সরবরাহ ঘাটতির দাবি কর্মকর্তাদেরজ্বালানি সংকট ও চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কম থাকায় বর্তমানে ফেনীতে ইচ্ছেমতো বা অনিয়ন্ত্রিত লোডশেডিং হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই ফেনী শহর থেকে গ্রামে বিভিন্ন সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে। গ্রাহকরা বলছেন, দিনে-রাতে বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এক ঘণ্টা মিললে আবার দীর্ঘসময় অন্ধকারে কাটাতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকার প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সামগ্রিক ক্ষেত্রে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, চাহিদার তুলনায় ফেনীতে বিদ্যুৎ মিলছে প্রায় অর্ধেক। তাই লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
অনিয়ন্ত্রিত লোডশেডিংয়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম মো. বায়েজীদ হোসেন শাহ দৈনিক ফেনীকে জানান, দিন-রাতে ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুতের ঘাটতি থাকলে সেক্ষেত্রে শিডিউল ধরে রাখা যায় না। সেক্ষেত্রে এলাকাভিত্তিক রুটিন করে লোডশেডিং হচ্ছে। তিনি আরও জানান, গত শুক্রবার রাতে ফেনীতে চাহিদা ৯৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে মিলেছে ৭৯ মেগাওয়াট। শনিবার দিনে ১০৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ মিলেছে ১০২ মেগাওয়াট। শনিবার রাত ১২টায় চাহিদা ১০০ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ৮৬ মেগাওয়াট। সর্বশেষ গতকাল রোববার (২ আগস্ট) দিনে ৮৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলেছে ৭৪ মেগাওয়াট।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সোনাগাজী জোনাল অফিসের ডিজিএম মোস্তফা কামাল বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্ব আমাদের। তবে চাহিদা অনুযায়ী জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ না পেলে গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। বর্তমানে সোনাগাজী উপজেলায় প্রতিদিন ‘পিক আওয়ার’-এ বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৭ মেগাওয়াট। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে আমরা মাত্র ৮ থেকে ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছি।
একই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ কান্তি মজুমদার জানান, জাতীয় গ্রিডে সমস্যার কারণে ফেনীতেও লোডশেডিং হচ্ছে। গতকাল রোববার দিনের বেলায় ফেনীতে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৪৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ২৫ মেগাওয়াট। অনিয়ন্ত্রিত লোডশেডিংয়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দিনে ও রাতে বিদ্যুতের ঘাটতি থাকলে লোডশেডিংয়ের শিডিউল মেইনটেইন করা সম্ভব হয় না।
বিপিডিবি সূত্র জানায়, ফেনী শহর এলাকায় শীত মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা গড়ে প্রায় ২৭ মেগাওয়াট থাকলেও গ্রীষ্ম ও গরমের সময়ে তা বেড়ে প্রায় ৪৫ মেগাওয়াটে পৌঁছে। গতকাল রোববার (২ আগস্ট) বিপিডিবির আওতায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ৪৫ মেগাওয়াট। তবে বিদ্যুৎ মিলেছে মাত্র ২৫ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদার প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকায় বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, বিদ্যুতের অনিয়ন্ত্রিত লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে জনজীবন। গ্রাহকরা বলছেন, লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারছে না, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ফ্রিজে রাখা খাবার। অনেক এলাকায় পানির জন্য মোটরও চালানো যাচ্ছে না।
ফেনী সরকারি জিয়া মহিলা কলেজের অনার্স ১ম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা কমিটির আহ্বায়ক মো. ইমাম উদ্দিন বলেন, পরীক্ষা চলাকালীন লোডশেডিং না দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এরপরও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে পরীক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
একইভাবে এইচএসসি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীরাও দুর্ভোগে পড়েছেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা চলমান থাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বিপাকে পড়েছেন পরীক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা।
অনার্স ১ম বর্ষের পরীক্ষার্থী আলাউদ্দিন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে অন্ধকারে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। গরমে ও ঘামে উত্তরপত্র ভিজে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফেনী জেলায় বর্তমানে বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ১৭৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আওতায় প্রায় ৯৫ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৮৫ ভাগ গ্রাহক প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন।
অন্যদিকে, ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ২৭ হাজার। এ সংস্থার আওতায় শীতকালে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৬৬ মেগাওয়াট এবং গ্রীষ্মকালে প্রায় ১২৬ মেগাওয়াট।
গ্রাহকদের দাবি, চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে সরবরাহ সামান্য কমে গেলেই লোডশেডিং শুরু হয়, এটি মেনে নেওয়া যায় না।