সোনাগাজীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের (ইজিপিপি) আওতায় ৫ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার ৯৪৫ টাকা ব্যয়ে ডাঙ্গি খাল খননের দৈর্ঘ্য এবং কার্যক্রম নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। খাল খনন শুরুর আগে গঠন করা হয়নি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি। প্রকল্পের আওতায় খালের দৈর্ঘ্য এবং কিলোমিটার প্রতি ব্যয় নিয়ে তৈরি হয়েছে অবিশ্বাস, বিস্ময় এবং অস্বচ্ছতা।
গত ৮ এপ্রিল প্রকাশিত বরাদ্দপত্রে এই খালের দৈর্ঘ্য দেখানো হয়েছে ২২ কিলোমিটার। গত ৪ জুন সংশোধিত বরাদ্দপত্রে খালের নাম পরিবর্তন এবং খনন এলাকা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ফলে সংশোধিত প্রকল্পের নাম হয়ে যায় 'সোনাগাজী ডাংগি খাল (নুর আলমের বাড়ির উত্তর পার্শ্ব হতে ফেনী নদী পর্যন্ত)' তবে, এতে দৈর্ঘ্য উল্লেখ করা হয়নি। গত ৮ জুন খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনের সময় ফেনী জেলা প্রশাসক ও সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খালটির খনন অংশের দৈর্ঘ্য সাড়ে ৮ কিলোমিটার উল্লেখ করেছেন।
অস্পষ্টতা এখানেই শেষ নয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড ফেনীর একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, ডাঙ্গি খালের যে অংশে খনন কাজ চলবে তার দৈর্ঘ্য হতে পারে সাড়ে চার কিলোমিটার। অর্থাৎ, এ তথ্যের ভিত্তিতে এই খাল খননে কিলোমিটার প্রতি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সোয়া কোটি টাকার অধিক।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওই সূত্র জানায়, নথিতে ডাঙ্গি খাল বা জাইল্লা ডাঙ্গি নামে কোন খাল নেই। ডাঙ্গি বলতে শাখা বোঝায়। বর্তমানে খাল খনন প্রকল্পের আওতায় ৭ নাম্বার স্লুইচ গেইট থেকে ছোট ফেনী নদী পর্যন্ত যে স্থানে কাজ করা হচ্ছে সেটির দৈর্ঘ্য ৪ থেকে সাড়ে ৪ কিলোমিটার হতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাগজে-কলমে খালের নাম 'আইআর৭এএন্ড৮বি (ইরিগেশন)। খালটি সাহাপুর আশ্রয়ন প্রকল্প, সোনাগাজী কলেজ এবং পল্লী বিদ্যুৎ অফিস দিয়ে গিয়ে ভূঁঞা বাজার হয়ে ছোট ফেনী নদী পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ, এর সাথে সংযুক্ত আরো ৮-৯টি শাখা রয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, সোনাগাজীর অন্যতম বড় ডাঙ্গি খালটি দুইটি চ্যানেলে বিভক্ত। এর একটি চ্যানেল ছোট স্লুইচ গেট, সাহাপুর আশ্রয়ন প্রকল্প, সোনাগাজী কলেজ এবং হাঁস প্রজনন খামারের পাশ দিয়ে গিয়ে ছোট ফেনী নদীতে মিলিত হয়েছে। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ২২ কিলোমিটার। অপর চ্যানেলটি সোনাগাজী কলেজ সংলগ্ন তাকিয়া রোডের দক্ষিণ মাথা থেকে লন্ডনি পড়ার পর পূর্ব বড়ধলী ধান গবেষণা কেন্দ্র হয়ে দক্ষিণ দিকে গিয়ে ফেনী নদীতে মিলিত হয়েছে।
প্রকল্পটি প্রসঙ্গে উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, উপজেলা পরিষদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী ডাঙ্গি খালের সাহাপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প, সোনাগাজী কলেজ এবং হাঁস প্রজনন খামারের পাশ দিয়ে গিয়ে ছোট ফেনী নদী পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার অংশ খননের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়। দেশ ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের জরীপ করেছে। পরবর্তীতে চলতি বছরের ৮ এপ্রিল ২২ কিলোমিটার খননের জন্য প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে গত ৪ জুন সোনাগাজী ডাঙ্গি খাল (নুর আলমের বাড়ির উত্তর পার্শ্ব থেকে ফেনী নদী পর্যন্ত) নামে সংশোধন করা হয়।
সূত্রটি জানায়, নির্দেশনা রয়েছে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে খনন কাজ শেষ করতে হবে। তবে এত অল্প সময়ে সাড়ে ৮ কিলোমিটার খাল খনন কাজ শেষ করা যাবে কিনা তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছে উপজেলা প্রশাসন।
এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খাল খনন কাজ শুরু আগেই পিআইসি কমিটি গঠনের নিয়ম রয়েছে। অথচ ৮ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে খনন কাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করার নিয়ম থাকলেও কমিটি অনুমোদনের আগেই উদ্বোধন হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নেতিবাচক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. এনামুল হক বলেন, আমি এখানে দায়িত্ব পাওয়ার আগে তৎকালীন পিআইও ২২ কিলোমিটার খালের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সময় স্বল্পতার কারণে সংশোধনী পাঠিয়ে সাড়ে ৮ কিলোমিটারের কাজ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ২২ কিলোমিটারের জন্য অনুমোদিত বরাদ্দের টাকা দিয়েই বর্তমানে সাড়ে ৮ কিলোমিটারের কাজ করা হবে। কাজ শেষে মূল্যায়ণ করে প্রকৃত কাজের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।
এ বিষয়ে সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিগ্যান চাকমা বলেন, জরুরি ভিত্তিতে খালের তালিকা চাওয়া হলে ডাঙ্গি খাল ২২ কিলোমিটার থাকায় দ্রুত সময়ে পাঠানো হয়েছিল। পরে দেখা যায় স্বল্প সময়ে পুরো খাল খনন করা সম্ভব নয় এবং সকল স্থানে খননের প্রয়োজন নেই। এ কারণে সংশোধন করে সাড়ে ৮ কিলোমিটার খনন কাজ করা হচ্ছে।
খালের তথ্য গোপন এবং অস্বাভাবিক বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খাল খনন কাজ শেষ হওয়ার পর হিসাব নিকাশের মাধ্যমে প্রকৃত কাজের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। যতটুকু কাজ হবে, ততটুকুর বিল দেওয়া হবে। বাকি টাকা ফেরত চলে যাবে।
খাল খনন কাজ নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সাড়ে ৮ কিলোমিটার খাল খননের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৫ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার ৯৪৫ টাকা। খালের নিচ থেকে ১ মিটার গভীর মাটি উত্তোলন এবং গড়ে ৮ মিটার প্রস্থ করে খনন কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশনা রয়েছে। খননকৃত মাটি খালের দুই পাড়ে সংরক্ষণ করা হবে। পরে ওই স্থানে বৃক্ষরোপণ করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
সোনাগাজীর সিনিয়র সাংবাদিক জসিম উদ্দিন কাঞ্চন বলেন, খালটির যে অংশে বর্তমানে খনন কাজ করা হচ্ছে, সেখানে এক মিটার গভীরতা অনুযায়ী পলিমাটি উত্তোলনের কথা থাকলেও বাস্তবে ওই পরিমাণ পলি নেই।
অন্যদিকে খালের প্রস্থ ৮ মিটার করে খনন করার কথা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে দখল ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার কারণে ৮ মিটার প্রস্থে কাজ করার সুযোগ নেই বলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন।
অবৈধ দখলদারদের রক্ষায় প্রকল্প পরিবর্তন!
ডাঙ্গি খালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ছোট স্লুইচ গেট হতে ছোট ফেনী নদী পর্যন্ত খালের চ্যানেলটি চরগণেশ, তাকিয়া রোডের দক্ষিণ অংশে, হাওয়াই রোড, সোনাগাজী পশ্চিম বাজার অংশসহ বিভিন্ন স্থানে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, রক্ষাপ্রাচীর, ভরাট করে জমি তৈরি করে বেশকিছু অবৈধ দখল রয়েছে। কিছু অংশে পুরো খালটিই দখল হয়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রশাসনে এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না শর্তে বলেন, শুরুতে মূল খালের প্রস্তাব পাঠিয়ে অনুমোদন করা হলেও পরে প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলেসহ নানা প্রতিবন্ধকতা এড়াতে পরবর্তীতে সংশোধন করে খালের ভিন্ন চ্যানেল কাজ শুরু করা হয়েছে। এখান খাল খনন উল্লেখ করা হলেও এটি মূলত খনন নয়, খাল সংস্কার বা পুনঃখনন বলা যেতে পারে।
