ফেনী    বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩
দৈনিক ফেনী

পেয়ার আহমদ মজুমদার: একজন শিক্ষক, সংগঠক ও মানুষের আপনজন



পেয়ার আহমদ মজুমদার: একজন শিক্ষক, সংগঠক ও মানুষের আপনজন

"একজন শিক্ষক মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু তাঁর শিক্ষা মৃত্যুবরণ করে না। একজন সমাজসেবক বিদায় নেন, কিন্তু তাঁর বপন করা মানবিকতার বীজ সমাজে বহুদিন ফল দেয়।"

আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যখন সমাজে যোগ্য মানুষের অভাবের চেয়ে ভালো মানুষের অভাব নিয়ে উদ্বেগ বেশি। শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে কি না—এই প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় যখন কোনো শিক্ষক, সমাজসেবক বা সংগঠকের মৃত্যু ঘটে, তখন সেটি কেবল একজন ব্যক্তির প্রয়াণ নয়; বরং সমাজের নৈতিক পুঁজি থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের বিদায়। মাওলানা পেয়ার আহমদ মজুমদারের প্রয়াণকে আমি সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখি।

তাঁকে শুধু একজন শিক্ষক বললে তাঁর পরিচয় পূর্ণ হয় না। তিনি ছিলেন শিক্ষা-অনুরাগী, সমাজ-সংগঠক, মানবিক মানুষ এবং সর্বোপরি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি নীরবে মানুষের জন্য কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি সমাজকে বদলাতে হলে প্রথমে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে, মানুষকে একত্রে কাজ করতে শেখাতে হবে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে লালন করতে হবে।

যে কয়জন মানুষ ছাগলনাইয়া একাডেমী ও কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠা করেন, তার অন্যতম ছিলেন পেয়ার আহমদ মজুমদার৷ এতে তার শিক্ষা অনুরাগের ও শিক্ষা সংগঠকের প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়াও তিনি লম্বা সময় ধরে ছাগলনাইয়া একাডেমি কিন্ডারগার্টেন এর প্রধান শিক্ষক হিসেবে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।  

আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় কয়েক বছর আগের হলেও ২০২৪ সালের ফেনীর ভয়াবহ বন্যার পর তাঁর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ হয়। দুর্যোগের সময় মানুষের প্রকৃত চরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন দেখেছি, তিনি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আন্তরিকতার সঙ্গে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেন। কোথায় ত্রাণ পৌঁছাবে, কারা সহযোগিতার বাইরে রয়ে গেছে, কীভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করা যায়, এসব বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল বাস্তবমুখী। তিনি বুঝতেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা শুধু দান-অনুদানের বিষয় নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব।

২০২৫ সাল থেকে আমরা উভয়েই ছাগলনাইয়া কামিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডির বিদ্যোৎসাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। সেই সময় থেকে আরও কাছ থেকে তাঁকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ হয়। মাদরাসার মিটিং ও অন্যান্য সভায় তাঁর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল—তিনি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানকে কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে দেখতেন না; বরং একটি এলাকার সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করতেন।

বর্তমান সময়ে অনেকেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, কিন্তু সবাই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকে ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন না। পেয়ার আহমদ মজুমদারের মধ্যে আমি সেই ব্যতিক্রমী দায়িত্ববোধ দেখেছি।

গত এক বছরে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপের শেষে তিনি প্রায় নিয়ম করে ছাগলনাইয়া একাডেমীর নতুন ভবনের ফাইলের খোঁজ নিতেন। জানতে চাইতেন—কোনো অগ্রগতি হয়েছে কি না, কোথাও কথা বলার সুযোগ আছে কি না, বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না।

এই বিষয়টি অনেকের কাছে একটি সাধারণ অনুসন্ধান মনে হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে এটি ছিল তাঁর চরিত্রের প্রতিফলন। কারণ তিনি ব্যক্তিগত কোনো লাভের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত শিক্ষা-পরিবেশ নিশ্চিত করার চিন্তা থেকে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতেন।

একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন নিয়ে একজন শিক্ষকের এই ধারাবাহিক উদ্বেগ আমাদের শিক্ষা দেয়—প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসা মানে শুধু সেখানে পড়ানোর দায়িত্ব পালন করা নয়; পড়ানোর দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও তার অগ্রগতির জন্য চিন্তা করা।

ছাগলনাইয়ায় কোনো প্রয়োজনে গেলে যাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করাকে আমি প্রয়োজনীয় মনে করতাম, তাঁদের মধ্যে পেয়ার ভাই ছিলেন অন্যতম। কারণ জানতাম, তাঁর সঙ্গে আলাপ মানেই এলাকার উন্নয়ন, শিক্ষা, সমাজ, তরুণদের ভবিষ্যৎ এবং মানুষের কল্যাণ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা। এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য—তিনি সমস্যা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন না; বরং সমাধানের পথ খুঁজতেন।

সমাজে আজ বিভাজন বাড়ছে। রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ, ব্যক্তিগত অবস্থান—সবকিছুই যেন সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। কিন্তু পেয়ার আহমদ মজুমদার ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের মানুষ। তিনি সকল রাজনৈতিক মত, সামাজিক অবস্থান এবং পেশার মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন।

আমি কখনো তাঁকে কাউকে ছোট করতে দেখিনি। মতের অমিলকে তিনি সম্পর্কের বাধা হতে দেননি। তিনি জানতেন, একটি সমাজ তখনই এগিয়ে যায়, যখন ভিন্নমতের মানুষও একটি সাধারণ কল্যাণের প্রশ্নে একসঙ্গে বসতে পারে। এই সংস্কৃতির আজ আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সামাজিক কাজে আন্তরিক সম্পৃক্ততা। কারও অসুস্থতা, কোনো অসহায় পরিবারের দুর্দশা, কোনো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন কিংবা জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ—নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তিনি সহযোগিতা করতেন। তিনি কখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে চাননি। বরং নীরবে কাজ করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

সম্ভবত এ কারণেই তাঁর মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান এবং সর্বস্তরের মানুষ সমানভাবে শোক প্রকাশ করেছেন। একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় মৃত্যুর পর মানুষের প্রতিক্রিয়ায় প্রতিফলিত হয়। পেয়ার আহমদ মজুমদারের ক্ষেত্রেও আমরা সেটিই দেখেছি।

আজ যখন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা নিয়েও নতুন করে ভাবছে, তখন পেয়ার আহমদ মজুমদারের মতো শিক্ষকদের জীবন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উপস্থিত হয়। কারণ শিক্ষা কেবল পাঠদান নয়; শিক্ষা হলো চরিত্র গঠন, সামাজিক দায়িত্ববোধ সৃষ্টি এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া।

একজন শিক্ষক যদি একটি প্রজন্মকে সৎ হতে শেখাতে পারেন, একজন সংগঠক যদি সমাজে সহযোগিতার সংস্কৃতি তৈরি করতে পারেন এবং একজন মানুষ যদি মৃত্যুর পর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেন—তবে তাঁর জীবন নিঃসন্দেহে সফল। পেয়ার আহমদ মজুমদারের জীবন আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়ে যায়।

তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে শুধু স্মরণসভা বা শোকবার্তায় নয়; বরং শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে নিজেদের সম্পৃক্ত করে, সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করে, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজের কল্যাণে কাজ করার মাধ্যমে। কারণ একজন মানুষের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদ নয়; তাঁর সৃষ্টি করা মূল্যবোধ।

পেয়ার আহমদ মজুমদার আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন শিক্ষা-প্রেম, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সম্প্রীতির চর্চা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি নিবেদনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তাঁর মুখ হয়তো ভুলে যাবে, কিন্তু তাঁর আদর্শকে ধারণ করতে পারলে তাঁর জীবন সমাজে বেঁচে থাকবে বহুদিন।

মহান আল্লাহ তাঁর জীবনের সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে প্রশস্ত করুন, নূরে পরিপূর্ণ করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট (সিজিডি); সিন্ডিকেট সদস্য, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

দৈনিক ফেনী

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬


পেয়ার আহমদ মজুমদার: একজন শিক্ষক, সংগঠক ও মানুষের আপনজন

প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

"একজন শিক্ষক মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু তাঁর শিক্ষা মৃত্যুবরণ করে না। একজন সমাজসেবক বিদায় নেন, কিন্তু তাঁর বপন করা মানবিকতার বীজ সমাজে বহুদিন ফল দেয়।"

আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যখন সমাজে যোগ্য মানুষের অভাবের চেয়ে ভালো মানুষের অভাব নিয়ে উদ্বেগ বেশি। শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে কি না—এই প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় যখন কোনো শিক্ষক, সমাজসেবক বা সংগঠকের মৃত্যু ঘটে, তখন সেটি কেবল একজন ব্যক্তির প্রয়াণ নয়; বরং সমাজের নৈতিক পুঁজি থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের বিদায়। মাওলানা পেয়ার আহমদ মজুমদারের প্রয়াণকে আমি সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখি।

তাঁকে শুধু একজন শিক্ষক বললে তাঁর পরিচয় পূর্ণ হয় না। তিনি ছিলেন শিক্ষা-অনুরাগী, সমাজ-সংগঠক, মানবিক মানুষ এবং সর্বোপরি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি নীরবে মানুষের জন্য কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি সমাজকে বদলাতে হলে প্রথমে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে, মানুষকে একত্রে কাজ করতে শেখাতে হবে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে লালন করতে হবে।

যে কয়জন মানুষ ছাগলনাইয়া একাডেমী ও কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠা করেন, তার অন্যতম ছিলেন পেয়ার আহমদ মজুমদার৷ এতে তার শিক্ষা অনুরাগের ও শিক্ষা সংগঠকের প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়াও তিনি লম্বা সময় ধরে ছাগলনাইয়া একাডেমি কিন্ডারগার্টেন এর প্রধান শিক্ষক হিসেবে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।  

আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় কয়েক বছর আগের হলেও ২০২৪ সালের ফেনীর ভয়াবহ বন্যার পর তাঁর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ হয়। দুর্যোগের সময় মানুষের প্রকৃত চরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন দেখেছি, তিনি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আন্তরিকতার সঙ্গে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেন। কোথায় ত্রাণ পৌঁছাবে, কারা সহযোগিতার বাইরে রয়ে গেছে, কীভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করা যায়, এসব বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল বাস্তবমুখী। তিনি বুঝতেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা শুধু দান-অনুদানের বিষয় নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব।

২০২৫ সাল থেকে আমরা উভয়েই ছাগলনাইয়া কামিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডির বিদ্যোৎসাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। সেই সময় থেকে আরও কাছ থেকে তাঁকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ হয়। মাদরাসার মিটিং ও অন্যান্য সভায় তাঁর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল—তিনি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানকে কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে দেখতেন না; বরং একটি এলাকার সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করতেন।

বর্তমান সময়ে অনেকেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, কিন্তু সবাই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকে ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন না। পেয়ার আহমদ মজুমদারের মধ্যে আমি সেই ব্যতিক্রমী দায়িত্ববোধ দেখেছি।

গত এক বছরে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপের শেষে তিনি প্রায় নিয়ম করে ছাগলনাইয়া একাডেমীর নতুন ভবনের ফাইলের খোঁজ নিতেন। জানতে চাইতেন—কোনো অগ্রগতি হয়েছে কি না, কোথাও কথা বলার সুযোগ আছে কি না, বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না।

এই বিষয়টি অনেকের কাছে একটি সাধারণ অনুসন্ধান মনে হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে এটি ছিল তাঁর চরিত্রের প্রতিফলন। কারণ তিনি ব্যক্তিগত কোনো লাভের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত শিক্ষা-পরিবেশ নিশ্চিত করার চিন্তা থেকে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতেন।

একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন নিয়ে একজন শিক্ষকের এই ধারাবাহিক উদ্বেগ আমাদের শিক্ষা দেয়—প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসা মানে শুধু সেখানে পড়ানোর দায়িত্ব পালন করা নয়; পড়ানোর দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও তার অগ্রগতির জন্য চিন্তা করা।

ছাগলনাইয়ায় কোনো প্রয়োজনে গেলে যাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করাকে আমি প্রয়োজনীয় মনে করতাম, তাঁদের মধ্যে পেয়ার ভাই ছিলেন অন্যতম। কারণ জানতাম, তাঁর সঙ্গে আলাপ মানেই এলাকার উন্নয়ন, শিক্ষা, সমাজ, তরুণদের ভবিষ্যৎ এবং মানুষের কল্যাণ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা। এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য—তিনি সমস্যা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন না; বরং সমাধানের পথ খুঁজতেন।

সমাজে আজ বিভাজন বাড়ছে। রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ, ব্যক্তিগত অবস্থান—সবকিছুই যেন সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। কিন্তু পেয়ার আহমদ মজুমদার ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের মানুষ। তিনি সকল রাজনৈতিক মত, সামাজিক অবস্থান এবং পেশার মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন।

আমি কখনো তাঁকে কাউকে ছোট করতে দেখিনি। মতের অমিলকে তিনি সম্পর্কের বাধা হতে দেননি। তিনি জানতেন, একটি সমাজ তখনই এগিয়ে যায়, যখন ভিন্নমতের মানুষও একটি সাধারণ কল্যাণের প্রশ্নে একসঙ্গে বসতে পারে। এই সংস্কৃতির আজ আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সামাজিক কাজে আন্তরিক সম্পৃক্ততা। কারও অসুস্থতা, কোনো অসহায় পরিবারের দুর্দশা, কোনো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন কিংবা জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ—নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তিনি সহযোগিতা করতেন। তিনি কখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে চাননি। বরং নীরবে কাজ করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

সম্ভবত এ কারণেই তাঁর মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান এবং সর্বস্তরের মানুষ সমানভাবে শোক প্রকাশ করেছেন। একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় মৃত্যুর পর মানুষের প্রতিক্রিয়ায় প্রতিফলিত হয়। পেয়ার আহমদ মজুমদারের ক্ষেত্রেও আমরা সেটিই দেখেছি।

আজ যখন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা নিয়েও নতুন করে ভাবছে, তখন পেয়ার আহমদ মজুমদারের মতো শিক্ষকদের জীবন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উপস্থিত হয়। কারণ শিক্ষা কেবল পাঠদান নয়; শিক্ষা হলো চরিত্র গঠন, সামাজিক দায়িত্ববোধ সৃষ্টি এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া।

একজন শিক্ষক যদি একটি প্রজন্মকে সৎ হতে শেখাতে পারেন, একজন সংগঠক যদি সমাজে সহযোগিতার সংস্কৃতি তৈরি করতে পারেন এবং একজন মানুষ যদি মৃত্যুর পর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেন—তবে তাঁর জীবন নিঃসন্দেহে সফল। পেয়ার আহমদ মজুমদারের জীবন আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়ে যায়।

তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে শুধু স্মরণসভা বা শোকবার্তায় নয়; বরং শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে নিজেদের সম্পৃক্ত করে, সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করে, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজের কল্যাণে কাজ করার মাধ্যমে। কারণ একজন মানুষের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদ নয়; তাঁর সৃষ্টি করা মূল্যবোধ।

পেয়ার আহমদ মজুমদার আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন শিক্ষা-প্রেম, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সম্প্রীতির চর্চা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি নিবেদনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তাঁর মুখ হয়তো ভুলে যাবে, কিন্তু তাঁর আদর্শকে ধারণ করতে পারলে তাঁর জীবন সমাজে বেঁচে থাকবে বহুদিন।

মহান আল্লাহ তাঁর জীবনের সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে প্রশস্ত করুন, নূরে পরিপূর্ণ করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট (সিজিডি); সিন্ডিকেট সদস্য, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়


দৈনিক ফেনী

সম্পাদক ও প্রকাশক: আরিফুল আমীন রিজভী কর্তৃক পপুলার অফসেট প্রেস, মিজান রোড, ফেনী-৩৯০০ থেকে মুদ্রিত এবং ৪৩৪, আমিন টাওয়ার (৬ষ্ঠ তলা), ট্রাংক রোড, ফেনী হতে প্রকাশিত।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী
পেয়ার আহমদ মজুমদার: একজন শিক্ষক, সংগঠক ও মানুষের আপনজন
0:00 0:00
1.0x