ফেনী    বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
দৈনিক ফেনী

ডাঙ্গি খালের প্রাক্কলন ব্যয়ে ‘মনগড়া তথ্য’, ৫৮.৮৫ শতাংশ বাস্তবায়নেই শেষ হলো কাজ!



ডাঙ্গি খালের প্রাক্কলন ব্যয়ে ‘মনগড়া তথ্য’, ৫৮.৮৫ শতাংশ বাস্তবায়নেই শেষ হলো কাজ!

সোনাগাজীর ডাঙ্গি খাল পুনর্খনন প্রকল্পে প্রাক্কলন, বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের হিসাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পে পাঁচ কিলোমিটার খননকাজ সম্পন্ন হয়েছে, যা প্রাক্কলিত কাজের ৫৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ কাজে ব্যয় হয়েছে ৭৬ লাখ ৩০ হাজার ৬২১ টাকা। অথচ প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৫ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার ৯৪৫ টাকা। কাজ শেষে অব্যয়িত ৪ কোটি ৯০ লাখ ২০ হাজার ৩২৪ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে, যা মোট প্রাক্কলিত অর্থের প্রায় ৮৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

প্রকল্পটি নিয়ে এর আগেও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক ফেনী। গত ১১ জুন প্রকাশিত হয় “সোনাগাজীতে খাল খনন কার্যক্রম নিয়ে ধোঁয়াশা: ডাঙ্গি খাল খননে কিলোমিটার প্রতি বরাদ্দ সোয়া কোটি টাকা!” শীর্ষক প্রতিবেদন। পরে ১৮ জুন “একাধিক প্রশ্ন রেখেই চলছে সোনাগাজী ডাঙ্গি খাল খনন” শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই দুই প্রতিবেদনে প্রকল্পের প্রাক্কলন, খালের দৈর্ঘ্য, বাস্তবায়ন কমিটি গঠন এবং দাপ্তরিক নথিপত্র নিয়ে একাধিক অসঙ্গতির বিষয় উঠে আসে।

তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিগ্যান চাকমা সে সময় বলেন, গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে খালের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য ছিল, পূর্বে ২২ কিলোমিটার খালের জন্য যে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছিল, সংশোধিত প্রকল্পে খালের দৈর্ঘ্য কমলেও একই বরাদ্দ রেখে প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয় এবং সেই অনুযায়ী হিসাব সমন্বয় করা হয়। বর্তমান বাস্তবায়ন শেষে জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে ওই বক্তব্য মিলিয়ে দেখলে প্রাক্কলন প্রণয়নের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এদিকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. এনামুল হকের বক্তব্যেও ভিন্নতা দেখা যায়। প্রথম প্রতিবেদনের সময় তিনি বলেছিলেন, সংশোধিত প্রকল্পেও প্রাক্কলনে উল্লেখিত অর্থই ব্যয় হবে। পরে একই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্প নির্দেশিকা অনুযায়ী সমপরিমাণ বরাদ্দ দেখিয়েই প্রাক্কলন প্রস্তুত করার নির্দেশনা রয়েছে।

বিষয়টি জানতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পের ধরন বা পরিমাণ পরিবর্তন হলে সেই অনুযায়ী বরাদ্দের প্রস্তাবও সংশোধন করে পাঠাতে হয়।

জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির কাজ ৫৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাস্তবায়নের পর সমাপ্ত দেখানো হয়েছে এবং অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে প্রাক্কলনে উল্লেখিত দৈর্ঘ্যের অবশিষ্ট অংশের কাজ কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোনাগাজী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. এনামুল হক তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, রাতে এ বিষয়ে কথা বলা সম্ভব নয়। দিনের বেলা অফিসে এলে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, তাঁদের দপ্তরের প্রাক্কলনে খালের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় সাড়ে আট কিলোমিটার। কিন্তু বাস্তবে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার খননের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট অংশের বিষয়ে তিনি কোনো তথ্য জানাতে পারেননি।

এদিকে প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর গত ১৩ জুন জেলা প্রশাসক মনিরা হক জেলার পাঁচ উপজেলায় প্রাক্কলন যাচাই কমিটি গঠন করেন। সোনাগাজী উপজেলা কমিটির সদস্যসচিব ও উপজেলা প্রকৌশলী জয় সেন বলেন, তাঁরা দায়িত্ব পাওয়ার আগেই প্রকল্পের বড় অংশের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। ফলে শুরু থেকে প্রাক্কলনের যথার্থতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এজন্য কাজ শেষে পোস্ট-ওয়ার্ক সার্ভে করার সুপারিশ করে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি আকলিমা খাতুন বলেন, প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাঁর বিস্তারিত জানা নেই। তিনি দাবি করেন, কাগজে-কলমে সভাপতি থাকলেও বাস্তবে কাজ পরিচালনা করেছেন অন্যরা।

দৈনিক ফেনী

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬


ডাঙ্গি খালের প্রাক্কলন ব্যয়ে ‘মনগড়া তথ্য’, ৫৮.৮৫ শতাংশ বাস্তবায়নেই শেষ হলো কাজ!

প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬

featured Image

সোনাগাজীর ডাঙ্গি খাল পুনর্খনন প্রকল্পে প্রাক্কলন, বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের হিসাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পে পাঁচ কিলোমিটার খননকাজ সম্পন্ন হয়েছে, যা প্রাক্কলিত কাজের ৫৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ কাজে ব্যয় হয়েছে ৭৬ লাখ ৩০ হাজার ৬২১ টাকা। অথচ প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৫ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার ৯৪৫ টাকা। কাজ শেষে অব্যয়িত ৪ কোটি ৯০ লাখ ২০ হাজার ৩২৪ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে, যা মোট প্রাক্কলিত অর্থের প্রায় ৮৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

প্রকল্পটি নিয়ে এর আগেও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক ফেনী। গত ১১ জুন প্রকাশিত হয় “সোনাগাজীতে খাল খনন কার্যক্রম নিয়ে ধোঁয়াশা: ডাঙ্গি খাল খননে কিলোমিটার প্রতি বরাদ্দ সোয়া কোটি টাকা!” শীর্ষক প্রতিবেদন। পরে ১৮ জুন “একাধিক প্রশ্ন রেখেই চলছে সোনাগাজী ডাঙ্গি খাল খনন” শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই দুই প্রতিবেদনে প্রকল্পের প্রাক্কলন, খালের দৈর্ঘ্য, বাস্তবায়ন কমিটি গঠন এবং দাপ্তরিক নথিপত্র নিয়ে একাধিক অসঙ্গতির বিষয় উঠে আসে।

তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিগ্যান চাকমা সে সময় বলেন, গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে খালের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য ছিল, পূর্বে ২২ কিলোমিটার খালের জন্য যে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছিল, সংশোধিত প্রকল্পে খালের দৈর্ঘ্য কমলেও একই বরাদ্দ রেখে প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয় এবং সেই অনুযায়ী হিসাব সমন্বয় করা হয়। বর্তমান বাস্তবায়ন শেষে জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে ওই বক্তব্য মিলিয়ে দেখলে প্রাক্কলন প্রণয়নের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এদিকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. এনামুল হকের বক্তব্যেও ভিন্নতা দেখা যায়। প্রথম প্রতিবেদনের সময় তিনি বলেছিলেন, সংশোধিত প্রকল্পেও প্রাক্কলনে উল্লেখিত অর্থই ব্যয় হবে। পরে একই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্প নির্দেশিকা অনুযায়ী সমপরিমাণ বরাদ্দ দেখিয়েই প্রাক্কলন প্রস্তুত করার নির্দেশনা রয়েছে।

বিষয়টি জানতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পের ধরন বা পরিমাণ পরিবর্তন হলে সেই অনুযায়ী বরাদ্দের প্রস্তাবও সংশোধন করে পাঠাতে হয়।

জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির কাজ ৫৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাস্তবায়নের পর সমাপ্ত দেখানো হয়েছে এবং অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে প্রাক্কলনে উল্লেখিত দৈর্ঘ্যের অবশিষ্ট অংশের কাজ কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোনাগাজী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. এনামুল হক তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, রাতে এ বিষয়ে কথা বলা সম্ভব নয়। দিনের বেলা অফিসে এলে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, তাঁদের দপ্তরের প্রাক্কলনে খালের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় সাড়ে আট কিলোমিটার। কিন্তু বাস্তবে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার খননের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট অংশের বিষয়ে তিনি কোনো তথ্য জানাতে পারেননি।

এদিকে প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর গত ১৩ জুন জেলা প্রশাসক মনিরা হক জেলার পাঁচ উপজেলায় প্রাক্কলন যাচাই কমিটি গঠন করেন। সোনাগাজী উপজেলা কমিটির সদস্যসচিব ও উপজেলা প্রকৌশলী জয় সেন বলেন, তাঁরা দায়িত্ব পাওয়ার আগেই প্রকল্পের বড় অংশের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। ফলে শুরু থেকে প্রাক্কলনের যথার্থতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এজন্য কাজ শেষে পোস্ট-ওয়ার্ক সার্ভে করার সুপারিশ করে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি আকলিমা খাতুন বলেন, প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাঁর বিস্তারিত জানা নেই। তিনি দাবি করেন, কাগজে-কলমে সভাপতি থাকলেও বাস্তবে কাজ পরিচালনা করেছেন অন্যরা।


দৈনিক ফেনী

সম্পাদক ও প্রকাশক: আরিফুল আমীন রিজভী কর্তৃক পপুলার অফসেট প্রেস, মিজান রোড, ফেনী-৩৯০০ থেকে মুদ্রিত এবং ৪৩৪, আমিন টাওয়ার (৬ষ্ঠ তলা), ট্রাংক রোড, ফেনী হতে প্রকাশিত।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী
ডাঙ্গি খালের প্রাক্কলন ব্যয়ে ‘মনগড়া তথ্য’, ৫৮.৮৫ শতাংশ বাস্তবায়নেই শেষ হলো কাজ!
0:00 0:00
1.0x