তালাবদ্ধ একটি বাড়ি। ঘরে কেউ থাকেন না। সুযোগ বুঝে চোরেরা ঢুকে নিয়ে গেছে একটি পরিবারের প্রায় সবকিছু। খাট, আলমারি, ডাইনিং টেবিল, পানির মোটর, বৈদ্যুতিক তার, বাল্ব কিছুই বাদ যায়নি। চুরি শেষে ঘরের ভেতরে পড়ে আছে শুধু খালি দেয়াল। গত শনিবার (২৯ আগস্ট) পরশুরাম পৌরসভার উত্তর কোলাপাড়ায় পরশুরাম গার্লস স্কুলের পেছনে আবদুল হালিমের বাড়িতে এমন ঘটনা ঘটে। পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন তিনি। বাড়িটি ছিল তালাবদ্ধ। প্রতিবেশীর ফোন পেয়ে বাড়িতে এসে তিনি দেখেন, প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই নিয়ে গেছে চোরেরা।
আবদুল হালিম বলেন, প্রতিবেশী ফোন করে জানান, ঘরে কিছুই নেই। এসে দেখি প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছু নিয়ে গেছে। চোরেরা যেন একটা সংসারই খুলে নিয়ে গেছে। খালি দেয়াল ছাড়া কিছুই পড়ে নেই।
একটি বাড়ি খালি করে দেওয়ার এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। গত জুন থেকে আগস্ট মাত্র তিন মাসে পরশুরামের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৫০টি চুরি, ছিনতাই ও চুরির চেষ্টার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জিডি, মামলা এবং ঘটনাস্থল ঘুরে সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে সব ঘটনার বিষয়ে থানায় মামলা হয়নি।
গতকাল সোমবার (৩১ আগস্ট) একই দিনে আরও তিনটি চুরির ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। দুপুরে পরশুরাম ডাকবাংলা মোড়ে রমজান স্টোর থেকে সিগারেটের কার্টন চুরির সময় রাকিব নামে এক যুবককে আটক করেছেন স্থানীয়রা। একই দিন রাতে গুথুমা চৌমুড়ীর মেঘনাথ হোমিও দোকান ও সলিয়া নায়েববাড়ি মাজারের দানবাক্স ভেঙে টাকা পয়সা নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।
৩০ আগস্ট রাতে জমিয়ারগাঁও গ্রামের সংবাদকর্মী সাইফুল ইসলামের মালিকানাধীন ট্রাকের দুইটি ব্যাটারি চুরি হয়ে যায়। চুরি হওয়া ব্যাটারিগুলোর মূল্য প্রায় ৩০ হাজার টাকা বলে তিনি দাবি করেন।
গত ২৭ আগস্ট দিনদুপুরে পরশুরামের সুবার বাজারের পূর্ব পাশে দাউদ মাস্টারের নির্মাণাধীন মার্কেট থেকে একটি মোটর চুরির অভিযোগ ওঠে। এর মাত্র তিন দিন আগে, ২৪ আগস্ট রাতে বাউরখুমা গ্রামের মো. সেলিমের গোয়ালঘর থেকে গরু চুরির অভিযোগ পাওয়া যায়। ২০ আগস্ট রাতে বাঁশপদুয়া এলাকার একটি মসজিদে দানবাক্স চুরির চেষ্টা করার সময় স্থানীয়রা চারজনকে আটক করে পুলিশে দেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, তাদের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করতে কেউ বাদী হননি। পুলিশ জানিয়েছে, বাদী না থাকায় ওই ঘটনায় আলাদা মামলা করা সম্ভব হয়নি। পরে তাদের অন্য একটি চুরির মামলায় আদালতে পাঠানো হয়।
বাঁশপদুয়া গ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে পূর্ব কোনা মসজিদের দানবাক্স, এক সেনাসদস্যের বাড়ি, শহীদের দোকান, পিনু মিয়ার দোকান, পলাশ সাহার দোকান, সাকিবের বাড়ি, মীর জামে মসজিদের দানবাক্স, নুর আহমেদের ঘর এবং আলম হুজুরের বাড়ির পানির মোটর চুরির অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চোর ধরে পুলিশে দেওয়ার পরও যদি কেউ মামলা করতে না চায়, তাহলে অপরাধীরা ভয় পাবে কেন? এতে চোরদের সাহস আরও বাড়তে পারে।
১৫ থেকে ২০ আগস্টের মধ্যে পরশুরাম উপজেলা গেটসংলগ্ন জাহান স্টোরের বিপরীতে সাহাব উদ্দিন স্টোরে তিন দফা চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। দোকান থেকে পান, সিগারেটসহ বিভিন্ন পণ্য এবং নগদ ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা চুরি হয়েছে বলে দাবি দোকান মালিকের। একই এলাকায় বারবার চুরি হলেও কার্যকর প্রতিরোধ না হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। জুনে পরশুরাম বাজারের কয়েকটি দোকানে চুরির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা মানববন্ধনও করেন।
চুরির পাশাপাশি ছিনতাইয়ের অভিযোগও রয়েছে। ২০ আগস্ট সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সোনালী ব্যাংক পরশুরাম শাখার সামনে নগদ এক লাখ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ করেন পৌরসভার দুবলাচাঁদ গ্রামের হোসনেয়ারা বেগম ও তাঁর মেয়ে লুবনা আক্তার সুমি। এর আগে ২৫ জুন পরশুরাম মাছ বাজারে এক নারীর কাছ থেকে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও এটিএম কার্ড ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
জুলাই মাসেও চুরির ঘটনা ছড়িয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। ৩০ জুলাই মধুগ্রামের প্রবাসী হাফেজ আহমদের বসতবাড়ি থেকে টিউবওয়েল চুরির অভিযোগ পাওয়া যায়। ২৮ জুলাই পশ্চিম সাহেবনগরে প্রবাসী শাহাদাত হোসেনের বাড়িতে চুরি করে নগদ ১৫ হাজার টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে।
শাহাদাত হোসেন বলেন, এর আগে মৃত জাহাঙ্গীর আলমের দোকানে চুরি, পরপর দুটি সিএনজি চুরি এবং মাওলানা মীর হোসেনের দোকানে চুরির ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া মাওলানা আবু মিয়ার বাগান থেকে গাছ কেটে নিয়ে বিক্রি করার অভিযোগে আরিফ জিয়া নামে একজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
২৫ জুলাই সাতকুচিয়া এলাকায় বিএডিসির সেচ প্রকল্পের তিনটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি হয়।
১১ জুলাই রাতে সাহেবের বাজারের মহিম স্টোর, ইলিয়াস স্টোর ও হুমায়ুন স্টোরে চুরির অভিযোগ পাওয়া যায়। একই সময়ে দোকানগুলোর সঙ্গে থাকা মসজিদের দানবাক্সও নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
২৩ জুন পরশুরাম বাজারের কাজী ফিসারিজ, সরকার ট্রেডার্স ও ফটিকের মোবাইল দোকান থেকে নগদ টাকা ও মালামাল চুরি হয়। ঘটনার প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন করেন।
১৯ জুন পূর্ব অলকা গ্রামে লোহার শিকল কেটে ছালেহ আহমদের বাড়ি থেকে একটি সিএনজি চুরি হয়। ১২ জুন অলকা চৈতার বাজারে মো. ইয়াছিনের দোকানের তালা ভেঙে নগদ টাকা, তেল, দুধের গুঁড়া, চা-পাতাসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে যায় চোরেরা।
মামলায় অনাগ্রহ ভুক্তভোগীদের: তিন মাসে ছয়টি চুরির মামলা
পরশুরাম থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জুনে চুরির মামলা হয়েছে তিনটি, জুলাইয়ে দুটি এবং আগস্টে একটিসহ তিন মাসে মোট ছয়টি। স্থানীয়ভাবে চুরি বা চুরির অভিযোগের যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তার তুলনায় পুলিশের মামলা-পরিসংখ্যান অনেক কম। কারণ চুরির শিকার অনেকেই মামলা করতে চান না। কেউ ঝামেলা এড়াতে চান, কেউ সময় দিতে চান না, আবার কেউ চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধার হবে কি না তা নিয়ে সংশয়ে থাকেন। প্রশ্ন উঠেছে, থানায় মামলা না হওয়া ঘটনাগুলো কি অপরাধের সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যাচ্ছে?
পরশুরাম থানা পুলিশের তথ্যমতে, জুনের তিনটি চুরি মামলার একটি ঘটনায় ছেলে নিজ ঘরে চুরি করেছিল এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য একটি মামলায় চোরাই মালসহ একজনকে আটক করা হয়েছে। পরশুরাম বাজারের তিন দোকানে চুরির ঘটনায় পাঁচজনকে শনাক্ত করার কথাও জানিয়েছে পুলিশ। তাদের আন্তঃজেলা চোরচক্রের সদস্য বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। শনাক্ত ব্যক্তিদের বাড়ি নড়াইল ও যশোর এলাকায় বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে সংশ্লিষ্ট থানায় চিঠি পাঠানো হয়েছে।
জুলাইয়ের দুটি চুরি মামলাতেই আসামি গ্রেপ্তার ও মালামাল উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। আগস্টে এখন পর্যন্ত একটি মামলা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আগস্টের ওই মামলায় চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ার পর এক ব্যক্তি ঘরের লোকজনকে আঘাত করে পালানোর চেষ্টা করে। পরে স্থানীয়রা তাকে ধরে পুলিশে দেন। প্রথমে ভুক্তভোগীরা মামলা করতে না চাইলেও পরে বুঝিয়ে মামলা নেওয়া হয়।
চোরাই পণ্য যাচ্ছে কোথায়?
পরশুরামে সাম্প্রতিক সময়ে যে ধরনের মালামাল চুরি হচ্ছে, তার অনেকগুলোই সহজে বহন ও বিক্রি করার উপযোগী পানির মোটর, বৈদ্যুতিক তার, ট্রান্সফরমার, টিউবওয়েল, সিএনজি বা এর যন্ত্রাংশ, দোকানের পণ্য, গাছ এবং গৃহস্থালির আসবাব।
এসব মালামাল চুরির পর কোথায় যাচ্ছে? কারা কিনছে? কোথায় বিক্রি হচ্ছে? চোরাই মাল পরিবহনে কারা সহযোগিতা করছে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর আড়ালে রয়ে গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, এসব প্রশ্নের উত্তর মিললে শুধু চোর নয়, চোরাই মাল কেনাবেচার সম্ভাব্য নেটওয়ার্কও শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এর আগে পরশুরামে চুরির ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে আসামি শনাক্ত ও চোরাই মাল উদ্ধারের নজিরও রয়েছে। ২০২৪ সালে একটি চুরির ঘটনায় পুলিশ সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে একজনকে গ্রেপ্তার করে এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চোরাই মাল উদ্ধার করেছিল।
মাদকবিরোধী তৎপরতায় বদলাচ্ছে অপরাধের ধরন?
পরশুরামের সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক ও চোরাচালানবিরোধী তৎপরতা সাম্প্রতিক সময়ে জোরদার হয়েছে। বিভিন্ন অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পণ্য ও মাদক জব্দের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে বিলোনিয়া, বাউরখুমা, বাউরপাথর, পশ্চিম সাহেবনগর, মধুগ্রাম ও রাঙ্গামাটিয়াসহ কয়েকটি এলাকায় মাদকবিরোধী কমিটি গঠন ও সামাজিক উদ্যোগের কথা জানা গেছে।
বিলোনিয়া মাদক নির্মূল কমিটির বোরহান উদ্দিন মজুমদারের দাবি, সামাজিক উদ্যোগের ফলে ভারত থেকে মাদক পাচার তুলনামূলকভাবে কমেছে।
তবে মাদক পাচার কমার সঙ্গে চুরি বাড়ার সরাসরি সম্পর্ক আছে এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের একটি অংশের ধারণা, সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধে জড়িত কিছু ব্যক্তি অন্য অপরাধে ঝুঁকতে পারেন।
যা বলছে পুলিশ
স্থানীয়দের কাছ থেকে ৫০টির বেশি চুরি-ছিনতাইয়ের তথ্য পাওয়া গেলেও তিন মাসে থানায় মামলা হয়েছে মাত্র ছয়টি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশ্রাফুল ইসলাম বলেন, চুরির কোনো ঘটনা ঘটলে ভুক্তভোগীদের থানায় অভিযোগ বা মামলা করার জন্য বলা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা মামলা করতে আগ্রহী হন না। আবার কোনো কোনো ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও তদন্তের প্রয়োজন হয়। মামলা না হলে সেটি পুলিশের নিয়মিত মামলার পরিসংখ্যানে যুক্ত হয় না।
ওসি আরও জানান, চুরির ঘটনায় আমরা গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। যেসব ঘটনায় মামলা হয়েছে, সেগুলোর আসামিদের গ্রেপ্তার ও চোরাই মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। স্থানীয়ভাবে কেউ চোর ধরলে তাদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা উচিত এবং ভুক্তভোগীদেরও আইনগত ব্যবস্থা নিতে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, চুরি প্রতিরোধে পুলিশি টহল বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সচেতন হতে হবে। তালাবদ্ধ বাড়ি, দোকান কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে প্রতিবেশীদের নজরদারি বাড়াতে হবে এবং কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তি বা ঘটনা দেখলে দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে।