ফেনী    বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩
দৈনিক ফেনী

জ্বালানি সংকটে শিল্প-অর্থনীতি



জ্বালানি সংকটে শিল্প-অর্থনীতি
কোলাজ: দৈনিক ফেনী

বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি হলো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ। অথচ শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ যত দ্রুত হয়েছে, সেই তুলনায় জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত ততটা শক্ত হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, লোডশেডিং এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে শিল্প খাতকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। গ্যাসের স্বল্পতা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি, লোডশেডিং এবং জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা-সব মিলিয়ে দেশের উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এখন বড় ধরনের চাপে।

বিশেষ করে গত দেড় মাস ধরে পরিস্থিতি শিল্প খাতের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। গত ১৫-২০ দিনে সংকটের তীব্রতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি সামাল দিতে লোডশেডিং করা হচ্ছে। কিন্তু শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদনে। একটি কারখানা কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকার অর্থ শুধু কয়েক ঘণ্টার উৎপাদন ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয় শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রপাতির ক্ষতি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খরচ, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারার ঝুঁকি এবং শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং জাতীয় বিপর্যয়।

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হচ্ছে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের বড় অংশের উৎপাদন, আমদানি ও বিতরণ সরকারি প্রতিষ্ঠাননির্ভর। ফলে এই ব্যবস্থার কোনো একটি উৎসে সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব দ্রুত পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি, এলএনজি সরবরাহে সমস্যা এবং বিদ্যুৎ আমদানির সরবরাহ কমে যাওয়ার মতো একাধিক ঘটনা চাপ তৈরি করেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে-জ্বালানি সরবরাহের পুরো ব্যবস্থাকে এক বা মুষ্টিমেয় উৎসের ওপর নির্ভরশীল রাখা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

এ অবস্থায় সবচেয়ে জরুরি হলো জ্বালানি সরবরাহে বহুমুখী চ্যানেল তৈরি করা। সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি সক্ষম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ ও বিতরণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে সরকারের ভূমিকা কমবে না; বরং সরকারের দায়িত্বের ধরন পরিবর্তিত হবে। সরকার সরাসরি ব্যবসা পরিচালনার পরিবর্তে নীতি নির্ধারণ, নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, মূল্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে-দাম বাড়বে কি না। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এর সমাধানও রয়েছে। সরকার যদি একই ধরনের জ্বালানির জন্য কার্যকর মূল্যনীতি, মান নিয়ন্ত্রণ ও ভর্তুকির কাঠামো নির্ধারণ করে, তাহলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতকে একই নিয়মের মধ্যে পরিচালনা করা সম্ভব। একজন উদ্যোক্তা যদি বাড়তি দাম দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ পান, তাহলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ক্ষতির তুলনায় সেই অতিরিক্ত ব্যয় অনেক সময় তার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। অর্থাৎ শিল্পের জন্য শুধু সস্তা জ্বালানি নয়, কোয়ালিটি এনার্জি বা নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জ্বালানি নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মজুদ সক্ষমতা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংকট দেখা দিলে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দ্রুত চাপের মুখে পড়ে। পর্যাপ্ত মজুদ থাকলে সাময়িক আন্তর্জাতিক সংকটের ধাক্কা সামাল দেওয়া সম্ভব। তাই কয়েক সপ্তাহের পরিবর্তে আরও দীর্ঘ সময়ের জ্বালানি মজুদের সক্ষমতা তৈরি করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে মজুদ করার অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া গেলে জাতীয় মজুদ সক্ষমতা বাড়তে পারে এবং সরকারের ওপর একক চাপও কমবে।

একই সঙ্গে বদলাতে হবে দেশের এনার্জি মিক্স বা জ্বালানী বৈচিত্র। দীর্ঘদিন প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর শিল্পায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একসময় বাংলাদেশে গ্যাস রপ্তানির সম্ভাবনাও আলোচিত হয়েছে। বাস্তবতা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশকে গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা তাই সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আঘাত করছে।

এই নির্ভরতা কমাতে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, বায়োগ্যাসসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় সব উৎস সমান কার্যকর না হলেও যেখানে যে উৎসের সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণও গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের বিভিন্ন জেলা ও শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে ছোট ও মাঝারি বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। কোনো একটি এলাকায় কয়েকশ মেগাওয়াট উৎপাদন কেন্দ্রীভূত না করে বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট ছোট উৎপাদন কেন্দ্র থাকলে একটি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমবে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যেতে পারে।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান কোনোভাবে জেনারেটর বা বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে পারলেও গ্রামের ছোট কারখানা, পোলট্রি খামার, মৎস্য খামার কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সেই সুযোগ নেই। কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেই তাদের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু শ্রমিকের বেতন, ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য খরচ বন্ধ হয় না। ফলে অনেক ছোট উদ্যোগ নীরবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

এর সঙ্গে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থারও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পোলট্রি, ডেইরি, মৎস্য ও কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংকট চলতে থাকলে এর প্রভাব শুধু শিল্পে নয়, খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বাজারদরেও পড়তে পারে।

বাংলাদেশ মুক্তবাজার অর্থনীতির পথে এগিয়ে চলা একটি দেশ। অর্থনীতির বড় অংশ পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি উদ্যোগে। সরকারের কাজ হবে ব্যবসা করা নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করবে, প্রতিযোগিতা করবে এবং একই সঙ্গে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির মধ্যে থাকবে।

জ্বালানি সংকট তাই শুধু বিদ্যুৎ বা তেলের সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্প, কৃষি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সংকট। একক উৎস ও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, বিকেন্দ্রীভূত উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পর্যাপ্ত মজুদ সক্ষমতা-এই চারটি স্তম্ভকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে টিকিয়ে রাখতে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু বেশি জ্বালানি নয়-নিরবচ্ছিন্ন, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত জ্বালানি। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই 'কোয়ালিটি এনার্জি' নিশ্চিত করার ওপর।

লেখক: সাবেক পরিচালক এফবিসিসিআই

দৈনিক ফেনী

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


জ্বালানি সংকটে শিল্প-অর্থনীতি

প্রকাশের তারিখ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি হলো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ। অথচ শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ যত দ্রুত হয়েছে, সেই তুলনায় জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত ততটা শক্ত হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, লোডশেডিং এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে শিল্প খাতকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। গ্যাসের স্বল্পতা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি, লোডশেডিং এবং জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা-সব মিলিয়ে দেশের উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এখন বড় ধরনের চাপে।

বিশেষ করে গত দেড় মাস ধরে পরিস্থিতি শিল্প খাতের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। গত ১৫-২০ দিনে সংকটের তীব্রতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি সামাল দিতে লোডশেডিং করা হচ্ছে। কিন্তু শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদনে। একটি কারখানা কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকার অর্থ শুধু কয়েক ঘণ্টার উৎপাদন ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয় শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রপাতির ক্ষতি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খরচ, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারার ঝুঁকি এবং শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং জাতীয় বিপর্যয়।

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হচ্ছে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের বড় অংশের উৎপাদন, আমদানি ও বিতরণ সরকারি প্রতিষ্ঠাননির্ভর। ফলে এই ব্যবস্থার কোনো একটি উৎসে সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব দ্রুত পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি, এলএনজি সরবরাহে সমস্যা এবং বিদ্যুৎ আমদানির সরবরাহ কমে যাওয়ার মতো একাধিক ঘটনা চাপ তৈরি করেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে-জ্বালানি সরবরাহের পুরো ব্যবস্থাকে এক বা মুষ্টিমেয় উৎসের ওপর নির্ভরশীল রাখা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

এ অবস্থায় সবচেয়ে জরুরি হলো জ্বালানি সরবরাহে বহুমুখী চ্যানেল তৈরি করা। সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি সক্ষম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ ও বিতরণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে সরকারের ভূমিকা কমবে না; বরং সরকারের দায়িত্বের ধরন পরিবর্তিত হবে। সরকার সরাসরি ব্যবসা পরিচালনার পরিবর্তে নীতি নির্ধারণ, নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, মূল্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে-দাম বাড়বে কি না। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এর সমাধানও রয়েছে। সরকার যদি একই ধরনের জ্বালানির জন্য কার্যকর মূল্যনীতি, মান নিয়ন্ত্রণ ও ভর্তুকির কাঠামো নির্ধারণ করে, তাহলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতকে একই নিয়মের মধ্যে পরিচালনা করা সম্ভব। একজন উদ্যোক্তা যদি বাড়তি দাম দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ পান, তাহলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ক্ষতির তুলনায় সেই অতিরিক্ত ব্যয় অনেক সময় তার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। অর্থাৎ শিল্পের জন্য শুধু সস্তা জ্বালানি নয়, কোয়ালিটি এনার্জি বা নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জ্বালানি নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মজুদ সক্ষমতা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংকট দেখা দিলে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দ্রুত চাপের মুখে পড়ে। পর্যাপ্ত মজুদ থাকলে সাময়িক আন্তর্জাতিক সংকটের ধাক্কা সামাল দেওয়া সম্ভব। তাই কয়েক সপ্তাহের পরিবর্তে আরও দীর্ঘ সময়ের জ্বালানি মজুদের সক্ষমতা তৈরি করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে মজুদ করার অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া গেলে জাতীয় মজুদ সক্ষমতা বাড়তে পারে এবং সরকারের ওপর একক চাপও কমবে।

একই সঙ্গে বদলাতে হবে দেশের এনার্জি মিক্স বা জ্বালানী বৈচিত্র। দীর্ঘদিন প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর শিল্পায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একসময় বাংলাদেশে গ্যাস রপ্তানির সম্ভাবনাও আলোচিত হয়েছে। বাস্তবতা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশকে গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা তাই সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আঘাত করছে।

এই নির্ভরতা কমাতে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, বায়োগ্যাসসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় সব উৎস সমান কার্যকর না হলেও যেখানে যে উৎসের সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণও গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের বিভিন্ন জেলা ও শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে ছোট ও মাঝারি বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। কোনো একটি এলাকায় কয়েকশ মেগাওয়াট উৎপাদন কেন্দ্রীভূত না করে বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট ছোট উৎপাদন কেন্দ্র থাকলে একটি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমবে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যেতে পারে।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান কোনোভাবে জেনারেটর বা বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে পারলেও গ্রামের ছোট কারখানা, পোলট্রি খামার, মৎস্য খামার কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সেই সুযোগ নেই। কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেই তাদের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু শ্রমিকের বেতন, ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য খরচ বন্ধ হয় না। ফলে অনেক ছোট উদ্যোগ নীরবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

এর সঙ্গে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থারও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পোলট্রি, ডেইরি, মৎস্য ও কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংকট চলতে থাকলে এর প্রভাব শুধু শিল্পে নয়, খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বাজারদরেও পড়তে পারে।

বাংলাদেশ মুক্তবাজার অর্থনীতির পথে এগিয়ে চলা একটি দেশ। অর্থনীতির বড় অংশ পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি উদ্যোগে। সরকারের কাজ হবে ব্যবসা করা নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করবে, প্রতিযোগিতা করবে এবং একই সঙ্গে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির মধ্যে থাকবে।

জ্বালানি সংকট তাই শুধু বিদ্যুৎ বা তেলের সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্প, কৃষি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সংকট। একক উৎস ও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, বিকেন্দ্রীভূত উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পর্যাপ্ত মজুদ সক্ষমতা-এই চারটি স্তম্ভকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে টিকিয়ে রাখতে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু বেশি জ্বালানি নয়-নিরবচ্ছিন্ন, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত জ্বালানি। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই 'কোয়ালিটি এনার্জি' নিশ্চিত করার ওপর।

লেখক: সাবেক পরিচালক এফবিসিসিআই


দৈনিক ফেনী

সম্পাদক ও প্রকাশক: আরিফুল আমীন রিজভী কর্তৃক পপুলার অফসেট প্রেস, মিজান রোড, ফেনী-৩৯০০ থেকে মুদ্রিত এবং ৪৩৪, আমিন টাওয়ার (৬ষ্ঠ তলা), ট্রাংক রোড, ফেনী হতে প্রকাশিত।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী
জ্বালানি সংকটে শিল্প-অর্থনীতি
0:00 0:00
1.0x