রাত নামলেই আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তায় ঘিরে ধরে ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার মানুষকে। কখন চোরের দল হানা দিয়ে মালামাল নিয়ে কেটে পড়বে এই অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে সাধারণ মানুষের। স্থানীয় মানুষ বলছেন, ফুলগাজীর বাজার থেকে গ্রাম সবখানেই একের পর এক চুরির ঘটনা ঘটছে। চুরির রেশ কিছুতেই থামছে না।

গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত (৮ এপ্রিল) প্রায় ১টার দিকে ফুলগাজী বাজারে ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক সড়কের পাশে মুহুরী নদীর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত একাধিক দোকানে হানা দেয় চোরেরা। জালালিয়া সুইটসের মালিক নজরুল ইসলাম সকালে দোকানে এসে দেখেন সব এলোমেলো। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১২টা ৫৪ মিনিটে চোর দোকানে ঢুকে প্রায় ১৩ মিনিট অবস্থান করে নগদ ৫০ হাজার টাকা, প্রায় ২০ হাজার টাকার একটি মোবাইল ফোন এবং শিশু খাদ্য নিয়ে পালিয়ে যায়।

একই রাতে পিএল স্টোরের মালিক মদন মোহন সাহার দোকানেও একই কায়দায় চুরি হয়। পুবালী ব্যাংকের ওপর দিয়ে উঠে টিনের চাল কেটে দোকানে প্রবেশ করে চোর। দীর্ঘ ৫০ বছরের ব্যবসায় জীবনে এমন ঘটনা তিনি কখনো দেখেননি বলে জানান। তার দোকান থেকে নগদ ৫০ হাজার টাকা ও সমপরিমাণ মালামাল নিয়ে যায় চোরেরা। পাশের ভাই-ভাই স্টোরের মালিক এয়াকুব মোহন জানান, তার দোকান থেকে প্রায় ২ লাখ টাকা ও মোবাইল কার্ড চুরি হয়েছে। কালাম ইলেকট্রিক থেকেও নগদ ১২ হাজার টাকা ও মোবাইল কার্ড নিয়ে গেছে চোরেরা।

ঘটনার পরদিন গতকাল বুধবার (৮ এপ্রিল) দুপুরে ফুলগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম মিজানুর রহমানসহ পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। একইসঙ্গে উপজেলা বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির দায়িত্বহীনতা ও পাহারাদারদের গাফিলতির বিষয়টি সামনে আনেন।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রায় ৫ শতাধিক দোকানের বিপরীতে পাহারাদার মাত্র ৬ জন, যা কার্যত অপ্রতুল। নিয়মিত চাঁদা ও ঈদ বোনাস দেওয়ার পরও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে। বাজারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নেই পর্যাপ্ত আলো কিংবা সিসিটিভি ক্যামেরা। বিশেষ করে ইউনিক ল্যাব ও ইসলামী ব্যাংকের পেছনের অংশটি দিনে-দুপুরেও নির্জন থাকে, আর রাতে তা পরিণত হয় অন্ধকার গলিতে।

চুরির ঘটনা শুধু বাজারে সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামেও। মুন্সীরহাট, দক্ষিণ শ্রীপুর, বৈরাগপুর, আনন্দপুর, নোয়াপুর, ধর্মপুর, বসন্তপুর ও জিএমহাট এলাকায় ধান, সোলার ব্যাটারি, পানির মোটর, বৈদ্যুতিক পাম্প, টমটম এমনকি গরু পর্যন্ত চুরির ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রেই থানায় অভিযোগ করা হয় না, ফলে প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর রাতে মুন্সীরহাটের বালুয়া গ্রামের সিএনজি চালক শাহাজাহানের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভাগ্য। বাড়ির উঠোন থেকে তার একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম সিএনজি চুরি হয়ে যায়। ঋণ নিয়ে কেনা গাড়িটি হারিয়ে তিনি এখন প্রায় নিঃস্ব। একইভাবে ২৮ মার্চ আনন্দপুর ইউনিয়নের সুমন নামের এক হতদরিদ্র টমটম চালকের গাড়িও চুরি হয়ে যায়, যিনি আগে ঠেলা গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

সাধারণ মানুষ বলছেন, রাতে সামান্য শব্দ পেলেই মনে হয় চোর ঢুকেছে। এক গৃহবধূ বলেন, পানির মোটর চুরি হওয়ার পর থেকে রাতে একা থাকতে ভয় লাগে। কৃষকরা জানান, আগে গরু মাঠে রেখে আসলেও এখন চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়ে ঘরেই রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।

২০২৪ সালের ৮ নভেম্বর ফুলগাজী বাজারে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলেও ৩ মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ১৭ মাস পার হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। বরং ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চাঁদার পরিমাণ বাড়লেও নিরাপত্তা ও অন্যান্য সেবায় উন্নতি হয়নি; বরং চুরি ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে।

উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল হোসেন ভূঁঞা বলেন, এসব চুরির পেছনে স্থানীয় চক্র জড়িত থাকতে পারে। তিনি বাজারে জুয়ার আসর ও নদীর পাড়ে সন্দেহজনক চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ, পাহারাদার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি স্থাপনের দাবি জানান তিনি।