নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে অবস্থিত মুছাপুর রেগুলেটর ভেঙে যাওয়ার দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। এতে ফেনীর সোনাগাজী ও দাগনভূঞা এবং নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার লাখো মানুষ মানবিক বিপর্যয়ে ভুগছেন। নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার কারণে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো পরিবার। স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, রেগুলেটর ভেঙে যাওয়ার পর থেকে জোয়ারের পানির সঙ্গে লবণাক্ততা বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। এতে কৃষি উৎপাদন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

সোনাগাজী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাঈন উদ্দিন আহমেদ জানান, মুছাপুর ক্লোজার বিলীন হওয়ার কারণে গতবছর বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানি সরাসরি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় প্রায় ২০৫ হেক্টর আমন ধানের জমি আক্রান্ত হয়েছে। এই ২০৫ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৪৫ মেট্রিক টন আমন ধান কম উৎপাদন হয়েছে। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৫২ লাখ টাকা।

সোনাগাজী উপজেলার কৃষি বিভাগ জানায়, বর্ষাকালে জোয়ারের পানির উচ্চতা বেশি হওয়ায় বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মাটিতে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে। এর প্রভাবে বর্তমান রবি মৌসুমে তরমুজ, সরিষা, গম, ভুট্টাসহ অন্যান্য রবি ফসলের ফলন কম হবে। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় কোটি টাকা। তবে বাস্তবে দেখা গেছে, লবণাক্ততা এক হাজার হেক্টরের অধিক কৃষি জমিতে বিস্তৃত।

দাগনভূঞা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, মুছাপুর রেগুলেটর না থাকায় নদীর লোনাপানির কারণে উপজেলার ৩ হাজার হেক্টর কৃষি জমি লবণাক্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কৃষকরা মিঠা পানি সংকটে রয়েছে। আমরা পরামর্শ দিচ্ছি পাম্পের মাধ্যমে পানি দিতে। গত বছর জোয়ারের প্রভাবে উপজেলার রাজাপুর, সিন্দুরপুর, পূর্বচন্দ্রপুর, রামনগর ও পূর্বচন্দ্রপুর-এসব এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় ফসল উৎপাদনে বিলম্ব হয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সামনে বর্ষার মৌসুমে আবারও জোয়ার প্রভাব ফেলবে। আমরা দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের এই বিষয়ে অবহিত করেছি। কিন্তু স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। 

কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বেলাল হোসেন বলেন, ১০০ হেক্টর কৃষি জমি সরাসরি নদী ভাঙনের কবলে পড়েছে। বন্যার পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার হেক্টর কৃষি জমির উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকার সংযোগ খালগুলো দিয়ে এখনো নিয়মিত লবণাক্ত পানি আসছে এবং লোনাপানির প্রভাব বড় আকারের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত বছর আমন ধান প্রায় ৮ হাজার হেক্টর, আউশ ২৫০ হেক্টর এবং সবজি প্রায় ৫০০ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমার কাছে একটি সমীক্ষা আছে, মুছাপুর রেগুলেটর বিলীন হওয়ায় নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা পর্যন্ত ৮০ হাজার কৃষি জমি বন্যা পরবর্তী সময়ে জলাবদ্ধতা, লোনাপানি, জোয়ারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানিয়েছি যেন দ্রুত সময়ে রেগুলেটর নির্মাণ এবং ভাঙনরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগীরা জানান, আমরা যা হারানোর হারিয়েছি। কিন্তু রেগুলেটর না থাকায় এখন কৃষি জমিতে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়বে। যা কৃষকদের দীর্ঘমেয়াদে ভোগাবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকার হাজারো পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে এবং লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

তারা আরও জানান, গত বছর বর্ষা মৌসুমে জোয়ারে নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়ি, টিউবওয়েল, গবাদিপশুর ঘর, স্কুল-মাদ্রাসা পানিতে ডুবে যায়। পানির সঙ্গে সাপ–ব্যাঙ ও বিষাক্ত পোকামাকড় বসতবাড়িতে ঢুকে পড়ে। জোয়ারের কারণে নিরাপদ পানীয়ের সংকট দেখা দেয়। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে নদীর পানি ব্যবহার করে, ফলে ডায়রিয়া ও চর্মরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। 

সোনাগাজীর দক্ষিণ বগাদানা এলাকার বাসিন্দা শাহেদা আক্তার বলেন, আমার ঘর খালের পাশে হওয়ায় প্রতিদিন দুইবার জোয়ারের পানিতে পাড় ভেঙে যাচ্ছে। এতে তার বসতঘর এখন বিলীন হওয়ার পথে। একই এলাকার বাসিন্দা জুয়েল, আব্দুর শুক্কুর ও আবুল হাসেম জানান, বর্ষায় যখন জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পায় তখন নলকূপ, হাঁস-মুরগির ঘর ও বসতবাড়ি প্রায়ই তলিয়ে যায়। পানির সঙ্গে সাপসহ বিভিন্ন বিষাক্ত পোকামাকড় বাড়িতে ঢুকে পড়ায় আমরা আতঙ্কের মধ্য থাকি। 

সায়েদপুর এলাকার ইব্রাহিম খলিল সিদ্দিকী বলেন, পানি জমে রাস্তাঘাট কাঁদায় পরিণত হয়েছে। এতে শিক্ষার্থী ও অসুস্থ রোগীদের যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে।

সোনাগাজী উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন বলেন, ইউনিয়নে ৫টি ওয়ার্ডের মজুপুর, মধ্যম সুলতানপুর, পূর্ব সুলতানপুর, ফতেহপুর, রঘুনাথপুর নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত। এসব এলাকায় শতাধিক পরিবারের নদী ভাঙনে ইতোমধ্যে বসতভিটা হারিয়েছে। এর মধ্যে রেড ক্রিসেন্ট ৩৬টি এবং সেনাবাহিনী ৩টি পরিবারকে পুনর্বাসন করেছে।  বাকি পরিবারগুলো ভবঘুরের মতো আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে জীবনযাপন করছে। নদীপাড়ের প্রায় ৫০০ পরিবার তাদের বাড়ির আঙিনা হারিয়েছে। সামনে বর্ষা মৌসুমে তাদের বসতবাড়ি বিলীনের শঙ্কা প্রবল, কারণ তখন পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি নদীতে স্রোতও বেশি থাকে। আমি মন্ত্রী মহোদয়কেও বিষয়টি অবগত করেছি।

এদিকে এ সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য জানতে ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে দাপ্তরিক সর্বশেষ তথ্য নেই। 

তবে, ২০২৪ সালে দৈনিক ফেনীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, ছোট ফেনী নদী এবং সিলোনিয়া নদীর ৪০টি স্থানে ভাঙনের কবলে পড়েছে। এসব স্থানে নদী তীরবর্তী ১৫ কিলোমিটার জায়গায় আগ্রাসীরূপে নদী ভাঙছে। প্রাথমিকভাবেভাবে এই ক্ষতি ৩০০ কোটির টাকা ধরে কাজের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। বাস্তবে এ পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে। এখানো পর্যাপ্ত বরাদ্দ না আসায় সব ভাঙনস্থানে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে ভাঙন স্থান আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট প্রবল বর্ষণ ও উজানের ঢলে মুছাপুরের ২৩ ভেন্টের রেগুলেটরটি ভেঙে যায়। এরপর থেকেই তিন উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জোয়ারের পানির সরাসরি প্রভাবে পড়েছে। এর আগে ২০০৫ সালে কোম্পানীগঞ্জ উপকূলে নদীভাঙন ঠেকাতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে প্রায় ১৯ কোটি ৪৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৩ ভেন্টের মুছাপুর রেগুলেটর নির্মাণ করা হয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত নতুন রেগুলেটর নির্মাণ ও নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে আগামী বর্ষা মৌসুমে ক্ষতির পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে এবং আরও বহু পরিবার নদীভাঙনের মুখে পড়বে।