এখনো শ্রাবণের ঘর সাজিয়ে রেখেছেন বাবা-মা
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। ফেনীর মহিপাল চত্বরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে মাথায় মায়ের ওড়না পেঁচিয়ে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন ইশতিয়াক আহম্মেদ শ্রাবণ। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। পরিবারকে বলেছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবাই যখন রাজপথে নেমেছে, তখন ঘরে বসে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সেই বের হওয়াই ছিল জীবনের শেষ যাত্রা। মহিপালে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান তিনি।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শ্রাবণের ঘরে খুব বেশি কিছু বদলায়নি। তার ব্যবহৃত পোশাক, বই, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র এখনও আগের জায়গাতেই রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা বলেন, ইচ্ছা করেই কিছু সরানো হয়নি। কারণ ঘরে ঢুকলেই এখনো মনে হয়, শ্রাবণ বুঝি একটু পরই ফিরে এসে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকবে।
সন্তান হারানোর বেদনা নিয়ে প্রতিটি দিন পার করছেন বাবা নেছার আহম্মেদ ও মা ফাতেমা আক্তার শিউলি। সময়ের সঙ্গে তাদের চোখের জল হয়তো কিছুটা আড়াল হয়েছে, কিন্তু বিচার না পাওয়ার আক্ষেপ আরও গভীর হয়েছে।
শ্রাবণের বাবা নেছার আহম্মেদ বলেন, আমাদের চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়। মামলার অনেক এজাহারভুক্ত আসামি এখনো বাইরে আছে। দুই বছরেও মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, দ্রুত চার্জশিট দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু করা হোক। মামলার তারিখগুলো যেন দ্রুত নির্ধারণ করা হয়।
তিনি বলেন, আমার ছেলে যে উদ্দেশ্যে জীবন দিয়েছে, সেই উদ্দেশ্যেরও পূর্ণ বাস্তবায়ন আমরা এখনো দেখিনি। তারা অন্যায়, বৈষম্য ও অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু দুই বছর পরও অনেক কিছু আগের মতোই রয়ে গেছে। আমরা চাই, রাষ্ট্র শহিদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা দিক এবং হত্যাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনুক।
জুলাই সনদের প্রসঙ্গ তুলে নেছার আহম্মেদ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য কমিটি হয়েছে, গণভোট হয়েছে, জনগণ রায়ও দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। এসব দেখে খুব কষ্ট লাগে। দেশের জন্য যেসব ভালো সিদ্ধান্ত, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত।
শ্রাবণের মা ফাতেমা আক্তার শিউলি বলেন, আজও মনে হয় শ্রাবণ দরজায় কড়া নাড়বে। ও আমাকে বলত, একদিন হজে নিয়ে যাবে। সেই কথাগুলো এখনো কানে বাজে। আমার ছেলেটা দেশের জন্য জীবন দিল, অথচ দুই বছরেও তার হত্যাকারীদের বিচার দেখতে পারলাম না। মৃত্যুর আগে শুধু ছেলের হত্যাকারীদের শাস্তি দেখে যেতে চাই।
তিনি বলেন, আমরা কোনো বিশেষ সুযোগ-সুবিধা চাই না। আমরা শুধু চাই রাষ্ট্র আমাদের সন্তানদের আত্মত্যাগের মর্যাদা দিক। যারা প্রকাশ্যে নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর গুলি চালিয়েছে, তাদের বিচার নিশ্চিত করা হোক।
পরিবারের সদস্যরা বলেন, সময় যতই গড়াচ্ছে, শ্রাবণের অনুপস্থিতি ততই বেশি অনুভব করছেন তারা। ঈদ, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্ত-সব জায়গাতেই শ্রাবণের শূন্যতা তাদের কাঁদায়। একমাত্র ছেলে হারানোর সেই বেদনা কখনও শেষ হওয়ার নয়। তাদের ভাষ্য, রাষ্ট্রীয় সহায়তা কিংবা আর্থিক অনুদান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে একজন মা-বাবার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে, যদি ছেলের হত্যাকারীরা আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়ায় এবং বিচার সম্পন্ন হয়। তাদের বিশ্বাস, বিচার প্রতিষ্ঠিত হলেই কেবল শ্রাবণের আত্মত্যাগের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো হবে এবং ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন নির্মম পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে না।
বিচারই একমাত্র প্রত্যাশা শহিদ মাসুদের মায়ের
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক দফা কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন ফেনী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সরওয়ার জাহান মাসুদ। পরিবারের কাছে বলে গিয়েছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেবেন। কিন্তু সেই যাওয়া আর ফিরে আসায় রূপ নেয়নি। মহিপালে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। পরিবারের দাবি, শরীরে একাধিক গুলি লাগার পরও তিনি জীবিত ছিলেন। ছোট ভাই মাসুম আল সামীর তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে পথে বাধার মুখে পড়তে হয়। তাদের অভিযোগ, সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে হয়তো বাঁচানো সম্ভব হতো মাসুদকে।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই বিকেলের প্রতিটি মুহূর্ত এখনো স্পষ্ট হয়ে ফিরে আসে মা বিবি কুলসুমের মনে। ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বিবি কুলসুম বলেন, দুই বছর ধরে শুধু শুনছি বিচার হবে, বিচার হবে। কিন্তু এখনো কোনো নজির দেখছি না। আমার ছেলের শরীরে একাধিক গুলি লেগেছিল। সেই কষ্ট কেউ বুঝবে না।
তিনি বলেন, দুই বছর ধরে বিচার চেয়ে আসছি, কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখতে পাইনি। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি আমার সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার চাই। শুনেছি কয়েকটি মামলার চার্জশিট হয়েছে। আশা করি, অন্তত এবার বিচার কার্যক্রম দৃশ্যমানভাবে এগোবে।
কথা বলতে বলতে ছেলের স্মৃতিচারণ করেন তিনি আরও বলেন, রাতে ঘুমাতে গেলে যখন ছেলেকে দেখতে পাই না, তখন কী কষ্ট হয় সেটা কাউকে বোঝাতে পারব না। আমি একজন মা। এই শূন্যতা, এই যন্ত্রণা আমাকে একাই বয়ে বেড়াতে হয়। আল্লাহ ধৈর্য দিয়েছেন বলেই দুই বছর ধরে বেঁচে আছি।
সরকারের দেওয়া সহায়তার কথা উল্লেখ করে বিবি কুলসুম বলেন, সরকার আমাদের জন্য অনেক কিছু করেছে, সহযোগিতাও করেছে। কিন্তু এসবের চেয়েও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিচার। আমার সন্তান তো আর ফিরে আসবে না। অন্তত হত্যাকারীদের শাস্তি হলে মনে হবে, রাষ্ট্র আমাদের সন্তানের আত্মত্যাগকে সম্মান করেছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের ছেলেদের ত্যাগের বিনিময়ে আজ অনেকেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। আমরা চাই, সরকার শহিদদের অবদান ভুলে না যাক। দেশ যেন সুন্দরভাবে চলে, মানুষের অধিকার নিশ্চিত হয়, আর আমাদের সন্তানদের হত্যাকারীরা যেন দ্রুত বিচারের মুখোমুখি হয়। এটাই একজন মা হিসেবে আমার শেষ প্রত্যাশা।
রক্তাক্ত শিহাবের শেষ মুহূর্ত এখনো ভুলেনি মা
ফেনীর মহিপালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক দফা কর্মসূচিতে অংশ নিতে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন ওয়াকিল আহম্মেদ শিহাব। পরিবার জানত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই তিনি রাজপথে যাচ্ছেন। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে ওঠে জীবনের শেষ যাত্রা। আন্দোলন চলাকালে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ছোড়া গুলিতে পিঠ, মাথা ও পায়ে গুলিবিদ্ধ হন শিহাব। সহযোদ্ধারা তাকে উদ্ধার করে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শিহাবের মায়ের কাছে সময় যেন থেমে আছে সেই বিকেলেই। ছেলের কথা বলতে গিয়ে এখনো কান্নায় ভেঙে পড়েন মাহফুজা আক্তার। ঘরের প্রতিটি কোণে, প্রতিটি স্মৃতিতে তিনি এখনো ছেলেকে খুঁজে ফেরেন।
মাহফুজা আক্তার বলেন, আমার ছেলে নামাজ পড়ত, সবাইকে সালাম দিত। অন্য কারও বিপদের কথা শুনলে সবার আগে ছুটে যেত। সেদিনও দেশের জন্য বের হয়েছিল। কিন্তু ঘরে ফিরল লাশ হয়ে।
তিনি বলেন, কারা অস্ত্র হাতে ছিল, কারা গুলি চালিয়েছে সব ভিডিওতে আছে। তারপরও দুই বছরেও বিচার এগোয়নি। আমরা শুধু সুষ্ঠু বিচার চাই। যারা আমাদের সন্তানদের ওপর অস্ত্র চালিয়েছে, তাদের বিচার চাই।
শিহাবের মা আরও বলেন, আমাদের সন্তানরা জীবন দিয়েছে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, গুম, খুন ও নির্যাতনমুক্ত একটি দেশের জন্য। কিন্তু এখনো এসব পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। দুই বছর পার হলেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আমরা দেখছি না। জুলাই সনদের বাস্তবায়নও এখনো হয়নি।
মাহফুজা আক্তার বলেন, আর কত রক্ত দিলে, কত মায়ের বুক খালি হলে এই দেশের পরিবর্তন আসবে? কোনো এমপি বা মন্ত্রীর সন্তান রাজপথে ছিল না। আমাদের সন্তানরাই রাজপথে গিয়ে জীবন দিয়েছে। অথচ আজও আমরা তাদের হত্যাকারীদের বিচার চাইতে ঘুরছি।
তিনি বলেন, গণভোটে মানুষ রায় দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। যারা আমাদের ছেলেদের হত্যা করেছে, তাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে দেশে ফিরে আমাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেয় এমন কথাও শুনি। তাই শুধু বিচার নয়, শহিদ পরিবারগুলোর নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
শাহীর স্মৃতি আঁকড়ে কান্না করেন মা
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে মায়ের কাছে ২৫ টাকা গাড়ি ভাড়া চেয়েছিলেন সাইদুল ইসলাম শাহী। মায়ের কাছে তখন টাকা ছিল না। পরে বাবা ২৫ টাকা দেন। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় শাহী বলেছিলেন, আমার কাছে ২৫ টাকা আছে, আর ২৫ টাকা পেলেই ফেনী থেকে বাড়ি ফিরতে পারব। সেই কথাই ছিল পরিবারের সঙ্গে তার শেষ কথা। মহিপালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের গুলিতে পিঠে তিনটি এবং কানের নিচে একটি গুলি লাগে তার। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। আর কোনোদিন বাড়ি ফেরা হয়নি শাহীর।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ২৫ টাকার সেই স্মৃতি এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারেননি মা রেহানা বেগম। ছেলের কথা বলতে গিয়ে এখনো কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। প্রতিদিনের মতো আজও দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন, যেন ছেলে হঠাৎ ফিরে আসবে।
রেহানা বেগম বলেন, দুই বছর হয়ে গেছে। এখনো কোনো বিচার হয়নি। যারা আমার সন্তানকে হত্যা করেছে, তাদের কেউ শাস্তি পায়নি। এটাই আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট।
তিনি বলেন, শাহী ছিল আমার আদরের সন্তান। ওর চলাফেরা, কথা বলা, হাসি-সবকিছু আজও চোখের সামনে ভাসে। ঘরে ঢুকলেই মনে হয়, ও বুঝি এখনই এসে ডাক দেবে। কিন্তু পুরো ঘরটাই এখন খালি লাগে। একজন মা হিসেবে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে?
রেহানা বেগম আরও বলেন, বিচার হলে হয়তো কিছুটা শান্তি পেতাম। রাষ্ট্র যদি আমাদের পাশে দাঁড়িয়েও থাকে, সহযোগিতা করেও থাকে, তারপরও আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া আমার সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার। যত সহযোগিতাই করা হোক, আমার সন্তান তো আর ফিরে আসবে না।
তিনি বলেন, দুই বছরেও দেশের তেমন কোনো পরিবর্তন দেখিনি। আমরা চাই, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হোক। যারা প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। তাহলে অন্তত মনে হবে, আমার ছেলের রক্ত বৃথা যায়নি।
শাহীর বড় ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন, মা এখনো প্রতিদিন শাহীর কথা মনে করে কান্না করেন। সময়ের সঙ্গে মানুষের ক্ষত শুকিয়ে যায় বলা হয়, কিন্তু আমাদের পরিবারের ক্ষেত্রে তা হয়নি। বরং প্রতিটি দিন আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, শাহী আর আমাদের মাঝে নেই। সরকারের কাছে আমাদের একটাই আবেদন দ্রুত বিচার নিশ্চিত করুন। যেন আর কোনো পরিবারকে বছরের পর বছর এমন অপেক্ষা করতে না হয়। বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু আমাদের পরিবার নয়, রাষ্ট্রের প্রতিও মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
মাসুমের হত্যাকারীদের বিচার চায় পরিবার
সেদিন পরিবারের নিষেধ অমান্য করেই ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন কলেজশিক্ষার্থী মাহবুবুল হক মাসুম। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক দফা কর্মসূচিতে অংশ নিতে যাওয়ার আগে ভাই-বোনদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ঢাকায় বাসার ভেতরেও শিশুরা মারা যাচ্ছে। আমি প্রয়োজনে শহিদ হব, তবুও আন্দোলনে যাব। এ সময় ঘরে বসে থাকা অন্যায়। পরিবারের কেউ তখন ভাবতেও পারেননি, এটাই হবে তাদের সঙ্গে মাসুমের শেষ কথোপকথন।
সেদিন মহিপালে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের গুলিতে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন মাসুম। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে তাকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। মৃত্যুর সঙ্গে টানা তিন দিন লড়াই করে ৭ আগস্ট বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মাসুমের শূন্যতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি পরিবার। বৃদ্ধা মা এখনো ছেলের কথা মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বড় ভাই মাহমুদুল হাসান বলেন, সময় পার হয়েছে, কিন্তু তাদের বেদনা একটুও কমেনি। বরং বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় সেই কষ্ট আরও গভীর হয়েছে।
মাহমুদুল হাসান বলেন, দুই বছর হয়ে গেল ভাই চলে গেছে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে সে জীবন দিয়েছে, তার বাস্তবায়ন আমরা এখনো দেখিনি। এত শত ছাত্র-জনতা জীবন দিল, হাজারো মানুষ আহত হলো দেশে পরিবর্তন আসবে, এই আশা নিয়েই তারা রাজপথে নেমেছিল। কিন্তু সেই আকাক্সক্ষার প্রতিফলন এখনো দেখতে পাচ্ছি না।
তিনি বলেন, অনেক আসামি এখনো পালিয়ে বেড়াচ্ছে। মামলাগুলোর দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের ঢিলেঢালা ভাব লক্ষ্য করছি। আসামিদের গ্রেপ্তারে প্রয়োজনীয় তৎপরতাও চোখে পড়ে না। আমরা চাই, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাদের কাউকেই যেন আইনের বাইরে রাখা না হয়।
তিনি আরও বলেন, আমরা জানি স্বজন হারানোর কষ্ট কী। আমরা ভাই হারিয়েছি। এই যন্ত্রণা কতটা গভীর, সেটা শুধু ভুক্তভোগীরাই বুঝতে পারে। বিচার না হলে ভবিষ্যতে দেশের জন্য কেউ নিজের জীবন নিয়ে রাজপথে নামতে সাহস পাবে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে, শহিদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা।
মাহমুদুল হাসান বলেন, আমরা সরকারের কাছে কোনো বিশেষ সুযোগ-সুবিধা চাই না। আমাদের একটাই দাবি-আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত করা হোক। একটি দেশে আইনের শাসন না থাকলে সেই দেশ কখনোই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যেতে পারে না। আমরা চাই, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হোক।
সেদিন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল লাশ
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থী, তরুণ, শ্রমজীবী, ব্যবসায়ী, অভিভাবকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সরকার পতনের এক দফা কর্মসূচির অংশ হিসেবে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেন তারা। প্রতিবাদী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মহিপাল। অনেকের হাতে জাতীয় পতাকা, কারও হাতে প্ল্যাকার্ড। সবার কণ্ঠে ছিল একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রত্যাশা।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আন্দোলনকারীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে মহিপাল ফ্লাইওভারের দক্ষিণ পাশে অবস্থান নিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আন্দোলনকারীরা সড়কেই জোহরের নামাজ আদায় করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর পর্যন্ত কর্মসূচি শান্তিপূর্ণই ছিল।
একই সময়ে শহরের ট্রাংক রোড এলাকায় অবস্থান নেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। দুপুর দেড়টার দিকে তারা মিছিল নিয়ে মহিপালের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। এরপর থেকেই দ্রুত বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। শহিদ শহিদুল্লাহ কায়সার সড়কজুড়ে ককটেল বিস্ফোরণ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং গুলির শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী, মামলার অভিযোগ এবং ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন দিক থেকে গুলি ছোড়া হয়। অনেকের হাতেই ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। একপর্যায়ে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা জীবন বাঁচাতে ছুটতে শুরু করেন। কিন্তু পিছু হটার সময়ও তাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে, সেদিন মহিপালের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল লাশ।
মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচ থেকে সার্কিট হাউস সড়ক, পাসপোর্ট অফিস এলাকা পর্যন্ত রক্তাক্ত দৃশ্যের সাক্ষী হয় মানুষ। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ইশতিয়াক আহম্মেদ শ্রাবণ, সরওয়ার জাহান মাসুদ, ওয়াকিল আহম্মদ শিহাব, সাইদুল ইসলাম শাহী, জাকির হোসেন শাকিব ও মোহাম্মদ সবুজ। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় মাহবুবুল হক মাসুমকে। তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ৭ আগস্ট চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারও মৃত্যু হয়।
সেদিন শুধু আন্দোলনকারীরাই নন, আহত হন পথচারী, গণমাধ্যমকর্মীসহ দেড় শতাধিক মানুষ। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, অনেক আহত ব্যক্তি নিরাপত্তাহীনতার কারণে হাসপাতালে যেতে পারেননি। আবার বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে গিয়েও হামলা ও বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ ওঠে।এদিকে হামলার সময় এসি মার্কেট সংলগ্ন মার্কেনটাইল ব্যাংক এলাকায় কয়েকজন সাংবাদিকের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটে। তাদের পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নেওয়া, মোবাইল ফোন ভাঙচুর এবং মারধর করেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। কয়েকজন সাংবাদিককে অস্ত্রের মুখে দ্বিতীয় তলায় ব্যাংকের ভেতরে আটকে রাখার ঘটনাও পরে আলোচনায় আসে।
সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে একের পর এক মরদেহ পৌঁছাতে থাকে। হাসপাতালের সামনে শুরু হয় স্বজনদের আহাজারি। কেউ ছেলেকে খুঁজছেন, কেউ ভাইকে, কেউ আবার আহত স্বজনের খোঁজে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন। জরুরি বিভাগের সামনে সাদা কাপড়ে ঢাকা মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা।
সেদিন সন্ধ্যা নামার আগেই পুরো ফেনী শহরের চিত্র বদলে যায়। ব্যস্ত ট্রাংক রোড, মহিপাল, শহিদ শহিদুল্লাহ কায়সার সড়ক-সবখানেই নেমে আসে অস্বাভাবিক নীরবতা। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, জনশূন্য হয়ে পড়ে রাস্তাঘাট। থেমে থেমে বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা যায় সন্ধ্যা পর্যন্ত।
দুই বছর পরও সেই দিনের অসংখ্য ভিডিও, ছবি, রক্তাক্ত পোশাক এবং স্বজনদের কান্না ফেনীর মানুষের স্মৃতিতে অম্লান। মহিপালের সেই দুপুর শুধু সাতজন শহিদের জীবনই কেড়ে নেয়নি, বদলে দিয়েছে অসংখ্য পরিবারের জীবন। আজও সেই দিনের প্রতিটি মুহূর্ত ফিরে আসে স্বজনদের স্মৃতিতে। তাদের একটাই প্রত্যাশা-যে রক্তে মহিপালের রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল, সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার যেন বিলম্বিত না হয়।
ভাইরাল হয় গুলির দৃশ্য
সেদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সরকার পতনের একদফা কর্মসূচির সমর্থনে মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে অবস্থান নেন ছাত্র-জনতা। দুপুর ২টা থেকে কর্মসূচিতে হামলা চালায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় অনেকের হাতে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে।
এ ঘটনার পর ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। নেটিজেনরা ভিডিওতে থাকা হত্যাকারীদের পরিচয়সহ ছবিও প্রকাশ করছেন। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি (কালো জ্যাকেট) শহিদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়ক হয়ে মহিপাল প্লাজা এলাকা থেকে একটি রিকশা থেকে নেমে গুলি করে করে সামনে দিকে এগিয়ে যায়। তার হাতের ইশারায় পরবর্তীতে পেছন থেকে অন্যরা সামনের দিকে এগিয়ে যান। নেটিজেনরা তাকে ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি জিয়া উদ্দিন বাবলু বলে দাবি করেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা পিছু হটলে তাদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করা হয়। এতে প্রাণ হারান ৭ জন।