দৈনিক ফেনীতে সংবাদ প্রকাশের পর ফুলগাজী উপজেলার মুন্সীরহাট ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী সিলোনিয়া নদীতে অবৈধ বাঁধ অপসারণ করে পানি প্রবাহে বাধা দূর করেছে প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহরিয়া ইসলামের নির্দেশে গতকাল রোববার (২৬ এপ্রিল) সকালে অভিযানে যান উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সৈয়দ মোস্তফা জামান। এতে ফুলগাজী থানা পুলিশের একটি দল অংশ নেন।
উল্লেখ্য, মুন্সীরহাট ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী মান্দারপুর এলাকার সাইফুলের দোকানের পূর্ব দিকে সিলোনিয়া নদীর “করইল্লা” নামে খ্যাত বশিরের ময়দা বিল এলাকায় গোসাইপুর গ্রামের একাধিক ব্যক্তি নদীতে বাঁধ দিয়ে এবং মেশিনের সাহায্যে পানি তুলে মাছ শিকার করছিল। এর ফলে নদীর পূর্ব পাড়ে পানি সরিয়ে নেওয়ায় পশ্চিম পাড়ের ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের গাবতলা এলাকার শতাধিক কৃষকের বোরো ধান শুকিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠে।
গত ২৫ এপ্রিল “মাছের জন্য বাঁধ, পানির অভাবে বিপর্যস্ত বোরো চাষ” শিরোনামে দৈনিক ফেনী পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়।
অভিযানে সিলোনিয়া নদীর পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে মুন্সীরহাট ইউনিয়নের মান্দারপুর এবং ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের গোসাইপুর অংশে স্থাপিত অবৈধ বাঁধ অপসারণ করা হয়।
এর আগে স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, গোসাইপুর এলাকার প্রায় ২২ জনের একটি গ্রুপ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নদীতে বাঁধ দিয়ে মেশিনের সাহায্যে পানি তুলে মাছ শিকার করছিল। এতে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হয়ে গাবতলা ও মান্দারপুর এলাকার বোরো ধানক্ষেতে মারাত্মক পানি সংকট দেখা দেয়। অন্তত তিন শতাধিক হেক্টর জমির ফসল ক্ষতির মুখে পড়ে।
স্থানীয় কৃষক আলমগীর বলেন, এক সপ্তাহেরও বেশি সময় আমরা সেচ দিতে পারিনি। মাঠ চৌচির হয়ে গিয়েছিল। দৈনিক ফেনীতে সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় আমরা কৃতজ্ঞ।
গাবতলা এলাকার কৃষক ইসমাইলও বলেন, সংবাদ প্রকাশের পরই প্রশাসন অভিযান চালিয়ে বাঁধ অপসারণ করেছে। এতে সেচ নিয়ে কৃষকদের দুশ্চিন্তা দূর হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ব্যবস্থাপনা সমিতির আওতাধীন আবু মেম্বারের স্কিমে প্রায় ১২০ হেক্টর এবং মীর হোসেন মীরুর স্কিমে দেড় শতাধিক হেক্টর জমি বোরো চাষের আওতায় রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আমিন হুজুর নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে গত ৮-১০ দিন ধরে নদী থেকে পানি তুলে মাছ শিকার করা হচ্ছিল, যার ফলে কৃষকদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি বাঁধ অপসারণ করা হয়েছে এবং আরেকটি বাঁধ অপসারণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। গোসাইপুর খালেদা জিয়া সড়কের গাবতলা-মান্দারপুর ব্রিজ সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকার প্রায় শতাধিক হেক্টর জমি ইতোমধ্যে শুকিয়ে গেছে।
তবে বাঁধ অপসারণ হলেও নতুন করে দেখা দিয়েছে পানি দূষণের শঙ্কা। স্থানীয়দের অভিযোগ, নোয়াপুর করইয়াসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েকটি মুরগির খামারের বর্জ্য সিলোনিয়া নদীতে ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্য বদরপুর ব্রিজ ও গাবতলা এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সেচের পানিকে দূষিত করছে।
কৃষক আলমগীর বলেন, দূষিত পানি দিয়েই ফসল সেচ দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও কৃষি বিভাগের সমন্বিত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
উপজেলা পানি উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও ফুলগাজী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মাস্টার আবুল কালাম বলেন, কৃষকদের স্বার্থে সবসময়ই পাশে থাকা উচিত। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবগত করেছি।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সৈয়দ মোস্তফা জামান বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশনায় বাঁধ অপসারণ করা হয়েছে। মৎস্য আইনে এ ধরনের কার্যক্রম দণ্ডনীয় অপরাধ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহরিয়া ইসলাম বলেন, বিষয়টি জানার পর কৃষক ও এলাকাবাসীর স্বার্থে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা বাঁধ অপসারণের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বোরো ফসল উৎপাদনে নদীর পানি দূষণ বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
