সরকারি চাকুরিতে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তার রোধ, প্রশাসনিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জবাবদিহি নিশ্চিতে নির্দিষ্ট সময় পর বদলি প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও ফেনী সরকারি কলেজে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। কলেজটির শিক্ষক-কর্মকর্তাদের যোগদানের তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, কেউ প্রায় দুই দশক, কেউ ১৬ থেকে ১৮ বছর, আবার অনেকে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একই কলেজে কর্মরত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পদোন্নতি পেয়েও ইনসিটু হিসেবে একই কলেজে দায়িত্ব পালন এবং সংযুক্তিতে দীর্ঘ সময় কর্মরত থাকার প্রবণতা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠানে অবস্থানের ফলে শক্তিশালী শিক্ষক বলয় গড়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে সেই বলয়কে ঘিরে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে মতবিরোধ, দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শুধু শিক্ষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, ছাপ পড়ছে কলেজের প্রশাসনিক কার্যক্রম, একাডেমিক পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের ওপরও।
সাম্প্রতিক সময়ে ফেনী সরকারি কলেজে চার শিক্ষককে বদলির আদেশ ঘিরে মানববন্ধন, প্রশাসনিক ভবনে তালা দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে কর্মসূচি পালনের ঘটনায় শিক্ষক বিভক্তির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। একটি পক্ষ এটিকে অন্যায় বদলির প্রতিবাদ হিসেবে দেখলেও অন্য পক্ষের দাবি, সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উন্নয়ন ফি আদায় এবং পরে সংবাদ প্রকাশের পর ফেরত দেওয়া, উন্নয়ন ব্যয় নিয়ে অডিট আপত্তি এবং সাবেক অধ্যক্ষ মো. আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে জেলার শতবর্ষী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ কলেজে জাতীয় পতাকা নামিয়ে বিতর্ক ও কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের শিক্ষক বিভক্তির আলোচনা সামনে আসে।
কলেজ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এসব ঘটনার সবগুলোকে একই সূত্রে বাঁধা না গেলেও দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অভ্যন্তরীণ শিক্ষক বলয় ও গোষ্ঠীগত বিভক্তি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এক পক্ষের বিরুদ্ধে অন্য পক্ষের মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ পাঠানো, পাল্টা অভিযোগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধ এবং বিভিন্ন ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
দৈনিক ফেনীর হাতে আসা কলেজের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের যোগদানের তালিকা অনুযায়ী, কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ২০০৫ সালের ২ জুলাই ফেনী সরকারি কলেজে যোগদান করেন। মাঝে এক বছর সোনাগাজী সরকারি কলেজে দায়িত্ব পালন করলেও পুনরায় ফেনী সরকারি কলেজে ফিরে এসে এখনো কর্মরত রয়েছেন। একই বছর সমাজকর্ম বিভাগের মো. ফরিদ আলম ভূঞাও যোগদান করেন। অন্য একটি কলেজে স্বল্প সময় দায়িত্ব পালনের পর সংযুক্তিতে আবারও ফেনী সরকারি কলেজে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
একইভাবে ২০০৫ সাল থেকে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাছান মাহমুদ রিয়াদ ভূঁঞা, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (সংযুক্ত) মো. মোশারফ হোসেন এবং গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (সংযুক্ত) জহির উদ্দিন কলেজটিতে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে জহির উদ্দিন মাঝে নোয়াখালী সরকারি কলেজ ও পরশুরাম সরকারি কলেজে দায়িত্ব পালন করলেও আবার ফেনী সরকারি কলেজেই ফিরে আসেন।
তালিকা অনুযায়ী, ২০০৮ সালে যোগদান করা ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (ইনসিটু) হাবিবুর রহমানও দীর্ঘদিন ধরে একই কলেজে রয়েছেন। মাঝে প্রায় এক বছর নোয়াখালী সরকারি কলেজে বদলি হলেও তিনিও ফেনী সরকারি কলেজে ফিরে এসেছেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (ইনসিটু) মো. আকতার হোসেন ২০১০ সাল থেকে এবং ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (ইনসিটু) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ ২০১১ সাল থেকে একই কলেজে কর্মরত।
এছাড়া ২০১২ সালে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. নূরুল আজিম ভূঁইয়া, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (সংযুক্ত) হারুনুর রশীদ ও একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আহমেদ আলী বিভোর, ২০১৩ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক (সংযুক্ত) মোবাশ্বেরা আক্তার ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ মোতাহার হোসাইন, ২০১৫ সালে অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আফরোজা বানু, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক প্রণব চন্দ্র দাস ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগের মো. ওয়াসিম পাটোয়ারী এবং ২০১৬ সালে বাংলা বিভাগের কাজী মোহাম্মদ রেজাউল হক, রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (ইনসিটু) তাছলিমা আক্তার ও গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আকবর হোসেন যোগদান করে এখনো একই কলেজে দায়িত্ব পালন করছেন।
এ তালিকায় আরও রয়েছেন বাংলা বিভাগের মর্জিনা আক্তার ২০১৯ সাল থেকে, ইংরেজি বিভাগের মাহফুজ উদ্দিন (সংযুক্ত) ২০১৭ সাল থেকে, ইতিহাস বিভাগের মো. আশরাফ উদ্দিন ২০১৯ সাল থেকে, ইসলামের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বিভাগের মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ ২০১৭ সাল থেকে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মোহাম্মদ তানভীর উদ্দিন (ইনসিটু) ২০১৭ সাল থেকে, অর্থনীতি বিভাগের কপিল ভট্টাচার্য (ইনসিটু) ২০১৯ সাল থেকে, ব্যবস্থাপনা বিভাগের হাসানুজ্জামান (ইনসিটু) ২০১৮ সাল থেকে এবং গণিত বিভাগের মো. দিদোয়ানুল কবির (ইনসিটু) ২০১৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কলেজটিতে ইনসিটু পদোন্নতিপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা ২১ জন। এছাড়া সংযুক্তিতে দায়িত্ব পালন করছেন অন্তত ৮ জন শিক্ষক। অর্থাৎ পদোন্নতি বা বিশেষ ব্যবস্থায় একই প্রতিষ্ঠানে বহাল থাকার সংখ্যাটিও কম নয়।
কলেজ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে থাকা শিক্ষকদের একটি অংশকে ঘিরে সময়ের সঙ্গে আলাদা আলাদা বলয় তৈরি হয়েছে। শিক্ষক পরিষদ নির্বাচনসহ কলেজের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এই বিভাজনের প্রভাব পড়ছে বলে তাদের দাবি। তবে শিক্ষক পরিষদ নির্বাচন ও কমিটি গঠনকে ঘিরে বিস্তারিত বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে আলাদাভাবে।
আরিফ হোসেন নামে কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, এসব ঘটনা দুঃখজনক। শিক্ষকরা আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে রাজনৈতিক সংগঠনকে নিজের অধীনে নিতে চান। বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে যারা যুক্ত, তাদেরও আয়ত্তে আনতে চান। শিক্ষক পরিষদের নির্বাচন নিয়েও আধিপত্য বিস্তার করতে চান। শিক্ষকদের বলতে শুনি তারা অতীতে ত্যাগী ছিল, এখনো ত্যাগীÑএসব কথা শিক্ষকদের মুখেই আনা উচিত নয় যদি তাদের নীতি-নৈতিকতা ঠিক থাকত।
তিনি বলেন, একটা ক্যাম্পাসের সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখার দায়িত্ব অধ্যক্ষের। সম্প্রতি জাতীয় পতাকা কাণ্ডে যে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে, সে জাতীয় পতাকা অবমাননা আগেই কালার জ্বলে নষ্ট হয়ে পড়েছিল। এসব বিষয় কলেজ প্রশাসনের নজর দেওয়া উচিত ছিল। অন্যদিকে শিক্ষকরা ক্লাস চলাকালীন প্রাইভেট বাণিজ্যসহ নানা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। ক্লাস চলাকালীন কোনো শিক্ষক ক্যাম্পাসের বাইরে যাবেন না এমন নীতিমালা করতে হবে। এসব বিষয় নজর দিলেই সুন্দর শিক্ষার পরিবেশ গড়ে উঠবে।
মুহাইমিন তাজিম নামে গণিত বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, এসব ঘটনায় কলেজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। শিক্ষকদের অপরাজনীতি শিক্ষার্থীদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কোনো শিক্ষার্থী কোনো শিক্ষকের আনুগত্য হলে অন্য শিক্ষক তাকে হেনস্তা করতে চান। এছাড়া শিক্ষকদের মধ্যে অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বও বিরাজমান। এসবের দায়িত্ব কেউ নিতে চান না। একজনের অভিযোগ অন্যজনের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এসবের কারণে স্বাভাবিক প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের যেভাবে নার্সিং করা প্রয়োজন, সেগুলো ঠিকভাবে করা হচ্ছে না।
শুধু বদলি ইস্যুই নয়, গত কয়েক বছরে নানা কারণে আলোচনায় এসেছে জেলার সবচেয়ে বড় এ বিদ্যাপীঠ। ইতোপূর্বে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দুই দফায় উন্নয়ন ফি আদায়ের অভিযোগ ওঠে। উন্নয়ন ব্যয় নিয়েও অডিট আপত্তি সৃষ্টি হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কলেজের উন্নয়ন তহবিলে ৫৩ লাখ টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৪ লাখ টাকার বেশি ব্যয় দেখানো হয়। অডিট আপত্তির পর তিনজন অধ্যক্ষ প্রায় ৩০ লাখ টাকা ফেরত দেন।
এছাড়া ২০১৯ সালে নির্বাচিত ফেনী কলেজ ছাত্র সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ২০২২ সালে ফেকসুর নামে ব্যয় দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, বাস্তবে এমন অনুষ্ঠানের জন্য এর চেয়ে অনেক কম অর্থ প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে সাবেক অধ্যক্ষ মো. আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দীর্ঘদিন একই কলেজে কর্মরত শিক্ষক ও বদলি নীতিমালা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফেনী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ এনামুল হক খোন্দকার বলেন, সরকারি চাকরিতে নিয়মিত বদলি হওয়া উচিত। ফেনী কলেজে দীর্ঘদিন একই শিক্ষক থাকার প্রবণতা কমানো প্রয়োজন। সরকার কার্যকর বদলি নীতিমালা চালু করলে বলয়, কোন্দল কমবে এবং পড়ালেখার পরিবেশ আরও সুন্দর হবে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরি সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও তৈরি হবে। একজন শিক্ষক একই ক্যাম্পাসে বছরের পর বছর অবস্থানের কারণে একটি বলয় তৈরি হয়।
কলেজের অভ্যন্তরীণ কমিটি নিয়ে মতবিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কলেজে বর্তমানে ৭০ থেকে ৭২ জন শিক্ষক রয়েছেন, কিন্তু বিভিন্ন ধরনের কমিটি রয়েছে ২৮ থেকে ২৯টি। তাই সকলকে সমান গুরুত্বের কমিটি দেওয়া সম্ভব নয়। কেউ গুরুত্বপূর্ণ কমিটি পাবেন, কেউ তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কমিটি পাবেন। আগে প্রতি পরীক্ষার আগে কমিটি গঠন করা হতো, তখন শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক ভূমিকা রাখতেন। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর বছরের শুরুতেই সব কমিটি গঠন করি।
অধ্যক্ষ আরও বলেন, সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। কেউ একবার ভালো কমিটি পেলে পরবর্তীতে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কমিটি পেতে পারেন। নতুন প্রভাষকদের বড় কমিটিতে রাখার সুযোগও সীমিত। কমিটি গঠনের সময় সবাইকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। অল্প কয়েকজন শিক্ষক এতে অসন্তুষ্ট থাকতে পারেন। তবে এসব অভ্যন্তরীণ বিষয় বাইরে নিয়ে যাওয়া ঠিক নয় এবং এ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলাও যৌক্তিক নয়।
ইনসিটুতে ২১ শিক্ষক, সংযুক্তিতে ৮ জন
ফেনী সরকারি কলেজের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের যোগদানের তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, কলেজটিতে দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক। সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হলেও কলেজটিতে কেউ প্রায় দুই দশক, কেউ ১৫ থেকে ১৮ বছর এবং অনেকে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কর্মরত। কলেজের ২১ জন শিক্ষক ‘ইনসিটু’, অর্থাৎ পদোন্নতি পেলেও তারা আগের কর্মস্থলেই দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ৮ জন শিক্ষক ‘সংযুক্তি’ হিসেবে রয়েছেন, যাদের প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিশেষভাবে এ কলেজে সংযুক্ত করা হয়েছে।
তালিকা অনুযায়ী, কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ২ জুলাই ২০০৫ সালে ফেনী সরকারি কলেজে যোগদান করেন। মাঝে এক বছর সোনাগাজী সরকারি কলেজে দায়িত্ব পালন করলেও তিনি পুনরায় ফেনী সরকারি কলেজে ফিরে এসে এখনো কর্মরত রয়েছেন। একই বছর সমাজকর্ম বিভাগের মো. ফরিদ আলম ভূঞাও যোগদান করেন। অন্য একটি কলেজে স্বল্প সময় দায়িত্ব পালনের পর সংযুক্তিতে আবারও ফেনী সরকারি কলেজে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
একইভাবে ২০০৫ সাল থেকে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাছান মাহমুদ রিয়াদ ভূঁঞা, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (সংযুক্ত) মো. মোশারফ হোসেন এবং গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (সংযুক্ত) জহির উদ্দিন কলেজটিতে কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে জহির উদ্দিন মাঝে নোয়াখালী সরকারি কলেজ ও পরশুরাম সরকারি কলেজে বদলি হলেও আবার ফেনী সরকারি কলেজে ফিরে আসেন।
২০০৮ সালে যোগদান করা ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (ইনসিটু) হাবিবুর রহমানও দীর্ঘদিন ধরে একই কলেজে দায়িত্ব পালন করছেন। মাঝে প্রায় এক বছর নোয়াখালী সরকারি কলেজে কর্মরত থাকলেও পরে আবার ফেনী সরকারি কলেজে ফিরে আসেন।
২০১০ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (ইনসিটু) মো. আকতার হোসেন এবং ২০১১ সালে ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (ইনসিটু) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ যোগদান করেন। দুজনই এখনও একই কলেজে কর্মরত রয়েছেন।
এছাড়া ২০১২ সালে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. নূরুল আজিম ভূঁইয়া, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (সংযুক্ত) হারুনুর রশীদ ও একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আহমেদ আলী বিভোর, ২০১৩ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক (সংযুক্ত) মোবাশ্বেরা আক্তার ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ মোতাহার হোসাইন, ২০১৫ সালে অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আফরোজা বানু, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক প্রণব চন্দ্র দাস ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগের মো. ওয়াসিম পাটোয়ারী এবং ২০১৬ সালে বাংলা বিভাগের কাজী মোহাম্মদ রেজাউল হক, রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (ইনসিটু) তাছলিমা আক্তার ও গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আকবর হোসেন যোগদান করে এখনো একই কলেজে দায়িত্ব পালন করছেন।
তালিকা অনুযায়ী, কলেজের বাংলা বিভাগের মর্জিনা আক্তার ২০১৯ সাল থেকে, ইংরেজি বিভাগের মাহফুজ উদ্দিন (সংযুক্ত) ২০১৭ সাল থেকে, ইতিহাস বিভাগের মো. আশরাফ উদ্দিন ২০১৯ সাল থেকে, ইসলামের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বিভাগের মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ ২০১৭ সাল, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মোহাম্মদ তানভীর উদ্দিন (ইনসিটু) ২০১৭ সাল, অর্থনীতি বিভাগের কপিল ভট্টাচার্য (ইনসিটু) ২০১৯ সাল, ব্যবস্থাপনা বিভাগের হাসানুজ্জামান (ইনসিটু) ২০১৮ সাল, গণিত বিভাগের মো. দিদোয়ানুল কবির (ইনসিটু) ২০১৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকার বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ এনামুল হক খোন্দকার বলেন, সরকারি বদলি নীতিমালা মানা হলে দীর্ঘদিন একই কলেজে থাকার সুযোগ থাকবে না। তদবির ছাড়া কোনো শিক্ষক একটি কলেজ থেকে অন্য কলেজে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। এজন্য কোনো শিক্ষক উপজেলাতে আজীবন থেকে যাচ্ছেন, কেউ আবার জেলা ও বিভাগীয় শহরে রয়েছেন। ভালো কলেজগুলোতে থাকার জন্য সব শিক্ষকরাই চাইবেন, কিন্তু বদলি নীতিমালা মানা হলে সেই সুযোগ কেউ পাবেন না। এতে সবাই ভালো কলেজে চাকরি করার সুযোগ পাবেন। সবাই যেন সমান সুযোগ পান, সেটার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে এসব কোন্দল, বলয় গড়ে উঠবে না।
একজন শিক্ষক চাইলেই এত বছর একই প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করতে পারেন কি না এ প্রশ্নের জবাবে কলেজ অধ্যক্ষ বলেন, বদলি নীতিমালা যেটি রয়েছে, তা শিক্ষা ক্যাডারে মানা হচ্ছে না। এটিতে শিক্ষকদের দোষের চেয়ে মন্ত্রণালয়ের বিষয় বেশি জড়িত।
কাটছে না শিক্ষক সংকট
ফেনী সরকারি কলেজে দীর্ঘদিন ধরে ইনসিটু পদোন্নতির সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে নতুন পদ সৃষ্টি না হওয়ায় শিক্ষক সংকট কাটছে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এনাম কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ১৫টি বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স পাঠদান পরিচালনার জন্য ১৮০টি শিক্ষকের পদ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কলেজটিতে কর্মরত শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৭২ জন। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকেরও কম শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে প্রায় ২৪ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ২১ জন শিক্ষক ইনসিটু হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি বিধান অনুযায়ী কোনো শিক্ষক ইনসিটুতে পদোন্নতি পেলে তিনি একই কলেজে দায়িত্ব পালন করলেও ওই পদ শূন্য হিসেবে দেখানো যায় না। ফলে নতুন করে নিয়োগ বা পদায়নের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। এতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকটের সমস্যাটি নিরসন হচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের এক শিক্ষক দৈনিক ফেনীকে জানান, সব সরকারি কলেজে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার সব বিভাগ না থাকায় এসব বিষয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতি অনেক ক্ষেত্রে বিলম্বিত হয়। অন্যদিকে বাংলা, ইংরেজি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাসসহ প্রায় সব কলেজে থাকা বিষয়গুলোর শিক্ষকদের পদোন্নতি তুলনামূলক দ্রুত হয়। এতে কেউ আগে, কেউ পরে ইনসিটুতে গেলেও নতুন পদ সৃষ্টি না হওয়ায় শূন্য পদ দেখানো সম্ভব হয় না এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগও সংকুচিত হয়।
এদিকে কলেজের শিক্ষক সংকটের কারণে অনার্স, মাস্টার্স, ডিগ্রি ও উচ্চ মাধ্যমিক সব মিলিয়ে একাধিক শিক্ষাবর্ষের পাঠদান সীমিতসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে চালাতে হচ্ছে। একই শিক্ষককে শ্রেণি কার্যক্রমের পাশাপাশি পরীক্ষা, খাতা মূল্যায়ন, ভর্তি, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও বিভিন্ন কমিটির কাজও সামলাতে হচ্ছে।
এ ব্যাপারে ফেনী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ এনামুল হক খোন্দকার বলেন, নতুন পদ সৃষ্টি না হওয়ায় পদোন্নতির যোগ্য শিক্ষকদের ইনসিটু দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাইলে ইনসিটু অবস্থায়ও শূন্য পদে বদলি দিতে পারে। নতুন পদ সৃষ্টি না হওয়ায় নিচের পর্যায়ের শিক্ষকরা সময়মতো পদোন্নতি পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, এনাম কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী অনার্স ও মাস্টার্স চালু থাকা প্রতিটি বিভাগে ১২ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও ফেনী কলেজের অধিকাংশ বিভাগে মাত্র পাঁচ থেকে ছয়জন শিক্ষক রয়েছেন। তবে মন্ত্রণালয় ১২ হাজার শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে সংকট কিছুটা দূর হতে পারে।