বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা ফেনী দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন এবং আকস্মিক বন্যার ভয়াবহতার সঙ্গে লড়াই করে আসছে। বিশেষ করে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে হাজার হাজার পরিবার জীবন-জীবিকা হারানোর শঙ্কায় দিন কাটায়। কৃষকের ক্ষেত ডুবে যায়, বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হয়। ফলে ফেনীর মানুষের কাছে বন্যা কোনো সাময়িক দুর্যোগ নয়; এটি এক দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট।
এই বাস্তবতায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সম্প্রতি ১,৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে "ফেনী জেলাধীন মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)" অনুমোদন করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় ফেনী সদর, ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া ও সোনাগাজী উপজেলায় নদীর তীর সংরক্ষণ, বাঁধ পুনর্বাসন, নদী পুনঃখনন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে।
একনেকের এই অনুমোদন নিঃসন্দেহে ফেনীবাসীর বহুদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। তবে প্রকল্প অনুমোদনের পরপরই নতুন একটি জনআলোচনার জন্ম হয়েছে—এত বড় এবং জনজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি কোন সংস্থা বাস্তবায়ন করবে?
এই প্রশ্ন থেকেই ফেনীর সামাজিক সংগঠন "আমরা গর্বিত আমরা ফেনীর সন্তান" শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধনের আয়োজন করে। মানববন্ধনে বক্তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, প্রকল্পটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন করা হোক। তাদের যুক্তি—ফেনীর মানুষ অতীতে বহু উন্নয়ন প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ, বিলম্ব এবং জবাবদিহিতার অভিজ্ঞতা পেয়েছে। তাই জনগণের হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন, যাদের দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা রয়েছে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া বক্তাদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—এটি কোনো রাজনৈতিক দাবি নয়; বরং একটি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবি। তাদের মতে, বন্যা প্রতিরোধের এই প্রকল্প ব্যর্থ হলে শুধু সরকারি অর্থের অপচয় হবে না, বরং আগামী কয়েক দশকের জন্য ফেনীর মানুষের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
আসলে এই দাবির পেছনে রয়েছে ফেনীর সাম্প্রতিক ইতিহাস। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যা জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প প্রস্তাবেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর আকস্মিক পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন এবং পলি জমার কারণে বিদ্যমান বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ, নদী পুনঃখননের মাধ্যমে নিষ্কাশন ও সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং বিপুল পরিমাণ সরকারি-বেসরকারি সম্পদ সুরক্ষার কথা উল্লেখ রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেনীর নদীগুলোর প্রধান সমস্যা কেবল বাঁধ ভেঙে যাওয়া নয়; বরং নদীর নাব্যতা হ্রাস, অনিয়ন্ত্রিত পলি জমা এবং জলপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিপথের পরিবর্তন। ফলে শুধু বাঁধ নির্মাণ করলেই হবে না; নদী ব্যবস্থাপনাকে বিজ্ঞানভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
বিশ্বখ্যাত পরিবেশবিদ Wangari Maathai একবার বলেছিলেন, "The environment and the economy are really both two sides of the same coin." অর্থাৎ, পরিবেশ ও অর্থনীতি পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। ফেনীর ক্ষেত্রেও এই সত্য প্রযোজ্য। কারণ নদী রক্ষা মানেই কৃষি রক্ষা, কৃষি রক্ষা মানেই স্থানীয় অর্থনীতি রক্ষা।
আজ ফেনীর মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু কেবল কাগজে-কলমে নয়। তারা এমন উন্নয়ন চায়, যা আগামী প্রজন্মকে নিরাপত্তা দেবে; এমন বাঁধ চায়, যা প্রথম বর্ষাতেই ভেঙে যাবে না; এমন প্রকল্প চায়, যা উদ্বোধনের জন্য নয়, মানুষের জীবন রক্ষার জন্য নির্মিত হবে।
এই কারণেই মুহুরী-কহুয়া প্রকল্প এখন শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়—এটি ফেনীর মানুষের আস্থা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ফেনীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে একটি বিষয় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে—"প্রকল্পটি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে, যারা সময়, গুণগত মান এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সক্ষম।" বক্তারা সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
এই দাবি কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া একটি জনমত। ফেনীর মানুষ বহু বছর ধরে নদীভাঙন, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ, জরুরি মেরামত এবং পুনঃসংস্কারের চক্র দেখেছে। বর্ষা এলে কোথাও বাঁধে ফাটল, কোথাও ভাঙন, আবার কোথাও পানি উপচে জনপদ প্লাবিত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের প্রত্যাশা—এবারের প্রকল্পটি যেন দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিয়ে আসে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্ব দেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী ব্যবস্থাপনা ও সেচ অবকাঠামো উন্নয়ন। বিভিন্ন সময় এই প্রতিষ্ঠান সফল প্রকল্পও বাস্তবায়ন করেছে। একই সঙ্গে সংসদীয় কমিটি, গণমাধ্যম এবং মহাহিসাব নিরীক্ষকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছু প্রকল্পে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা রক্ষণাবেক্ষণজনিত সীমাবদ্ধতার বিষয়ও উঠে এসেছে। এসব অভিজ্ঞতাই জনমনে আরও কার্যকর বাস্তবায়নের দাবি জোরালো করেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশল ইউনিট দেশের বিভিন্ন অবকাঠামো, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন এবং জরুরি নির্মাণকাজে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এই কারণেই অনেক নাগরিকের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে, সময়মতো কাজ শেষ করা এবং মান নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটিও সত্য যে, কোনো প্রকল্প কোন সংস্থা বাস্তবায়ন করবে, সেটি সরকারের নীতিগত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়; এ বিষয়ে নির্ধারিত আইন, বিধিমালা এবং সক্ষমতা মূল্যায়নের প্রক্রিয়া রয়েছে।
আসলে এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু সেনাবাহিনী নয়; কেন্দ্রবিন্দু হলো সুশাসন। জনগণ জানতে চায়—১,৫৪২ কোটি টাকার প্রকল্পে কীভাবে মান নিয়ন্ত্রণ হবে, কীভাবে কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হবে, কীভাবে জনগণের অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং প্রকল্প শেষ হওয়ার পর বাঁধ কত বছর কার্যকর থাকবে।
বিশ্বব্যাংক বহুবার উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিয়মিত তদারকিকে সফল বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। একইভাবে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)-এর ১৬ নম্বর লক্ষ্যেও কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, প্রকল্পের সাফল্য শুধু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে পরিকল্পনা, তদারকি, স্বাধীন মান যাচাই এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপরও।
ফেনীর মানুষ আজ যে প্রশ্ন তুলছে, সেটি মূলত উন্নয়নের দর্শন নিয়ে। তারা এমন একটি প্রকল্প চায়, যার প্রতিটি স্তরে থাকবে স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং জনসম্পৃক্ততা। প্রকল্পের প্রতিটি টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে, কাজ কতদূর এগিয়েছে এবং নির্ধারিত মান বজায় রাখা হচ্ছে কি না—এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে মানুষের আস্থাও বাড়বে।
সুতরাং, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নের দাবি হোক বা অন্য কোনো বাস্তবায়ন কাঠামো—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফেনীর মানুষ যেন আর প্রতিবছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি না দেখে। কারণ একটি বাঁধের শক্তি শুধু তার কংক্রিটে নয়; তার পরিকল্পনা, নির্মাণমান, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনগণের আস্থার মধ্যেই নিহিত।
ফেনীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনকে শুধু একটি দাবিনামা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি জনপদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, উদ্বেগ এবং নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। বারবার বন্যা, নদীভাঙন এবং বাঁধের দুর্বলতার অভিজ্ঞতা মানুষকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে তারা শুধু প্রকল্প অনুমোদনের খবরে সন্তুষ্ট নয়; বরং প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দেখতে চায়।
প্রকৃতপক্ষে, ফেনীর মুহুরী-কহুয়া অঞ্চলের সংকট কেবল স্থানীয় কোনো সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ফেনী জেলা একদিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি ঢলের প্রভাব বহন করে, অন্যদিকে উপকূলীয় আবহাওয়ার পরিবর্তনেরও শিকার হয়। ফলে অল্প সময়ের ভারী বর্ষণেও নদীগুলো দ্রুত ফুলে-ফেঁপে ওঠে এবং বিপুল জনপদ প্লাবিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলাচ্ছে। স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং নদীর প্রবাহের অস্বাভাবিক পরিবর্তন ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। সে কারণে আজ যে বাঁধ নির্মাণ করা হবে, তা কেবল বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নয়; আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের জলবায়ু বাস্তবতাও মাথায় রেখে নির্মাণ করতে হবে।
বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর অন্যতম দর্শন হলো দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ। মুহুরী-কহুয়া প্রকল্পও সেই বৃহত্তর চিন্তার অংশ হওয়া উচিত। কারণ এটি শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প নয়; এটি কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি, পরিবহন এবং মানবিক নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ফেনীর অর্থনীতির একটি বড় অংশ কৃষিনির্ভর। মুহুরী সেচ প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে জেলার কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ধান, সবজি এবং বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের উৎপাদন এই অঞ্চলের সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যখন নদীভাঙন, পলি জমা এবং বন্যার কারণে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হন। ফলে মুহুরী-কহুয়া প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন সরাসরি কৃষকের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
মানববন্ধনের বক্তারা যে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন, সেটিকে মূলত জনগণের আস্থার প্রশ্ন হিসেবে দেখা যেতে পারে। মানুষ এমন একটি বাস্তবায়ন কাঠামো চায়, যেখানে সময়ক্ষেপণ কম হবে, মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হবে এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের গতি ব্যাহত হবে না। সরকার শেষ পর্যন্ত যে ব্যবস্থাই গ্রহণ করুক না কেন, জনগণের এই আস্থার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প নির্মাণের পর পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। তাই মুহুরী-কহুয়া প্রকল্পের ক্ষেত্রেও শুধু নির্মাণ নয়, নির্মাণ-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং, ড্রেজিং, বাঁধ পরিদর্শন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে সবচেয়ে আধুনিক প্রকল্পও সময়ের সঙ্গে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট একবার বলেছিলেন, “The nation that destroys its soil destroys itself.” কথাটি মূলত ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ প্রসঙ্গে বলা হলেও এর অন্তর্নিহিত বার্তা অত্যন্ত গভীর। একটি জাতি তার নদী, পানি ও পরিবেশ রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে তার উন্নয়নও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। ফেনীর বাস্তবতা আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।
আজ প্রয়োজন রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি। মুহুরী-কহুয়া প্রকল্প কোনো দলের নয়, কোনো সরকারের নয়; এটি ফেনীর লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রকল্প। তাই এখানে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জনস্বার্থ, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং স্বচ্ছতা।
সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা খুবই স্পষ্ট—
প্রথমত, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কাজের অগ্রগতি ও ব্যয়ের তথ্য নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
তৃতীয়ত, স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন ও তদারকির ব্যবস্থা রাখতে হবে।
চতুর্থত, স্থানীয় জনগণ, কৃষক, নদী বিশেষজ্ঞ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতামত বিবেচনায় নিতে হবে।
পঞ্চমত, প্রকল্পকে শুধুমাত্র বাঁধ নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
ফেনীর মানুষ বহু বছর ধরে প্রতিশ্রুতি শুনেছে। তারা অসংখ্যবার আশাবাদী হয়েছে, আবার হতাশও হয়েছে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ একনেকে অনুমোদিত ১,৫৪২ কোটি টাকার এই প্রকল্প শুধু একটি উন্নয়ন উদ্যোগ নয়; এটি একটি জেলার নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনমানের সঙ্গে জড়িত।
শহীদ মিনারের মানববন্ধনে উচ্চারিত কণ্ঠগুলো মূলত একটি কথাই বলতে চেয়েছে—“আমরা উন্নয়ন চাই, তবে টেকসই উন্নয়ন; আমরা প্রকল্প চাই, তবে কার্যকর প্রকল্প; আমরা বাঁধ চাই, তবে এমন বাঁধ যা আগামী প্রজন্মকে নিরাপত্তা দেবে।”
মুহুরী ও কহুয়া নদীর তীরবর্তী জনপদের মানুষ এখন আর নতুন প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় নেই। তারা দেখতে চায় বাস্তব পরিবর্তন। তারা দেখতে চায় এমন একটি প্রকল্প, যা বর্ষার প্রথম স্রোতেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে না; বরং দুর্যোগের সময় লাখো মানুষের আশ্রয় ও আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়াবে।
ফেনীর ইতিহাস সাক্ষী হয়ে থাকবে—এই প্রকল্প সফল হলে এটি হবে একটি জনপদের পুনর্জাগরণের গল্প। আর ব্যর্থ হলে এটি কেবল আরেকটি ব্যয়বহুল উন্নয়ন প্রকল্পের নাম হয়ে থাকবে। সিদ্ধান্ত আজ নীতিনির্ধারকদের হাতে, কিন্তু এর সুফল কিংবা কুফল বহন করবে ফেনীর সাধারণ মানুষ।
মো: আবদুস সালাম ফরায়জী
লেখক ও সংগঠক এবং
উপদেষ্টা- আমরা গর্বিত আমরা ফেনীর সন্তান।