ডান পায়ে রক্ত চলাচল বন্ধ থাকায় অসহ্য যন্ত্রণায় তার চিৎকারে প্রতিদিন আশেপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠত। এরমধ্যে পায়ের মাংস পঁচে যেতে শুরু করেছিল তার। গত ১৫ বছরের অধিক সময় ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা পরিবার তার সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যয় যোগান দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল।
চিকিৎসকের পরামর্শ, ডান পায়ে অস্ত্রোপাচার করে বাদ দিতে হবে। অপারশেন করতে লাগবে প্রায় দেড় লাখ টাকা। আত্মীয় স্বজনের কাছে ধার দেনা করে ও ঘরের জিনিসপত্র করে ৪০ হাজার টাকা সংগ্রহ করতে পেরেছিল তার পরিবার। কিন্তু বাকী টাকার ব্যবস্থা না হওয়ায় তাদের চোখে মুখে ছিল অন্ধকার। বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি।
এমন পরিস্থিতিতে পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বীরচন্দ্র নগর গ্রামের মোঃ নুরুল আলম নুরুর সহায়তা এগিয়ে এল ফেইসবুক গ্রুপ ‘আমাদের মির্জানগর’। তার জীবন বাঁচাতে সাহায্য চেয়ে করা আবেদনের মাধ্যমে সংগৃহীত ১লাখ টাকা দিয়ে নুরুর জীবনাশংকা দূর করল তারা।
গ্রুপ পরিচালনাকারী সদস্যরা জানান, নূর আলমের চিকিৎসার জন্য সাহায্য চেয়ে “নূর আলম বাঁচতে চায়, আপনাদের ভালোবাসায়” শিরোনামে গত ২২ মে দুপুরে ফেসবুকে একটি পোস্ট করা হয়। মাত্র ৩৬ ঘন্টার মধ্যেই সে আবেদনে সাড়া দেন শতাধিক গ্রুপ মেম্বার। একদিনের মধ্যে সংগ্রহ হয়ে যায় ১ লাখ টাকা। এরপর দিন নূর আলমের অবস্থা অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেদিন রাতে তার অপারেশন সম্পূর্ণ হয়।
গতকাল শক্রবার (২৫ মে) মির্জানগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান ভুট্টু ও স্থানীয় ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান ছুট্টু'র উপস্থিতিতে নূর আলমের বড় ভাই আবুল কালাম ও শ্যালক আবু বক্কর এর নিকট সংগৃহীত ১ লক্ষ টাকা হস্তান্তর করা হয়। এসময় এডমিন প্যানেলের প্রতিনিধি হিসেবে ফখরুল ইসলাম ফারুক, লোকমান মাহমুদ, মোরশেদ হামদান ও আরিফ রহমান উপস্থিত ছিলেন।
এডমিন প্যানেলের সদস্য ও সাবেক ইউপি সদস্য ফখরুল ইসলাম ফারুক বলেন, পরপর দুটি মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষের এগিয়ে আসছে এটি ইউনিয়নের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। এ গ্রুপের মাধ্যমে মির্জানগর ইউনিয়ন একটি মডেল ইউনিয়নে রুপান্তরিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এডমিন প্যানেলের আরেক সদস্য বলেন, দলমত বিভেদ ভুলে মানুষ মানুষের পাশে এভাবে এগিয়ে আসার মাধ্যমে যেকোনো সমাজেরই পরিবর্তন সম্ভব। চলমান সংকটময় পরিস্থিতিতেও মানুষ মানবতার ডাকে সাড়া দিচ্ছেন, তা সত্যিই অভাবনীয়।
সাহায্য পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলে নূর আলমের বড় ভাই আবুল কালাম। তিনি বলেন, এ টাকা না পেলে ভাইয়ের চিকিৎসা করা হয়ত সম্ভব হত না। সাহায্যকারী সকলের প্রতি আমরা অশেষ কৃতজ্ঞতা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অনুদানকারী বলেন, গ্রুপের পূর্বের কার্যক্রমটিও আমার অত্যন্ত ভালো লেগেছে। তারা কাজটি স্বচ্ছতার সাথে করেছে। তাই এবারের নূর আলমের সাহায্য সংক্রান্ত স্ট্যাটাসটি চোখে পড়লে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করতে চেষ্টা করেছি।
মির্জানগর ইউপি চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান ভুট্টু বলেন, ‘আমাদের মির্জানগর’ নামে ফেসবুক গ্রুপটি তাদের মানবিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ইউনিয়নের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ¦ল করছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে গ্রুপের কার্যক্রমে সবসময় পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন চেয়ারম্যান।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নুরুর রক্তনালীতে প্রতিবন্ধকতা থাকায় ৬ বছর আগে বাম পা হাঁটুর উপরে কেটে বাদ দিতে হয়েছিল। একইস সমস্যা ডান পায়ে দেখা দেয়া রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করতে গত বছর রিং বসানো হয়েছিল। কিন্তু কোন উন্নতি না হওয়ায় পায়ের মাংস পঁচে আঙ্গুল জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।
নুরুল আলম এক ছেলে ও এক মেয়ের পিতা। তার ছেলে রাশেদুল ইসলাম ফসল এলাকায় মানুষের বিভিন্ন কাজ করেই সংসার চালায়।
উল্লেখ্য, গত কয়দিন আগে গ্রুপর একটি স্ট্যাটাসের মাধ্যমে প্রায় ৩ লক্ষ টাকার তহবিল সংগ্রহ করে করোনা প্রাদুর্ভাবে অসহায় হয়ে পড়া ইউনিয়নের ৫০৩টি পরিবারকে খাদ্যসহায়তা প্রদান করা হয়েছে।