতার বিন্যাস বদলেছে? সাধারণ মানুষের হতাশার কারণও খুব জটিল নয়। তারা এখনো নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে বিপর্যস্ত, কর্মসংস্থানের সংকটে অনিশ্চিত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। নারী ও শিশু নির্যাতন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা তাদের মনে সেই কাক্সিক্ষত নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে পারেনি। উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক, মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা যদি বদলে না যায়, তবে সেই উন্নয়নও তাদের কাছে দূরের গল্প হয়ে থাকে।
জুলাই আমাদের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছিল। রাষ্ট্রকে নতুন করে কল্পনা করার, গণতন্ত্রকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার এবং নাগরিকের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনার সুযোগ। সেই সুযোগের মূল্য ছিল অসংখ্য তরুণের জীবন, হাজারো পরিবারের অশ্রু আর একটি জাতির দীর্ঘ প্রতীক্ষা। সেই আত্মত্যাগকে যদি আমরা কেবল বার্ষিক স্মরণসভা, ফুলেল শ্রদ্ধা কিংবা রাজনৈতিক বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, তবে সবচেয়ে বড় অবিচার করা হবে জুলাইয়ের সঙ্গেই। দুই বছর পর তাই প্রশ্নটি আর শুধু রাষ্ট্রের প্রতি নয়, প্রশ্নটি আমাদের সবার প্রতি। আমরা কি সত্যিই এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলছি, যেখানে আইনের শাসন ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে থাকবে, নাকি আবারও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করছি? কারণ বিপ্লবের ইতিহাস শেষ হয় না ক্ষমতার পরিবর্তনে; তার প্রকৃত পরিণতি নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রের চরিত্রে। আলেক্সিস দ্য টকভিলের সতর্কবাণী আজও আমাদের সামনে প্রাসঙ্গিক-প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ব্যবধান যত বাড়ে, ইতিহাস তত কঠিন হয়ে ওঠে। সেই ব্যবধান কমিয়ে আনার দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়; রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ এবং সচেতন প্রতিটি নাগরিকের। জুলাই আমাদের হাতে একটি প্রতিশ্রুতি তুলে দিয়েছিল, এখন সেটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়ও আমাদেরই। জুলাই তাই কেবল স্মৃতির নাম নয়; এটি একটি অসমাপ্ত অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার পূরণ করতে পারলেই শহীদদের আত্মত্যাগ ইতিহাসের গৌরব হয়ে থাকবে। আর যদি ব্যর্থ হই, তবে ইতিহাস হয়তো একদিন লিখবে-বাংলাদেশ একটি স্বৈরাচারকে পরাজিত করেছিল, কিন্তু নিজের স্বপ্নকে রক্ষা করতে পারেনি।
লেখক : মাহমুদুল হাসান, কার্যনির্বাহী সদস্য, ফেনী ইউনিভার্সিটি ল স্টুডেন্টস’ ফোরাম
তরুণদের স্বপ্ন পূরণেই জুলাইয়ের সার্থকতা
জুলাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এখন আর শুধু একটি মাসের নাম নয়। এটি হয়ে উঠেছে একটি প্রজন্মের আকাক্সক্ষা, ক্ষোভ, সাহস এবং পরিবর্তনের প্রত্যাশার প্রতীক। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। আন্দোলনের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসে বৈষম্য, জবাবদিহি, ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে মানুষের দীর্ঘদিনের নানা প্রশ্ন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের অনুসন্ধানেও আন্দোলনের পেছনে কোটা সংস্কারের পাশাপাশি শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিয়ে অসন্তোষের বিষয় উঠে এসেছে।সেই জুলাই আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। শিখিয়েছে, একটি দেশের তরুণ প্রজন্ম শুধু চাকরি বা সুযোগ চায় না, তারা ন্যায়, মর্যাদা, জবাবদিহি এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলার অধিকারও চায়। কিন্তু জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আজও রয়ে গেছেÑআমরা কি সেই স্বপ্নের কাছাকাছি যেতে পেরেছি?
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুতর দিক ছিল ব্যাপক প্রাণহানি। জাতিসংঘের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। প্রতিবেদনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচার আটক ও নির্যাতনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে জুলাইয়ের মূল্যায়ন শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে করা সম্ভব নয়; মানবাধিকার ও আইনের শাসনের দিকটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই জাতীয় আন্দোলনের প্রভাব দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পড়েছিল। ফেনীও এর বাইরে ছিল না। বিশেষ করে ৪ আগস্ট মহিপালে ঘটে যাওয়া ঘটনা ফেনীর জুলাইয়ের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। অসহযোগ আন্দোলনের ওই দিনে সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় প্রথমদিকে আটজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে তদন্ত ও মামলার নথিতে ওই ঘটনায় অন্তত ১১ জন নিহত হওয়ার তথ্য উঠে আসে। নিহতদের অনেকেই ছিলেন তরুণ।
জুলাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো মানুষের মধ্যে অধিকার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিয়ে আগের চেয়ে বেশি সচেতনতা তৈরি হওয়া। তরুণদের একটি বড় অংশ নিজেদের ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় ও পরবর্তী ঘটনাগুলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে এনেছে।
তবে এখানেই জুলাইয়ের স্বপ্ন ও বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। একটি আন্দোলনের সাফল্য শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বিচার করা যায় না। সাধারণ মানুষের জীবন কতটা বদলেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর হয়েছে, ন্যায়বিচার কতটা নিশ্চিত হয়েছে এবং তরুণদের জন্য সুযোগ কতটা বেড়েছে এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে কর্মসংস্থানের বিষয়টি সামনে রাখা জরুরি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য তৈরি হয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ চাকরি। অর্থাৎ, তরুণদের একটি বড় অংশ এখনও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। জুলাইয়ের আন্দোলনে তরুণদের যে বড় অংশগ্রহণ ছিল, তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা তাই আন্দোলন-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ন্যায়বিচারের বিষয়টিও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় নিহতদের পরিবারের কাছে শুধু স্মরণ নয়, কার্যকর বিচারও প্রত্যাশিত। ফেনীতে মহিপালের ঘটনায় মামলা ও চার্জশিট হয়েছে। শহীদদের স্মরণে ‘জুলাই স্কয়ার’-এর মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও, বিচারপ্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফল এবং দায় নির্ধারণই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করবে।
তাহলে আমরা জুলাই থেকে কী পেয়েছি? পেয়েছি পরিবর্তনের একটি সুযোগ, নাগরিক অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা এবং রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রত্যাশা। কিন্তু এর পাশাপাশি এটাও স্বীকার করতে হবে যে জুলাইয়ের সঙ্গে যুক্ত সব প্রত্যাশা এখনও পূরণ হয়নি। কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক চাপ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির মতো বিষয়গুলো এখনও আলোচনার দাবি রাখে।
তাই জুলাইকে শুধু একটি অতীত ঘটনা হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য সীমিত হয়ে যায়। বরং জুলাইয়ের মূল্যায়ন হওয়া উচিত বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করে। যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা থেকে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, তার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোন জায়গাগুলোতে এখনও কাজ বাকিÑএই হিসাব করাই প্রয়োজন।
ফেনীর মহিপালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আমাদের সেই হিসাবের কথাই মনে করিয়ে দেয়। শহীদদের স্মরণ করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি তাদের আত্মত্যাগের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যাশাগুলো বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিও নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
জুলাইয়ের স্বপ্ন তাই এখনও একটি চলমান প্রশ্ন। এর উত্তর শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে নয়; বরং ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, সমান সুযোগ, কর্মসংস্থান এবং মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্যেই সেই উত্তর খুঁজতে হবে।
লেখক : পিয়াসা আক্তার, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ফেনী ইউনিভার্সিটি।
ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও, প্রত্যাশা পূরণ হয়নি
জুলাই আমাদের কাছে কেবল একটি মাস নয়, একটি স্বপ্নের নাম। একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। যে বাংলাদেশে বৈষম্যের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হবে সাম্য, দুর্নীতির পরিবর্তে জবাবদিহিতা, বিভেদের পরিবর্তে ভ্রাতৃত্ব এবং অন্যায়ের পরিবর্তে ন্যায়বিচার। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে দেশমাতার কল্যাণে অসংখ্য তরুণ-যুবক রাস্তায় নেমেছিল। অনেকে জীবন দিয়েছেন, অনেকে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। অসংখ্য মা তাঁদের সন্তানের লাশ বুকে তুলে নিয়েছেন, কেউবা লাশটাও খুঁজে পাননি। কত শিশু এতিম হয়েছে, কত যুবতী বিধবা হয়েছেন। সেই আত্মত্যাগ কোনোভাবেই সাধারণ কোনো রাজনৈতিক ঘটনার অংশ নয়; এটি জাতির বিবেকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বেদনাময় ইতিহাস।কিন্তু এই সময় এসে মনে প্রশ্ন জাগেÑজুলাইয়ের সেই স্বপ্নের কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে? বাস্তবতা হলো, ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে, নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব হয়েছে, নতুন সম্ভাবনার আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসেনি।
দুর্নীতি এখনো আমাদের পিছু ছাড়েনি। বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব নিয়ে মানুষের অভিযোগ কমেনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি, তার সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস ও জ্বালানির সংকট এবং অতিরিক্ত ব্যয়-সবকিছু মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। অনেকের আশঙ্কা, এভাবে ব্যয় বাড়তে থাকলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য মৌলিক সেবাগুলোও একসময় নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
গ্যাস সংকটের কারণে বহু এলাকায় মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও রান্নার গ্যাসের সংকট, কোথাও যানবাহনে গ্যাস-তেল নেই, চলাচলে ভোগান্তি। যে দূরত্ব ২০-৩০ টাকা ভাড়ায় অতিক্রম করা যেত, সেখানে এখন ব্যয় করতে হচ্ছে ৮০-১০০ টাকা ভাড়া। এই দুর্ভোগ সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের যে প্রত্যাশা ছিল, সেটিও এখনো বাস্তব রূপ পায়নি। পরীক্ষা-কেন্দ্রিক শিক্ষার বাইরে দক্ষতা, গবেষণা ও সৃজনশীলতাভিত্তিক শিক্ষা নিয়ে বহু আলোচনা হলেও শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা খুব বেশি বদলায়নি। নেই পর্যাপ্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক। বরং অনেকের মনে শিক্ষার মান ও পরিবেশ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সুঠাম মেরুদণ্ডের রক্তগরম তরুণরা শিক্ষাবিমুখ হয়ে ঝুঁকে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়া ও টিকটকের কালো অন্ধকারে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, সমাজে কাক্সিক্ষত ভ্রাতৃত্ববোধ, সহনশীলতা ও শ্রদ্ধার পরিবেশও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। শহর থেকে গ্রাম-সব জায়গায় হিংসা, সংঘাত, চুরি, ডাকাতি, খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধের খবর প্রতিদিন মানুষকে উদ্বিগ্ন করে। অনিয়ম ও বৈষম্যের প্রতিবাদে তরুণেরা বারবার রাজপথে নামছে। কিন্তু প্রতিবারই প্রশ্ন থেকে যায়-তাদের আত্মত্যাগ কি কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের পথে এগিয়ে দিচ্ছে, নাকি কয়েক যুগ পরপর একই আত্মত্যাগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে?
আমরা কি এই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম? জুলাই আন্দোলন কি কেবল ক্ষমতার পালাবদলের জন্য ছিল? নাকি এটি ছিল রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে দেওয়ার একটি সুযোগ, একটি স্বপ্ন, একটি আহ্বান? আমরা তো স্বপ্ন দেখেছিলাম একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, স্বচ্ছ, সমতাভিত্তিক ও সম্মানের বাংলাদেশের।
জুলাই আমাদের শিখিয়েছে, পরিবর্তনের জন্য মানুষ জীবন দিতেও প্রস্তুত। কিন্তু সেই পরিবর্তনকে টেকসই ও অর্থবহ করে তোলার দায়িত্ব রাষ্ট্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের। আত্মত্যাগের মর্যাদা তখনই রক্ষা পাবে, যখন সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার, সুশাসন, নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার পাবে।
জুলাইয়ের স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কেবল সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং সর্বোপরি মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা, সম্মান ও ভ্রাতৃত্ববোধ।
যারা জুলাইয়ে জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো হবে তখনই, যখন আগামী প্রজন্ম আর একই দাবিতে, একই বেদনা নিয়ে, একই রাস্তায় বারবার দাঁড়াতে বাধ্য হবে না। নয়তো বারবার মনে একই প্রশ্ন জাগবে-কী পেয়েছি আমরা?’
লেখক: নাজাত আরা চৌধুরী সামিয়া, শিক্ষার্থী আইন বিভাগ, ফেনী ইউনিভার্সিটি।
জুলাইয়ের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে
ইতিহাসের পাতায় যুগে যুগে ক্ষমতার দম্ভ স্তব্ধ হয়েছে মানুষের সাহসের কাছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানও তেমনই এক ইতিহাসÑযেখানে নিরস্ত্র তরুণদের সাহস, আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধ একটি জাতির দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে বিস্ফোরণে রূপ দিয়েছিল।পঞ্জিকার পাতায় সেটি ছিল জুলাই মাস। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই কেবল একটি মাস নয়; এটি একটি প্রজন্মের আকাক্সক্ষা, ক্ষোভ, সাহস এবং পরিবর্তনের স্বপ্নের প্রতীক। বৈষম্যের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ধীরে ধীরে পরিণত হয় সর্বস্তরের মানুষের অভ্যুত্থানে। শিক্ষার্থী, তরুণ, শ্রমজীবী, রিকশাচালক, হকার, দিনমজুরসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ নেমে এসেছিলেন রাজপথে। একসময় এই আন্দোলন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছিল মানুষের অধিকার ও মর্যাদার সম্মিলিত লড়াই।
এই কারণেই 'নিরস্ত্র সাহসের সশস্ত্র ইতিহাস-বাক্যটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃতিকে ধারণ করে। আন্দোলনকারীদের হাতে ছিল না কোনো আগ্নেয়াস্ত্র, ছিল না সামরিক শক্তি। তাদের শক্তি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, ন্যায্যতার দাবি এবং ভয়কে জয় করার মানসিক দৃঢ়তা। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় শক্তির বিপরীতে তারা রাজপথে দাঁড়িয়েছিল বুক পেতে। সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও তাজা গুলির ভয়ও তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি।
জুলাইয়ের প্রতিটি দিন ছিল একেকটি রক্তাক্ত অধ্যায়। একজনের রক্ত আরেকজনের প্রতিবাদের সাহস হয়ে উঠেছে। একজনের মৃত্যু হাজারো মানুষকে রাজপথে নিয়ে এসেছে। ১৬ জুলাই ২০২৪ এই ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় দিন। রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তার হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, ছিল কেবল নির্ভীক প্রতিবাদ। গুলিতে তার মৃত্যু পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়। তার প্রসারিত দুই হাত পরিণত হয় জুলাইয়ের প্রতিরোধের প্রতীকে।
জুলাইয়ের এই আত্মত্যাগ শুধু রংপুরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। চট্টগ্রামের রাজপথে মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামসহ অসংখ্য তরুণ প্রাণ দিয়েছেন। ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও বহু মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছেন। শহীদ ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ, শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, শাইখ আশহাবুল ইয়ামিন, ফারহান ফাইয়াজ, শিশু রিয়া গোপসহ অসংখ্য নাম আজ জুলাইয়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে আরও হাজারো নাম, যাদের অনেককে হয়তো ইতিহাস আলাদাভাবে মনে রাখবে না; কিন্তু তাদের রক্ত ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়।
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর সর্বজনীনতা। রাজপথে মানুষ নিজের পরিচয় ভুলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। একজন রিকশাচালক, একজন হকার, একজন শ্রমিক কিংবা একজন শিক্ষার্থীÑসবার কণ্ঠ মিশে গিয়েছিল একই দাবিতে। আর তরুণেরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিল।
আমি নিজে এই আন্দোলনের একজন প্রত্যক্ষদর্শী এবং একজন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে খুব কাছ থেকে দেখেছি মানুষের সেই সাহস। দেখেছি, মৃত্যুর ভয়কে অতিক্রম করে কীভাবে মানুষ রাজপথে দাঁড়িয়েছে। একজনের পতনের পর কীভাবে আরও শত মানুষ সামনে এগিয়ে এসেছে। গুলির শব্দের মধ্যেও কীভাবে উচ্চারিত হয়েছে প্রতিবাদের স্লোগান। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই মনে হয়-জুলাই ছিল শুধু একটি আন্দোলন নয়, এটি ছিল মানুষের ভেতরে জমে থাকা সাহসের বিস্ফোরণ।
যে স্বপ্নের জন্য এত মানুষ জীবন দিয়েছেন, সেই স্বপ্নকে ধারণ করাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। জুলাইয়ের চেতনা মানে শুধু একটি তারিখ স্মরণ করা নয়; অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানুষের অধিকার ও মর্যাদার পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
শহীদদের আত্মত্যাগ যেন কোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ না হয়, জুলাইয়ের ইতিহাস যেন বিকৃত বা বিস্মৃত না হয়-এ দায়িত্ব আমাদের সবার। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানাতে হবে, কীভাবে একটি প্রজন্ম অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, কীভাবে নিরস্ত্র মানুষ ভয়কে জয় করেছিল এবং কীভাবে অসংখ্য মানুষের রক্তে রচিত হয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। ২০২৪-এর জুলাই আমাদের শিখিয়েছে-অস্ত্রের শক্তিই সবসময় শেষ কথা নয়। কখনো কখনো একটি নিরস্ত্র মানুষের সাহসই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। একটি প্রসারিত হাত, একটি জাতীয় পতাকা, একটি প্রতিবাদের স্লোগান কিংবা একটি খালি বুকও ইতিহাস বদলে দিতে পারে। তাই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুধু অতীত নয়, এটি একটি চলমান অঙ্গীকার। শহীদদের রক্তের কাছে আমাদের অঙ্গীকার, জুলাইয়ের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কারণ জুলাই শুধু রক্তের ইতিহাস নয়; এটি সাহসের ইতিহাস। শুধু মৃত্যুর ইতিহাস নয়, এটি জেগে ওঠার ইতিহাস। আর সেই কারণেই-জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিরস্ত্র সাহসের এক সশস্ত্র ইতিহাস।
লেখক : সাজিদ উল হক ভূঁইয়া, প্রচার সম্পাদক, ফেনী ইউনিভার্সিটি ল স্টুডেন্টস’ ফোরাম





