ফেনী জেনারেল হাসপাতালে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা কিংবা রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে নার্সরাই কি বারবার প্রথমে কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছেন? সম্প্রতি সাপে কাটায় নাসিমা আক্তার নামে এক নারীর মৃত্যুর ঘটনায় মেডিসিন ওয়ার্ডে কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগের মুখে হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহিনুর আক্তারকে দাঁড় করানোর পর এমন প্রশ্নই উঠেছে হাসপাতালজুড়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দায়িত্বে অবহেলা থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে একই সঙ্গে রোগী ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত, জনবল সংকট, অতিরিক্ত রোগীর চাপ ও হাসপাতালের প্রশাসনিক তদারকির বিষয়গুলো নিয়েও এখন আলোচনা হচ্ছে।
সাপে কাটা নাসিমা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোবারক হোসেন দুলাল জানান, রোগীর অবস্থার অবনতি হওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স সময়মতো চিকিৎসককে অবহিত না করায় অ্যান্টিভেনম দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। গাফিলতি বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে।
তবে নার্স শাহিনুর আক্তারের দাবি, সেদিন নাসিমাকে ‘সংকটাপন্ন’ রোগী হিসেবে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। মৃতের স্বামীকেও রোগীর বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ভোরে রোগীর স্বামী এসে চোখ না খোলার কথা জানালে সঙ্গে সঙ্গে রোগীর কাছে গিয়ে চিকিৎসককে খবর দেওয়া হয়।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার রাতে ২৬ শয্যার মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন ৯১ জন রোগী। তাদের সেবায় দায়িত্বে ছিলেন একজন স্টাফ নার্স ও একজন ইন্টার্ন নার্স।
ধারণক্ষমতার বহুগুণ রোগী থাকা একটি ওয়ার্ডে এত সীমিত জনবল দিয়ে গুরুতর রোগীসহ সবার সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ কতটা সম্ভব এ প্রশ্নও উঠেছে। এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের একজন নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক ফেনীকে বলেন, কর্তব্যে অবহেলা থাকলে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু কোনো রোগীর মৃত্যু কিংবা হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার ঘটনায় সবসময় শুধু নার্সকে সামনে রেখে তদন্ত করলে প্রকৃত কারণ বেরিয়ে নাও আসতে পারে। রোগী হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কার কী দায়িত্ব ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এর আগেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছিল ফেনী জেনারেল হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে ‘পিঠা তৈরি কাণ্ডে’। গত জানুয়ারিতে হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডের অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে গ্যাসের চুলায় রান্নার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। পরে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের আদেশে নার্সিং সুপারভাইজার কল্পনা রানী মন্ডল ও সিনিয়র স্টাফ নার্স রানী বালা হালদারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ ঘটনার পর ১৩ জানুয়ারি ১৫ জন নতুন নার্সকে পদায়ন করা হয়েছিল।
নাসিমার মৃত্যুর ঘটনায়ও একই প্রশ্ন সামনে এসেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে নার্সের গাফিলতির কথা বললেও তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ফলে চূড়ান্তভাবে কার দায় কতটুকু, তা তদন্ত প্রতিবেদনেই স্পষ্ট হওয়ার কথা।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের মতে, সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় সময়জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি বিভাগে রোগীকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, কোন পরিস্থিতিতে তাকে মেডিসিন ওয়ার্ডে পাঠানো হয়েছে, চিকিৎসকের নির্দেশনা কী ছিল, রোগীর শরীরে বিষক্রিয়ার লক্ষণ কখন দেখা দিয়েছে, অ্যান্টিভেনম দেওয়ার প্রয়োজন কখন তৈরি হয়েছে এবং তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স কী পদক্ষেপ নিয়েছেন এসব বিষয় একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি ওই রাতে ২৬ শয্যার ওয়ার্ডে ৯১ রোগী ভর্তি থাকার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি উঠেছে। একজন স্টাফ নার্স ও একজন ইন্টার্ন নার্সের ওপর এত বিপুলসংখ্যক রোগীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কেন, গুরুতর রোগীদের পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জনবল ছিল কি না এবং হাসপাতালের প্রচলিত নার্সিং প্রটোকল অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছিল কি না এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।
হাসপাতালের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রোকন উদ দৌলা জানিয়েছেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুদ ছিল। জরুরি প্রয়োগের জন্য আইসিইউতেও দুটি ভায়াল রাখা ছিল। ফলে অ্যান্টিভেনম না থাকার কারণে নাসিমাকে তা দেওয়া যায়নি এমন অভিযোগ সঠিক নয়।
সেদিন ৯১ রোগীর সেবার ভার ছিল এক নার্সের ওপর
সেদিন ফেনী জেনারেল হাসপাতালের ২৬ শয্যার মেডিসিন ওয়ার্ডে ৯১ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। অর্থাৎ নির্ধারিত শয্যার প্রায় সাড়ে তিনগুণ বাড়তি রোগীর চাপ ছিল ওই ওয়ার্ডে। এত বিপুলসংখ্যক রোগীর সেবায় দায়িত্বে ছিলেন মাত্র একজন স্টাফ নার্স শাহিনুর আক্তার। তার সহযোগী হিসেবে ছিলেন একজন ইন্টার্ন নার্স।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নাসিমার চিকিৎসায় নার্স শাহিনুরের গাফিলতির বিষয়টি সামনে আনার পর নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুখ খুলতে শুরু করেছেন অন্য নার্সরা। প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে ২৬ শয্যার ওয়ার্ডে ৯১ রোগী রাখা হয়, সেই ব্যবস্থাপনার দায় কার?
শাহিনুর আক্তার বলেন, রোগীর চাপ ছিল অনেক বেশি। এরপরও নাসিমাকে ‘ক্রিটিক্যাল’ রোগী হিসেবে নজরদারিতে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক নার্স বলেন, ৯১ জন রোগীর মধ্যে গুরুতর ও সাধারণ রোগী সবাইকে একজন স্টাফ নার্সের পক্ষে সমানভাবে পর্যবেক্ষণ করা বাস্তবে কঠিন। বিশেষ করে সাপে কাটা রোগীর মতো সংকটাপন্ন রোগীর জন্য আলাদা নজরদারি প্রয়োজন।
এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোবারক হোসেন দুলাল বলেন, ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত রোগীর চাপ সবার জন্যই ভোগান্তির। রোগী বেশি থাকলেও দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ নেই। নাসিমার ক্ষেত্রে কী ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখছে তদন্ত কমিটি।
নার্সদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ ও ক্ষোভ
গতকাল রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত কমিটি নার্স শাহিনুর আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি আকস্মিক অচেতন হয়ে পড়ে যান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তদন্ত কমিটির সদস্য ও হাসপাতালের নার্স সুপারভাইজার মর্জিনা বেগম।
তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব আমি এবং আরেক সদস্য শাহিনুরকে সেই রাতের কথা জিজ্ঞেস করি। সে খুবই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সে অচেতন হয়ে পড়ে যায়। তাৎক্ষণিক তাকে ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। পরে সহকর্মীদের সহযোগিতায় তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
তবে শাহিনুরের অচেতন হবার বিষয়টি অবগত নয় বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোবারক হোসেন দুলাল। তিনি বলেন, এমন কিছু আমার সামনে ঘটেনি। বিষয়টি সম্পর্কে জানা নেই। তদন্ত কমিটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে। এখানে শুধু শাহিনুর নয়, মৃত রোগীর স্বজন, জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ডে কর্তব্যরত নার্স, চিকিৎসক সকলকেই জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক নার্স বলেন, একজন নার্সকে দায়ী করা সহজ। কিন্তু রোগী হাসপাতালে আসার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যে চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছেন, সেখানে প্রত্যেকের দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত কী ছিল, তা তদন্ত করা দরকার।
আরেক নার্স বলেন, আমরা দায়িত্বে অবহেলার পক্ষে নই। কিন্তু একজন নার্স যদি সবসময় এই আশঙ্কায় থাকেন যে কোনো রোগীর অবস্থা খারাপ হলেই পুরো দায় তার ওপর পড়বে, তাহলে সেটি কর্মপরিবেশের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
নার্সদের মধ্যে কর্তব্যকালীন নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তারা বলছেন, হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকালে রোগী ও স্বজনদের চাপ, ক্ষোভ কিংবা অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এর সঙ্গে যদি কোনো রোগীর জটিলতা বা মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের আগেই নার্সকে দায়ী করার পরিবেশ তৈরি হয়, তাহলে তাঁদের পেশাগত নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তি দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।