ফেনী    রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
দৈনিক ফেনী

ব্যাংক হিসাবের তথ্য হাতিয়ে টাকা লুট করছে প্রতারকচক্র



ব্যাংক হিসাবের তথ্য হাতিয়ে টাকা লুট করছে প্রতারকচক্র

ফেসবুকে অল্প খরচে বিদেশে নেওয়ার লোভনীয় একটি বিজ্ঞাপন দেখে প্রতারক চক্রের ফাঁদে পা দেন ফেনীর ফতেহপুর এলাকার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। বিজ্ঞাপনে দেওয়া একটি ইমো নম্বরে যোগাযোগ করলে প্রতারকরা তাকে জানায়, ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য একটি ব্যাংকে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে সেখানে ৫ লাখ টাকা জমা রাখতে হবে।

প্রতারকচক্রের কথামতো তৌহিদুল ইসলাম ব্যাংকে গিয়ে একটি নতুন হিসাব খুলে সেখানে ৫ লাখ টাকা জমা রাখেন। এরপর প্রতারক চক্রটি তার কাছে ব্যাংক স্টেটমেন্ট দাবি করে। স্টেটমেন্ট দেওয়ার পর চক্রটি আরও একটি ওটিপি চায়। সহজ-সরল বিশ্বাসে তিনি ওটিপিটি দিয়ে দিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যাংক হিসাব থেকে পুরো ৫ লাখ টাকা তুলে নেয় প্রতারকরা। তৌহিদুল ইসলাম বলেন, প্রথমে বুঝতেই পারিনি এটা আসলে একটা ফাঁদ। ওটিপি দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি আমার টাকা নেই। ব্যাংক থেকে এভাবে টাকা হাতিয়ে নেবে যা আমার কল্পনাতীত। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে জানালেও তখন আর কিছু করার ছিল না। এই প্রতারণার ফলে আমি এবং আমার পরিবার বর্তমানে চরম অর্থকষ্ট ও অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি। স্বপ্ন দেখে এখন হতাশার অন্ধকারে পড়ে গেছি।

তৌহিদুল ইসলামের মতো একই কৌশলে প্রতারিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন একাধিক ভুক্তভোগী। এ নিয়ে অনুসন্ধান করে দৈনিক ফেনী। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বিদেশে কাজের সুযোগ’, ‘কম খরচে ইউরোপ ভিসা’, ‘মালয়েশিয়া বা দুবাইতে হালাল জব’ এরকম বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ফেসবুক, ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে একটি প্রতারকচক্র সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছে। তারা নিজেদের বৈধ রিক্রুটিং এজেন্ট বা বিদেশি কোম্পানির প্রতিনিধি দাবি করে আস্থা অর্জন করে। পরে নির্দিষ্ট ব্যাংকে মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট খুলে বিপুল পরিমাণ টাকা জমা দেওয়ার শর্তে ভিসার প্রলোভন দেখানো হয়।

একাধিক ভুক্তভোগী জানান, তারা টাকা জমা দেওয়ার পর প্রতারকদের আর খুঁজে পাননি এবং যোগাযোগের নম্বরও বন্ধ পেয়ে থাকেন। এর ফলে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে চরম দুর্দশায় দিন পার করছে। অনেকে ঋণ করে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ব্যাংক হিসাবে জমা রেখেছিলেন।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, প্রতারকচক্রটি তাদের টার্গেটে থাকা ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকে টাকা জমা রাখার জন্য বলে থাকে।

এসব ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাথে কথা হয় দৈনিক ফেনীর প্রতিবেদকের সঙ্গে। ব্যাংক এবং সিজেদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা জানান, একাধিক গ্রাহক এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগীদের সতর্ক করে এবং ওটিপি ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য কাউকে না দিতে পরামর্শ দেয়। গ্রাহকদের সাইবার জালিয়াতি বিষয়ে সচেতন করতে বিভিন্ন সময় প্রচারও চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে, একাধিক ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রতারণার কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে ভুক্তভোগী বলছেন, প্রতারকচক্রটি তাদের এসব ব্যাংকে হিসাব খোলার কথা বলেছে। ‘ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হবে’ এই অজুহাতে অভিযোগগুলো ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে বলে জানায় ভুক্তভোগীরা।

ব্যাংক ও নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে শহরের শহিদ শহীদুল্লা কায়সার সড়কে একটি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক বলেন, গ্রাহকরা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে তাদের নিজস্ব সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো ব্যাংকই কখনো গ্রাহকের কাছে ওটিপি চায় না, আবার কেউ কেন হিসাব খুলছেন সে বিষয়েও ব্যাংক প্রশ্ন করে না। আমাদের এক গ্রাহক সম্প্রতি এমন একটি প্রতারণার ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছিলেন। তবে সময়মতো প্রতারণার বিষয়টি জানতে পেরে তাকে সতর্ক করি এবং শেষ পর্যন্ত তিনি এই ফাঁদ থেকে সরে আসেন। এ ধরনের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে সবারই সচেতন থাকা জরুরি।

একই শর্তে, একই সড়কে অন্য একটি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক দাবি করেন, আমাদের ব্যাংকে এ ধরনের প্রতারণার কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে সামগ্রিকভাবে দেশে প্রতিনিয়ত মানুষ এই ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছে। আমাদের ব্যাংকে এ ধরনের প্রতারণার নজির খুবই কম, কারণ আমরা মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দিই না। সাধারণত যেসব প্রতিষ্ঠানের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা রয়েছে সেগুলোতে এসব ঘটনার নজির থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সকল ব্যাংকের পক্ষ থেকে গণমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে বারবার বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই কাউকে ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) শেয়ার করা যাবে না। গ্রাহকদের মনে রাখতে হবে, কোনো ব্যাংকই কখনো অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত বিষয়ে ফোন করে গ্রাহকের কাছে ওটিপি বা পাসওয়ার্ড চাইবে না। যদি কেউ কারও কথায় প্ররোচিত হয়ে ওটিপি দিয়ে দেন, তাহলে সে ক্ষেত্রে ব্যাংক দায়ভার নেবে না। এ বিষয়ে গ্রাহকদের সচেতনতা জরুরি।

 

বিদেশ ‘টোপের’ শিকার তারা

বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণার নতুন ফাঁদ পেতেছে একটি চক্র। তাদের খপ্পরে পড়ে টাকা খুইয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এমনই দুই ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছে দৈনিক ফেনী।

ফেনী শহরে একটি ওয়ার্কশপে চাকুরি করেন মামুন। তিনি বলেন, আমি প্রথমে ফেসবুকে একটি বিজ্ঞাপন দেখি, যেখানে অল্প খরচে বিদেশে যাওয়ার কথা বলা হয়। বিজ্ঞাপনটি দেখে পেইজে দেওয়া একটি নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করি। কথা বলার পর ওই নম্বর থেকে আমাকে জানায়, বিদেশ যাত্রার জন্য ব্যাংকে একটি হিসাব খুলে সেখানে দুই লাখ টাকা জমা দিয়ে একটি ব্যাংক স্টেটমেন্ট পাঠাতে হবে। আমি তার কথা অনুযায়ী ব্যাংকে একটি হিসাব খুলে তাতে দুই লাখ টাকা জমা দিই এবং সেই স্টেটমেন্ট তাকে পাঠিয়ে দিই। কিন্তু পরদিন রাতে দেখি আমার একাউন্টে কোনো টাকা নেই। এরপর আমি হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করলে দেখি সে আমাকে ব্লক করে দিয়েছে। ব্যাংক থেকে আমার টাকা এভাবে হাতিয়ে নেবে আমি জীবনে চিন্তাও করিনি।

ফেনীর শহরের শান্তিকোম্পানি সড়কে একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে মাওলানা জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, আমি বিদেশ যাওয়ার জন্য আমার এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হয়। বন্ধু ও আমি এক ব্যক্তির সাথে কথা বলি। ওই ব্যক্তি আমাকে অল্প খরচে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর কথা বলে। তার সঙ্গে আমার হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ হয়েছিল রোজার মাসে। কিন্তু কয়েক মাস যাওয়ার পর কোরবান ঈদের পরে আমাকে কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্যাংকের নাম দিয়ে বলেন, সেগুলোর যেকোনো একটিতে একাউন্ট খুলতে হবে।

ভুক্তভোগী জসিম বলেন, আমি ভিন্ন একটি ব্যাংকে একাউন্ট খোলার ইচ্ছা প্রকাশ করলে ওই ব্যক্তি (প্রতারক) জানিয়ে দেন, সে ব্যাংকে হবে না। পরে আমি তার পরামর্শ অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট ব্যাংকে গিয়ে একাউন্ট খুলি। ব্যক্তিটি আমাকে ‘ফুড প্যাকেজিং’ কোম্পানির ভিসার মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর কথা বলে এবং এজন্য কমপক্ষে ৩ লাখ টাকা একাউন্টে জমা রাখার শর্ত দেয়। আমি আত্মীয়-স্বজন থেকে টাকা সংগ্রহ করে ব্যাংক একাউন্ট করতে চাই। একাউন্ট খোলার সময় ব্যাংকের কর্মকর্তারা আমাকে জানান, এটি একটি প্রতারণামূলক প্রক্রিয়া এবং আমি প্রতারণার ফাঁদে পড়তে যাচ্ছি। তখনই আমি সতর্ক হয়ে নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে নিই।


যা বলছে পুলিশ
ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. সাইফুল ইসলাম দৈনিক ফেনীকে বলেন, আমরা এ ধরনের কয়েকটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে বের করা হবে, কোন ব্যাংকে এসব ঘটনা ঘটছে, সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর গাফিলতি আছে কি না কিংবা কেউ জড়িত কি না। এসব যাচাই করে আমরা প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।

তিনি আরও বলেন, এই ধরনের প্রতারণা থেকে দূরে থাকতে গ্রাহকদের সচেতন হওয়া জরুরি। কোনো অবস্থাতেই কাউকে পাসওয়ার্ড বা ওটিপি দেওয়া যাবে না। সচেতনতাই এমন অপরাধ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে জানান তিনি।

দৈনিক ফেনী

রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬


ব্যাংক হিসাবের তথ্য হাতিয়ে টাকা লুট করছে প্রতারকচক্র

প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুলাই ২০২৫

featured Image

ফেসবুকে অল্প খরচে বিদেশে নেওয়ার লোভনীয় একটি বিজ্ঞাপন দেখে প্রতারক চক্রের ফাঁদে পা দেন ফেনীর ফতেহপুর এলাকার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। বিজ্ঞাপনে দেওয়া একটি ইমো নম্বরে যোগাযোগ করলে প্রতারকরা তাকে জানায়, ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য একটি ব্যাংকে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে সেখানে ৫ লাখ টাকা জমা রাখতে হবে।

প্রতারকচক্রের কথামতো তৌহিদুল ইসলাম ব্যাংকে গিয়ে একটি নতুন হিসাব খুলে সেখানে ৫ লাখ টাকা জমা রাখেন। এরপর প্রতারক চক্রটি তার কাছে ব্যাংক স্টেটমেন্ট দাবি করে। স্টেটমেন্ট দেওয়ার পর চক্রটি আরও একটি ওটিপি চায়। সহজ-সরল বিশ্বাসে তিনি ওটিপিটি দিয়ে দিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যাংক হিসাব থেকে পুরো ৫ লাখ টাকা তুলে নেয় প্রতারকরা। তৌহিদুল ইসলাম বলেন, প্রথমে বুঝতেই পারিনি এটা আসলে একটা ফাঁদ। ওটিপি দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি আমার টাকা নেই। ব্যাংক থেকে এভাবে টাকা হাতিয়ে নেবে যা আমার কল্পনাতীত। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে জানালেও তখন আর কিছু করার ছিল না। এই প্রতারণার ফলে আমি এবং আমার পরিবার বর্তমানে চরম অর্থকষ্ট ও অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি। স্বপ্ন দেখে এখন হতাশার অন্ধকারে পড়ে গেছি।

তৌহিদুল ইসলামের মতো একই কৌশলে প্রতারিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন একাধিক ভুক্তভোগী। এ নিয়ে অনুসন্ধান করে দৈনিক ফেনী। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বিদেশে কাজের সুযোগ’, ‘কম খরচে ইউরোপ ভিসা’, ‘মালয়েশিয়া বা দুবাইতে হালাল জব’ এরকম বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ফেসবুক, ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে একটি প্রতারকচক্র সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছে। তারা নিজেদের বৈধ রিক্রুটিং এজেন্ট বা বিদেশি কোম্পানির প্রতিনিধি দাবি করে আস্থা অর্জন করে। পরে নির্দিষ্ট ব্যাংকে মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট খুলে বিপুল পরিমাণ টাকা জমা দেওয়ার শর্তে ভিসার প্রলোভন দেখানো হয়।

একাধিক ভুক্তভোগী জানান, তারা টাকা জমা দেওয়ার পর প্রতারকদের আর খুঁজে পাননি এবং যোগাযোগের নম্বরও বন্ধ পেয়ে থাকেন। এর ফলে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে চরম দুর্দশায় দিন পার করছে। অনেকে ঋণ করে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ব্যাংক হিসাবে জমা রেখেছিলেন।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, প্রতারকচক্রটি তাদের টার্গেটে থাকা ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকে টাকা জমা রাখার জন্য বলে থাকে।

এসব ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাথে কথা হয় দৈনিক ফেনীর প্রতিবেদকের সঙ্গে। ব্যাংক এবং সিজেদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা জানান, একাধিক গ্রাহক এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগীদের সতর্ক করে এবং ওটিপি ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য কাউকে না দিতে পরামর্শ দেয়। গ্রাহকদের সাইবার জালিয়াতি বিষয়ে সচেতন করতে বিভিন্ন সময় প্রচারও চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে, একাধিক ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রতারণার কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে ভুক্তভোগী বলছেন, প্রতারকচক্রটি তাদের এসব ব্যাংকে হিসাব খোলার কথা বলেছে। ‘ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হবে’ এই অজুহাতে অভিযোগগুলো ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে বলে জানায় ভুক্তভোগীরা।

ব্যাংক ও নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে শহরের শহিদ শহীদুল্লা কায়সার সড়কে একটি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক বলেন, গ্রাহকরা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে তাদের নিজস্ব সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো ব্যাংকই কখনো গ্রাহকের কাছে ওটিপি চায় না, আবার কেউ কেন হিসাব খুলছেন সে বিষয়েও ব্যাংক প্রশ্ন করে না। আমাদের এক গ্রাহক সম্প্রতি এমন একটি প্রতারণার ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছিলেন। তবে সময়মতো প্রতারণার বিষয়টি জানতে পেরে তাকে সতর্ক করি এবং শেষ পর্যন্ত তিনি এই ফাঁদ থেকে সরে আসেন। এ ধরনের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে সবারই সচেতন থাকা জরুরি।

একই শর্তে, একই সড়কে অন্য একটি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক দাবি করেন, আমাদের ব্যাংকে এ ধরনের প্রতারণার কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে সামগ্রিকভাবে দেশে প্রতিনিয়ত মানুষ এই ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছে। আমাদের ব্যাংকে এ ধরনের প্রতারণার নজির খুবই কম, কারণ আমরা মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দিই না। সাধারণত যেসব প্রতিষ্ঠানের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা রয়েছে সেগুলোতে এসব ঘটনার নজির থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সকল ব্যাংকের পক্ষ থেকে গণমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে বারবার বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই কাউকে ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) শেয়ার করা যাবে না। গ্রাহকদের মনে রাখতে হবে, কোনো ব্যাংকই কখনো অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত বিষয়ে ফোন করে গ্রাহকের কাছে ওটিপি বা পাসওয়ার্ড চাইবে না। যদি কেউ কারও কথায় প্ররোচিত হয়ে ওটিপি দিয়ে দেন, তাহলে সে ক্ষেত্রে ব্যাংক দায়ভার নেবে না। এ বিষয়ে গ্রাহকদের সচেতনতা জরুরি।

 

বিদেশ ‘টোপের’ শিকার তারা

বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণার নতুন ফাঁদ পেতেছে একটি চক্র। তাদের খপ্পরে পড়ে টাকা খুইয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এমনই দুই ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছে দৈনিক ফেনী।

ফেনী শহরে একটি ওয়ার্কশপে চাকুরি করেন মামুন। তিনি বলেন, আমি প্রথমে ফেসবুকে একটি বিজ্ঞাপন দেখি, যেখানে অল্প খরচে বিদেশে যাওয়ার কথা বলা হয়। বিজ্ঞাপনটি দেখে পেইজে দেওয়া একটি নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করি। কথা বলার পর ওই নম্বর থেকে আমাকে জানায়, বিদেশ যাত্রার জন্য ব্যাংকে একটি হিসাব খুলে সেখানে দুই লাখ টাকা জমা দিয়ে একটি ব্যাংক স্টেটমেন্ট পাঠাতে হবে। আমি তার কথা অনুযায়ী ব্যাংকে একটি হিসাব খুলে তাতে দুই লাখ টাকা জমা দিই এবং সেই স্টেটমেন্ট তাকে পাঠিয়ে দিই। কিন্তু পরদিন রাতে দেখি আমার একাউন্টে কোনো টাকা নেই। এরপর আমি হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করলে দেখি সে আমাকে ব্লক করে দিয়েছে। ব্যাংক থেকে আমার টাকা এভাবে হাতিয়ে নেবে আমি জীবনে চিন্তাও করিনি।

ফেনীর শহরের শান্তিকোম্পানি সড়কে একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে মাওলানা জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, আমি বিদেশ যাওয়ার জন্য আমার এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হয়। বন্ধু ও আমি এক ব্যক্তির সাথে কথা বলি। ওই ব্যক্তি আমাকে অল্প খরচে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর কথা বলে। তার সঙ্গে আমার হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ হয়েছিল রোজার মাসে। কিন্তু কয়েক মাস যাওয়ার পর কোরবান ঈদের পরে আমাকে কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্যাংকের নাম দিয়ে বলেন, সেগুলোর যেকোনো একটিতে একাউন্ট খুলতে হবে।

ভুক্তভোগী জসিম বলেন, আমি ভিন্ন একটি ব্যাংকে একাউন্ট খোলার ইচ্ছা প্রকাশ করলে ওই ব্যক্তি (প্রতারক) জানিয়ে দেন, সে ব্যাংকে হবে না। পরে আমি তার পরামর্শ অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট ব্যাংকে গিয়ে একাউন্ট খুলি। ব্যক্তিটি আমাকে ‘ফুড প্যাকেজিং’ কোম্পানির ভিসার মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর কথা বলে এবং এজন্য কমপক্ষে ৩ লাখ টাকা একাউন্টে জমা রাখার শর্ত দেয়। আমি আত্মীয়-স্বজন থেকে টাকা সংগ্রহ করে ব্যাংক একাউন্ট করতে চাই। একাউন্ট খোলার সময় ব্যাংকের কর্মকর্তারা আমাকে জানান, এটি একটি প্রতারণামূলক প্রক্রিয়া এবং আমি প্রতারণার ফাঁদে পড়তে যাচ্ছি। তখনই আমি সতর্ক হয়ে নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে নিই।


যা বলছে পুলিশ
ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. সাইফুল ইসলাম দৈনিক ফেনীকে বলেন, আমরা এ ধরনের কয়েকটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে বের করা হবে, কোন ব্যাংকে এসব ঘটনা ঘটছে, সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর গাফিলতি আছে কি না কিংবা কেউ জড়িত কি না। এসব যাচাই করে আমরা প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।

তিনি আরও বলেন, এই ধরনের প্রতারণা থেকে দূরে থাকতে গ্রাহকদের সচেতন হওয়া জরুরি। কোনো অবস্থাতেই কাউকে পাসওয়ার্ড বা ওটিপি দেওয়া যাবে না। সচেতনতাই এমন অপরাধ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে জানান তিনি।


দৈনিক ফেনী

সম্পাদক ও প্রকাশক: আরিফুল আমীন রিজভী কর্তৃক পপুলার অফসেট প্রেস, মিজান রোড, ফেনী-৩৯০০ থেকে মুদ্রিত এবং ৪৩৪, আমিন টাওয়ার (৬ষ্ঠ তলা), ট্রাংক রোড, ফেনী হতে প্রকাশিত।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী
ব্যাংক হিসাবের তথ্য হাতিয়ে টাকা লুট করছে প্রতারকচক্র
0:00 0:00
1.0x