ফেনী    বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
দৈনিক ফেনী

ফিরে দেখা ২৪ : ‘ভুল’ চিকিৎসায় চিকিৎসকের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ



ফিরে দেখা ২৪ : ‘ভুল’ চিকিৎসায় চিকিৎসকের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ

গেল বছরের ২১ জুন রাতে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন হিসেবে পরিচিত প্রফেসর ডা. কাইয়্যুমের ব্যক্তি মালিকানাধীন ফেনী প্রাইভেট হাসপাতালে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক আকিফা সুলতানার ল্যাপারোস্কোপি সার্জারি করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সেদিন সার্জারির আগে তাকে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়। অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করেন ডা. আবদুর রহমান নামে ফেনীর বাইরে থেকে আসা এক চিকিৎসক। এর পর থেকেই আকিফার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরিস্থিতি ভালো নয় দেখে সেখান থেকে তাকে প্রথমে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। কোনো উন্নতি না হওয়ায় পরদিন ২২ জুন ভোরে চট্টগ্রাম এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা যান ডা. আকিফা।

এ ঘটনার পর দেশজুড়ে আলোচনায় ছিল ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনা।

গত ২৩ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের নির্দেশনা মোতাবেক সার্জারি করার সময়ে জটিলতার প্রেক্ষিতে এ রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই তদন্ত কমিটিতে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. জালাল হোসেনকে সভাপতি করা হয়। এতে সদস্য হিসেবে ছিলেন হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) ডা. মো. কামরুজ্জামান, তৎকালীন দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল ইসলাম, ফেনী জেনারেল হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি) ডা. তাহিরা খাতুন ও জুনিয়র কনসালটেন্ট (এনেস্থেশিয়া) ডা. মো. ইলিয়াছ ভূঞা।

এ কমিটিকে পাঁচ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হলেও পরে তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আরও চার কার্যদিবস বাড়িয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল।

ডা. আকিফার স্বজনরা ইতোমধ্যে অভিযোগ করেন, ফেনী প্রাইভেট হাসপাতাল নামে ওই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ডা. কাইয়্যুমের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আকিফার মৃত্যু হয়েছে।

আকিফার চাচা ইকরাম উল্ল্যাহ ইতোমধ্যে দৈনিক ফেনীকে বলেন, আমার ভাতিজির এক সময়ের রুমমেট ফেনীতে কর্মরত ডা. নিলুফা পলির কথায় সে ফেনীতে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি করাতে যায়। আকিফা একজন অভিজ্ঞ ও সিনিয়র এনেস্থেশিওলজিস্ট চিকিৎসক চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের মালিক ডা. কাইয়্যুম বয়োবৃদ্ধ একজনকে নিয়ে আসেন। বয়সের ভারে ওই এনেস্থেশিওলজিস্ট নিজেই অসুস্থ। এনেস্থেশিয়া দেওয়ার পরই আমার ভাতিজির শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে।

তিনি বলেন, ভুল এনেস্থেশিয়া দেওয়ার পর ২১ জুন রাত ১০টার দিকে ফেনী প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে আমাদের ফোন করে বলা হয় ঢাকা থেকে যেন আইসিইউ সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ফেনীতে যাই। সেদিন রাত ৩টার দিকে আমরা ফেনী জেনারেল হাসপাতালে পৌঁছাই। সেখানে গিয়ে ডা. আকিফাকে আইসিইউতে সংকটাপন্ন অবস্থায় দেখতে পাই। তখন সেখানে অবস্থান করা হাসপাতালের চারজন চিকিৎসক ডা. আকিফাকে দ্রুত ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। কিন্তু শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার স্বার্থে চিকিৎসকদের পরামর্শে দুইজন চিকিৎসকসহ চট্টগ্রাম এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু এভারকেয়ারের মেডিকেল বোর্ড থেকে আমাদের জানায়, ফেনী প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার আর অবশিষ্ট কিছু নেই। ওই অবস্থায় তাকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আনার কোনো সুযোগ নেই। তখনই তারা আশা ছেড়ে দেন। এরপর আমরা তাকে ঢাকায় নেওয়ার জন্য রওনা হলে পথিমধ্যে তার মৃত্যু হয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. শিহাব উদ্দিন দৈনিক ফেনীকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের নির্দেশনা মোতাবেক সার্জারি করার সময়ে জটিলতার প্রেক্ষিতে এ রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় গত বছরের ২৩ জুন পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে কমিটির প্রতিবেদন অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তারপর এ বিষয়ে আর কোনো নির্দেশনা আসেনি।

তদন্ত প্রতিবেদনে এ মৃত্যুর ঘটনায় কারো সম্পৃক্ততা বা গাফেলতির তথ্য পাওয়া গেছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিবেদনের তথ্যের বিষয়টি এখন স্মরণে নেই বলে মন্তব্য করেন জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের এ শীর্ষ কর্মকর্তা।

উল্লেখ্য, ডা. আকিফা সুলতানা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের মো. গোলাম মোস্তফার দ্বিতীয় সন্তান। তিনি পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বাবার ফ্ল্যাটে থাকতেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি অবিবাহিত ছিলেন। ডা. আরিফা সুলতানা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে চিকিৎসা পেশায় যোগদান করেন। সর্বশেষ তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিনিয়র ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

দৈনিক ফেনী

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬


ফিরে দেখা ২৪ : ‘ভুল’ চিকিৎসায় চিকিৎসকের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ

প্রকাশের তারিখ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৫

featured Image

গেল বছরের ২১ জুন রাতে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন হিসেবে পরিচিত প্রফেসর ডা. কাইয়্যুমের ব্যক্তি মালিকানাধীন ফেনী প্রাইভেট হাসপাতালে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক আকিফা সুলতানার ল্যাপারোস্কোপি সার্জারি করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সেদিন সার্জারির আগে তাকে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়। অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করেন ডা. আবদুর রহমান নামে ফেনীর বাইরে থেকে আসা এক চিকিৎসক। এর পর থেকেই আকিফার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরিস্থিতি ভালো নয় দেখে সেখান থেকে তাকে প্রথমে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। কোনো উন্নতি না হওয়ায় পরদিন ২২ জুন ভোরে চট্টগ্রাম এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা যান ডা. আকিফা।

এ ঘটনার পর দেশজুড়ে আলোচনায় ছিল ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনা।

গত ২৩ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের নির্দেশনা মোতাবেক সার্জারি করার সময়ে জটিলতার প্রেক্ষিতে এ রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই তদন্ত কমিটিতে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. জালাল হোসেনকে সভাপতি করা হয়। এতে সদস্য হিসেবে ছিলেন হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) ডা. মো. কামরুজ্জামান, তৎকালীন দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল ইসলাম, ফেনী জেনারেল হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি) ডা. তাহিরা খাতুন ও জুনিয়র কনসালটেন্ট (এনেস্থেশিয়া) ডা. মো. ইলিয়াছ ভূঞা।

এ কমিটিকে পাঁচ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হলেও পরে তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আরও চার কার্যদিবস বাড়িয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল।

ডা. আকিফার স্বজনরা ইতোমধ্যে অভিযোগ করেন, ফেনী প্রাইভেট হাসপাতাল নামে ওই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ডা. কাইয়্যুমের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আকিফার মৃত্যু হয়েছে।

আকিফার চাচা ইকরাম উল্ল্যাহ ইতোমধ্যে দৈনিক ফেনীকে বলেন, আমার ভাতিজির এক সময়ের রুমমেট ফেনীতে কর্মরত ডা. নিলুফা পলির কথায় সে ফেনীতে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি করাতে যায়। আকিফা একজন অভিজ্ঞ ও সিনিয়র এনেস্থেশিওলজিস্ট চিকিৎসক চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের মালিক ডা. কাইয়্যুম বয়োবৃদ্ধ একজনকে নিয়ে আসেন। বয়সের ভারে ওই এনেস্থেশিওলজিস্ট নিজেই অসুস্থ। এনেস্থেশিয়া দেওয়ার পরই আমার ভাতিজির শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে।

তিনি বলেন, ভুল এনেস্থেশিয়া দেওয়ার পর ২১ জুন রাত ১০টার দিকে ফেনী প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে আমাদের ফোন করে বলা হয় ঢাকা থেকে যেন আইসিইউ সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ফেনীতে যাই। সেদিন রাত ৩টার দিকে আমরা ফেনী জেনারেল হাসপাতালে পৌঁছাই। সেখানে গিয়ে ডা. আকিফাকে আইসিইউতে সংকটাপন্ন অবস্থায় দেখতে পাই। তখন সেখানে অবস্থান করা হাসপাতালের চারজন চিকিৎসক ডা. আকিফাকে দ্রুত ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। কিন্তু শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার স্বার্থে চিকিৎসকদের পরামর্শে দুইজন চিকিৎসকসহ চট্টগ্রাম এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু এভারকেয়ারের মেডিকেল বোর্ড থেকে আমাদের জানায়, ফেনী প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার আর অবশিষ্ট কিছু নেই। ওই অবস্থায় তাকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আনার কোনো সুযোগ নেই। তখনই তারা আশা ছেড়ে দেন। এরপর আমরা তাকে ঢাকায় নেওয়ার জন্য রওনা হলে পথিমধ্যে তার মৃত্যু হয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. শিহাব উদ্দিন দৈনিক ফেনীকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের নির্দেশনা মোতাবেক সার্জারি করার সময়ে জটিলতার প্রেক্ষিতে এ রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় গত বছরের ২৩ জুন পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে কমিটির প্রতিবেদন অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তারপর এ বিষয়ে আর কোনো নির্দেশনা আসেনি।

তদন্ত প্রতিবেদনে এ মৃত্যুর ঘটনায় কারো সম্পৃক্ততা বা গাফেলতির তথ্য পাওয়া গেছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিবেদনের তথ্যের বিষয়টি এখন স্মরণে নেই বলে মন্তব্য করেন জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের এ শীর্ষ কর্মকর্তা।

উল্লেখ্য, ডা. আকিফা সুলতানা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের মো. গোলাম মোস্তফার দ্বিতীয় সন্তান। তিনি পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বাবার ফ্ল্যাটে থাকতেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি অবিবাহিত ছিলেন। ডা. আরিফা সুলতানা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে চিকিৎসা পেশায় যোগদান করেন। সর্বশেষ তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিনিয়র ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।


দৈনিক ফেনী

সম্পাদক ও প্রকাশক: আরিফুল আমীন রিজভী কর্তৃক পপুলার অফসেট প্রেস, মিজান রোড, ফেনী-৩৯০০ থেকে মুদ্রিত এবং ৪৩৪, আমিন টাওয়ার (৬ষ্ঠ তলা), ট্রাংক রোড, ফেনী হতে প্রকাশিত।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী
ফিরে দেখা ২৪ : ‘ভুল’ চিকিৎসায় চিকিৎসকের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ
0:00 0:00
1.0x