ফেনীর ফুলগাজীতে মোহাম্মদ রাকিব উদ্দিন নামে এক ইংরেজি শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে প্রাইভেট পড়ানোর মাধ্যমে তিনি অভিভাবকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। পরে বিভিন্ন অজুহাতে তাদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে আত্মসাৎ করে গা-ঢাকা দেন।
অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ রাকিব উদ্দিন ফুলগাজী পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে ২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি যোগদান করেন। তার বাড়ি চাঁদপুর জেলার দক্ষিণ মতলব উপজেলার কাচিয়ারা গ্রামের মোহাম্মদ শাহ আলমের ছেলে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাকিব উদ্দিন প্রথমে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ানোর মাধ্যমে তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন। এরপর পিতা-মাতার অসুস্থতা, ব্যক্তিগত জরুরি প্রয়োজন কিংবা পারিবারিক সংকটের কথা বলে অল্প অঙ্কের টাকা ধার নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে তা পরিশোধ করে বিশ্বাস অর্জন করেন। পরবর্তীতে সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করে ধাপে ধাপে বড় অঙ্কের টাকা সংগ্রহ করতে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন মহিলা অভিভাবকের কাছ থেকে ২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেন তিনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব অভিভাবকের স্বামীরা প্রবাসে থাকায় বিষয়টি গোপনেই থেকে যায়।
শুধু অভিভাবক নয়, সহকর্মী শিক্ষক, কর্মচারী থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষও তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন। বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সহকর্মী কমল চন্দ্র দে’র কাছ থেকে ৫ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, সুজন চন্দ্র দেবনাথের কাছ থেকে ৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, সিনিয়র শিক্ষক সামছুন্নাহারের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা, প্রণব কুমার বণিকের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া শিক্ষক রুমা রাণী ধর ও ল্যাব সহকারী ওমর ফারুকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পরবর্তীতে পরিশোধ করলেও, এক রাজমিস্ত্রী হেলপার থেকে ৪০ হাজার টাকা এবং ফুলগাজী বাজারের এক সেলুন কর্মীর কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বিভিন্ন ব্যাংক ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক থেকে জামিনদার ব্যবহার করে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের নাম ব্যবহার করেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে। শিক্ষার্থী তারিন ও পায়েল জানান, তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন রাকিব। পশ্চিম দেড়পাড়ার এক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা, ঘনিয়ামোড়ার ফারিয়ার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা, তাসরিফা চৌধুরীর কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা, দক্ষিণ শ্রীপুরের তাসমিনার অভিভাবকের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা, সাদিয়া সুলতানা মীমের কাছ থেকে ১৩ হাজার টাকা (যার মধ্যে ৬ হাজার ফেরত দিয়েছেন), বৈরাগপুরের নুরজাহানের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা, দক্ষিণ শ্রীপুরের সানজিদা আক্তারের কাছ থেকে ২ হাজার টাকা, গোসাইপুরের সামিয়া সুলতানার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা, নুসরাত জাহান মুমুর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা এবং প্রিয়ন্তী পাল পুষ্পের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এভাবে শতাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আর ফেরত দেননি তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ মার্চ থেকে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছেন রাকিব উদ্দিন। তার ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা গেছে দরজায় তালা ঝুলছে। এরপর থেকেই একের পর এক অভিযোগ জমা পড়তে থাকে এবং বর্তমানে অভিযোগের সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়েছে বলে জানা গেছে।
স্টাফ কাউন্সিলের সম্পাদক শিক্ষক মোহাম্মদ শাহাজাহান বলেন, রাকিব অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির এবং সহকর্মীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন জানান, রাকিব উদ্দিন বিভিন্ন কৌশলে অভিভাবক ও সহকর্মীদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে বিপুল অভিযোগ জমা পড়েছে। তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে নিলক্ষী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ ইব্রাহিম জানান, ২০ রমজানের আগে তার কাছ থেকেও টাকা ধার নিয়ে আর পরিশোধ করেননি রাকিব।
জানা গেছে, ২০১২ সালে চাঁদপুরের মতলব থানার নওগাঁ উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকাকালীন সময়েও তার বিরুদ্ধে একই ধরনের প্রতারণার অভিযোগ উঠেছিল। ওই সময়ের তার এক সহকর্মী ও বর্তমানে উত্তর ডিঙ্গভাঙ্গা শহীদ জিয়াউর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কাওসার মিয়াজি বলেন, সে খুবই জালিয়াত প্রকৃতির মানুষ।
এছাড়া কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার মালিগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহবুব আল হাসান জানান, ২০২২ সালে তিনি (অভিযুক্ত শিক্ষক রাকিব) সেখানে কর্মরত ছিলেন এবং পরে ফেনীতে চলে যান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই শিক্ষকের কর্মকাণ্ডে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
রাকিব উদ্দিনের এক ছাত্র চাঁদপুর মতলব উপজেলার বাসিন্দা সৌদি প্রবাসী আবদুর রহমান ঢালী জানান, পিতার অসুস্থতার কথা বলে বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে প্রায় ৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছিলেন রাকিব, যা এখনো পরিশোধ করা হয়নি।
ফুলগাজী পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আহমেদ হোসেন মজুমদার জানান, নৈতিক স্খলনের কারণে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রতারণার অভিযোগ পেয়েছি, তবে ব্যক্তিগত লেনদেনের দায় সংশ্লিষ্টদের।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক একাডেমিক সুপারভাইজার মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, লিখিত কোন অভিযোগ পাওয়া যায় নি। ছুটি নিয়েছে না-কি অসুস্থ তা প্রধান শিক্ষক নিশ্চয়ই আইনানুসারে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত শিক্ষকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
এ প্রসঙ্গে ফুলগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসএম মিজানুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
