রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হল আজ। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটে। এই দিনটি পরবর্তীকালে ‘৩৬ জুলাই’ নামে পরিচিতি পায়। দিবসটি পালনে রাজধানীসহ সারাদেশে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আজ সরকারি ছুটির দিন। জাতীয়ভাবে উদযাপন করা হবে দিবসটি।
সেদিন ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ‘যেন দেশ আবার স্বাধীন হয়েছে’-এমন স্লোগানে স্লোগানে মুখর ছিল জনপদ। ফেনীর পথে-ঘাটে নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোরসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ বিজয়োল্লাসে মেতেছিলেন। দুপুর ২টা থেকে শহরের বিভিন্ন সড়কে নেমে আসে ছাত্র-জনতার ঢল। এসময় তরুণ-তরুণীসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষের হাতে শোভা পায় জাতীয় পতাকা। শহরের ট্রাঙ্ক রোড থেকে শুরু করে প্রতিটি অলিতে গলিতে সেদিন ছিল বিজয়ের উন্মাদনা। কে পালিয়েছে, কে পালিয়েছে, শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনা। অনেকেই স্লোগান দেন জিতিলো রে, জিতিলো, ছাত্র সমাজ জিতিলো, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলে, ফেনী জেলা স্বাধীন হল-এমন স্লোগানে, মিছিলে শহরের রাস্তায় রাস্তায়, মোড়ে মোড়ে বিজয়োল্লাস করছিল ছাত্র-জনতা। ‘অনেক দিন দম বন্ধ ছিল, আজ যেন আবার মুক্তির নিঃশ্বাস নিতে পারছি’-উল্লাস করতে করতে অনেকেই এভাবেই নিজের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেছিলেন দৈনিক ফেনীর কাছে।
শহরের প্রতিটি প্রধান সড়কসহ অলিগলিতে ছিল হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি। এর আগের দিন ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্লাইওভারের নিচে জড়ো হতে থাকেন হাজারো ছাত্র-জনতা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সরকার পতনের এক দফা কর্মসূচির সমর্থনে রাজপথে নেমেছিলেন শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, ব্যবসায়ী, অভিভাবকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতিবাদী স্লোগানে উত্তপ্ত ছিল মহিপাল ও আশপাশের এলাকা। অনেকের কাঁধে জাতীয় পতাকা, কারও হাতে প্ল্যাকার্ড। বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও নিপীড়নের অবসান ঘটিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যাশাই ছিল তাদের কণ্ঠে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে ‘বিজয়’ উদযাপনে ফেনীর ট্রাঙ্ক রোডে নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোরসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের ঢল। ছবি : দৈনিক ফেনী
সেদিন দুপুর পর্যন্ত পরিস্থিতি ছিল আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে। একপর্যায়ে মহিপাল ফ্লাইওভারের দক্ষিণ পাশে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন তারা। মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফ্লাইওভারের নিচেই আন্দোলনকারীরা জোহরের নামাজ আদায় করেন। কিন্তু দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে পুরো পরিস্থিতি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য ও মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে মহিপালের দিকে এগিয়ে আসেন। এরপর শুরু হয় ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। যে রাজপথ কিছুক্ষণ আগেও ছিল প্রতিবাদের স্লোগানে মুখর, সেটিই অল্প সময়ের ব্যবধানে রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে ‘বিজয়’ উদযাপনে ফেনীর ট্রাঙ্ক রোডে নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোরসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের ঢল। ছবি : দৈনিক ফেনী
সেদিনের সেই গুলিতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ইশতিয়াক আহম্মেদ শ্রাবণ, সরওয়ার জাহান মাসুদ, ওয়াকিল আহম্মেদ শিহাব, সাইদুল ইসলাম শাহী, জাকির হোসেন শাকিব ও মোহাম্মদ সবুজ। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় কলেজশিক্ষার্থী মাহবুবুল হক মাসুমকে। মাথায় গুলিবিদ্ধ মাসুমকে প্রথমে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। মৃত্যুর সঙ্গে তিন দিন লড়াই করে ৭ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মারা যান। সেই দিনের ঘটনায় আহত হন শিক্ষার্থী, পথচারী, গণমাধ্যমকর্মীসহ দেড় শতাধিক মানুষ। অনেকেই রাজনৈতিক ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাও নিতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে ফেনীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে উল্লাস করছে ছাত্র-জনতা। ছবি : দৈনিক ফেনী
৫ আগস্ট জেলাজুড়ে বিজয় উদযাপনের একই চিত্র দেখা গেছে ফেনীর শহর থেকে গ্রামে। শেখ হাসিনার পদত্যাগে উল্লাস করতে রাস্তায় নেমেছিলেন লাখো মানুষ। সেদিন দুপুর দেড়টার দিকে শহরের জহিরিয়া মসজিদের সামনে আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে গায়েবানা জানাজা পড়েন মুসল্লিরা। এরপর থেকে শহরজুড়ে জনতার বিজয় ধ্বনি ওঠে। বিজয় মিছিল থেকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগ নিয়ে বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে শহর।
জুলাইয়ের শুরুতে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। একই আন্দোলনে শামিল হয় ফেনীর সাধারণ শিক্ষার্থীরাও।
দুই বছর পরও শহীদ পরিবারগুলোর অভিযোগ, বিচার প্রক্রিয়ার গতি তাদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ধীর। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আসামি এখনো গ্রেপ্তারের বাইরে বলে দাবি তাদের। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের মূল আকাক্সক্ষা-আইনের শাসন, জবাবদিহি ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা। তাদের ভাষ্য, রাষ্ট্র আর্থিক সহায়তা দিয়েছে, খোঁজও নিয়েছে; কিন্তু সন্তান হারানোর শোক লাঘবের একমাত্র পথ হলো দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শহরের মাষ্টারপাড়ায় সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম হাজারী বাগানবাড়িতে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। ছবি : দৈনিক ফেনী
মহিপালের ঘটনায় হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ফেনী মডেল থানায় মোট ২২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি হত্যা এবং ১৫টি হত্যাচেষ্টা ও হামলার মামলা। এসব মামলার মধ্যে ১৪টি মামলার অভিযোগপত্র ইতোমধ্যে আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ। বাকি মামলাগুলোর তদন্তও দ্রুত গতিতে চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
সেদিন একপর্যায়ে বিজয়োল্লাস ক্ষোভে রূপ নেয়। শহরের একাধিক স্থাপনায় অগ্নিযোগ ভাংচুরের পর বিক্ষুব্ধ জনতা আগুন দেয় নিজাম হাজারীর বহুল আলোচিত সেই প্রাসাদোপম বাগানবাড়িতে। এরপর একে একে ফেনী পৌরসভা, জেলার একাধিক থানাসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা, ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স, আওয়ামী লীগ কার্যালয়, নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ জনতা।