ফেনী    সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
দৈনিক ফেনী

অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার

পরবর্তী প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকার ও আমাদের আজকের সিদ্ধান্ত



পরবর্তী প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকার ও আমাদের আজকের সিদ্ধান্ত

হাসপাতালের রাতের একটি নিজস্ব ভাষা আছে। দিনের কোলাহল স্তিমিত হয়ে এলে সেই ভাষা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। করিডোরজুড়ে ধীর পায়ের শব্দ, কোথাও চাপা কান্না, কোথাও দীর্ঘ নীরবতা। অপেক্ষমাণ মানুষের মুখে তখন একই প্রশ্ন—আরও কিছু কি করা যায়?

কাচের দরজার ওপারে চিকিৎসকেরা জীবনকে আরেকটু সময় দেওয়ার চেষ্টা করেন। এপাশে স্বজনেরা অপেক্ষা করেন একটি বাক্যের জন্য—“রোগী এখন আশঙ্কামুক্ত।” আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা সাধারণ মানুষের কাছে শেষ পর্যন্ত এই বিশ্বাসেই এসে ঠেকে যে, সংকট যত গভীরই হোক, কার্যকর একটি ওষুধ হয়তো এখনো বাকি আছে।

কিন্তু পৃথিবী ধীরে ধীরে এমন এক সময়ের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে সেই শেষ ভরসাটিই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

সম্প্রতি দেশের কয়েকটি শীর্ষ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে বহুঔষধ-প্রতিরোধী জীবাণুর উদ্বেগজনক উপস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আমাদের এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে, যার অভিঘাত শুধু চিকিৎসাব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। বিষয়টি কেবল হাসপাতালের কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। এটি এমন এক নীরব সংকট, যা বহু বছর ধরে আমাদের চোখের সামনেই তৈরি হয়েছে, অথচ আমরা তার শব্দ শুনতে পাইনি।

মানুষের ইতিহাসে এমন কিছু আবিষ্কার আছে, যেগুলো সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক তার অন্যতম। একসময় নিউমোনিয়া, প্রসব-পরবর্তী সংক্রমণ, সাধারণ ক্ষত কিংবা টাইফয়েডের মতো রোগ অসংখ্য জীবনের সমাপ্তি ঘটাত। অ্যান্টিবায়োটিক সেই বাস্তবতা বদলে দিয়েছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞান নতুন আত্মবিশ্বাস পেয়েছিল। নিরাপদ অস্ত্রোপচার সম্ভব হয়েছিল, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো জটিল চিকিৎসা বাস্তব রূপ পেয়েছিল, অকালজাত নবজাতকের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়েছিল। কোটি কোটি পরিবার ফিরে পেয়েছিল তাদের প্রিয় মানুষকে।

কিন্তু বিজ্ঞানের ইতিহাস আরেকটি সত্যও শেখায়—যে অর্জনকে মানুষ যত্নে রক্ষা করতে পারে না, একসময় সেটিই তার হাতছাড়া হয়ে যায়।

বহুঔষধ-প্রতিরোধী জীবাণুর সংকট কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়। এটি দীর্ঘদিনের ছোট ছোট ভুলের সমষ্টি। জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন, নির্ধারিত সময়ের আগেই ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া, এক রোগীর প্রেসক্রিপশন অন্যের জন্য ব্যবহার করা—এসব অভ্যাস এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে আমরা এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিপদটি আর অনুভব করি না। অথচ প্রতিবার এমন ভুল ব্যবহারের মধ্য দিয়ে জীবাণুর বিরুদ্ধে নয়, বরং জীবাণুর পক্ষেই আমরা অনিচ্ছাকৃতভাবে কাজ করি।

প্রকৃতির নিয়ম খুব সরল। দুর্বল জীবাণু ধ্বংস হয়, কিন্তু যেগুলো বেঁচে যায়, তারা নিজেদের বদলে নিতে শেখে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিবর্তিত জীবাণুই নতুন প্রজন্ম তৈরি করে, যারা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিরোধী। তখন একই ওষুধ, একই মাত্রা, একই চিকিৎসা—কোনোটিই আর আগের মতো কাজ করে না। চিকিৎসকের ব্যর্থতা নয়, ব্যর্থ হয়ে পড়ে ওষুধের কার্যকারিতা।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন অভিঘাত পড়ে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোতে। সেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। গুরুতর সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারের চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অনেক সময় অপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না। জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনে চিকিৎসককে দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটিই সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু যখন স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এই পরিস্থিতি নিয়মে পরিণত হয়, তখন প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তারের ঝুঁকিও বাড়তে থাকে।

এখানেই সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি স্পষ্ট হয়। আমরা প্রায়ই ভাবি, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ। বাস্তবে তা নয়। একজন মানুষের অসচেতন সিদ্ধান্তের প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো সমাজকে স্পর্শ করে। কারণ প্রতিরোধী জীবাণু কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা হাসপাতালের সীমানা মেনে চলে না। একবার জন্ম নিলে তা মানুষের চলাচল, খাদ্য, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভেতর দিয়ে নীরবে ছড়িয়ে পড়ে।

তাই এই সংকটকে কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ব্যাখ্যা করলে তার গভীরতা ধরা পড়ে না। এটি মূলত আমাদের সামাজিক আচরণ, জনস্বাস্থ্যনীতি এবং নাগরিক দায়িত্ববোধেরও একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা আজ নিজেদেরই বহু বছরের অবহেলার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি।

সংকটটি আরও গভীর হয় যখন হাসপাতালের সীমানা পেরিয়ে আমরা সমাজের বৃহত্তর বাস্তবতার দিকে তাকাই। বহু মানুষ এখনো মনে করেন, অ্যান্টিবায়োটিক এমন একটি ওষুধ, যা যেকোনো জ্বর, কাশি বা গলা ব্যথায় দ্রুত আরোগ্য এনে দেয়। এই ভুল ধারণা বছরের পর বছর ধরে এমনভাবে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ কেনা, পরিচিত কারও প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করা কিংবা কয়েক দিন ভালো লাগলেই ওষুধ বন্ধ করে দেওয়াকে অনেকেই আর অনিয়ম বলে মনে করেন না। অথচ এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলোর মধ্য দিয়েই আমরা এমন এক বিপদের ভিত্তি নির্মাণ করছি, যার পরিণতি ভোগ করবে আগামী প্রজন্ম।

এই দায় অবশ্য কেবল সাধারণ মানুষের নয়। একজন চিকিৎসক যখন সংকটাপন্ন রোগীর সামনে দাঁড়ান, তখন তাঁর প্রথম দায়িত্ব জীবন রক্ষা করা। কিন্তু দেশের বহু হাসপাতালে দ্রুত জীবাণু শনাক্ত করার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। পরীক্ষার ফল পেতে সময় লাগে, আর সংক্রমণ সেই সময়ের জন্য অপেক্ষা করে না। ফলে চিকিৎসককে অনেক ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকির ভিত্তিতে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয়। অধিকাংশ সময় সেটিই রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত। কিন্তু একটি দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যখন এই জরুরি ব্যবস্থা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপও বাড়তে থাকে। সমস্যাটি তাই কোনো ব্যক্তির নয়; এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা।

এদিকে আরেকটি নীরব বিপদ তৈরি হচ্ছে হাসপাতালের বাইরেও। দ্রুত উৎপাদনের লক্ষ্য, রোগ প্রতিরোধের আশঙ্কা কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার কারণে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতে বহু ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এর অবশিষ্টাংশ মাটি, পানি এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেই ফিরে আসে। ফলে মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ—এগুলোকে আলাদা করে দেখার সুযোগ আর নেই। একটির ক্ষতি অন্যটির নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করে। জনস্বাস্থ্যের এই সমন্বিত বাস্তবতা আমাদের নীতিনির্ধারণে আরও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

এ কারণেই বহুঔষধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইকে কেবল চিকিৎসকদের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। ওষুধ প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি কার্যকরভাবে বন্ধ করা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জীবাণু শনাক্তকরণ পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো, হাসপাতাল ভিত্তিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নীতি বাস্তবায়ন এবং কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে ওষুধ ব্যবহারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা—এসব উদ্যোগকে একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয় থেকে গণমাধ্যম পর্যন্ত এমন একটি সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিককে সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণযোগ্য একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে দেখা হবে।

প্রযুক্তির এই সময়ে আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিন সম্পাদনা কিংবা মহাকাশ অভিযানের সাফল্যে মুগ্ধ হই। কিন্তু সভ্যতার এই অগ্রযাত্রার ভিত্তি এখনো মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক হারিয়ে গেলে কেবল একটি ওষুধ হারাবে না; অনিশ্চিত হয়ে পড়বে নিরাপদ অস্ত্রোপচার, ক্যানসারের চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা এবং অসংখ্য জটিল চিকিৎসার ভবিষ্যৎ। তখন প্রযুক্তির উৎকর্ষও মানুষের জীবনরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারবে না।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক সভ্যতা বাইরের আক্রমণে নয়, নিজেদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধও তেমনই এক সংকট—যেখানে প্রতিপক্ষকে শক্তিশালী করছে আমাদেরই অসতর্কতা। তাই এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি শুরু হতে পারে একটি সাধারণ সিদ্ধান্ত থেকে—চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া, নির্ধারিত কোর্স সম্পূর্ণ করা এবং ওষুধকে তাৎক্ষণিক স্বস্তির উপায় নয়, ভবিষ্যতের জীবনরক্ষাকারী সম্পদ হিসেবে দেখা।

একটি কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের মূল্য কোনো ওষুধের পাতায় লেখা দামে নির্ধারিত হয় না। তার প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় তখন, যখন সংকটের মুখে একজন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন, যখন একটি শিশু তার বাবাকে ফিরে পায়, কিংবা একটি পরিবার মৃত্যুর বদলে জীবনের সংবাদ শোনে। সভ্যতার এই অর্জনকে রক্ষা করা তাই শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দায় নয়; এটি আমাদের প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একদিন হয়তো জানতে চাইবে—জীবনরক্ষার এই অমূল্য উত্তরাধিকার আমাদের হাতে ছিল, আমরা কি তাকে রক্ষা করতে পেরেছিলাম?

তবু আশার জায়গাটি এখনো পুরোপুরি নিভে যায়নি। বহুঔষধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার অনিবার্য কোনো নিয়তি নয়; এটি মানুষের তৈরি সংকট, তাই এর সমাধানের পথও মানুষের হাতেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কঠোর অ্যান্টিবায়োটিক নীতি, কার্যকর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, উন্নত পরীক্ষাগার ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতার সমন্বয়ে এই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও সেই পথ বন্ধ নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং সামাজিক অংশগ্রহণকে একই সুতায় গাঁথার।

স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নকে আমরা প্রায়ই নতুন ভবন, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা বিশেষায়িত হাসপাতালের সংখ্যায় মাপি। কিন্তু একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় অন্য জায়গায়—একজন সাধারণ মানুষ অসুস্থ হলে তিনি কি সময়মতো সঠিক রোগ নির্ণয়, কার্যকর ওষুধ এবং নিরাপদ চিকিৎসা পাবেন? যদি সবচেয়ে প্রয়োজনের সময় একটি অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজই না করে, তবে কংক্রিটের বিশাল ভবন কিংবা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি মানুষের কাছে খুব সামান্য সান্ত্বনাই দিতে পারবে।

এই কারণেই অ্যান্টিবায়োটিককে শুধু একটি ওষুধ হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়েছে। এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা, খাদ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং টেকসই উন্নয়নের প্রশ্ন। একটি প্রতিরোধী জীবাণু কোনো ভিসা নেয় না, কোনো সীমান্ত চেনে না, কোনো সামাজিক পরিচয়ও মানে না। আজ একটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে যে সংকটের শুরু, কাল তা অন্য শহরে, অন্য দেশে কিংবা অন্য মহাদেশে পৌঁছে যেতে পারে। সংক্রমণের এই পৃথিবীতে নিরাপত্তাও তাই আর একার নয়; এটি সবার।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও এই বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পাওয়া দরকার। শিশুরা যদি ছোটবেলা থেকেই শেখে যে অ্যান্টিবায়োটিক জ্বরের সাধারণ ওষুধ নয়, বরং বিশেষ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত একটি মূল্যবান চিকিৎসা-সম্পদ, তাহলে ভবিষ্যতের নাগরিকরা আরও দায়িত্বশীল হবে। একইভাবে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট এবং স্থানীয় প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। আইন মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আসে সচেতনতা থেকে।

একটি সমাজের সভ্যতা কেবল তার প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে প্রকাশ পায় না; প্রকাশ পায় সে তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদকে কতটা দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করেছে, তার মধ্যেও। অ্যান্টিবায়োটিক সেই বিরল সম্পদগুলোর একটি, যা আবিষ্কার করতে মানুষের শতাব্দীর গবেষণা লেগেছে, কিন্তু অপব্যবহারে হারাতে সময় লাগতে পারে মাত্র কয়েক দশক। তাই এটি সংরক্ষণ করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক অঙ্গীকার।

হয়তো কোনো একদিন গভীর রাতে আবারও একটি হাসপাতালের করিডোরে উদ্বিগ্ন কিছু মানুষ অপেক্ষা করবেন। একজন চিকিৎসক দরজা খুলে বাইরে এসে ধীর কণ্ঠে বলবেন, “সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে, রোগী এখন আশঙ্কামুক্ত।” সেই বাক্যের ভেতরে শুধু একজন মানুষের জীবন নয়, লুকিয়ে থাকবে বহু বছরের বৈজ্ঞানিক সাধনা, সঠিক নীতি, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং একটি জাতির সচেতনতার সাফল্য।

মানুষের ইতিহাসে কিছু বিজয় অস্ত্র দিয়ে অর্জিত হয়, কিছু অর্জিত হয় প্রজ্ঞা দিয়ে। বহুঔষধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই দ্বিতীয় ধরনের। এখানে জয়ী হবে তারা, যারা সময় থাকতে নিজেদের অভ্যাস বদলাতে পারবে। কারণ একটি কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সম্পদ নয়; এটি আগামী দিনের অসংখ্য মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা আজ আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

দৈনিক ফেনী

সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬


পরবর্তী প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকার ও আমাদের আজকের সিদ্ধান্ত

প্রকাশের তারিখ : ০৩ আগস্ট ২০২৬

featured Image

হাসপাতালের রাতের একটি নিজস্ব ভাষা আছে। দিনের কোলাহল স্তিমিত হয়ে এলে সেই ভাষা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। করিডোরজুড়ে ধীর পায়ের শব্দ, কোথাও চাপা কান্না, কোথাও দীর্ঘ নীরবতা। অপেক্ষমাণ মানুষের মুখে তখন একই প্রশ্ন—আরও কিছু কি করা যায়?

কাচের দরজার ওপারে চিকিৎসকেরা জীবনকে আরেকটু সময় দেওয়ার চেষ্টা করেন। এপাশে স্বজনেরা অপেক্ষা করেন একটি বাক্যের জন্য—“রোগী এখন আশঙ্কামুক্ত।” আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা সাধারণ মানুষের কাছে শেষ পর্যন্ত এই বিশ্বাসেই এসে ঠেকে যে, সংকট যত গভীরই হোক, কার্যকর একটি ওষুধ হয়তো এখনো বাকি আছে।

কিন্তু পৃথিবী ধীরে ধীরে এমন এক সময়ের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে সেই শেষ ভরসাটিই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

সম্প্রতি দেশের কয়েকটি শীর্ষ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে বহুঔষধ-প্রতিরোধী জীবাণুর উদ্বেগজনক উপস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আমাদের এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে, যার অভিঘাত শুধু চিকিৎসাব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। বিষয়টি কেবল হাসপাতালের কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। এটি এমন এক নীরব সংকট, যা বহু বছর ধরে আমাদের চোখের সামনেই তৈরি হয়েছে, অথচ আমরা তার শব্দ শুনতে পাইনি।

মানুষের ইতিহাসে এমন কিছু আবিষ্কার আছে, যেগুলো সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক তার অন্যতম। একসময় নিউমোনিয়া, প্রসব-পরবর্তী সংক্রমণ, সাধারণ ক্ষত কিংবা টাইফয়েডের মতো রোগ অসংখ্য জীবনের সমাপ্তি ঘটাত। অ্যান্টিবায়োটিক সেই বাস্তবতা বদলে দিয়েছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞান নতুন আত্মবিশ্বাস পেয়েছিল। নিরাপদ অস্ত্রোপচার সম্ভব হয়েছিল, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো জটিল চিকিৎসা বাস্তব রূপ পেয়েছিল, অকালজাত নবজাতকের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়েছিল। কোটি কোটি পরিবার ফিরে পেয়েছিল তাদের প্রিয় মানুষকে।

কিন্তু বিজ্ঞানের ইতিহাস আরেকটি সত্যও শেখায়—যে অর্জনকে মানুষ যত্নে রক্ষা করতে পারে না, একসময় সেটিই তার হাতছাড়া হয়ে যায়।

বহুঔষধ-প্রতিরোধী জীবাণুর সংকট কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়। এটি দীর্ঘদিনের ছোট ছোট ভুলের সমষ্টি। জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন, নির্ধারিত সময়ের আগেই ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া, এক রোগীর প্রেসক্রিপশন অন্যের জন্য ব্যবহার করা—এসব অভ্যাস এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে আমরা এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিপদটি আর অনুভব করি না। অথচ প্রতিবার এমন ভুল ব্যবহারের মধ্য দিয়ে জীবাণুর বিরুদ্ধে নয়, বরং জীবাণুর পক্ষেই আমরা অনিচ্ছাকৃতভাবে কাজ করি।

প্রকৃতির নিয়ম খুব সরল। দুর্বল জীবাণু ধ্বংস হয়, কিন্তু যেগুলো বেঁচে যায়, তারা নিজেদের বদলে নিতে শেখে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিবর্তিত জীবাণুই নতুন প্রজন্ম তৈরি করে, যারা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিরোধী। তখন একই ওষুধ, একই মাত্রা, একই চিকিৎসা—কোনোটিই আর আগের মতো কাজ করে না। চিকিৎসকের ব্যর্থতা নয়, ব্যর্থ হয়ে পড়ে ওষুধের কার্যকারিতা।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন অভিঘাত পড়ে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোতে। সেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। গুরুতর সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারের চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অনেক সময় অপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না। জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনে চিকিৎসককে দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটিই সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু যখন স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এই পরিস্থিতি নিয়মে পরিণত হয়, তখন প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তারের ঝুঁকিও বাড়তে থাকে।

এখানেই সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি স্পষ্ট হয়। আমরা প্রায়ই ভাবি, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ। বাস্তবে তা নয়। একজন মানুষের অসচেতন সিদ্ধান্তের প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো সমাজকে স্পর্শ করে। কারণ প্রতিরোধী জীবাণু কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা হাসপাতালের সীমানা মেনে চলে না। একবার জন্ম নিলে তা মানুষের চলাচল, খাদ্য, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভেতর দিয়ে নীরবে ছড়িয়ে পড়ে।

তাই এই সংকটকে কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ব্যাখ্যা করলে তার গভীরতা ধরা পড়ে না। এটি মূলত আমাদের সামাজিক আচরণ, জনস্বাস্থ্যনীতি এবং নাগরিক দায়িত্ববোধেরও একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা আজ নিজেদেরই বহু বছরের অবহেলার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি।

সংকটটি আরও গভীর হয় যখন হাসপাতালের সীমানা পেরিয়ে আমরা সমাজের বৃহত্তর বাস্তবতার দিকে তাকাই। বহু মানুষ এখনো মনে করেন, অ্যান্টিবায়োটিক এমন একটি ওষুধ, যা যেকোনো জ্বর, কাশি বা গলা ব্যথায় দ্রুত আরোগ্য এনে দেয়। এই ভুল ধারণা বছরের পর বছর ধরে এমনভাবে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ কেনা, পরিচিত কারও প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করা কিংবা কয়েক দিন ভালো লাগলেই ওষুধ বন্ধ করে দেওয়াকে অনেকেই আর অনিয়ম বলে মনে করেন না। অথচ এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলোর মধ্য দিয়েই আমরা এমন এক বিপদের ভিত্তি নির্মাণ করছি, যার পরিণতি ভোগ করবে আগামী প্রজন্ম।

এই দায় অবশ্য কেবল সাধারণ মানুষের নয়। একজন চিকিৎসক যখন সংকটাপন্ন রোগীর সামনে দাঁড়ান, তখন তাঁর প্রথম দায়িত্ব জীবন রক্ষা করা। কিন্তু দেশের বহু হাসপাতালে দ্রুত জীবাণু শনাক্ত করার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। পরীক্ষার ফল পেতে সময় লাগে, আর সংক্রমণ সেই সময়ের জন্য অপেক্ষা করে না। ফলে চিকিৎসককে অনেক ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকির ভিত্তিতে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয়। অধিকাংশ সময় সেটিই রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত। কিন্তু একটি দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যখন এই জরুরি ব্যবস্থা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপও বাড়তে থাকে। সমস্যাটি তাই কোনো ব্যক্তির নয়; এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা।

এদিকে আরেকটি নীরব বিপদ তৈরি হচ্ছে হাসপাতালের বাইরেও। দ্রুত উৎপাদনের লক্ষ্য, রোগ প্রতিরোধের আশঙ্কা কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার কারণে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতে বহু ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এর অবশিষ্টাংশ মাটি, পানি এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেই ফিরে আসে। ফলে মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ—এগুলোকে আলাদা করে দেখার সুযোগ আর নেই। একটির ক্ষতি অন্যটির নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করে। জনস্বাস্থ্যের এই সমন্বিত বাস্তবতা আমাদের নীতিনির্ধারণে আরও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

এ কারণেই বহুঔষধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইকে কেবল চিকিৎসকদের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। ওষুধ প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি কার্যকরভাবে বন্ধ করা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জীবাণু শনাক্তকরণ পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো, হাসপাতাল ভিত্তিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নীতি বাস্তবায়ন এবং কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে ওষুধ ব্যবহারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা—এসব উদ্যোগকে একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয় থেকে গণমাধ্যম পর্যন্ত এমন একটি সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিককে সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণযোগ্য একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে দেখা হবে।

প্রযুক্তির এই সময়ে আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিন সম্পাদনা কিংবা মহাকাশ অভিযানের সাফল্যে মুগ্ধ হই। কিন্তু সভ্যতার এই অগ্রযাত্রার ভিত্তি এখনো মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক হারিয়ে গেলে কেবল একটি ওষুধ হারাবে না; অনিশ্চিত হয়ে পড়বে নিরাপদ অস্ত্রোপচার, ক্যানসারের চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা এবং অসংখ্য জটিল চিকিৎসার ভবিষ্যৎ। তখন প্রযুক্তির উৎকর্ষও মানুষের জীবনরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারবে না।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক সভ্যতা বাইরের আক্রমণে নয়, নিজেদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধও তেমনই এক সংকট—যেখানে প্রতিপক্ষকে শক্তিশালী করছে আমাদেরই অসতর্কতা। তাই এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি শুরু হতে পারে একটি সাধারণ সিদ্ধান্ত থেকে—চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া, নির্ধারিত কোর্স সম্পূর্ণ করা এবং ওষুধকে তাৎক্ষণিক স্বস্তির উপায় নয়, ভবিষ্যতের জীবনরক্ষাকারী সম্পদ হিসেবে দেখা।

একটি কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের মূল্য কোনো ওষুধের পাতায় লেখা দামে নির্ধারিত হয় না। তার প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় তখন, যখন সংকটের মুখে একজন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন, যখন একটি শিশু তার বাবাকে ফিরে পায়, কিংবা একটি পরিবার মৃত্যুর বদলে জীবনের সংবাদ শোনে। সভ্যতার এই অর্জনকে রক্ষা করা তাই শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দায় নয়; এটি আমাদের প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একদিন হয়তো জানতে চাইবে—জীবনরক্ষার এই অমূল্য উত্তরাধিকার আমাদের হাতে ছিল, আমরা কি তাকে রক্ষা করতে পেরেছিলাম?

তবু আশার জায়গাটি এখনো পুরোপুরি নিভে যায়নি। বহুঔষধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার অনিবার্য কোনো নিয়তি নয়; এটি মানুষের তৈরি সংকট, তাই এর সমাধানের পথও মানুষের হাতেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কঠোর অ্যান্টিবায়োটিক নীতি, কার্যকর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, উন্নত পরীক্ষাগার ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতার সমন্বয়ে এই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও সেই পথ বন্ধ নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং সামাজিক অংশগ্রহণকে একই সুতায় গাঁথার।

স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নকে আমরা প্রায়ই নতুন ভবন, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা বিশেষায়িত হাসপাতালের সংখ্যায় মাপি। কিন্তু একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় অন্য জায়গায়—একজন সাধারণ মানুষ অসুস্থ হলে তিনি কি সময়মতো সঠিক রোগ নির্ণয়, কার্যকর ওষুধ এবং নিরাপদ চিকিৎসা পাবেন? যদি সবচেয়ে প্রয়োজনের সময় একটি অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজই না করে, তবে কংক্রিটের বিশাল ভবন কিংবা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি মানুষের কাছে খুব সামান্য সান্ত্বনাই দিতে পারবে।

এই কারণেই অ্যান্টিবায়োটিককে শুধু একটি ওষুধ হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়েছে। এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা, খাদ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং টেকসই উন্নয়নের প্রশ্ন। একটি প্রতিরোধী জীবাণু কোনো ভিসা নেয় না, কোনো সীমান্ত চেনে না, কোনো সামাজিক পরিচয়ও মানে না। আজ একটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে যে সংকটের শুরু, কাল তা অন্য শহরে, অন্য দেশে কিংবা অন্য মহাদেশে পৌঁছে যেতে পারে। সংক্রমণের এই পৃথিবীতে নিরাপত্তাও তাই আর একার নয়; এটি সবার।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও এই বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পাওয়া দরকার। শিশুরা যদি ছোটবেলা থেকেই শেখে যে অ্যান্টিবায়োটিক জ্বরের সাধারণ ওষুধ নয়, বরং বিশেষ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত একটি মূল্যবান চিকিৎসা-সম্পদ, তাহলে ভবিষ্যতের নাগরিকরা আরও দায়িত্বশীল হবে। একইভাবে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট এবং স্থানীয় প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। আইন মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আসে সচেতনতা থেকে।

একটি সমাজের সভ্যতা কেবল তার প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে প্রকাশ পায় না; প্রকাশ পায় সে তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদকে কতটা দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করেছে, তার মধ্যেও। অ্যান্টিবায়োটিক সেই বিরল সম্পদগুলোর একটি, যা আবিষ্কার করতে মানুষের শতাব্দীর গবেষণা লেগেছে, কিন্তু অপব্যবহারে হারাতে সময় লাগতে পারে মাত্র কয়েক দশক। তাই এটি সংরক্ষণ করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক অঙ্গীকার।

হয়তো কোনো একদিন গভীর রাতে আবারও একটি হাসপাতালের করিডোরে উদ্বিগ্ন কিছু মানুষ অপেক্ষা করবেন। একজন চিকিৎসক দরজা খুলে বাইরে এসে ধীর কণ্ঠে বলবেন, “সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে, রোগী এখন আশঙ্কামুক্ত।” সেই বাক্যের ভেতরে শুধু একজন মানুষের জীবন নয়, লুকিয়ে থাকবে বহু বছরের বৈজ্ঞানিক সাধনা, সঠিক নীতি, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং একটি জাতির সচেতনতার সাফল্য।

মানুষের ইতিহাসে কিছু বিজয় অস্ত্র দিয়ে অর্জিত হয়, কিছু অর্জিত হয় প্রজ্ঞা দিয়ে। বহুঔষধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই দ্বিতীয় ধরনের। এখানে জয়ী হবে তারা, যারা সময় থাকতে নিজেদের অভ্যাস বদলাতে পারবে। কারণ একটি কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সম্পদ নয়; এটি আগামী দিনের অসংখ্য মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা আজ আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।


দৈনিক ফেনী

সম্পাদক ও প্রকাশক: আরিফুল আমীন রিজভী কর্তৃক পপুলার অফসেট প্রেস, মিজান রোড, ফেনী-৩৯০০ থেকে মুদ্রিত এবং ৪৩৪, আমিন টাওয়ার (৬ষ্ঠ তলা), ট্রাংক রোড, ফেনী হতে প্রকাশিত।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক ফেনী
পরবর্তী প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকার ও আমাদের আজকের সিদ্ধান্ত
0:00 0:00
1.0x