ক্ষণস্থায়ী এই জীবনে জন্মের একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর তাঁকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। মানুষ চলে যায় কিন্তু রেখে যায় তার কর্ম, অর্জন ও স্মৃতিচিহৃ। ফেনীর একজন নিভৃতচারী সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক ছিলেন ফিরোজ আলম। ছিলেন এজন্যই উল্লেখ করা হলো তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। শনিবার দুপুরে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন এই সাংবাদিক।
দৈনিক সুপ্রভাত ফেনী’ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বরেণ্য সাংবাদিক ফিরোজ আলম আর নেই। তিনি আজ দুপুরে ঢাকা যাওয়ার পথে বাসে হার্ট অ্যাটাক করেন। পরে রাজধানীর দৈনিক জনপদ মোড় থেকে এক সিএনজিচালিত অটোরিক্সা চালক তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন (ইন্না-লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬০ বছর।
ফিরোজ আলমের জন্ম ১৯৬৬ সালে ফেনী পৌরসভার বিরিঞ্চি এলাকায়। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে এক মেয়ের জনক।মৃত্যুকালে অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, সাংবাদিক সহকর্মী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
গতকাল ২৭ মার্চ শুক্রবার রাত ৮টার পর তিনি যখন ফেনী প্রেস ক্লাবে এসেছিলেন তাঁর হাতে ছিল একটি শপিং ব্যাগ। ব্যাগে ছিল চিকিৎসার কিছু কাগজপত্রাদি। ক্লাবে উপস্থিত সহকর্মীদের সাথে কর্মদন ও কুশল বিনিময় শেষে সোফায় আমার পাশে এসে বসলেন। বললাম, কেমন আছেন ফিরোজ ভাই? অনেকদিন দেখা নেই। তিনি কিছুটা নিচু সরে বললেন, অসুস্থ। ঈদের দুইদিন পর ঢাকায় ছোট্ট একটি অপারেশন হয়েছে। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। আগামীকাল (শনিবার) আবার চেকাপের জন্য ঢাকায় যাচ্ছি। বুকে এখনো ব্যথা আছে, দোয়া করিও।
তাঁর সাথে কথা বলা শেষে আমি দৈনিক ফেনী’র সম্পাদক আরিফুল আমিন রিজভী ভাইকে কল দিয়ে প্রথম আলো বন্ধুসভার আয়োজনে ‘মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড’ এ অতিথি থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। রিজভী ভাইয়ের সাথে কথা চলাকালীন সময় ফিরোজ ভাই আমার দিকে কয়েকবার আঁড় চোখে তাকিয়ে ছিলেন। মনে মনে হয়তো ভাবছিলেন তাঁকে কেন আমন্ত্রণ জানাচ্ছি না। আমিও একবার মনে করলাম তাঁকে ৩০ মার্চের প্রোগ্রামের আমন্ত্রণ জানাই। আবার পরক্ষণে চিন্তা করলাম ছোট্ট একটি অনুষ্ঠানে এত বেশি অতিথি হলে সবাইকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। এতে আমন্ত্রিত অতিথি মনে কষ্ট পেতে পারে। তাই আর ফিরোজ ভাইকে ওই প্রোগ্রামের আমন্ত্রণ জানায়নি। এর কিছুক্ষণ পর তিনি গুটিগুটি পায়ে হেঁটে প্রেসক্লাবের দোতলা ভবন থেকে নিচে নেমে বাড়ি চলে যান।
৯০এর দশকে সাংবাদিকতায় পা রাখা ফিরোজ আলম ছিলেন ব্যাংকার। বিগত ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সোনালী ব্যাংক থেকে অবসরে যান। সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক ফিরোজ আলম ছিলেন ‘দৈনিক সুপ্রভাত ফেনী’ প্রধান সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত)। তিনি পাক্ষিক ‘ফেনী চিত্র’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। দুটো পত্রিকার প্রকাশক ছিলেন তাঁর স্ত্রী আমেনা জোহরা।
সাংবাদিক ফিরোজ আলমের অগ্রজ সহকর্মী ছিলেন প্রয়াত সাংবাদিক শাহজালাল রতন। ফিরোজ আলমের সরকারি ব্যাংকিংয়ে চাকরির কারণে তার স্ত্রীর নামে পত্রিকা দুটির অনুমতি নেওয়া হলেও পত্রিকা দুটির কাজ করতেন ফিরোজ আলম নিজে। এ কাজে তাঁকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করতেন শাহজালাল রতন।
ফিরোজ আলম ৯০এর দশকে রাজধানী ঢাকায় আনন্দপত্র দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন। এরপর স্পোটর্স রিপোটার হিসাবে দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক লাল সবুজ, দৈনিক কালবেলা, দৈনিক রূপালী তে কাজ করেছেন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত ক্রীড়া পাক্ষিক খেলা পত্রিকায় প্রথমে রিপোর্টার পরে নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। ছিলেন ক্রীড়া বিষয়ক ফিচার লেখক। নানা পত্রিকায় তাঁর অনেকগুলো ফিচার ছাপা হয়েছে। ব্যাংকিং চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর ফেনী শহরের মিজান রোডের আলিয়া মাদ্রাসা মার্কেটের দ্বিতীয় তালায় ‘দৈনিক সুপ্রভাত ফেনীর’ কার্যালয় স্থাপন করেছিলেন।
নিভৃতচারী সাংবাদিক ফিরোজ আলমের সাথে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। দীর্ঘ দুই যুগের এই সম্পর্কে তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, ভালবাসতেন। ২০২৪ সালে আমি দৈনিক প্রথম আলোতে যোগদানের পর তিনি আমাকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছিলেন। তিনি দৈনিক প্রথম আলোর নিয়মিত পাঠক ছিলেন। প্রথম আলোতে ফেনীর প্রকাশিত প্রতিটি প্রতিবেদন তিনি তাঁর দৈনিক সুপ্রভাত ফেনী পত্রিকায় ছাপাতেন ও ওয়েবসাইটে পুনঃপ্রকাশ করতেন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি আমাকে অনেকদিন বলেছিলেন তার পত্রিকাটি নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য। আমি বলেছিলাম আপাতত আপনি করেন, আমি আপনাকে অন্যভাবে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।
সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর তিনি একদিন আমার সাথে দেখা করে বললেন শামীম ‘অধিকার’ (দেশের অন্যতম বৃহৎ মানবাধিকার সংগঠন) প্রোগ্রামগুলোতে আমন্ত্রণ জানিও। আগে সরকারি চাকরি করার কারণে তোমার প্রোগ্রামগুলোতে আসতে পারতাম না, সরকারি বাধ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে। এখন থেকে তোমার অধিকারের সকল প্রোগ্রামে আমি উপস্থিত থাকবো। সেই থেকে ২০২৪, ২৫ ও ২৬ সালের শুরুর অনেকগুলো প্রোগ্রামে তিনি অতিথি হিসেবে অধিকারের সাথে ছিলেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলা প্রশাসনের ভিজিলেন্স টিমের সদস্য করে দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। একটি গোয়েন্দা সংস্থার ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের সহযোগিতায় ফিরোজ আলম ভাইকে এই সুযোগটি করে দেয়া হয়। তবে দায়িত্ব পালন শেষে একদিন তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন দায়িত্ব পালন করলেও তিনি আর্থিক কোনো সুযোগ সুবিধা পাননি।
চাকরি :
১৯৯৩ সালে সোনালী ব্যাংকে চাকুরি নেন ফিরোজ আলম। চাকরিজীবনে ক্যাশিয়ার, জুনিয়র অফিসার, অফিসার, সিনিয়র অফিসার ও শাখা ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সোনালী ব্যাংক ফেনীর প্রধান কার্যালয়, মহিপাল শাখা, সদর উপজেলা শাখাসহ বিভিন্ন কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
দীর্ঘ তিন দশক ধরে সরকারি চাকরি ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি গবেষণায় মনোনিবেশ করেছিলেন। ইতিমধ্যে ছয়টি গবেষণাধর্মী বই প্রকাশ করেছেন। আরো কয়েকটি গ্রন্থ তিনি সম্পাদনার জন্য কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
প্রকাশিত গ্রন্থ :
চাকুরির পাশাপাশি অবসর সময়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার নিয়মিত লেখালিখে চালিয়ে যেতেন ফিরোজ আলম। তিনি বিগত তিনদশকে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থ সমূহের মধ্যে রয়েছে ‘ফেনী জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’, ‘ফেনীর আউলিয়া পাগলা মিঞা (র.) জীবন কথা’, ‘ফেনীর শহীদ বুদ্ধিজীবী’, ‘ফেনীর কথা নবীন চন্দ্র সেন’, ‘ফেনীর ভাষা আন্দোলন’ ও ‘আমার শহর ফেনী’।
সাংবাদিকতায় সম্মাননা :
বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির (বিএসপিএ) বর্ষসেরা ক্রীড়া সাংবাদিক পুরস্কারু২০২২ অনুষ্ঠানে বিশ্ব ক্রীড়া সাংবাদিকতা দিবসের সম্মাননা দেওয়া হয় ফিরোজ আলমকে। ২০০৩ সালের ২৫ নভেম্বর বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের ডাচ-বাংলা অডিটরিয়ামে পুরস্কার তুলে দেন বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজা। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির সভাপতি সনৎ বাবলা ও সাধারণ সম্পাদক সামন হোসেন।
নিভৃতচারী ফিরোজ আলম ভাইরা আমাদের এই জনপদের গর্ব। তাঁকে হারিয়ে আমাদের অপার শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ফিরোজ ভাই আপনি ওপারে ভালো থাকবেন, বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয় এ। আল্লাহ আপনাকে বেহেস্তের সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করুক।
লেখক : সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও উন্নয়ন কর্মী
প্রতিনিধি, দৈনিক প্রথম আলো
