৫ম শ্রেণীর ছাত্রী জুঁইয়ের বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। টিকটক আর ফেসবুকে তার সাথে পরিচয় হয় ২২ বছরের টিকটকার শাকিল ওরফে সাকিবের সাথে। শাকিল তাকে টিকটকের স্টুডিও দেখাবার লোভ দেখিয়ে ডেকে নিয়ে আসে। এরপর ঘর বন্ধ করে ধর্ষণ করে। পরিবারের চাপে কিংবা পুলিশের ভয়ে হোক অথবা জুঁই প্রেগন্যান্ট হওয়াতে হোক, শাকিল ১২ বছরের শিশু জুঁইকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ছেলে সন্তান জন্ম নেয়ার ২-৩ মাস পরেই শাকিল আর শাকিলের মা বাচ্চাটা রেখে দিয়ে জুঁইকে ঘর হতে বের করে দেয়। জুঁইয়ের পরিবার লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মামলা করলে ৭ মাসের শিশুটাকে মায়ের জিম্মায় দেয়া হয়েছে। তবে মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো আসেনি।
এই শিশু জুঁইয়ের শৈশব শেষ, কৈশোর শেষ, স্বাস্থ্য শেষ, শিক্ষাজীবন শেষ, মানসিক সুখ-শান্তি শেষ আর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এই দুইজন এখন সমাজের বোঝায় পরিণত হল। এই সবকিছুর মূলে কি? স্মার্টফোন , ইন্টারনেট , টিকটক এর মতো সোশ্যাল মিডিয়া নাকি বাবা-মায়ের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা আর উদাসীনতার কারণে এসব ঘটনা ঘটল৷
অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর বয়সসীমা নির্ধারণের আইন পাস করেছে। একই ধরনের নীতিগত উদ্যোগ নিয়ে এগোচ্ছে যুক্তরাজ্য ও ভিয়েতনাম। এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য শিশুদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা নয়; বরং তাদের মানসিক স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং সুস্থভাবে বিকশিত হওয়া নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের সুস্পষ্ট আইন বা কার্যকর বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে খুব অল্প বয়সেই শিশুরা স্মার্টফোন, ট্যাব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জগতে প্রবেশ করছে। বাস্তবতা হলো, ছয়-সাত বছরের অনেক শিশুই অভিভাবকের মোবাইল নিয়মিত ব্যবহার করে এবং নয়-দশ বছর বয়সেই অনেকের হাতে ব্যক্তিগত স্মার্টফোন তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু সন্তানেরা অনলাইনে কী দেখছে, কার সঙ্গে কথা বলছে কিংবা কোন প্ল্যাটফর্মে কতটা সময় কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে অধিকাংশ পরিবারে নিয়মিত নজরদারির সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন বহু ঘটনার খবর এসেছে, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে শিশু ও কিশোরীরা যৌন নিপীড়ন, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল কিংবা পাচারের শিকার হয়েছে। উপরের আলোচিত ঘটনায়ও দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে এই কিশোরীর জীবন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। মামলাটি এখনো বিচারাধীন; তাই এর চূড়ান্ত দায় নির্ধারণ আদালতের বিষয়। তবে ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে—ডিজিটাল জগতে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা এখনও প্রস্তুত নই।
এ ধরনের ঘটনার জন্য কেবল প্রযুক্তিকে দায়ী করলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। মোবাইল ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজে অপরাধী নয়; এগুলো কেবল একটি মাধ্যম। প্রকৃত সংকট তৈরি হয় যখন প্রযুক্তির ব্যবহার হয় নিয়ন্ত্রণহীন, নজরদারিহীন এবং সচেতনতা ছাড়া। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দুর্বল অভিভাবকত্ব, ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব, অপরাধীদের সক্রিয়তা এবং আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা।
আজকের অনেক পরিবারে বাবা-মা জীবিকার ব্যস্ততায় কিংবা নিজ নিজ ডিজিটাল জগতে নিমগ্ন থাকেন। সন্তানও তখন আশ্রয় খুঁজে পায় মোবাইলের পর্দায়। কিন্তু একটি শিশুর প্রথম নিরাপত্তা বলয় হওয়ার কথা ছিল পরিবার। সেই সম্পর্ক যখন দুর্বল হয়ে যায়, তখন ভার্চুয়াল পৃথিবীর অচেনা মানুষ সহজেই তার বিশ্বাস অর্জন করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, UNICEF এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইম, অনলাইন হয়রানি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মানসিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি এবং আত্মসম্মানবোধের অবনতি—এসব ঝুঁকির সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল ব্যবহারের সম্পর্ক বহু গবেষণায় উঠে এসেছে। একই সঙ্গে অনলাইন গ্রুমিং ও যৌন শোষণের ঘটনাও বিশ্বব্যাপী বাড়ছে।
তাহলে বাংলাদেশের করণীয় কী?
প্রথমত, ১৬ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বয়স যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অনলাইন আচরণবিধি বাধ্যতামূলক শিক্ষার অংশ হওয়া দরকার। শিশুরা শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার শিখবে না; প্রযুক্তির ঝুঁকিও শিখবে।
তৃতীয়ত, অভিভাবকদের জন্য ডিজিটাল প্যারেন্টিং প্রশিক্ষণ জরুরি। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, স্ক্রিন-টাইম নির্ধারণ, প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার এবং নিয়মিত কথোপকথন—এসবই এখন ভালো অভিভাবকত্বের অপরিহার্য অংশ।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোকেও বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী শিশু-নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
শিশুর ভবিষ্যৎ রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
প্রশ্নটি তাই একেবারেই সরল—অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য কিংবা ভিয়েতনাম যদি শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কেন পারবে না?
আমাদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি শিশুদের হাতে শুধু একটি স্মার্টফোন তুলে দেব, নাকি তাদের হাতে তুলে দেব একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ? কারণ একটি হারিয়ে যাওয়া শৈশব কোনো আদালতের রায়ে আর ফিরে আসে না।