লক্ষ কোটি জনতাকে কাঁদিয়ে অসংখ্য ভক্তকে শোক সাগরে ভাসিয়ে চিরতরে চলে গেলেন আমাদের অতি প্রিয় নেত্রী ম্যাডাম খালেদা জিয়া। আমি ২০২৪ সালের জানুয়ারী মাসে লন্ডন গেলাম আমার প্রিয় নেত্রী অসুস্থ ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে দেখতে। লন্ডন পৌঁছে ম্যডামের ব্যক্তিগত চিকিৎসক প্রফেসর ডা. জাহিদকে ফোন দিলাম এবং ম্যাডামের শারীরিক অবস্থার খবরাখবর জানতে চাইলাম। এরপর তাঁকে বললাম আমি অসুস্থ ম্যাডামকে দেখতে যেতে চাই। উত্তরে ডা. জাহিদ বললেন যে, ম্যাডামের সাথে দেখা করা খুবই রেস্ট্রিকটেড। তখন তাঁকে বললাম আমি তাকে দেখতে না পারলেও অন্ততঃ লন্ডন ক্লিনিকে গিয়ে রোগমুক্তি কামনায় গেটওয়েল কার্ড দিয়ে আসতে চাই। তিনি প্রস্তাবে সাড়া দিলেন এবং যেতে বললেন।
সেদিন ছিলো ২০২৪ সালের ২৩শে জানুয়ারী। আমার ছোট ভাই লন্ডনে বসবাসকারী অসরপ্রাপ্ত বিএসসি’র জিএম ক্যাপ্টেন মইন আমি এবং আমার সহধর্মিনী খোদেজা বেগম চুনিকে নিয়ে লন্ডন ক্লিনিকে পৌঁছাই। পৌঁছাতে চ্যানেল আই’র টিভি সাংবাদিকের সাথে দেখা এবং তাকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর তিনি আমাদেরকে হাসপাতালের রিসেপশানে নিয় যান। সেখানে ঢুকতেই ডা. জাহিদের সাথে দেখা এবং ম্যাডামের জন্য তাঁর রোগমুক্তি কামনায় আমাদের পক্ষ থেকে তাঁকে একটি গেটওয়েল কার্ড ও ফুল ম্যাডামের নিকট পৌঁছে দেয়ার জন্য ডা. জাহিদের হাতে দিলাম। এগুলো নিয়ে ডা. জাহিদ গিয়ে ম্যাডামকে আমার নাম বলার পর ম্যাডাম এ অসুস্থ্য শরীরেও আমাকে চিনতে পেরেছেন এবং আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যেতে ডা. জাহিদকে অনুমতি দিলেন। আমরা ডা. জাহিদ ফিরে আসলে তার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু ডা. জাহিদ তড়িঘড়ি করে ফিরে এসে আমাদেরকে ম্যাডামের কক্ষে নিয়ে গেলেন। ম্যাডাম জানতে চাইলেন আমরা কেমন আছি? তাঁর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ের এক ফাঁকে আমার স্ত্রী ম্যাডাম আপনাকে যে এত কষ্ট দিলো সে এখন কোথায়? কিন্তু আমরা তার উত্তর শুনে স্তম্ভিত হলাম তিনি একবারেও তাঁর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটি কথাও মন্দ বললেন না। শুধু বললেন ‘আল্লাহ দেখবেন’।
আজ মনে খুবই কষ্ট পাচ্ছি তাঁর মহাপ্রয়াণে। বেশী কষ্ট পাচ্ছি এটা ভেবে যে তাঁর সাথে আমার অনেকদিন দেখা হয় নাই, নিজেও দেশে ছিলাম না। কিন্তু এতদিন পরও নানান রোগে জর্জরিত অবস্থায়ও তিনি আমাকে চিনতে পেরেছেন এ স্নেহ আমি কোথায় রাখবো।
আমার মা মারা যাওয়ার পর যেরূপ কষ্ট পেয়ে ছিলাম সেরূপ কষ্টই আমি আজ পাচ্ছি। এ অনুভূতি একমাত্র আল্লাহ’র তরফ থেকেই পাওয়া যায়। আল্লাহ ম্যডামকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন এ কামনাই শুধু আমি করছি।
ম্যাডাম ছিলেন একজন নির্ভীক নেত্রী খালেদা জিয়া। তাঁহার অনেক সাহসী কর্মকান্ডের উদাহরণ দেওয়ার মত রয়েছে। আমি তন্মধ্যে একটি ঘটনার সাক্ষী যা এখানে বলতে চাই। নব্বইয়ের গনঅভ্যুত্থান পূর্ববর্তী সময়ে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় একদিন সচিবালয় ঘেরাও কর্মসুচি দেয়া হয়েছিলো। তাঁর আহবানে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ঐ ঘেরাও কর্মসুচিতে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিই। উল্লেখ্য সেসময়ে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা সব দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে অধিক যোগাযোগ রেখে চলতো। যাক শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেক আমরা মিছিল নিয়ে সচিবালয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম। শিক্ষক সমিতির মিছিলটি সচিবালয়ের কাছাকাছি পৌঁছাতেই শুরু হলো টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ। ফলে আমাদের মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। আমি শুনলাম ম্যাডাম খালেদা জিয়া জনতার মিছিলের নেতৃত্বে সামনের কাতারে থেকে টিয়ার গ্যাস সেলের আঘাত পেয়ে আহত হয়েছেন। আমি ঝুঁকি নিয়ে ম্যডামকে দেখতে একটু সামনের দিকে আগাতেই দেখি ম্যাডাম জনগণের মনের সাহস যাতে ভাঙ্গে সেজন্য নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। এই অতি ঝুঁকিপূর্ন অবস্থায়ও তার মনোবল এবং দৃঢ়তা দেখে আমি অভিভূত হই। প্রশাসনে থেকে দলমত নির্বিশেষে প্রতিষ্ঠানের আইন অনুসারে দায়িত্ব পালন করার ব্যপারে তিনি ছিলেন অতি সজাগ।
আমার খেয়াল আছে বিশেষ মহলের বাধা এড়িয়ে তিনি যখন আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেন। আমি উক্ত পদে যোগদান করে তাঁর সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করতে যাই এবং তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি জিজ্ঞ্যস করি আমার প্রতি তাঁর কোনো উপদেশ আছে কিনা। এর উত্তরে তিনি আমাকে বলেন ‘আপনাকে যোগ্য বিবেচনা করেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, বিশ্ববিদ্যলয়ের আইন অনুসরন করে ন্যায়নীতির সাথে দায়িত্ব নির্বাহ করবেন’। আমি তাঁর ন্যায়নীতির প্রতি নিষ্ঠা দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। তাই এত বড় একজন আদর্শবান ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ রহমতের কারণে আল্লাহর ইচ্ছায় কোটি লোকের আকুতিতে এতবড় জনসমাবেশে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হলো।
আমি তার নিকট কৃতজ্ঞ কারণ আমি বারবার তাঁর আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। আমি যখন কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে তখন প্রো-ভিসির পদ শুন্য হয়। আমি এই পদের জন্য প্রার্থী ছিলাম না বরং এক বন্ধু সহকর্মীর প্রতি সমর্থন ছিলো। কিন্ত তার সাথে আর একজন অধ্যাপক রেসে অবতীর্ণ হন।
আমি যতটুকু বিশস্তসূত্রে জানতে পেরেছি, দুজনের তীব্র তদ্বিরে ম্যাডাম বিরক্ত হয়ে তাদের কাউকে নিয়োগ না দিয়ে তাঁর দফতরকে নির্দেশ দেন আমাকে নিয়োগ দিতে। আমি নিয়োগ দেওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে এ খবর জেনে অতি আশ্চর্য হলাম। লজ্জায় পড়ে গেলাম রেসে প্রতিদ্বন্দ্বী আমার সহকর্মী বন্ধু আমাকে ভুল বুঝতে পারেন। কিন্তু ম্যাডামের আশির্বাদ উপেক্ষা করে না বলার মত অশোভন কাজ করাও আমার জন্য গর্হিত আচরন হবে বিধায় আমি গ্রেইসফুলী পদটি গ্রহণ করলাম। আমার নিকট অনুভূতি হলো যে আমি ম্যাডাম খালেদা জিয়ার আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি।
আমি প্রো-ভিসি পদে থাকার সময়ে ম্যাডাম একবার আমাকে তাঁর সাথে দেখা করতে খবর পাঠান। আমি যাওয়ার পর তিনি আমার সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক নিয়োগে কোনো বৈষম্য করা হয় কিনা জানতে চান। আমি এতে একটু বিব্রত বোধ করলাম। বুঝতে পারলাম তার কাছে খবর আছে। কারণ আমি দু-একবার নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি হিসাবে এ প্রবণতার সম্মুখীন হয়েছি। যদিও এ ধরনের প্রবণতার প্রশ্রয় আমি কখনও দেইনি।
এ প্রবণতার পেছনে তাদের যুক্তি ছিলো যে মেয়েদেরকে বিভাগের সব কাজে সব সময়ে পাওয়া যায় না। কারণ পারিবারিক কারণে ও রাতবিরাতে জরুরী কাজে মেয়েদেরকে পাওয়া যায় না। কিন্তু ম্যাডাম একথা শুনে সন্তষ্ট হতে পারেন নি। তিনি বললেন- এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। এ ধরনের প্রবণতাকে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না। খালেদা জিয়াই প্রথম নারী শিক্ষার উন্নয়নে মেয়েদের হায়ার সেকেন্ডারী লেভেল পর্যন্ত বিনা খরচে শিক্ষাদানের প্রথা চালু করেন। তিনি উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রেও দেশে নারীদের প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়ার অগ্রদূত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনিই প্রথম নারী প্রো ভিসি নিয়োগ দেন। একজন নারীকে তিনিই প্রথম সরকারী কর্মকমিশনের মত এত উঁচু স্তরের প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসাবে নিয়োগ দেন।
বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে লিখে শেষ করা যাবে না। নানা কাজে তাঁর সংস্পর্শে এসে অনেক চমৎকার স্মৃতি আমি/আমরা বহন করছি। আল্লাহ যদি মেহেরবানী করেন ভবিষ্যতে আরও অনেক স্মৃতিচারণ করার আশা রাখি। আজ পুনরায় আল্লাহতায়ালার নিকট প্রার্থনা করছি আল্লাহ যেন বেগম খালেদা জিয়াকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।
লেখক : সাবেক প্রো-উপাচার্য ও উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
