ফেনী    রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
দৈনিক ফেনী

মুক্তিকামীদের পথ দেখিয়েছিল গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদ



মুক্তিকামীদের পথ দেখিয়েছিল গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদ

১৯৭১ সালে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের পর কার্যত ভেঙে পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো। জেলা, মহকুমায় জনসাধারণের নিয়ন্ত্রণ নেয় গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদ বা সংগ্রাম কমিটি। ফেনীতে সশস্ত্র সংগ্রামের বার্তা ছড়াতে থাকে এই কমিটি। একইসাথে বাজারব্যবস্থা, যুদ্ধের প্রস্তুতি, সশস্ত্র প্রশিক্ষণ এবং সম্ভাব্য যুদ্ধে প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহের কঠিনতম কাজ করেছিল সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৭১ সালের ২৭-২৮ মার্চ পাকিস্তানি হানাদারের বিরুদ্ধে ফেনীতে প্রথম যুদ্ধে মুক্তিকামী বাঙালির জয় হয় সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে।

১৯৭১ সালের ১৩ মার্চ তৎকালীন নোয়াখালী জেলা গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদের নামে বিলি হয় প্রচারপত্র (তথ্যসূত্র-মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ: নোয়াখালী জেলা)। প্রচারপত্রের নিচের দিকে উল্লেখ করা হয়েছে ৫ সদস্যের নোয়াখালী জেলা গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদ সভ্যদের নাম। তারা হলেন আবদুল মালেক উকিল (সভাপতি), নুরুল হক (সম্পাদক), তিনজন সদস্য এমএ রশিদ, খাজা আহমদ এবং সহিদ উদ্দিন এসকান্দার। এরা সকলেই আওয়ামী নেতা এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদ সদস্য। ফেনী তখন নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত মহকুমা।

নোয়াখালী জেলা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পরপরই ফেনী মহকুমা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। গঠিত হয় থানা কমিটিও। জেলার আদলে মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সংগ্রাম পরিষদের যথাক্রমে সভাপতি ও সম্পাদক হন। তবে কত সদস্য বিশিষ্ট ফেনী মহকুমা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়েছিল তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আওয়ামী লীগের একক নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলেও মার্চের মাঝামাঝি এসে সর্বদলীয় ফেনী মহকুমা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় (সূত্র—বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের, সদস্য, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ)।

ফেনী মহকুমা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ছিলেন খাজা আহমদ। একইসময়ে তিনি নোয়াখালী জেলার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গঠিত সংগ্রাম কমিটির পাঁচজনের একজন ছিলেন। মহকুমা কমিটির সম্পাদক ছিলেন এমএস হুদা। সদস্যদের মধ্যে সৈয়দ আহমদ, আবদুল মালেক, এবিএম তালেব আলী, নুরুল হুদা, সুজাত আলী, সৈয়দ রুহুল আমিন, আবদুর রহমান বিকম, আবদুস সাত্তার, ইউনুছ চৌধুরী, একেএম শামছুল হক, মাহফুজুল হক, খায়েজ আহমেদ (নবাবপুর), সুলতান আহমেদ (লেমুয়া), অধ্যাপক মাহবুবুল আলম অন্যতম (সূত্র-সাপ্তাহিক জাতীয়বার্তা)।

বিভিন্ন সূত্রে দেখা গেছে, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর অসহযোগ আন্দোলনে ঢাকা হতে ঘোষিত কর্মসূচিগুলো ফেনীতে সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে পালিত হয়েছে। ফেনী মহকুমায় এই কমিটির ব্যাপক ভূমিকা ছিল। অস্ত্র প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিচালনা, দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগ এবং ঐতিহাসিক সিও অফিস যুদ্ধে মুক্তিকামী বাঙালির বিজয় সুনিশ্চিত হয়েছিল সংগ্রাম কমিটির বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত ও সমন্বয়ে। এছাড়া ত্রিপুরায় শরণার্থী ক্যাম্প, যুব প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে মুখ্য ভূমিকা রাখেন সংগ্রাম পরিষদের নেতারা।

মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রাম পরিষদের ভূমিকা বুঝতে সহযোগী হতে পারে যুদ্ধকালীন পত্রিকায় প্রকাশিত বিবৃতি ও সংবাদ। ৭১-এর মার্চের শেষদিন জয় বাংলা শীর্ষক পত্রিকায় সম্পাদকীয়'র নিন্মোক্ত খন্ডাংশে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে। অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে সংগ্রাম পরিষদ বা গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদের ভূমিকা কী ছিল তা এতে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। জয় বাংলা পত্রিকার সম্পাদকের ওই আহবানের মাধ্যমে সংগ্রাম পরিষদের কার্যকারিতা এবং বাঙালির কাছে এর গ্রহণযোগ্যতার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়—
‘‘গতকল্যকার সংখ্যায় আমরা জনসাধারণের প্রতি আবেদন করিয়াছিলাম- প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্রয় করিবেন না। জানিতে পারিলাম কিছুসংখ্যক লোক বেহুশের মত লবণ কিনিতে শুরু করিয়াছেন। এই জাতীয় কর্ম হইতে বিরত থাকুন । ইহাতে বাজারে সংকট সৃষ্টি হইতে পারে। আমরা মনে করি দোকানদারদের উচিত লবণের মত একটি অত্যাবশ্যকীয় জিনিস কাহারও নিকট এক সঙ্গে অর্ধসেরের বেশী বিক্রয় না করা। এই সমস্ত ছোটখাট ব্যাপারেও সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকিবেন—ইহা কোন কাজের কথা নহে। সংগ্রাম পরিষদের অনুমোদন সাপেক্ষে আপনারাও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি নাগরিকের জাতীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করা কর্তব্য (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ-২)’’।

৭ই মার্চের পরেই ফেনী মহকুমা সদর ছাড়াও ইউনিয়নেও অস্ত্র প্রশিক্ষণের তথ্য পাওয়া গেছে। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক-আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য, ছুটিতে আসা এসব বাহিনীর সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাদের সমন্বয় করেছেন সংগ্রাম পরিষদের নেতারা (তথ্যসূত্র-বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু ইউসুফ)।

পাকিস্তান সরকারের শাসন প্রত্যাখ্যান করে নতুন নির্দেশনা আসে সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে দেওয়া নির্দেশনা এবং এরপর অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে অন্যান্য নির্দেশনাগুলো সর্বত্র ছড়িয়েছিল সংগ্রাম পরিষদ।

নোয়াখালী জেলা গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদের নামে জনস্বার্থে প্রচারপত্রে প্রচারিত বার্তায় এর প্রমাণ মেলে। এতে প্রচারিত নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়—
“১। পুন:নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত সাহায্য ও পুনর্বাসনের যাবতীয় কার্য্য, সাহায্য সামগ্রী সরবরাহ ও বণ্টন যথারীতি চলবে।
২। সমবায় ব্যাংক ও অন্যান্য তফসিলী ব্যাঙ্কের যাবতীয় লেনদেন বর্ত্তমান কর্মসূচী অনুযায়ী অব্যাহত থাকিবে।
৩। জিলা পরিষদ, পৌরসভা, স্থানীয় সমবায় অফিসের যাবতীয় উন্নয়ন কাৰ্য্য; পশু পালন অফিস; সি-ও (উন্নয়ন) অফিস; ওয়াপদা অফিস; সড়ক ও গৃহ নির্মাণ বিভাগীয় প্রকৌশলীর অফিস; হুকুম দখলীয় জমিনের ক্ষতিপূরণ অফিস; খাদ্য বিভাগীয় যাবতীয় অফিস; স্বাস্থ্য বিভাগীয় যাবতীয় অফিস; ব্যাঙ্কের লেনদেন সম্পর্কিত সংশ্লিষ্ট একাউন্ট অফিস; শিক্ষা বিভাগীয় যাবতীয় অফিস (যাহাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন বা অনঢ কোন টাকা লেনদেন করা হয় ইত্যাদি) এবং সার, বীজ পাম্প সরবরাহ: টিউবওয়েল সম্পর্কিত অফিস প্রতিদিন শুধু উন্নয়ন কার্য সম্পাদনের জন্য এবং দুর্গত এলাকায় সাহায্য পুনর্বাসনের কার্যাদি সম্পাদনের জন্য এবং জনসাধারণের হুকুম দখলীকৃত জমিনের ক্ষতিপুরণ প্রদানের হয় খোলা থাকিবে।
৪। দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কাব্য প্রতিরোধ করে পুলিশ, আনসার ও গ্রাম্য চৌকিদারগণ অপরাধীকে গ্রেফতার করতঃ সংশ্লিষ্ট থানা বা ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট হাজির করিবে এবং বিচারাধীন কোন আসামীকে পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী খালাস বা মুক্তি দেওয়া বিবেচিত হইলে বা জামিনে মুক্তি প্রদান উপযুক্ত মনে করিলে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিষ্ট্রেট তাহা নিজ চেম্বারে বা বাসায় সম্পাদন করিতে পারিবেন। পুলিশ একাউন্ট বিভাগ ও অপরাধ দমন সংক্রান্ত শাখা খোলা থাকিবে।
৫। যাবতীয় উন্নয়ন কার্য্য; সাহায্য ও পুনর্বাসন কার্য্য; কোন দুর্ঘটনা ও জরুরী তদন্ত কার্য্যে প্রশাসনিক, জন স্বাস্থ্য, ডাক্তারখানা ও স্বায়ত্ব শাসিত প্রতিষ্ঠান সমূহ উপরোক্ত কার্য্যোসাপেক্ষে এবং শুধু বেসামরিক কার্যে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের যানবাহন ব্যবহার করিতে পারিবে।
৬। কোর্ট, কাছারী, কালেক্টরী ও প্রত্যেক ফৌজদারী এবং দেওয়ানী আদালত আপাততঃ বন্ধ থাকিবে।
৭। সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকিবে।
৮। সমস্ত ভূমি-রাজস্ব, লবণ কর বন্ধ থাকিবে। কিন্তু বাজারের তোলা, গণ্ডি ইত্যাদি আদায় হইবে।
৯। কেন্দ্রীয় সরকারের দেয় অন্যান্য ট্যাক্স আদায় হইলে তাহা ইন্টার্ণ-মার্কেটাইল ও ব্যাঙ্কিং করপোরেশনে জনা থাকিবে। প্রমোদ কর ও নগদ শুল্ক আদায় হইবে।
১০। সমস্ত অফিস, আদালতে, গৃহে, দোকানে এবং যানবাহনে কালো পতাকা উড্ডীন থাকিবে।”

কার্যত মার্চেই ফেনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় মহকুমা সংগ্রাম কমিটির হাতে। প্রসঙ্গক্রমে, ভাষাসৈনিক বিচারপতি কাজী এবাদুল হক আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন, যুদ্ধ শুরুর মুহূর্তে ফেনী শহরে তেলের পাম্পে গাড়ির তেলের জন্য গেলে খাজা আহমদের অনুমতি লাগবে বলে ফিরিয়ে দেয় কর্মরতরা। খাজা আহমদের কাছে টোকেন চাইলে তিনি অপরাগতা প্রকাশ করেন এবং জানান, যতটুকু তেল আছে তা যুদ্ধে কাজে লাগবে।

সংগ্রাম পরিষদের ব্যবস্থাপনায় ফেনীতে গেরিলা যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে যায় ৭ই মার্চের পর। বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট সার্জেন শামছুল হক (আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ২৩ নম্বর আসামী) ও সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট নুরুল হকসহ একাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা ও ইপিআর সদস্য প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। ২৬ মার্চ ফেনী থানার তৎকালিন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী অস্ত্রাগার উন্মুক্ত করে দিলে খাজা আহমদের নেতৃত্বে অস্ত্র সংগ্রহ করা হয় (সূত্র-বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেব)।

ছাত্র ও যুবকদের পিটিআই স্কুল মাঠে, ঈদগাহ ময়দান প্রভৃতি উন্মুক্ত স্থানে ডামি বন্দুক দিয়ে কুচকাওয়াজ করত। মূলত যুবকগণ এভাবে গোপনে মুক্তিযুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছিল (সূত্র-বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ মুজিবুর রহমান)।

এ প্রসঙ্গে যুদ্ধ চলাকালীন জোন ডি (ফেনী, পরশুরাম, সোনাগাজী, ছাগলনাইয়া) অধিনায়ক, ফেনী-২ আসনের এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক জয়নাল আবেদিন ভিপি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বিভিন্ন ছদ্মবেশে অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ শুরু হয়। আমরা ৩০ হতে ৪০ জন ইউওটিসি করতাম। সেসময় ইউওটিসি সদস্যরা অস্ত্র চালনা ও বিভিন্ন জরুরি প্রশিক্ষণে দক্ষ ছিল। এর সাথে যুক্ত করতে থাকি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ছাত্র জনতা। ফেনী কলেজের অনেক শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন।

যুদ্ধ শুরুর পর ভারতে গড়ে তোলা বিভিন্ন ক্যাম্পের দায়িত্বে কাজ করেন এ কমিটির নেতারা। তখনও যুদ্ধরত অঞ্চলে কাজ করেছে সংগ্রাম কমিটি। বিশেষ করে, যুদ্ধে যেতে আগ্রহী যুবকদের ভারতে প্রেরণে কাজ করেছে সংগ্রাম পরিষদ।

 

দৈনিক ফেনী

রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬


মুক্তিকামীদের পথ দেখিয়েছিল গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদ

প্রকাশের তারিখ : ১২ মার্চ ২০২৬

featured Image

১৯৭১ সালে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের পর কার্যত ভেঙে পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো। জেলা, মহকুমায় জনসাধারণের নিয়ন্ত্রণ নেয় গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদ বা সংগ্রাম কমিটি। ফেনীতে সশস্ত্র সংগ্রামের বার্তা ছড়াতে থাকে এই কমিটি। একইসাথে বাজারব্যবস্থা, যুদ্ধের প্রস্তুতি, সশস্ত্র প্রশিক্ষণ এবং সম্ভাব্য যুদ্ধে প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহের কঠিনতম কাজ করেছিল সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৭১ সালের ২৭-২৮ মার্চ পাকিস্তানি হানাদারের বিরুদ্ধে ফেনীতে প্রথম যুদ্ধে মুক্তিকামী বাঙালির জয় হয় সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে।

১৯৭১ সালের ১৩ মার্চ তৎকালীন নোয়াখালী জেলা গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদের নামে বিলি হয় প্রচারপত্র (তথ্যসূত্র-মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ: নোয়াখালী জেলা)। প্রচারপত্রের নিচের দিকে উল্লেখ করা হয়েছে ৫ সদস্যের নোয়াখালী জেলা গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদ সভ্যদের নাম। তারা হলেন আবদুল মালেক উকিল (সভাপতি), নুরুল হক (সম্পাদক), তিনজন সদস্য এমএ রশিদ, খাজা আহমদ এবং সহিদ উদ্দিন এসকান্দার। এরা সকলেই আওয়ামী নেতা এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদ সদস্য। ফেনী তখন নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত মহকুমা।

নোয়াখালী জেলা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পরপরই ফেনী মহকুমা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। গঠিত হয় থানা কমিটিও। জেলার আদলে মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সংগ্রাম পরিষদের যথাক্রমে সভাপতি ও সম্পাদক হন। তবে কত সদস্য বিশিষ্ট ফেনী মহকুমা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়েছিল তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আওয়ামী লীগের একক নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলেও মার্চের মাঝামাঝি এসে সর্বদলীয় ফেনী মহকুমা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় (সূত্র—বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের, সদস্য, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ)।

ফেনী মহকুমা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ছিলেন খাজা আহমদ। একইসময়ে তিনি নোয়াখালী জেলার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গঠিত সংগ্রাম কমিটির পাঁচজনের একজন ছিলেন। মহকুমা কমিটির সম্পাদক ছিলেন এমএস হুদা। সদস্যদের মধ্যে সৈয়দ আহমদ, আবদুল মালেক, এবিএম তালেব আলী, নুরুল হুদা, সুজাত আলী, সৈয়দ রুহুল আমিন, আবদুর রহমান বিকম, আবদুস সাত্তার, ইউনুছ চৌধুরী, একেএম শামছুল হক, মাহফুজুল হক, খায়েজ আহমেদ (নবাবপুর), সুলতান আহমেদ (লেমুয়া), অধ্যাপক মাহবুবুল আলম অন্যতম (সূত্র-সাপ্তাহিক জাতীয়বার্তা)।

বিভিন্ন সূত্রে দেখা গেছে, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর অসহযোগ আন্দোলনে ঢাকা হতে ঘোষিত কর্মসূচিগুলো ফেনীতে সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে পালিত হয়েছে। ফেনী মহকুমায় এই কমিটির ব্যাপক ভূমিকা ছিল। অস্ত্র প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিচালনা, দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগ এবং ঐতিহাসিক সিও অফিস যুদ্ধে মুক্তিকামী বাঙালির বিজয় সুনিশ্চিত হয়েছিল সংগ্রাম কমিটির বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত ও সমন্বয়ে। এছাড়া ত্রিপুরায় শরণার্থী ক্যাম্প, যুব প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে মুখ্য ভূমিকা রাখেন সংগ্রাম পরিষদের নেতারা।

মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রাম পরিষদের ভূমিকা বুঝতে সহযোগী হতে পারে যুদ্ধকালীন পত্রিকায় প্রকাশিত বিবৃতি ও সংবাদ। ৭১-এর মার্চের শেষদিন জয় বাংলা শীর্ষক পত্রিকায় সম্পাদকীয়'র নিন্মোক্ত খন্ডাংশে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে। অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে সংগ্রাম পরিষদ বা গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদের ভূমিকা কী ছিল তা এতে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। জয় বাংলা পত্রিকার সম্পাদকের ওই আহবানের মাধ্যমে সংগ্রাম পরিষদের কার্যকারিতা এবং বাঙালির কাছে এর গ্রহণযোগ্যতার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়—
‘‘গতকল্যকার সংখ্যায় আমরা জনসাধারণের প্রতি আবেদন করিয়াছিলাম- প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্রয় করিবেন না। জানিতে পারিলাম কিছুসংখ্যক লোক বেহুশের মত লবণ কিনিতে শুরু করিয়াছেন। এই জাতীয় কর্ম হইতে বিরত থাকুন । ইহাতে বাজারে সংকট সৃষ্টি হইতে পারে। আমরা মনে করি দোকানদারদের উচিত লবণের মত একটি অত্যাবশ্যকীয় জিনিস কাহারও নিকট এক সঙ্গে অর্ধসেরের বেশী বিক্রয় না করা। এই সমস্ত ছোটখাট ব্যাপারেও সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকিবেন—ইহা কোন কাজের কথা নহে। সংগ্রাম পরিষদের অনুমোদন সাপেক্ষে আপনারাও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি নাগরিকের জাতীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করা কর্তব্য (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ-২)’’।

৭ই মার্চের পরেই ফেনী মহকুমা সদর ছাড়াও ইউনিয়নেও অস্ত্র প্রশিক্ষণের তথ্য পাওয়া গেছে। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক-আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য, ছুটিতে আসা এসব বাহিনীর সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাদের সমন্বয় করেছেন সংগ্রাম পরিষদের নেতারা (তথ্যসূত্র-বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু ইউসুফ)।

পাকিস্তান সরকারের শাসন প্রত্যাখ্যান করে নতুন নির্দেশনা আসে সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে দেওয়া নির্দেশনা এবং এরপর অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে অন্যান্য নির্দেশনাগুলো সর্বত্র ছড়িয়েছিল সংগ্রাম পরিষদ।

নোয়াখালী জেলা গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদের নামে জনস্বার্থে প্রচারপত্রে প্রচারিত বার্তায় এর প্রমাণ মেলে। এতে প্রচারিত নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়—
“১। পুন:নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত সাহায্য ও পুনর্বাসনের যাবতীয় কার্য্য, সাহায্য সামগ্রী সরবরাহ ও বণ্টন যথারীতি চলবে।
২। সমবায় ব্যাংক ও অন্যান্য তফসিলী ব্যাঙ্কের যাবতীয় লেনদেন বর্ত্তমান কর্মসূচী অনুযায়ী অব্যাহত থাকিবে।
৩। জিলা পরিষদ, পৌরসভা, স্থানীয় সমবায় অফিসের যাবতীয় উন্নয়ন কাৰ্য্য; পশু পালন অফিস; সি-ও (উন্নয়ন) অফিস; ওয়াপদা অফিস; সড়ক ও গৃহ নির্মাণ বিভাগীয় প্রকৌশলীর অফিস; হুকুম দখলীয় জমিনের ক্ষতিপূরণ অফিস; খাদ্য বিভাগীয় যাবতীয় অফিস; স্বাস্থ্য বিভাগীয় যাবতীয় অফিস; ব্যাঙ্কের লেনদেন সম্পর্কিত সংশ্লিষ্ট একাউন্ট অফিস; শিক্ষা বিভাগীয় যাবতীয় অফিস (যাহাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন বা অনঢ কোন টাকা লেনদেন করা হয় ইত্যাদি) এবং সার, বীজ পাম্প সরবরাহ: টিউবওয়েল সম্পর্কিত অফিস প্রতিদিন শুধু উন্নয়ন কার্য সম্পাদনের জন্য এবং দুর্গত এলাকায় সাহায্য পুনর্বাসনের কার্যাদি সম্পাদনের জন্য এবং জনসাধারণের হুকুম দখলীকৃত জমিনের ক্ষতিপুরণ প্রদানের হয় খোলা থাকিবে।
৪। দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কাব্য প্রতিরোধ করে পুলিশ, আনসার ও গ্রাম্য চৌকিদারগণ অপরাধীকে গ্রেফতার করতঃ সংশ্লিষ্ট থানা বা ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট হাজির করিবে এবং বিচারাধীন কোন আসামীকে পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী খালাস বা মুক্তি দেওয়া বিবেচিত হইলে বা জামিনে মুক্তি প্রদান উপযুক্ত মনে করিলে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিষ্ট্রেট তাহা নিজ চেম্বারে বা বাসায় সম্পাদন করিতে পারিবেন। পুলিশ একাউন্ট বিভাগ ও অপরাধ দমন সংক্রান্ত শাখা খোলা থাকিবে।
৫। যাবতীয় উন্নয়ন কার্য্য; সাহায্য ও পুনর্বাসন কার্য্য; কোন দুর্ঘটনা ও জরুরী তদন্ত কার্য্যে প্রশাসনিক, জন স্বাস্থ্য, ডাক্তারখানা ও স্বায়ত্ব শাসিত প্রতিষ্ঠান সমূহ উপরোক্ত কার্য্যোসাপেক্ষে এবং শুধু বেসামরিক কার্যে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের যানবাহন ব্যবহার করিতে পারিবে।
৬। কোর্ট, কাছারী, কালেক্টরী ও প্রত্যেক ফৌজদারী এবং দেওয়ানী আদালত আপাততঃ বন্ধ থাকিবে।
৭। সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকিবে।
৮। সমস্ত ভূমি-রাজস্ব, লবণ কর বন্ধ থাকিবে। কিন্তু বাজারের তোলা, গণ্ডি ইত্যাদি আদায় হইবে।
৯। কেন্দ্রীয় সরকারের দেয় অন্যান্য ট্যাক্স আদায় হইলে তাহা ইন্টার্ণ-মার্কেটাইল ও ব্যাঙ্কিং করপোরেশনে জনা থাকিবে। প্রমোদ কর ও নগদ শুল্ক আদায় হইবে।
১০। সমস্ত অফিস, আদালতে, গৃহে, দোকানে এবং যানবাহনে কালো পতাকা উড্ডীন থাকিবে।”

কার্যত মার্চেই ফেনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় মহকুমা সংগ্রাম কমিটির হাতে। প্রসঙ্গক্রমে, ভাষাসৈনিক বিচারপতি কাজী এবাদুল হক আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন, যুদ্ধ শুরুর মুহূর্তে ফেনী শহরে তেলের পাম্পে গাড়ির তেলের জন্য গেলে খাজা আহমদের অনুমতি লাগবে বলে ফিরিয়ে দেয় কর্মরতরা। খাজা আহমদের কাছে টোকেন চাইলে তিনি অপরাগতা প্রকাশ করেন এবং জানান, যতটুকু তেল আছে তা যুদ্ধে কাজে লাগবে।

সংগ্রাম পরিষদের ব্যবস্থাপনায় ফেনীতে গেরিলা যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে যায় ৭ই মার্চের পর। বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট সার্জেন শামছুল হক (আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ২৩ নম্বর আসামী) ও সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট নুরুল হকসহ একাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা ও ইপিআর সদস্য প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। ২৬ মার্চ ফেনী থানার তৎকালিন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী অস্ত্রাগার উন্মুক্ত করে দিলে খাজা আহমদের নেতৃত্বে অস্ত্র সংগ্রহ করা হয় (সূত্র-বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেব)।

ছাত্র ও যুবকদের পিটিআই স্কুল মাঠে, ঈদগাহ ময়দান প্রভৃতি উন্মুক্ত স্থানে ডামি বন্দুক দিয়ে কুচকাওয়াজ করত। মূলত যুবকগণ এভাবে গোপনে মুক্তিযুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছিল (সূত্র-বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ মুজিবুর রহমান)।

এ প্রসঙ্গে যুদ্ধ চলাকালীন জোন ডি (ফেনী, পরশুরাম, সোনাগাজী, ছাগলনাইয়া) অধিনায়ক, ফেনী-২ আসনের এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক জয়নাল আবেদিন ভিপি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বিভিন্ন ছদ্মবেশে অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ শুরু হয়। আমরা ৩০ হতে ৪০ জন ইউওটিসি করতাম। সেসময় ইউওটিসি সদস্যরা অস্ত্র চালনা ও বিভিন্ন জরুরি প্রশিক্ষণে দক্ষ ছিল। এর সাথে যুক্ত করতে থাকি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ছাত্র জনতা। ফেনী কলেজের অনেক শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন।

যুদ্ধ শুরুর পর ভারতে গড়ে তোলা বিভিন্ন ক্যাম্পের দায়িত্বে কাজ করেন এ কমিটির নেতারা। তখনও যুদ্ধরত অঞ্চলে কাজ করেছে সংগ্রাম কমিটি। বিশেষ করে, যুদ্ধে যেতে আগ্রহী যুবকদের ভারতে প্রেরণে কাজ করেছে সংগ্রাম পরিষদ।

 


দৈনিক ফেনী

সম্পাদক ও প্রকাশক: আরিফুল আমীন রিজভী কর্তৃক পপুলার অফসেট প্রেস, মিজান রোড, ফেনী-৩৯০০ থেকে মুদ্রিত এবং ৪৩৪, আমিন টাওয়ার (৬ষ্ঠ তলা), ট্রাংক রোড, ফেনী হতে প্রকাশিত।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী
মুক্তিকামীদের পথ দেখিয়েছিল গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদ
0:00 0:00
1.0x