ফেনী সরকারি কলেজে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত অবস্থায় থাকা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় শরীরচর্চা প্রশিক্ষক আলী হোসেনকে চাকরিচ্যুত করা হলেও তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহের পদ্ধতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত কমিটি দাবি করছে-সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইলফোন থেকে উদ্ধার করা ছবি ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তার সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হয়েছে। তবে অভিযুক্ত আলী হোসেন সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে অধ্যক্ষ নিজেই বলেছেন, সিসিটিভি ফুটেজে পতাকা নামানোর দৃশ্য দেখা যায়নি, কারণ পতাকার স্থানটি ক্যামেরার আওতার বাইরে ছিল।
এ নিয়ে দৈনিক ফেনীর অনুসন্ধানে কলেজের একাধিক শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যে তদন্তের বিভিন্ন ধাপে অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত মিলেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের এক শিক্ষক জানান, জাতীয় পতাকার উত্তোলনের স্থানটি সাধারণত তালাবদ্ধ থাকে এবং ব্যবহৃত পতাকাটিও অনেকটা বিবর্ণ ছিল। ৬ জুলাই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার আগেও পতাকাটি একইভাবে অর্ধনমিত অবস্থায় ছিল। এ কাণ্ডে মূল ঘটনার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে কলেজ শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, হিংসাত্মক মনোভাব ও শিক্ষক পরিষদকেন্দ্রিক বিরোধ।
এর আগে, গত ৬ জুলাই কলেজে এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে ফেনী সরকারি কলেজের প্রশাসনিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত অবস্থায় থাকা একটি ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
ঘটনার দুই দিন পর ৮ জুলাই বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কলেজের অফিস সহকারী আলমগীর ফোন করে শরীরচর্চা প্রশিক্ষক আলী হোসেনকে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে যেতে বলেন। আলী হোসেন সেখানে গেলে প্রথমে তাকে বাইরে অপেক্ষা করানো হয়। পরে শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক ফরিদ আলম ভূঁঞা, ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান এবং আইসিটি প্রভাষক আবু মোতালেবের উপস্থিতিতে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি নিয়ে নেওয়া হয়।
কলেজের শরীরচর্চা প্রশিক্ষক আলী হোসেন জানান, তাকে পাশের হিসাবরক্ষকের কক্ষে বসিয়ে রাখা হয়। এ সময় অপর কক্ষে তার মোবাইল ফোনে একটি ‘রিকভারি অ্যাপ’ ইনস্টল করে একটি ছবি বের করা হয়। পরে তাকে ডেকে ছবিটি কোথা থেকে এসেছে এবং কখন তোলা হয়েছে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
এরই মধ্যে ৮ জুলাই কলেজ প্রশাসন উল্লেখিত তিন শিক্ষককে দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। গত ১৪ জুলাই তদন্ত কমিটি আলী হোসেনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে অধ্যক্ষের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
এর দুই দিন পর ১৬ জুলাই কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ এনামুল হক খোন্দকার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে আলী হোসেনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অধ্যক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া কলেজ ক্যাম্পাসে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ৬ জুলাই এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে প্রশাসনিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় উত্তোলিত জাতীয় পতাকা পরিকল্পিতভাবে নামিয়ে অবমাননাকর অবস্থায় ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তদন্তে তার সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে। এ আদেশ ১৯ জুলাই থেকে কার্যকর হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সদস্য ও আইসিটি প্রভাষক আবু মোতালেব বলেন, তদন্ত শেষে প্রতিবেদন অধ্যক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৬ জুলাই বেলা ১১টা ৫২ মিনিটে আলী হোসেন জাতীয় পতাকার স্ট্যান্ডে প্রবেশ করেন। এরপর তিনি পতাকা নামিয়ে ১১টা ৫৪ মিনিটে ছবি তুলে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে পাঠান। এসব ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট কথোপকথনের তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে।
তিনি বলেন, ওই দিন এইচএসসি পরীক্ষা চলায় কলেজে মোবাইলফোন ব্যবহার সীমিত ছিল। ১৪৪ ধারা জারি থাকায় অপারেটর ও পর্যবেক্ষক ছাড়া অন্য কারও মোবাইলফোন ব্যবহারের অনুমতি ছিল না। তাই তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই আলী হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক ফরিদ আলম ভূঁঞা বলেন, ঘটনার দিন এইচএসসির ইংরেজি পরীক্ষা চলছিল। ওই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাতীয় পতাকা নিচে নেমে থাকা একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
তিনি বলেন, তদন্তের জন্য সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয় এবং পতাকা উত্তোলনের দায়িত্বে থাকা অফিস সহায়ককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অফিস সহায়ক জানান, তিনি নিয়ম অনুযায়ী সকালে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। পরে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শরীরচর্চা প্রশিক্ষক আলী হোসেন প্রশাসনিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে পতাকার স্ট্যান্ডের কাছে অবস্থান করছেন এবং সেখান থেকে ছবি তোলেন। তার অবস্থান জাতীয় পতাকার দিকেই ছিল।
ফরিদ আলম ভূঁঞা বলেন, পরদিন আলী হোসেনকে ডেকে তার মোবাইল ফোন পরীক্ষা করা হয়। প্রথমে কিছু না পাওয়া গেলেও পরে একটি রিকভারি অ্যাপের মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবিটি উদ্ধার করা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সে প্রথমে দাবি করে ছবিটি তাকে অন্য একজন পাঠিয়েছেন। তবে কে পাঠিয়েছেন, সেই বিষয়ে কোনো তথ্য বা প্রমাণ দিতে পারেননি।
ফরিদ আলম ভূঁঞা আরও বলেন, একপর্যায়ে আলী হোসেন কান্নাকাটি করে নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং ক্ষমা চান। কারও প্ররোচনায় এ কাজ করেছেন কি না জানতে চাওয়া হলেও সে কোনো তথ্য দেননি। পরে ১২ জুলাই সে তদন্ত কমিটির কাছে একটি লিখিত বক্তব্যও জমা দেন। তিনি বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্তের কর্মকাণ্ডে কলেজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
ছবিটি আলী হোসেন নিজেই তুলেছেন-এ বিষয়ে কী প্রমাণ রয়েছে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির আহবায়ক ফরিদ আলম ভূঁঞা বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে তাকে পতাকার স্ট্যান্ডের কাছে গিয়ে ছবি তুলতে দেখা গেছে। যদি ছবিটি অন্য কেউ পাঠিয়ে থাকে, তাহলে সেটিরও উপযুক্ত তথ্য বা নথি তার কাছে থাকার কথা ছিল। কিন্তু তিনি তা দেখাতে পারেননি। বরং তদন্ত কমিটির সামনে নিজের ভুল স্বীকার করেছেন। এসব তথ্য-প্রমাণই ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যথেষ্ট বলে মনে করেছে তদন্ত কমিটি।
তবে একই বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ এনামুল হক খোন্দকার ভিন্ন বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে আলী হোসেন পতাকা নামাচ্ছেন-এমন দৃশ্য দেখা যায়নি। কারণ পতাকার স্থানটি ক্যামেরার আওতার বাইরে ছিল। তবে তাকে পতাকার ছবি তুলতে দেখা গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তদন্ত কমিটির আরেক সদস্য হাবিবুর রহমান জানান, রিকভারি অ্যাপের মাধ্যমে অভিযুক্তের মোবাইল ফোন থেকে ছবিটি উদ্ধার করা হয়। পরে সে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান এবং তাকে মাফ করে দেওয়ার অনুরোধ করেন। এসব ঘটনার রেকর্ডও সংরক্ষিত রয়েছে।
অন্যদিকে তদন্ত কমিটির দাবি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত শরীরচর্চা প্রশিক্ষক আলী হোসেন। তার দাবি, ঘটনাটির সঙ্গে তিনি কোনোভাবেই জড়িত নন। বরং তাকে দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে।
আলী হোসেন জানান, কলেজ কর্তৃপক্ষ যে সময়ের কথা উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, সেই সময় তিনি কলেজ ছাত্রদলের প্রস্তাবিত ফুটবল টুর্নামেন্ট সংক্রান্ত একটি চাহিদাপত্র অধ্যক্ষের কাছে দিতে প্রশাসনিক ভবনে গিয়েছিলেন। তবে অধ্যক্ষ বাইরে থাকায় অফিস সহায়ক তাকে পরে আসতে বলেন।
তিনি বলেন, ৮ জুলাই হঠাৎ ফোন পেয়ে কলেজে যাই। সেখানে আমাকে প্রায় এক ঘণ্টা একটি কক্ষে বসিয়ে রাখা হয়। পরে আমার ব্যবহৃত মোবাইলফোন নিয়ে যাওয়া হয়। তখনও আমার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, সেটিও জানানো হয়নি। তার দাবি, তার মোবাইলফোনে আগে কখনো জাতীয় পতাকার ওই ছবিটি ছিল না। পরে শিক্ষকরা তাকে একটি ছবি দেখিয়ে সেটি সম্পর্কে জানতে চান। তিনি তখনই বলেন, ছবিটির সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
আলী হোসেন জানান, অধ্যক্ষের কার্যালয়ে তাকে দীর্ঘ সময় ধরে জেরা করা হয়। একপর্যায়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান তাকে বলেন, কোনো একজন স্যারের নাম বলে দাও, আমরা তোমার বিষয়টি দেখব। তিনি আরও বলেন, পরে ফরিদ স্যারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। তিনি আমাকে সান্ত্বনা দেন। এখন সেই ঘটনাকেই তারা ‘ক্ষমা চাওয়া’ ও ‘ভুল স্বীকার’ হিসেবে প্রচার করছেন। আমি কোনো সময় ঘটনার দায় স্বীকার করিনি। আলী হোসেন বলেন, গত ১২ জুলাই উপস্থিতি শিটে স্বাক্ষর করতে গেলে আমাকে আবারও ডাকা হয়। পরে সমাজকর্ম বিভাগের একটি কক্ষে তদন্ত কমিটির আহবায়ক ফরিদ আলম ভূঁঞা, সদস্য হাবিবুর রহমান ও আবু মোতালেব স্যার প্রায় দেড় ঘণ্টা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ওই সময় বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে আমাকে স্বীকারোক্তি দিতে চাপ দেওয়া হয়। সেখানে একপর্যায়ে হাবিব স্যার উনার হাতে থাকা মোবাইল ফোন দিয়ে লুকিয়ে ভিডিও ধারণেরও চেষ্টা করেন। আমি কিছু স্বীকার না করায় তিনি ফরিদ স্যারকে বলেন, ‘যা লেখার আছে, আপনারা লিখে দেন।’ পরে আমাকে একটি সাদা কাগজে পুরো ঘটনা লিখে দিতে বলা হয়। তবে তদন্ত কমিটির সদস্য কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান প্রসঙ্গে প্রদত্ত বক্তব্যের কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি আলী হোসেন।
তিনি আরও বলেন, এ অভিযোগ উঠার পরেও পুরো সময়জুড়ে আমি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছি। ১৯ জুলাই দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রধান সহকারীর কক্ষ থেকে আমাকে ডাকা হয়। পরে অফিস সহকারীর মাধ্যমে ১৬ জুলাই স্বাক্ষরিত চাকরিচ্যুতির চিঠি হাতে দেওয়া হয়। এরপর কলেজের দায়িত্বে থাকা চাবি ও অন্যান্য মালামাল নিয়ম অনুযায়ী বুঝিয়ে দিয়েছি।
কলেজের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষক পরিষদকে কেন্দ্র করে কলেজের অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব তীব্র হয়েছে। নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ, অবিশ্বাস ও গ্রুপিংয়ের কারণে কর্মপরিবেশেও এর প্রভাব পড়ছে। তাদের মতে, পতাকা সংক্রান্ত ঘটনাটিও সেই অস্থিরতার বাইরে নয়।
যা বলছেন অধ্যক্ষ
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ এনামুল হক খোন্দকার বলেন, উদ্দেশ্যমূলকভাবে জাতীয় পতাকা নামিয়ে কলেজ প্রশাসন ও অধ্যক্ষকে ফাঁসানোর জন্যই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি এমন কাজ করতে পারে না।
তিনি বলেন, এ ঘটনার পেছনে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। তদন্ত প্রতিবেদনে একজন শিক্ষকের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে সেই শিক্ষকের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি অধ্যক্ষ।
তবে সিসিটিভি ফুটেজ প্রসঙ্গে অধ্যক্ষের বক্তব্য তদন্ত কমিটির বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তিনি বলেন, পতাকা নামানোর দৃশ্য সিসিটিভিতে দেখা যায়নি, কারণ পতাকার অবস্থান ক্যামেরার আওতার বাইরে ছিল। তবে আলী হোসেনকে ওই স্থানের দিকে গিয়ে ছবি তুলতে দেখা গেছে।
আলী হোসেনের বিরুদ্ধে লিখিত স্বীকারোক্তি রয়েছে কি না জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, লিখিত কোনো স্বীকারোক্তি নেই। তিনি তদন্ত কমিটির সামনে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
চাকরিচ্যুতির বিষয়ে তিনি বলেন, সে (আলী হোসেন) অস্থায়ী কর্মচারী, একপ্রকার দৈনিক মজুরিভিত্তিক। তার চাকরি স্থায়ী না হওয়ার কারণে আমি চাকরিচ্যুত করেছি। আগে সে এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল। আমি এসে ২০২৫ সালে তাকে নিয়োগ দিয়েছি। দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী হলে যখন মন চাইবে তখনি তাকে চাকরিচ্যুত করা যাবে।
জাতীয় পতাকা অবমাননার মতো গুরুতর অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যক্ষ বলেন, মামলা করার সুযোগ এখনো রয়েছে। প্রয়োজন হলে পরে মামলা করা হবে। আমরা বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চাই না।
ক্যাম্পাসে আলী হোসেনকে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রবেশ নিষিদ্ধ বলতে আমার অনুমতি নিয়ে ঢুকতে পারবে। আমি কাউকে ক্ষতিকর মনে করলে নিষিদ্ধ করতে পারি।
তদন্তে শিক্ষকের ফোন নম্বর নিয়েও বিতর্ক
তদন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্যের অংশ হিসেবে উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আহমেদ আলী বিভোরের সঙ্গে আলী হোসেনের ফোনালাপের তথ্য ও বিভিন্ন সময়ে তার কলেজে চলাচলের সিসিটিভি ফুটেজ প্রতিবেদককে সরবরাহ করেন তদন্ত কমিটি।
তবে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আহমেদ আলী বিভোর। তিনি বলেন, আমার সঙ্গে অভিযুক্তের যোগাযোগ নিয়ে তদন্ত কমিটি বা কলেজ প্রশাসন কখনো আমার বক্তব্য নেয়নি। আমাকে কিছুই জানানোও হয়নি। অথচ আমার মোবাইল নম্বর ও কল সংক্রান্ত তথ্য কীভাবে বাইরে দেওয়া হলো, সেটিই বড় প্রশ্ন।
তিনি আরও বলেন, যদি তদন্তের প্রয়োজনেই এমন তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকে, তাহলেও বিধি অনুযায়ী আমাকে অবহিত করার কথা ছিল। বিষয়টি ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও প্রচলিত আইনি বিধানের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ফরিদ আলম ভূঁঞা বলেন, আমরা কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করিনি। তদন্তের অংশ হিসেবে অভিযুক্তের ফোনে ওই সময় যাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, কেবল সেই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া কলেজ অধ্যক্ষের বিষয়।
তদন্ত কমিটির দেওয়া সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেছে
দৈনিক ফেনীর কাছে তদন্ত কমিটির সরবরাহ করা ৫৩ সেকেন্ডের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত ৬ জুলাই সকাল ১১টা ৫১ মিনিট ১১ সেকেন্ডে কলেজের প্রশাসনিক ভবনের দ্বিতীয় তলার পতাকা স্ট্যান্ড সংলগ্ন বারান্দার গেটের সামনে আসেন অভিযুক্ত আলী হোসেন। একই সময়ে বারান্দায় আরও দুই ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে কথা বলতে ও পায়চারি করতে দেখা যায়। সেখানে প্রায় ২৩ সেকেন্ড অবস্থান করার পর সকাল ১১টা ৫১ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে একজনের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায় আলী হোসেনকে।
তদন্ত কমিটির সরবরাহ করা ১ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত ৬ জুলাই সকাল ১১টা ৫৪ মিনিট ১৪ সেকেন্ড থেকে ২৩ সেকেন্ডের মধ্যে প্রশাসনিক ভবন থেকে খুব স্বাভাবিকভাবেই বেরিয়ে আসেন আলী হোসেন। এরপর সকাল ১১টা ৫৫ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে আবারও প্রশাসনিক ভবনের সামনে আসেন তিনি। এ সময় এক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা যায় আলী হোসেনকে।
তদন্ত কমিটির সরবরাহ করা ১ মিনিট ২২ সেকেন্ডের অন্য আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত ৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা ২১ মিনিট ৩২ সেকেন্ডে ফেনী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের কক্ষে জেরা ও মোবাইল তল্লাশি শেষে আলী হোসেনকে বুকে জড়িয়ে ধরে পিঠ চাপড়ে সান্ত্বনা দিতে দেখা যায় তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ফরিদ আলম ভূঁঞাকে। এ সময় আলী হোসেনকে কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিল। প্রায় এক মিনিট অধ্যক্ষের কক্ষে একসঙ্গে অবস্থান করেন আলী হোসেন ও ফরিদ আলম। এ সময় ফরিদ আলমকে আলী হোসেনকে কিছু বোঝাতে দেখা যায়। সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে তারা দুজন অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সহকারীর কক্ষের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান। তবে জেরার আগের ও পরের কোনো সিসিটিভি ফুটেজ প্রতিবেদককে সরবরাহ করেনি তদন্ত কমিটি।
এদিকে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্যের অংশ হিসেবে উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আহমেদ আলী বিভোরের সঙ্গে আলী হোসেনের ফোনালাপের তথ্য এবং বিভিন্ন সময়ে কলেজে তার চলাচলের সিসিটিভি ফুটেজও প্রতিবেদককে সরবরাহ করেছে তদন্ত কমিটি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর এনামুল হক খোন্দকার বলেন, বারান্দায় ওই সময় দুই ব্যক্তির মধ্যে একজন কলেজের কর্মচারী ও অন্যজন এইচএসসি পরীক্ষায় দায়িত্বরত চিকিৎসক ছিলেন। তবে কলেজের কর্মচারী কখনো এমন কাজ করবে না।
উত্তর মেলেনি যেসব প্রশ্নের
পুরো ঘটনার পরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। তদন্ত কমিটির একজন সদস্য দাবি করেছেন, সিসিটিভি ফুটেজে পতাকা নামানোর দৃশ্য রয়েছে। অন্যদিকে কলেজ অধ্যক্ষ বলেছেন, পতাকা নামানোর দৃশ্য ক্যামেরায় দেখা যায়নি। তদন্তে রিকভারি অ্যাপের মাধ্যমে মোবাইল থেকে ছবি উদ্ধারের কথা বলা হলেও সে প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। একইভাবে তদন্ত কমিটি মৌখিক স্বীকারোক্তির কথা বললেও অধ্যক্ষ লিখিত স্বীকারোক্তি না থাকার কথা স্বীকার করেছেন, আর অভিযুক্ত শুরু থেকেই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
এসব পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, তদন্ত প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও কলেজ প্রশাসনের দাবি, তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে অভিযুক্ত আলী হোসেন দাবি করেছেন, তিনি নির্দোষ এবং তার সঙ্গে অবিচার করা হয়েছে।