সকালে অসুস্থ ননদকে দেখতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন জাকিয়া আক্তার (৩৮), সঙ্গে ছিলেন বড় মেয়ে ওয়াহিদা আক্তার জুহা (২০)। পরিবারের কেউ ভাবতেও পারেননি, রাত নামার আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাবেন দুজনই। এখন সাদা কাফনে মোড়ানো মা-মেয়ের মরদেহ পাশাপাশি রাখা হয়েছে লাশবাহী ফ্রিজিং ভ্যানে। শেষবারের মতো মুখ দেখার জন্য সৌদি আরব ও ইতালি থেকে দেশে ফিরছেন তাদের স্বামীরা। সেই অপেক্ষায় প্রহর গুনছে শোকাহত পরিবার।
রোববার (২৮ জুন) ফুলগাজী উপজেলার মুন্সীরহাট ইউনিয়নের উত্তর আনন্দপুর মজুমদার বাড়িতে গিয়ে এমন করুণ দৃশ্য দেখা গেছে। শনিবার (২৭ জুন) রাতে ফেনী-বিলোনিয়া আঞ্চলিক সড়কের ফুলগাজী উপজেলা পরিষদসংলগ্ন পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সামনে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মুরগিবাহী একটি খালি পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান তারা। একই দুর্ঘটনায় নিহত হন ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের উত্তর দৌলতপুর গ্রামের আবুল কালামের ছেলে মোহাম্মদ কাউসার (৩২)।
সরেজমিনে দেখা যায়, মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও নিহত মা-মেয়ের নিথর দেহ বাড়ির উঠোনে ফ্রিজার ভ্যানে রাখা হয়েছে। উঠোনে চেয়ার পেতে বসে আছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা স্বজনরা। সাদা কাফনে মোড়ানো মরদেহের পাশে বসে কেউ দোয়া পড়ছেন, কেউ স্মৃতিচারণ করছেন, আবার কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। জাকিয়ার বড় ছেলে আশরাফুল ইসলাম সৌরভ ও ছোট মেয়ে মেহেজাবিন জিদনি মা ও বোনকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। সত্তরোর্ধ্ব মা মোমেনা খাতুন মেয়ে ও নাতনির মৃত্যুশোকে বিলাপ করছেন।
নিহত জাকিয়ার ভাসুর শাহ আলম মজুমদার সবুজ বলেন, ক্যান্সারে আক্রান্ত ননদ মাসুদা আক্তারকে দেখতে শনিবার সকালে বাড়ি থেকে বের হন জাকিয়া ও তার মেয়ে। রাতে বাড়ি ফেরার পথে তারা দুর্ঘটনার শিকার হন। সন্ধ্যায় ছেলের সঙ্গে জাকিয়ার সর্বশেষ কথা হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, ফুফুর বাড়ি থেকে বের হয়ে সিএনজিতে উঠেছেন এবং শিগগিরই বাড়ি ফিরবেন।
তিনি বলেন, হঠাৎ ভাইয়ের স্ত্রী ও ভাতিজির মৃত্যুতে পুরো পরিবার স্তব্ধ হয়ে গেছে। মরদেহগুলোর অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে স্বজনরা গোসল করানোর সময় পাশে থাকতে পারেননি। ফেনী থেকে লোক এনে তাদের গোসল করানো হয়েছে।
জাকিয়ার ভগ্নিপতি মো. আহসানুল করিম বলেন, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে সৌদি আরবে কর্মরত নূরের ছফা মজুমদার সোহেল স্ত্রী ও মেয়ের মৃত্যু সংবাদে ভেঙে পড়েছেন। শেষবারের মতো স্ত্রী ও মেয়ের মুখ দেখতে রোববার তিনি দেশের উদ্দেশ্যে বিমানে রওনা হয়েছেন।
অন্যদিকে, মাত্র ৮ মাস আগে ওয়াহিদা আক্তার জুহার বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন পরই ছাগলনাইয়ার বাসিন্দা তার স্বামী ইতালি প্রবাসী কাজী আজাদ হোসেন কর্মস্থলে ফিরে যান। আগামী ১২ জুলাই দেশে এসে স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। স্ত্রীর মৃত্যুসংবাদ পেয়ে তিনিও দেশে ফিরছেন।
জুহার মামা সাইদুল হক বলেন, বিয়ের এক সপ্তাহ পরই জুহার স্বামী ইতালি চলে যান। দেশে ফিরে স্ত্রীকে নিয়ে সময় কাটানোর অনেক পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সবকিছু শেষ হয়ে গেল।
জাকিয়ার বড় বোন দুবাই প্রবাসী মনোয়ারা বেগম মায়া বলেন, তিন দিন আগে তিনি দেশে ফিরেছেন। বোনের সঙ্গে দেখা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর মধ্যেই মৃত্যুসংবাদ পান। আকস্মিক দুর্ঘটনায় বোন ও ভাগনির এই করুণ মৃত্যু তারা কোনোভাবে মানতে পারছেন না।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সৌদি প্রবাসী নূরের ছফা মজুমদার সোহেলের জীবনে ২৭ জুন দিনটি যেন এক বেদনার স্মৃতি হয়ে আছে। ঠিক ১৪ বছর আগে একই দিনে তিনি তার মাকে হারিয়েছিলেন। এবার একই দিনে হারালেন স্ত্রী ও বড় মেয়েকে।
জানাজা ও দাফনের বিষয়ে স্বজনরা জানান, উভয়ের স্বামী দেশে পৌঁছানোর পর সোমবার জানাজার সময় নির্ধারণ করা হবে। পরে ফুলগাজীর আনন্দপুর ইউনিয়নের মজুমদার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে মা ও মেয়েকে পাশাপাশি দাফন করা হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত মরদেহ দুটি ফ্রিজিং ভ্যানে সংরক্ষণ করা হবে।
এর আগে, শনিবার রাতে ফেনী-বিলোনিয়া আঞ্চলিক সড়কের ফুলগাজী পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সামনে ফেনীগামী একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মুরগিবাহী খালি পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে পাঁচজন আহত হন। তাদের উদ্ধার করে ফুলগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মোহাম্মদ কাউসার ও ওয়াহিদা আক্তার জুহাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে গুরুতর আহত জাকিয়া আক্তারকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও দুইজন।
এ ঘটনায় রোববার (২৮ জুন) নিহতদের মধ্যে কাউসারের বাবা আবুল কালাম অজ্ঞাত পিকআপচালকের বিরুদ্ধে ফুলগাজী থানায় একটি মামলা করেছেন বলে জানিয়েছেন থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম মিজানুর রহমান।