ফুলগাজীতে চেক জাল করে সরকারি অর্থ লোপাটের বিষয়টি নিয়ে উপজেলাজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে দৈনিক ফেনীর অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩ মার্চ পর্যন্ত ২৬টি চেকের প্রতিটি চেকে ইউএনও’র স্বাক্ষরের পর অঙ্কে ও কথায় মূল অঙ্কের পাশে ২ লাখ টাকা বাড়তি যুক্ত করে চতুরভাবে এই জালিয়াতি করা হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, প্রায় আট মাস ধরে ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিলের বিভিন্ন খাতের চেকে অনুমোদিত টাকার সঙ্গে বাড়তি ২ লাখ টাকা অঙ্কে ও কথায় যুক্ত করে অর্থ লোপাট করা হয়। গত ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই প্রথমবার চেক জালিয়াতি করে টাকা উত্তোলন করা হয়। অফিস আপ্যায়ন খাতে ওই চেকে প্রকৃত অঙ্কের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার টাকা। জালিয়াতি করে কথায় ও অঙ্কে দুই লাখ যুক্ত করার পর চেকে অনুমোদিত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৩ হাজার টাকায়।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩ মার্চ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট খাতে ২৬টি চেকের অনুমোদিত অর্থের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৪৫৫ টাকা। এর বিপরীতে প্রতিটি চেক থেকে ২ লাখ টাকা বাড়তি যুক্ত করে ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ৫১ লাখ ৪৫৫ টাকা। সর্বশেষ চেক জালিয়াতি করা হয় চলতি বছরের ৩ মার্চ। ওই চেকে গাড়ির জ্বালানি তেলের বিল বাবদ ১৬ হাজার ৭২২ টাকার অর্থ অনুমোদন করা হয়। এই চেকটিতেও বাড়তি ২ লাখ টাকা যোগ করে প্রতারণা করা হয়।
জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী ইউএনও ফাহরিয়া ইসলাম ফুলাগাজীতে ১৪ মাস দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি উপজেলা পরিষদ প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। ২০২৫ সালের ৮ মে ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর চলতি বছরের ২৩ জুন তাকে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে বদলির আদেশ জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রস্তুতির সময় হিসাব—নিকাশ নিরীক্ষণ করে চেক জালিয়াতির বিষয়টি উদঘাটন করতে পারেন তিনি। চেক বইয়ের কাউন্টারফয়েল, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, রেজিস্ট্রার ও ভাউচার মেলানোর পর হিসেবে বিপুল গরমিল টের পাওয়া যায়।
দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক চেক জালিয়াতি করে অর্থ উত্তোলন করা হলেও এতদিন কেন তা ধরা পড়েনি, এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ফুলগাজীতে থেকে বিদায়ের প্রাক্কালে এমন কাণ্ডে বিপাকে পড়েছেন ফাহরিয়া ইসলাম। এতে জড়িত থাকায় উপজেলা পরিষদের তিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও যথাযথ প্রশাসনিক তদারকিতে ব্যর্থতার দায় নিতে হতে পারে বিসিএস ২৫তম প্রশাসন ব্যাচের এই কর্মকর্তাকেও। তবে এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খুলতে চাননি তিনি।
টাকা উত্তোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীও
সোনালী ব্যাংকের ফুলগাজী শাখার ব্যাংক হিসাব অনুযায়ী, চেক জালিয়াতির পর ব্যাংক থেকে সর্বাধিক টাকা উত্তোলন করেছেন অফিস সহায়ক মো. ফিরোজ। তিনি জালিয়াতির ২১টি চেকের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন করেছেন। এছাড়া অপর অফিস সহায়ক নূর ইসলাম চারবার এবং ক্ষুদিরাম শর্মা নামে পরিষদের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী টাকা তুলতে ব্যাংকে গেছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্ষুদিরাম শর্মা একটি চেকে মাধ্যমে ২ লাখ ১৬ হাজার ১০০ টাকা উত্তোলন করেন। অথচ সংশ্লিষ্ট চেকের প্রকৃত অনুমোদিত অর্থ ছিল মাত্র ১৬ হাজার ১০০ টাকা। অর্থাৎ ওই চেকে বাড়তি ২ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে ব্যাংক স্টেটমেন্টে পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে জানতে ক্ষুদিরাম শর্মার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়।
ফুলগাজী উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. ইউসুফ বলেন, এটি উপজেলা পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব তহবিলের টাকা। এ ধরনের লেনদেনে আইবাস ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। শুধু কর্মচারীদের বেতনের বিল ব্যাংকে দেওয়া হয়। এরপর কীভাবে টাকা উত্তোলন হয়েছে, সেটি উপজেলা পরিষদের বিষয়।
পরশুরামের ইউএনওকে ফুলগাজীর অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান
ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা না থাকায় বর্তমানে পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অতনু বড়–য়াকে ফুলগাজীর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দৈনিক ফেনীকে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে মুহুরী নদীর বাঁধ পরিদর্শন এবং এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এখনো ফুলগাজীতে যেতে পারেননি। তিনি আরও জানান, নতুন ইউএনও দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হবে।
জালিয়াতির পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করা হবে: জেলা প্রশাসক
ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, চেকের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন ও জালিয়াতির পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করা হবে। ব্যাংক থেকে অ্যাকাউন্টস অফিসারের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের কথা ছিল, কিন্তু তা বাহকের মাধ্যমে উত্তোলন কেন করা হয়েছে এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, এ বিষয়টি আমাকে দেখে বলতে হবে। প্রাথমিকভাবে যা জেনেছি, চেক লেখা হয়েছে, ব্যাংকে জমা হয়েছে এবং পরে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। এটি সম্ভবত আইবাসের মাধ্যমে হয়নি।
ব্যাংক স্টেটমেন্টে বাহক হিসেবে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সম্পৃক্ততার ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, এ মুহূর্তে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। এটি তদন্তাধীন বিষয়। পুলিশ কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য বের করবে।
তিনি বলেন, এটি প্রশাসনিক বিষয়। সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী ফৌজদারি মামলার বিষয় বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিধিমালায় যা রয়েছে
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপজেলা পরিষদ হিসাব বিধিমালায় অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে চেকের ব্যবহার প্রসঙ্গে বিধান রয়েছে, পরিষদ তহবিলের ব্যাংক হিসাবের নগদ অর্থ জমা ও উত্তোলনের দায়িত্ব উপজেলা ফিন্যান্স অফিসারের। এক হাজার টাকার অধিক পরিমাণ প্রদেয় অর্থ চেয়ারম্যান ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা কর্তৃক স্বাক্ষরিত ক্রস চেকের মাধ্যমে প্রদান করা যাবে এবং অনুমোদিত খাতে উক্ত অর্থ যথাযথ পদ্ধতিতে বিধি মোতাবেক ব্যয় হয়েছে কিনা তা চেকে স্বাক্ষরের আগে চেয়ারম্যান ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিশ্চিত হতে হবে। এছাড়া অর্থ প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে ভাউচারে নাম্বার উল্লেখ করে ‘চেকের মাধ্যমে পরিশোধ’ লিখিত ষ্ট্যাম্প লাগানোর বিধান রয়েছে।
অথচ ফুলগাজী উপজেলা পরিষদে সেই বিধিমালা মানা হয়নি। পরিষদের চেক যেত কম্পিউটার অপারেটর হাতে। ব্যাংক থেকে চেকের অর্থ উত্তোলন করতেন অভিযুক্ত দুইজন অফিস সহায়ক।
মামলার অগ্রগতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা ফুলগাজী থানার উপপুলিশ পরিদর্শক (এসআই) নুরুল ইসলাম জানান, পরিষদের কম্পিউটার অপারেটর পার্থ সারথী পাল, অফিস সহায়ক মো. ফিরোজ ও নূর ইসলামের প্রতারণা, জালিয়াতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও পরস্পরের যোগসাজশে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত উত্তোলিত অর্থের প্রকৃত গন্তব্য, অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কোথায় ব্যর্থতা ছিল, সেসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।