দুই বছর পরও শহিদ পরিবারগুলোর অভিযোগ, জুলাইয়ের প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়ার গতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ধীর। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আসামি এখনো গ্রেপ্তারের বাইরে বলে ক্ষোভ রয়েছে তাদের। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের মূল আকাক্সক্ষা-আইনের শাসন, জবাবদিহি ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা। তাদের ভাষ্য, রাষ্ট্র আর্থিক সহায়তা দিয়েছে, খোঁজও নিয়েছে; কিন্তু সন্তান হারানোর শোক কাটানোর একমাত্র পথ হলো দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মহিপালের ঘটনায় হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ফেনী মডেল থানায় মোট ২২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি হত্যা এবং ১৫টি হত্যাচেষ্টা ও হামলার মামলা। এসব মামলার মধ্যে ১৪টি মামলার অভিযোগপত্র ইতোমধ্যে আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ। বাকি মামলাগুলোর তদন্তও দ্রুত গতিতে চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
শহিদ ইশতিয়াক আহম্মেদ শ্রাবণের বাবা নেছার আহম্মেদ বলেন, আমাদের চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়, মামলার অনেক এজাহারভুক্ত আসামি এখনো বাইরে আছে। দুই বছরেও মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। দ্রুত চার্জশিট দিয়ে বিচার শুরু করা হোক।
ফেনীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ৭ শহিদ
শহিদ সরওয়ার জাহান মাসুদের মা বিবি কুলসুম বলেন, সরকার আমাদের সহযোগিতা করেছে, কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া বিচার। আমার সন্তানদের হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
শহিদ ওয়াকিল আহম্মেদ শিহাবের মা মাহফুজা আক্তার বলেন, কারা অস্ত্র হাতে ছিল, কারা গুলি চালিয়েছে-সব ভিডিওতে আছে। তারপরও বিচার হয়নি। আর কত মায়ের বুক খালি হলে এই দেশের পরিবর্তন আসবে?
শহিদ সাইদুল ইসলাম শাহীর মা রেহানা বেগম বলেন, দুই বছর হয়ে গেল, এখনো কোনো বিচার হয়নি। আমার ছেলে ২৫ টাকা গাড়িভাড়া নিয়ে আন্দোলনে গিয়েছিল, কিন্তু আর ঘরে ফিরতে পারেনি।
শহিদ মাহবুবুল হক মাসুমের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান বলেন, ভাইয়েরা যে উদ্দেশ্যে জীবন দিয়েছে, তার বাস্তবায়ন হয়নি। অনেক আসামি এখনো পালিয়ে বেড়াচ্ছে। মামলার অগ্রগতি নেই।
শুধু শহিদ পরিবারই নয়, জুলাই আন্দোলনের সংগঠক ও আহতরাও মনে করছেন, দুই বছর পরও মহিপালের হত্যাকাণ্ডের বিচার দৃশ্যমানভাবে শেষ না হওয়ায় শহিদদের আত্মত্যাগের প্রতি প্রত্যাশিত রাষ্ট্রীয় প্রতিফলন এখনো দেখা যায়নি। তাদের ভাষ্য, শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়, প্রতিটি মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ করে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফেনীর সাবেক সমন্বয়ক মুহাইমিন তাজিম বলেন, মহিপালের মতো একটি প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশ মামলার বিচার এখনো দৃশ্যমান হয়নি। শহিদ পরিবারের সদস্যদের আজও বিচারের দাবিতে কথা বলতে হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা চাই, বিচার যেন কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, আইনের ভিত্তিতে দ্রুত সম্পন্ন হয়।
মামলার অগ্রগতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, অস্ত্র সবার কাছে থাকে না। যাদের কাছে অস্ত্র ছিল, তারা মূল সন্ত্রাসী। অস্ত্র নিয়ে যারা ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে, তাদের অনেকেই শুরুতেই পালিয়ে যায়। তারপরও তদন্ত থেমে নেই। তথ্য-প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন উপায়ে তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ চলছে। দ্রুত মামলাগুলোর নিষ্পত্তির জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন করছে।