রহমত ও মাগফিরাতের বসন্ত পেরিয়ে পবিত্র মাহে রমজান প্রবেশ করেছে শেষ দশকে। ইসলামি পরিভাষায় রমজানের এই শেষ দশ দিনকে বলা হয় ‘নাজাতের দশক’। ‘নাজাত’ অর্থ মুক্তি। অর্থাৎ, এই দশ দিনে আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসংখ্য বান্দাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করে নেন।

একজন মুমিনের জন্য রমজানের প্রথম ২০ দিনের চেয়েও শেষ ১০ দিন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই দশকেই লুকিয়ে আছে হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রজনী ‘লাইলাতুল কদর’। তাই নবী কারিম (সা.) এই দশকে ইবাদতের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতেন।

শেষ দশক কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

রমজানের শেষ দশক হলো ইবাদতের চূড়ান্ত সময়। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "যখন রমজানের শেষ দশক আসত, নবী কারিম (সা.) তাঁর লুঙ্গি শক্ত করে বাঁধতেন (অর্থাৎ ইবাদতের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিতেন), রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং তাঁর পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন।" (সহিহ বুখারি: ২০২৪)

এই হাদিস থেকেই বোঝা যায়, শেষ দশকে রাসুল (সা.) দুনিয়াবি সব ব্যস্ততা কমিয়ে পুরোপুরি আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হতেন। এই দশকে এমন একটি রাত রয়েছে, যে রাতের ইবাদত হাজার বছরের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। নাজাতের এই দশ দিনে নিজেকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করতে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট আমল রয়েছে:

১. ইতিকাফ করা:

শেষ দশকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সুন্নাত আমল হলো ইতিকাফ। দুনিয়ার সব কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, "রাসুলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকাল অবধি রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর স্ত্রীগণও ইতিকাফ করেছেন।" (সহিহ বুখারি: ২০২৬)

২. লাইলাতুল কদর অন্বেষণ:

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।" (সুরা কদর, আয়াত: ৩)।

রমজানের শেষ দশকের যেকোনো বেজোড় রাতে এই মহিমান্বিত রজনী লুকিয়ে আছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, "তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে শবে কদর তালাশ করো।" (সহিহ বুখারি: ২০১৭)। ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাতে বিশেষ ইবাদতের মাধ্যমে কদর তালাশ করতে হবে।

৩. কদরের বিশেষ দোয়া পড়া

লাইলাতুল কদর পেলে কী দোয়া পড়তে হবে, তা রাসুল (সা.) শিখিয়ে দিয়েছেন। হজরত আয়েশা (রা.) রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি যদি জানতে পারি যে আজ লাইলাতুল কদর, তাহলে আমি কী দোয়া পড়ব? তিনি বললেন, তুমি পড়বে—

"আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউয়ুন; তুহিব্বুল আফওয়া; ফাফু আন্নি।"

(অর্থ: হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। কাজেই আমাকে ক্ষমা করে দিন।) —(সুনানে তিরমিজি: ৩৫১৩)

৪. কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ আদায়

শেষ দশকে রাতে না ঘুমিয়ে বেশি বেশি নফল নামাজ, বিশেষ করে তাহাজ্জুদ আদায় করা উচিত। রাসুল (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদতে দাঁড়াবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।" (সহিহ বুখারি: ১৯০১)

৫. বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির

রমজান হলো কোরআন নাজিলের মাস। তাই শেষ দশকে কোরআন তিলাওয়াত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। পাশাপাশি চলতে-ফিরতে, উঠতে-বসতে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং বেশি বেশি ইস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করতে হবে। জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য "আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান নার" (হে আল্লাহ, আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিন)—এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়া উচিত।

৬. দান-সদকা ও ফিতরা আদায়

রমজান মাসে যেকোনো নেক আমলের সওয়াব ৭০ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তাই শেষ দশকে বেশি বেশি দান-সদকা করা উচিত। কদরের রাতে দান করলে তা হাজার মাস বা ৮৩ বছর দান করার সওয়াব এনে দেবে। এছাড়া ঈদুল ফিতরের নামাজের আগেই গরিব-দুঃখীদের হক ‘সদকাতুল ফিতর’ আদায় করে দেওয়া এই দশকের অন্যতম করণীয়।

রমজানের প্রথম ২০ দিন যদি কোনো কারণে অবহেলায় চলেও যায়, তবু শেষ ১০ দিন হতে পারে ঘুরে দাঁড়ানোর মোক্ষম সুযোগ। দৌড় প্রতিযোগিতায় শেষ মুহূর্তে যেমন প্রতিযোগীরা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে, মুমিনের জন্যও শেষ দশক হলো জান্নাত লাভের সেই চূড়ান্ত দৌড়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে রমজানের শেষ দশকে বেশি বেশি ইবাদত করার এবং জাহান্নাম থেকে নাজাত পাওয়ার তওফিক দান করুন।