ফেনী পৌরসভায় নতুন করে নির্ধারণ করা হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কারও কর বেড়েছে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রায় ৩৫ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। গতকাল রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) এ নিয়ে পৌরসভার প্রধান ফটকের সামনে মানববন্ধন করে নতুন নির্ধারিত কর প্রত্যাহার, পুনর্মূল্যায়ন এবং নাগরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে কর নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে পৌরসভার কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাদের অপসারণের দাবি তুলেন বক্তারা।
ফেনী পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ফেনী পৌরসভায় হোল্ডিং ট্যাক্স গ্রাহক রয়েছেন প্রায় ২৬ হাজার ৫০০ জন। বিভিন্ন কারণে ৮০০ থেকে ১ হাজার হোল্ডিং করের আওতার বাইরে রয়েছে। গত অর্থবছরে হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ ফেনী পৌরসভা প্রায় ৬ কোটি টাকা আদায় করেছে। চলতি অর্থবছরে নির্ধারিত করের ভিত্তিতে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ কোটি টাকা।
পৌর এলাকার রামপুরের বাসিন্দা সিরাজ উল্লাহ। গত বছর তার হোল্ডিং ট্যাক্স ছিল ২ হাজার ৫২ টাকা। এবার তাকে ৬৭ হাজার ৪৫০ টাকার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমার ভবনটি দুইতলা, কোনো পরিবর্তনও হয়নি। এরপরও কীভাবে এত বেশি কর নির্ধারণ করা হয়েছে, বুঝতে পারছি না। সংসারের খরচ বেড়েছে, কিন্তু আয় বাড়েনি। গত বছর ২ হাজার ৫২ টাকা কর দিয়ে এবার ৬৭ হাজার ৭৫০ টাকা কেন দিতে হবে? নাগরিকদের সঙ্গে আলোচনা না করেই কর্মকর্তারা অস্বাভাবিক হারে হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করেছেন। যিনি এ কাজ করেছেন তার মানসিক সুস্থতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অবিলম্বে এসব অযৌক্তিক কর প্রত্যাহার করে পৌরবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে নতুন করে কর নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে যাব।
পৌর কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, নতুন কর নির্ধারণে ব্যাপক অসঙ্গতি রয়েছে। কারও ২ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা, কারও ২০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা এবং কারও ২ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কর নির্ধারণ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
মানববন্ধনে জেলা জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মাসুদ পারভেজের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মামুনের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন-শুকদেব নাথ তপন, রাবিউল হক রাবি, বেলাল পাটোয়ারী, ওমর ফারুক, রাসেল পাটোয়ারী, সোহেল ভূঁইয়া প্রমুখ।
শরীফুল ইসলাম রাসেল নামে একজন অভিযোগ করে বলেন, সাবেক মেয়রের সময়ে করা সার্ভের তথ্য ব্যবহার করে পৌরসভার কর্মকর্তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো কর নির্ধারণ করছেন। শুনানির নামে ১০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে এবং সেখানে লুটপাট হয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে অন্য কোনো পৌরসভায় এভাবে হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানো হয়নি। অন্যদিকে পৌরসভার সচিব বিভিন্নভাবে আমাদের কর্মসূচি বন্ধ করার চেষ্টা করেছেন৷ অর্থাৎ এসব কাজে তিনিও জড়িত।
তিনি বলেন, পৌরসভার অস্থায়ী কর্মচারীদের অনেকের বাড়ি-গাড়ি রয়েছে। অনেক নাগরিক আয়কর রিটার্ন দাখিলের জন্য নিয়মিত পৌরকর দিয়ে দিয়েছেন। তাদের ওপর অস্বাভাবিক কর চাপানো হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ নেন কর্মকর্তারা। এসময় তিনি বর্তমান কর্মকর্তাদের অপসারণ এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্বে না আসা পর্যন্ত নতুন নির্ধারিত হারে কর না দেওয়ার কথা বলেন।
আবদুর রহিম নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, আগে আমার হোল্ডিং ট্যাক্স ছিল ৮৩৯ টাকা। এবার তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৭২৫ টাকা। আমার আগের নির্ধারিত কর পুনর্বহালের করতে হবে। নতুন নির্ধারিত হারে কর দেওয়া হবে না। আলোচনা করেই কর হার নির্ধারণ করতে হবে।
ওসমান গনি রাসেল নামে আরেকজন বলেন, পৌরসভার ড্রেন ঠিক নেই, সড়কের বাতিগুলো ঠিকমতো কাজ করে না। ডেঙ্গু প্রতিরোধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এসব নাগরিক সেবা নিশ্চিত না করলে আমরা কর দিতে বাধ্য না। নাগরিকদের ওপর বাড়তি কর চাপানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, তারা একটা বিল করে দেবে, আমরা দিয়ে দেবÑএমন তো হতে পারে না। আগে যেখানে ২ হাজার টাকা কর দেওয়া হতো, এবার সেখানে ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অবিলম্বে এসব কর প্রত্যাহার করতে হবে। দাবি মানা না হলে পৌরসভা ঘেরাওসহ কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
পৌরসভার এসেসর মোহাম্মদ হানিফ বলেন, হোল্ডিং ট্যাক্স সাধারণত পাঁচ বছর পরপর নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ কর নির্ধারণ হয়েছিল ২০১৭-১৮ সালে। নতুন পাঁচ বছর মেয়াদী কর নির্ধারণের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালে। সরকার পরিবর্তন, বন্যাসহ বিভিন্ন কারণে এ কাজে বিলম্ব হয়েছে। পরে কাজ শেষ করে নাগরিকদের কাছে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নাগরিকদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে কর কমানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। কারও কর অস্বাভাবিক মনে হলে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। আবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ভবনের পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করেই নতুন কর নির্ধারণ করা হয়েছে। কর বাড়ানো-কমানোর জন্য কর্মকর্তারা টাকা নিয়েছেন এমন অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। কেউ আমার বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারলে পদত্যাগ করব।
তিনি আরও বলেন, আগের সময়েও অনেকেই হোল্ডিং ট্যাক্স কমানোর জন্য পৌরসভায় এসেছেন। ২০১৮ সালে হাজি আলাউদ্দিন মেয়র থাকাকালে অনেকে দুই-তিনবার তদবির করেছেন এবং মেয়র ও সংসদ সদস্যের সুপারিশ নিয়ে এসেছেন। পুরোনো ভবনের তথ্য দেখিয়ে অনেকে কর দিয়েছেন। এ ধরনের ক্ষেত্রে কর কমানোর বিভিন্ন রেকর্ড পৌরসভায় রয়েছে। কেউ ১৩০ ভাগ, ১০৮ ভাগ ও ১২৯ ভাগ পর্যন্ত কর কমানোর রেকর্ড রয়েছে। নতুন করে পুনর্মূল্যায়নের পর এসব বিষয় নাগরিকদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে।
ফেনী পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সামছুদ্দিন বলেন, তিন বছর আগের যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতেই এই হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কোনো গৃহমালিকের ট্যাক্স নিয়ে অভিযোগ থাকলে বিধি অনুযায়ী আপিল করার সুযোগ রয়েছে। যারা আগে বেশি কমিয়েছে, তাদের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। এছাড়া আমার বিষয়ে যে অভিযোগ এসেছে তা ভিত্তিহীন। না জেনে আমার বিষয়ে এসব কেন বলছে জানিনা, ট্যাক্স শাখা আলাদা। এগুলো যাচাই-বাছাই হয়েছে দুই বছর আগে। আমি তখন দায়িত্বেও ছিলাম না।
সদ্য বদলি হওয়া ফেনী পৌর প্রশাসক দিদারুল আলম বলেন, পৌরসভা ৮ বছর পরে ট্যাক্স পুনঃনির্ধারণ করেছে। তবে আমরা সাধারণ মানুষের কথা শুনব। প্রয়োজনে সপ্তাহে দুইবার করে শুনানি করব। যে কর বাড়ানো হয়েছে তা সমন্বয় করা হবে।