ফেনী    বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
দৈনিক ফেনী

পরশুরামে বিলুপ্তির পথে আখের গুড় : সরকারি সহযোগিতা পান না আখচাষীরা



পরশুরামে বিলুপ্তির পথে আখের গুড় : সরকারি সহযোগিতা পান না আখচাষীরা

পরশুরামে বিলুপ্তির পথে শত বছরের ঐতিহ্য আখের গুড় উৎপাদন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সম্ভাবনাময় আখের গুড় উৎপাদনের আগ্রহ হারাচ্ছেন এ অঞ্চলের আখ চাষীরা। জানা গেছে, পার্বত্য ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা মুহুরীর নদীর চরে শত বছর ধরে আখ চাষ করছে মির্জানগর ইউনিয়নের দক্ষিণ কাউতলী ও চম্পকনগর গ্রামের মানুষ। এখানকার আখ থেকে উৎপাদিত গুড় দেশের বিভিন্নস্থানে বিক্রি হতো। বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মুহুরী ও কহুয়া নদীর চরাঞ্চলের মাটি বেলে দোআঁশ প্রকৃতির হওয়ায় আখ চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। তবে দিন দিন পরশুরামে আখ চাষ কমছে।

উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলায় ১৮ হেক্টর জমিতে আখ চাষ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৩ হেক্টর জমির আখ কাটা হয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট মাসের ভয়াবহ বন্যায় আখ ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। আখচাষের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়া নিয়ে কৃষি অফিসের সন্দেহ রয়েছে। উপজেলায় প্রায় ৪৫০ জন কৃষক আখ চাষের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন। এদিকে গুড় উৎপাদনের সাথে কতজন চাষী জড়িত রয়েছেন, কৃষি বিভাগের কাছে তার কোন তথ্য নেই।

উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মতিউর রহমান জানান, বন্যার কারণে ধানের পাশাপাশি আখের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ৩ হেক্টর জমির আখ নষ্ট হয়ে গেছে।

দক্ষিণ কাউতলী ও চম্পকনগর গ্রামে তৈরি হয় সুস্বাদু আখের গুড়। চম্পকনগর গ্রামে আখচাষ ও গুড় উৎপাদনের সাথে প্রায় ১০টি পরিবার জড়িত রয়েছেন। প্রায় ৪০ বছর ধরে এ পেশায় জড়িত নুরনবী। তিনি বলেন, আমাদের বাবা দাদারা এই কাজ করেছে, আমরাও করছি। ৫-৭ বছর আগে দুই গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবার এ পেশার সাথে জড়িত ছিল। সরকারিভাবে কোন সহযোগিতা না পাওয়ায় এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন অনেকে। আখ চাষ ও গুড় উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্তদের দাবি, সরকার সহজ শর্তে আখচাষীদের ঋণ দিলে পরশুরামে আখ চাষ ও গুড় উৎপাদন বাড়বে।

নুরনবী বলেন, কোন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার না করে আখের গুড় উৎপাদন করা হয়। আমাদের উৎপাদন করা আখের গুড়ের সুনাম রয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে এসে আখের গুড় কিনে নেন। প্রতি কেজি গুড় ১৩০ টাকা করে পাইকারি দরে বিক্রি হয়।

আখের গুড় তৈরি করেন চম্পকনগর গ্রামের হুমায়ন কবির। তিনি বলেন, গুড় উৎপাদনে অনেক কষ্ট করতে হয়। খেত থেকে আখ কেটে নিয়ে পাতা ও অপ্রয়োজনীয় অংশ ছেঁটে আঁটি বেঁধে রাখা হয় আখ। কাটা আখ খেত থেকে নেওয়া হয় মাড়াই যন্ত্রে। সেগুলো থেকে মাড়াই যন্ত্রের মাধ্যমে রস বের করা হয়। ডিজেল ইঞ্জিনের সঙ্গে এই যন্ত্রের চাকা যুক্ত করে ফিতার সাহায্যে ঘোরানো হয়। এতে আখ থেকে বের হয়ে আসে সুমিষ্ট রস। আখের পাতা আখের রস জ্বাল দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়। আখ থেকে বের করা রস বিশেষ পাত্রে রেখে বড় চুল্লির আগুনে ৩ থেকে ৪ ঘন্টা জ্বাল দিতে হয়। আখের রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরির পর তা বাঁশ দিয়ে তৈরি টুকরিতে রাখা হয়। টুকরিভর্তি গুড় পাইকাররা কিনে নেন। টুকরিতে দীর্ঘক্ষণ রাখার ফলে জমাট বাঁধে আখের গুড়। সেই গুড় খুচরা বাজারে বিক্রি করা হয়। তিনি জানান, ২৪০ কেজি আখের রস থেকে ৪৫ থেকে ৫০ কেজি গুড় হয়।

পরশুরাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. খোরশেদ আলম জানান, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে আখ চাষ বাড়াতে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতিমধ্যে ৫ হেক্টর জমিতে আখ আবাদ করা হয়েছে। আখচাষী ও গুড় উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্তদের প্রণোদনার ব্যবস্থা নেই। বন্যা পরবর্তী সময়ে কৃষকদেরকে সার, বীজসহ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।

পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুর রহমান বলেন, আখ চাষ ও গুড় উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বিভাগের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

দৈনিক ফেনী

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬


পরশুরামে বিলুপ্তির পথে আখের গুড় : সরকারি সহযোগিতা পান না আখচাষীরা

প্রকাশের তারিখ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪

featured Image

পরশুরামে বিলুপ্তির পথে শত বছরের ঐতিহ্য আখের গুড় উৎপাদন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সম্ভাবনাময় আখের গুড় উৎপাদনের আগ্রহ হারাচ্ছেন এ অঞ্চলের আখ চাষীরা। জানা গেছে, পার্বত্য ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা মুহুরীর নদীর চরে শত বছর ধরে আখ চাষ করছে মির্জানগর ইউনিয়নের দক্ষিণ কাউতলী ও চম্পকনগর গ্রামের মানুষ। এখানকার আখ থেকে উৎপাদিত গুড় দেশের বিভিন্নস্থানে বিক্রি হতো। বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মুহুরী ও কহুয়া নদীর চরাঞ্চলের মাটি বেলে দোআঁশ প্রকৃতির হওয়ায় আখ চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। তবে দিন দিন পরশুরামে আখ চাষ কমছে।

উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলায় ১৮ হেক্টর জমিতে আখ চাষ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৩ হেক্টর জমির আখ কাটা হয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট মাসের ভয়াবহ বন্যায় আখ ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। আখচাষের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়া নিয়ে কৃষি অফিসের সন্দেহ রয়েছে। উপজেলায় প্রায় ৪৫০ জন কৃষক আখ চাষের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন। এদিকে গুড় উৎপাদনের সাথে কতজন চাষী জড়িত রয়েছেন, কৃষি বিভাগের কাছে তার কোন তথ্য নেই।

উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মতিউর রহমান জানান, বন্যার কারণে ধানের পাশাপাশি আখের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ৩ হেক্টর জমির আখ নষ্ট হয়ে গেছে।

দক্ষিণ কাউতলী ও চম্পকনগর গ্রামে তৈরি হয় সুস্বাদু আখের গুড়। চম্পকনগর গ্রামে আখচাষ ও গুড় উৎপাদনের সাথে প্রায় ১০টি পরিবার জড়িত রয়েছেন। প্রায় ৪০ বছর ধরে এ পেশায় জড়িত নুরনবী। তিনি বলেন, আমাদের বাবা দাদারা এই কাজ করেছে, আমরাও করছি। ৫-৭ বছর আগে দুই গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবার এ পেশার সাথে জড়িত ছিল। সরকারিভাবে কোন সহযোগিতা না পাওয়ায় এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন অনেকে। আখ চাষ ও গুড় উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্তদের দাবি, সরকার সহজ শর্তে আখচাষীদের ঋণ দিলে পরশুরামে আখ চাষ ও গুড় উৎপাদন বাড়বে।

নুরনবী বলেন, কোন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার না করে আখের গুড় উৎপাদন করা হয়। আমাদের উৎপাদন করা আখের গুড়ের সুনাম রয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে এসে আখের গুড় কিনে নেন। প্রতি কেজি গুড় ১৩০ টাকা করে পাইকারি দরে বিক্রি হয়।

আখের গুড় তৈরি করেন চম্পকনগর গ্রামের হুমায়ন কবির। তিনি বলেন, গুড় উৎপাদনে অনেক কষ্ট করতে হয়। খেত থেকে আখ কেটে নিয়ে পাতা ও অপ্রয়োজনীয় অংশ ছেঁটে আঁটি বেঁধে রাখা হয় আখ। কাটা আখ খেত থেকে নেওয়া হয় মাড়াই যন্ত্রে। সেগুলো থেকে মাড়াই যন্ত্রের মাধ্যমে রস বের করা হয়। ডিজেল ইঞ্জিনের সঙ্গে এই যন্ত্রের চাকা যুক্ত করে ফিতার সাহায্যে ঘোরানো হয়। এতে আখ থেকে বের হয়ে আসে সুমিষ্ট রস। আখের পাতা আখের রস জ্বাল দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়। আখ থেকে বের করা রস বিশেষ পাত্রে রেখে বড় চুল্লির আগুনে ৩ থেকে ৪ ঘন্টা জ্বাল দিতে হয়। আখের রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরির পর তা বাঁশ দিয়ে তৈরি টুকরিতে রাখা হয়। টুকরিভর্তি গুড় পাইকাররা কিনে নেন। টুকরিতে দীর্ঘক্ষণ রাখার ফলে জমাট বাঁধে আখের গুড়। সেই গুড় খুচরা বাজারে বিক্রি করা হয়। তিনি জানান, ২৪০ কেজি আখের রস থেকে ৪৫ থেকে ৫০ কেজি গুড় হয়।

পরশুরাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. খোরশেদ আলম জানান, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে আখ চাষ বাড়াতে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতিমধ্যে ৫ হেক্টর জমিতে আখ আবাদ করা হয়েছে। আখচাষী ও গুড় উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্তদের প্রণোদনার ব্যবস্থা নেই। বন্যা পরবর্তী সময়ে কৃষকদেরকে সার, বীজসহ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।

পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুর রহমান বলেন, আখ চাষ ও গুড় উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বিভাগের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।


দৈনিক ফেনী

সম্পাদক ও প্রকাশক: আরিফুল আমীন রিজভী কর্তৃক পপুলার অফসেট প্রেস, মিজান রোড, ফেনী-৩৯০০ থেকে মুদ্রিত এবং ৪৩৪, আমিন টাওয়ার (৬ষ্ঠ তলা), ট্রাংক রোড, ফেনী হতে প্রকাশিত।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী
পরশুরামে বিলুপ্তির পথে আখের গুড় : সরকারি সহযোগিতা পান না আখচাষীরা
0:00 0:00
1.0x