সকাল থেকে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করে সন্ধ্যার আগে হাতে পেয়েছেন ৭০০ টাকা। সেই টাকা নিয়ে শহরের বড় বাজারে এসেছিলেন দিনমজুর আবদুল করিম। হিসাব ছিল সপ্তাহের বাজার করবেন। কিন্তু এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরে নিত্যপণ্যের দাম শুনে বারবার থমকে দাঁড়াতে হয়েছে তাকে। শেষ পর্যন্ত টমেটো, বরবটি কিংবা বেগুন না কিনে শুধু আলু, পেঁয়াজ, সামান্য শসা, কিছু ডাল আর আধা লিটার তেল নিয়ে বাড়ির পথ ধরেন। বাজার থেকে বের হওয়ার সময় তার কণ্ঠে ছিল দীর্ঘশ্বাস।
তিনি বলেন, সাতশ টাকা আয় করি। আগে এই টাকায় সপ্তাহের বাজারের অনেকটাই হয়ে যেত। এখন দুই-তিনটা সবজি কিনলেই টাকা শেষ। ছেলেমেয়েদের চাহিদা মেটাতে পারি না।
শুধু আবদুল করিম নন, গতকাল শনিবার (১ আগস্ট) ফেনীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বিশেষ করে সবজি, কাঁচামরিচ, ডাল, ভোজ্যতেল, ডিম ও মুরগির দাম বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সংসার চালানোকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, অনেক ক্রেতাই প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণে পণ্য কিনছেন। কেউ আধা কেজি ডাল, কেউ দুই-তিনশ গ্রাম সবজি, আবার কেউ একটি পণ্যের বদলে তুলনামূলক কম দামের অন্য পণ্য বেছে নিচ্ছেন। ব্যবসায়ীরাও বলছেন, আগের তুলনায় অনেক ক্রেতা শুধু দাম জেনে ফিরে যাচ্ছেন।
বাজারে কেনাকাটা করতে আসা গৃহিণী রুবিনা আক্তার বলেন, একসময় পাঁচশ টাকায় কয়েক দিনের বাজার হয়ে যেত। এখন এক হাজার টাকা নিয়েও প্রয়োজনীয় সবকিছু কেনা যায় না। তাই কোনটা কিনব আর কোনটা বাদ দেব, সেই হিসাব করতে হচ্ছে।
রিকশাচালক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন আয় এক রকম থাকে না। কিন্তু বাজারে গেলে মনে হয় সবকিছুর দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। সংসার চালাতে এখন ধারদেনা করতে হচ্ছে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য এসব দামে কিনে সংসার চালানো কষ্টকর।
স্কুল শিক্ষক মশিউর রহমান বলেন, বাজারে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেই হবে না। নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে নিয়মিত নজরদারি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অযৌক্তিক মুনাফা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শ্রমজীবী ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলো। জেলা প্রশাসনকে এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি করার আহ্বান জানান তিনি।
এ ব্যাপারে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ফেনীর সহকারী পরিচালক আছাদুল ইসলাম বলেন, ভোক্তারা দাম নিয়ে অস্বস্তিতে আছেন—এমন নানা ধরনের অভিযোগ প্রতিনিয়ত পাচ্ছি। বিশেষ করে সবজির দাম বাড়তি থাকায় ভোক্তাদের কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে আমরা নিয়মিত বাজার তদারকি করছি, স্থানীয়ভাবে কেউ কারসাজি করে দাম বৃদ্ধি করছে কি না—এসব বিষয়ে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। সবজির দাম সারাদেশেই বাড়তি। স্থানীয়ভাবে কেউ যেন কারসাজি করতে না পারে, সেজন্য আমরা নজরদারি করছি।
সবজির বাজারে অস্বস্তি মাছ-মুরগি, সবজির দামেও অস্বস্তি: যোগানের ঘাটতি বলছেন বিক্রেতারা
গতকাল ফেনী শহরের বড় বাজার, নাজির রোড, পৌর হকার্স মার্কেট বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা, বরবটি ১০০ থেকে ১১০ টাকা, বেগুন ১০০ টাকা, গাজর ১০০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা, পটল ৬০ টাকা, ঝিঙা ৬০ টাকা, শসা ৪০ টাকা, ঢেঁড়স ৬০ টাকা, কাঁকরোল ৭০ টাকা ও চিচিঙ্গা ৫০ টাকায়। সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কাঁচামরিচ, যার কেজি ৩২০ টাকা।
মুদি পণ্যের বাজারেও স্বস্তি নেই। প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৫৫ টাকা, আলু ৩০, আদা ১৫০, রসুন ১৪০, মোটা চাল ৬০, মিনিকেট চাল ৮৫, মসুর ডাল ১৬০, মোটা মসুর ডাল ৯০, চিনি ১১০, আটা ৪৫ ও প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও আটাশ চাল ৬০ টাকা ও মিনিকেট চাল কেজি প্রতি ৮ টাকা বেড়ে ৮৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক ডজন ডিম কিনতে গুনতে হচ্ছে ১৪৫ টাকা। অন্যদিকে ব্রয়লার মুরগি ১৮০ টাকা, কক মুরগি ৩৩০ টাকা, লাল মুরগি ৩৮০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৫৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
গত সপ্তাহের তুলনায় অধিকাংশ মাছের দামও কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেড়েছে। গরিবের মাছ হিসেবে পরিচিত পাঙাশের কেজি এখন ২০০ টাকা ছাড়িয়ে ২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২৬০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া মানভেদে চিংড়ি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, রুই ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, টেংরা ৭০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা ও পোঁয়া ২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, পাইকারি বাজার থেকেই বেশির ভাগ পণ্য বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। পরিবহন ব্যয়, সরবরাহের ঘাটতি ও মৌসুমি প্রভাবের কারণেও কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। তবে ক্রেতারা বলছেন, বাজারে কার্যকর নজরদারি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে একই পণ্য ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টি, উৎপাদন এলাকায় সরবরাহ কমে যাওয়া এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক সবজির দাম বেড়েছে।
তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু সরবরাহ সংকট নয়, উৎপাদক থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর পথে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী, পরিবহন ব্যয় এবং দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনাও মূল্যবৃদ্ধির বড় কারণ।
সোহাগ মল্লিক নামে এক সবজি বিক্রেতা জানান, চট্টগ্রাম ও পাহাড়ি এলাকায় সাম্প্রতিক বন্যার কারণে সবজির দাম গত দুই সপ্তাহ ধরে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু সবজি ওঠানামা করলেও, আবার কিছু একই দামেই বিক্রি হচ্ছে।
তিনি বলেন, আড়ত থেকে সবজি বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু পচা ও বাতিল থাকে। সেগুলো বাদ দিয়ে দিতে হয়। এর মধ্যে লেবার খরচ, গাড়ি ভাড়া সবমিলিয়ে হিসাব করে বিক্রি করতে হয়। যার ফলে প্রতিটি সবজিই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
সবজি বিক্রেতা মো. সবুজ জানান, ক্রমাগত বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যাপ্ত সবজি বাজারে আসছে না। সরবরাহ কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে দাম বেড়েছে, সেই প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়েছে।
নাজির রোডের ব্যবসায়ী মোর্শেদ বলেন, গত কিছুদিন যাবৎ মুদি পণ্যে কিছু কিছু দাম বাড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যে সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ ও আদা-রসুনের দাম কিছুটা বেড়েছে। গত এক-দুই সপ্তাহ দাম ওঠানামা করেছে। এর মধ্যে সাবান, হুইল পাউডার এসব জাতীয় পণ্যগুলোর দাম দ্রুত বাড়ছে। পাশাপাশি গত কয়েকদিন চালের দামও আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে।
ফেনী পৌর তরকারি আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাফর আহমেদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অতিবৃষ্টি, বন্যার কারণে সব সবজির দাম বেশি। যেসব জায়গা থেকে সবজি আসে সেখানে বৃষ্টির কারণে যোগান কম। ফলে সরবরাহ আগের তুলনায় কমে গেছে। আগে যেখানে ২০ গাড়ি সবজি আসত ফেনীতে, এখন আসছে ৫ গাড়ি। চাহিদার তুলনায় পণ্য কম থাকায় বাজারে দাম কিছুটা বাড়তি।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বৃষ্টি কমায় কিছু কিছু সবজির দাম কমতে শুরু করেছে। এর মধ্যে শসা, পটলের সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে। আগামী ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে দাম সহনীয় পর্যায়ে আসতে পারে।