ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে জড়ো হতে থাকেন ছাত্র-জনতা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সরকার পতনের এক দফা কর্মসূচির সমর্থনে রাজপথে নেমেছিলেন শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, ব্যবসায়ী, অভিভাবকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতিবাদী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে মহিপাল ফ্লাইওভার এলাকা। অনেকের কাঁধে জাতীয় পতাকা, কারও হাতে প্ল্যাকার্ড। বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও নিপীড়নের অবসান ঘটিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যাশাই ছিল তাদের কণ্ঠে।
সেদিন দুপুর পর্যন্ত পরিস্থিতি ছিল আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে। একপর্যায়ে মহিপাল ফ্লাইওভারের দক্ষিণ পাশে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন তারা। মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফ্লাইওভারের নিচেই আন্দোলনকারীরা জোহরের নামাজ আদায় করেন। কিন্তু দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে পুরো পরিস্থিতি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য ও মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে মহিপালের দিকে এগিয়ে আসেন। এরপর শুরু হয় ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। যে রাজপথ কিছুক্ষণ আগেও ছিল প্রতিবাদের স্লোগানে মুখর, সেটিই অল্প সময়ের ব্যবধানে রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে।
সেদিনের সেই গুলিতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ইশতিয়াক আহম্মেদ শ্রাবণ, সরওয়ার জাহান মাসুদ, ওয়াকিল আহম্মেদ শিহাব, সাইদুল ইসলাম শাহী, জাকির হোসেন শাকিব ও মোহাম্মদ সবুজ। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় কলেজশিক্ষার্থী মাহবুবুল হক মাসুমকে। মাথায় গুলিবিদ্ধ মাসুমকে প্রথমে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। মৃত্যুর সঙ্গে তিন দিন লড়াই করে ৭ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মারা যান। সেই দিনের ঘটনায় আহত হন শিক্ষার্থী, পথচারী, গণমাধ্যমকর্মীসহ দেড় শতাধিক মানুষ। অনেকেই রাজনৈতিক ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাও নিতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
মহিপালের ঘটনার পর ফেনী জেনারেল হাসপাতালের চিত্র ছিল হৃদয়বিদারক। একের পর এক মরদেহ এসে পৌঁছাতে থাকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা মরদেহের পাশে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতাল চত্বর। কেউ ছেলেকে খুঁজছেন, কেউ ভাইকে। আবার অনেকে হাসপাতালে গিয়ে প্রিয়জনের খোঁজ না পেয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়িয়েছেন। আহতদের চিকিৎসা নিতে বাধা দেওয়া ও হাসপাতাল এলাকায় হামলার অভিযোগও ওঠে সেদিন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই প্রাণচঞ্চল ফেনী শহর পরিণত হয়েছিল এক ভয়ার্ত জনপদে। ফাঁকা হয়ে যায় ট্রাংক রোড, মহিপাল, শহিদ শহিদুল্লাহ কায়সার সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো।
আজ সেই রক্তাক্ত ৪ আগস্টের দুই বছর। সময়ের সঙ্গে রাজপথের রক্ত মুছে গেছে, থেমে গেছে গুলির শব্দও। কিন্তু সন্তান হারানো পরিবারগুলোর বুকের ক্ষত আজও শুকায়নি। দুই বছর ধরে তারা আদালতের প্রতিটি তারিখের দিকে তাকিয়ে আছেন, তদন্তের প্রতিটি অগ্রগতির খবর রাখছেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি আশ্বাস শুনছেন। কিন্তু তাদের প্রশ্ন একটাই-যে সন্তানরা একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন নিয়ে রাজপথে নেমেছিল, তাদের হত্যার বিচার শেষ হতে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?
শুধু মহিপালেই নয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে ফেনীর আরও কয়েকজন সন্তান জেলার বাইরে শহিদ হন। তাদের মধ্যে দাগনভূঞার সাইফুল ইসলাম আরিফ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট চট্টগ্রামের সিআরবি এলাকায় আন্দোলনে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। টানা ৫৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এছাড়া রাজধানী ঢাকায় আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন সোনাগাজীর আব্দুল গণি বোরহান, পরশুরামের ইকরাম হোসেন কাউছার এবং মোহাম্মদ আবু বক্কর ছিদ্দিক। মহিপালের রক্তাক্ত বিকেল কিংবা জেলার বাইরের রাজপথ-সবখানেই জুলাই আন্দোলনে ফেনী হারিয়েছে তার সম্ভাবনাময় কয়েকজন সন্তানকে।
দুই বছর পরও শহীদ পরিবারগুলোর অভিযোগ, বিচার প্রক্রিয়ার গতি তাদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ধীর। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আসামি এখনো গ্রেপ্তারের বাইরে বলে দাবি তাদের। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের মূল আকাক্সক্ষা-আইনের শাসন, জবাবদিহি ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা। তাদের ভাষ্য, রাষ্ট্র আর্থিক সহায়তা দিয়েছে, খোঁজও নিয়েছে; কিন্তু সন্তান হারানোর শোক লাঘবের একমাত্র পথ হলো দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার।
মহিপালের ঘটনায় হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ফেনী মডেল থানায় মোট ২২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি হত্যা এবং ১৫টি হত্যাচেষ্টা ও হামলার মামলা। এসব মামলার মধ্যে ১৪টি মামলার অভিযোগপত্র ইতোমধ্যে আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ। বাকি মামলাগুলোর তদন্তও দ্রুত গতিতে চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
শহিদ ইশতিয়াক আহম্মেদ শ্রাবণের বাবা নেছার আহম্মেদ বলেন, আমাদের চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়, মামলার অনেক এজাহারভুক্ত আসামি এখনো বাইরে আছে। দুই বছরেও মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। দ্রুত চার্জশিট দিয়ে বিচার শুরু করা হোক।
শহিদ সরওয়ার জাহান মাসুদের মা বিবি কুলসুম বলেন, সরকার আমাদের সহযোগিতা করেছে, কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া বিচার। আমার সন্তানদের হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মাসুদের শরীরে একাধিক গুলি লাগে। পরিবারের দাবি, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও তিনি জীবিত ছিলেন। ছোট ভাই তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে পথে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়তে হয়। তাদের বিশ্বাস, সময়মতো চিকিৎসা পেলে হয়তো আজও মাসুদ বেঁচে থাকতেন। সেই আক্ষেপও আজ দুই বছর পর সমান তীব্র।
শহিদ ওয়াকিল আহম্মেদ শিহাবের মা মাহফুজা আক্তার বলেন, কারা অস্ত্র হাতে ছিল, কারা গুলি চালিয়েছে-সব ভিডিওতে আছে। তারপরও বিচার হয়নি। আর কত মায়ের বুক খালি হলে এই দেশের পরিবর্তন আসবে?
শহিদ সাইদুল ইসলাম শাহীর মা রেহানা বেগম বলেন, দুই বছর হয়ে গেল, এখনো কোনো বিচার হয়নি। আমার ছেলে ২৫ টাকা গাড়িভাড়া নিয়ে আন্দোলনে গিয়েছিল, কিন্তু আর ঘরে ফিরতে পারেনি।
শহিদ মাহবুবুল হক মাসুমের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান বলেন, ভাইয়েরা যে উদ্দেশ্যে জীবন দিয়েছে, তার বাস্তবায়ন হয়নি। অনেক আসামি এখনো পালিয়ে বেড়াচ্ছে। মামলার অগ্রগতি নেই।
শুধু শহিদ পরিবারই নয়, জুলাই আন্দোলনের সংগঠক ও আহতরাও মনে করছেন, দুই বছর পরও মহিপালের হত্যাকাণ্ডের বিচার দৃশ্যমানভাবে শেষ না হওয়ায় শহিদদের আত্মত্যাগের প্রতি প্রত্যাশিত রাষ্ট্রীয় প্রতিফলন এখনো দেখা যায়নি। তাদের ভাষ্য, শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়, প্রতিটি মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ করে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফেনীর সাবেক সমন্বয়ক মুহাইমিন তাজিম বলেন, মহিপালের মতো একটি প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশ মামলার বিচার এখনো দৃশ্যমান হয়নি। শহিদ পরিবারের সদস্যদের আজও বিচারের দাবিতে কথা বলতে হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা চাই, বিচার যেন কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, আইনের ভিত্তিতে দ্রুত সম্পন্ন হয়।
মহিপালে গুলিতে আহত হওয়া ফেনী ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী নুর হোসেন বলেন, আহতদের অনেকেই এখনো শারীরিক ও মানসিক জটিলতা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন।
মামলার অগ্রগতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, অস্ত্র সবার কাছে থাকে না। যাদের কাছে অস্ত্র ছিল, তারা মূল সন্ত্রাসী। অস্ত্র নিয়ে যারা ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে, তাদের অনেকেই শুরুতেই পালিয়ে যায়। তারপরও তদন্ত থেমে নেই। তথ্য-প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন উপায়ে তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ চলছে। দ্রুত মামলাগুলোর নিষ্পত্তির জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন করছে।