ফেনী সরকারি কলেজের শিক্ষক পরিষদ মিলনায়তনে কলেজ ছাত্রদলের বর্ধিত সভা আয়োজন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সভার ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত মিলনায়তনে রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের সাংগঠনিক সভা আয়োজনের অনুমতি ও কলেজ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। কলেজ ছাত্রদলের দাবি, শিক্ষক মিলনায়তনে সভা করতে কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছে তারা। তবে কলেজ অধ্যক্ষ ছাত্রদলের দাবি নাকচ করে বলছেন, এ ধরনের কোন অনুমতি দেওয়া হয়নি।
গতকাল রোববার (৯ আগস্ট) শিক্ষক পরিষদ মিলনায়তনে কলেজ ছাত্রদলের বর্ধিত সভার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিতে কলেজ ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের শিক্ষক মিলনায়তনের টেবিল ঘিরে বসে সভায় অংশ নিতে দেখা যায়। পেছনে টানানো ব্যানারে ‘ফেনী সরকারি কলেজ ছাত্রদল’ ও ‘বর্ধিত সভা’ লেখা ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সভার ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
এ নিয়ে কলেজের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নানা মন্তব্য করছেন। তারা বলছেন, শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত মিলনায়তনে একটি ছাত্রসংগঠনের সভা আয়োজন কলেজ প্রশাসনের ব্যর্থতা।
শাওন নামে কলেজের এক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে মন্তব্য করে লিখেন, ফেনী কলেজে শিক্ষকদের লজ্জার ইতিহাস রচিত হলো। কলেজ অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ, শিক্ষক পরিষদ এবং শিক্ষকদের চেয়ারে কলেজ ছাত্রদল। গত ১৬ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থাকা অবস্থায় কখনো কেউ দেখেছে ছাত্রলীগ শিক্ষক পরিষদে দলীয় প্রোগ্রাম করতে? কলেজ প্রশাসন দেউলিয়া আর মেরুদণ্ডহীন।
সোহরাব হোসেন শাকিল নামে একজন ফেসবুকে মন্তব্য করে লিখেছেন, শিক্ষক পরিষদে ছাত্র সংগঠনের মিটিং এটাতো কখনো ছাত্রলীগও করছে কিনা সন্দেহ। ছাত্র রাজনীতির জন্য ছাত্র সংসদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ৫ই আগস্টের পর ২ বছর ইন্টিরিম সরকার এর মধ্যে আমরা বা অন্যান্য ছাত্র সংগঠন চাইলেও মিটিং করতে পারতো যেকোন জায়গায়। আমরা বা অন্য কোনো সংগঠনতো তা করে নাই। কিন্তুু শিক্ষক পরিষদে ছাত্র সংগঠনের বর্ধিত সভা কোনো ভাবেই কাম্য নয়।
লায়ন মাইনুদ্দিন ভূঁইয়া নাকে আরেকজন লিখেন, দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি ফেনী কলেজে পদচারণা। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। নিজের শিক্ষক কিংবা কলেজের শিক্ষক কখনো কারো চেয়ারে বসা দূরের কথা, অশোভন আচরণও করিনি। আজকের ছবিটা দেখে অন্যদের মত আমিও অবাক হলাম!
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক ফরিদ আলম ভূঁঞা দৈনিক ফেনীকে বলেন, আমি বিষয়টি অবগত ছিলাম না। সভাটি যখন হয়, তখন আমি আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় ছিলাম। পরে কলেজে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ফেসবুকে বিষয়টি দেখেছি।
তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষকদের কোনো প্রোগ্রাম থাকলে বিএনসিসি, রোভার স্কাউটের শিক্ষার্থীদের বসিয়ে প্রোগ্রাম করি। অন্য শিক্ষার্থীদের এখানে বসার সুযোগ নেই, এটি শিক্ষকদের বসার রুম।
শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক আরও বলেন, এ বিষয়ে ছাত্রদলের কোনো নেতা বা শিক্ষার্থী আমার সাথে কথা বলেনি। এখানে কোনো শিক্ষার্থীদের বসার অনুমতি আমরা প্রদান করি না। আমি এ বিষয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলব।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সালাউদ্দিন মামুন বলেন, এটি কলেজ প্রশাসনকে প্রশ্ন করতে হবে। কলেজ প্রশাসন অনুমতি না দিলে কীভাবে করছে, তারা ব্যাখ্যা দিতে পারবে। কলেজ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে জেলা ছাত্রদলকে এখনো কিছু জানায়নি। তবে সেখানে অন্যরাও কর্মসূচি করে বলে জানতে পেরেছি। এজন্য বিষয়টি ঘোলাটে মনে হচ্ছে। মামুন জানান, এ বিষয়ে তিনি কোন অভিযোগ পাননি। সেজন্য সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
‘অনুমতি নিয়ে’ যত কথা
শিক্ষক পরিষদ মিলনায়তনে সভা আয়োজন নিয়ে কলেজ ছাত্রদল দাবি করছে, শিক্ষক মিলনায়তনে সভা করতে কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়েছে। তবে কলেজ অধ্যক্ষ ছাত্রদলের দাবি নাকচ করে বলছেন, তিনি এ ধরনের কোন অনুমতি দেননি।
অধ্যক্ষের এমন অনুমতি দেওয়ার সুযোগ আছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষক পরিষদ সম্পাদক ফরিদ আলম ভূঁঞা বলেন, তিনি (অধ্যক্ষ) অনুমতি দিয়েছেন কি না জানি না, তবে দেওয়ার কথা না। যতটুকু জানি, তাদের অডিটোরিয়ামে কিংবা ক্লাসরুমে সভা করার জন্য বলা হয়েছিল।
কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জাহেদ হাসান রনি বলেন, অধ্যক্ষের মৌখিক অনুমতির নিয়েই আমরা সেখানে বর্ধিত সভার আয়োজন করেছি। কলেজে শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো কমনরুম নেই। ছাত্রসংগঠনগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কোনো কক্ষও চায়নি। কলেজের ক্ষতি হয়, এমন কিছু না করে অনুমতি নিয়েই আমরা সভা করেছি। তিনি আরও বলেন, সভায় আমরা শিক্ষক পরিষদের জন্য বরাদ্দ করা চেয়ার ব্যবহার করিনি। শিক্ষকদের বসার জায়গার বিপরীত পাশে বসে সভা করেছি।
রনির দাবি, এখানে নিয়মিত অন্যান্য ছাত্র সংগঠন, বিভিন্ন ক্লাব সভার আয়োজন করে থাকে। সেই জায়গায় আমরা সভার আয়োজনের আগে অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং তার অনুমতি পেয়ে সেখানে সভা করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফেনী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর এনামুল হক খোন্দকার জানান, তিনি শিক্ষক পরিষদ মিলনায়তনে সভা করার অনুমতি দেননি বরং ছাত্রদল নেতাদের অডিটোরিয়ামে সভা করার কথা বলেছিলেন।
তিনি বলেন, শিক্ষক পরিষদ মিলনায়তনে সভা করার বিষয়টি সঠিক হয়নি। তারা এসে আমাকে বলেছে, তখন আমি বলেছি এখানে শিক্ষকদের বসার রুম। আমি সম্মতি দেয়নি। তাদের অডিটোরিয়ামে সভা করতে বলেছি, শিক্ষক পরিষদ মিলনায়তনে নয়।
এ ঘটনায় কলেজের পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, এখন আর কী করার আছে। ব্যবস্থা নেওয়ার মত কিছু নেই।