ফেনীতে ওয়ান স্টোপস মেটারিনিটি ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে প্রসূতি নাঈমা আক্তার লিজার মৃত্যুর ঘটনায় এখনো ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পায়নি পুলিশ। ময়নাতদন্ত না পাওয়ায় এ ঘটনায় করা মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা ফেনী মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. নুরুল করিম। তিনি জানান, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে দ্রুত চার্জশিট জমা দেওয়া হবে। এ মামলার ৫ আসামি জামিনে থাকায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি।
এর আগে ওয়ান স্টোপস মেটারিনিটি ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এনে গত ১৫ এপ্রিল রাতে প্রসূতি লিজার বাবা মোহাম্মদ নুর করিম বাদী হয়ে ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিকের মালিক ডা. নাজমুল হক ভূঁইয়া, তার স্ত্রী ডা. নাসরিন আক্তার মুক্তা, ফেনী প্রাইভেট হাসপাতালের মালিক ডা. আবদুল কাইয়ুম, মোটবী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা গীতা রানী এবং ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিকের ম্যানেজার আতিকুর রহমানকে আসামি করে ফেনী মডেল থানায় মামলা করেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ফেনী সদর উপজেলার শিবপুর এলাকার বাসিন্দা লিজার প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ ছিল ১২ এপ্রিল। তবে ১০ এপ্রিল প্রসব ব্যথা শুরু হলে তাকে প্রথমে স্থানীয় মোটবী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখান থেকে এক স্বাস্থ্য সহকারীর পরামর্শে তাকে ফেনী শহরের ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ক্লিনিকে নেওয়ার পর কোনো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই জরুরি ভিত্তিতে লিজার সিজার অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পর থেকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এ সময় তাকে দুই ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়। পরবর্তীতে অবস্থার আরও অবনতি হলে একই দিন তাকে ফেনী প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আবারও কোনো পরীক্ষা ছাড়াই দ্বিতীয়বার অপারেশন করা হয়। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোগীর অবস্থার অবনতি হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত রেফার করা হয়নি। রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে বিকেলের দিকে তাকে চট্টগ্রামের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে লিজার মৃত্যু হয়েছে।
এ ঘটনার তদন্তে কমিটি গঠন করে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। তদন্তে গাইনী চিকিৎসক নাসরীন আক্তার মুক্তার গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রাথমিক ও চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণে লিজার মৃত্যুতে চিকিৎসায় গুরুতর গাফিলতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তদন্তে প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অস্ত্রোপচারের সময় নির্ধারিত চিকিৎসা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়নি এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও পরবর্তী চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়ও ঘাটতি ছিল। অস্ত্রোপচারের পর রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তদন্তে আরও উঠে আসে, ছনুয়া ও মোটবী ইউনিয়নের দুই পরিবার পরিকল্পনা কর্মীÑগীতা রানী দাসসহ অপর একজন রোগীকে সরকারি হাসপাতালে না পাঠিয়ে সরাসরি ওই ক্লিনিকে নিয়ে আসেন, যা নীতি বিরোধী। তাদের বিরুদ্ধে রোগীদের আল্ট্রাসাউন্ড ও অ্যান্টিবায়োটিক পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ মিলেছে।
প্রসঙ্গত, গত ১০ এপ্রিল নাঈমা আক্তার লিজা প্রসব ব্যথা নিয়ে ফেনী ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিকে ভর্তি হন। রাতে তার অপারেশন হলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরদিন সকালে নবজাতক রেখে লিজাকে ‘ফেনী প্রাইভেট হাসপাতালে’ পাঠায় ওয়ান স্টোপস কর্তৃপক্ষ। সেখানে চার ঘণ্টা অপারেশন থিয়েটারে রেখে বিকেলে চট্টগ্রামে পাঠান তারা। চট্টগ্রামে নেওয়ার পথে গাড়িতেই মৃত্যু হয় লিজার। পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।