ঈদের ছুটি শেষ হলেও স্বস্তি ফেরেনি ফুলগাজী-ফেনী সড়কের যাত্রীদের মাঝে। প্রশাসনের নির্ধারিত ভাড়া বহাল থাকার ঘোষণা উপেক্ষা করে গত ২৯ মার্চ হঠাৎ করেই ৩০ টাকার স্থলে ৪০ টাকা ভাড়া আদায় শুরু করেছে সিএনজি চালকরা। এতে প্রতিদিনের যাতায়াতে সাধারণ মানুষ পড়েছে চরম ভোগান্তিতে। যাত্রীদের অভিযোগ-জ্বালানি সংকটকে অজুহাত বানিয়ে চালকরা কার্যত যাত্রীদের জিম্মি করে ভাড়া আদায় করছে।

এর আগে ২০২৫ সালের ১৯ মে উপজেলা প্রশাসনের এক সভায় ফুলগাজী-ফেনী রুটে সিএনজি ভাড়া জনপ্রতি ৩০ টাকা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহরিয়া ইসলাম নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই সিদ্ধান্তের কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রশাসনকে পাশ কাটিয়ে চালকদের একতরফা সিদ্ধান্তেই এখন ভাড়া নির্ধারিত হচ্ছে। চালকরা নিজেরাও বিষয়টি অস্বীকার করছেন না। চালক তাজু জানান, চালকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

আরেক চালক জামাল উদ্দিন বলেন, সবকিছুর দাম বাড়ায় ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে, প্রশাসনের জন্য অপেক্ষা করলে চলছিল না।

অন্যদিকে চালক মহিম দাবি করেন, ২০১৫ সালের পর আর ভাড়া বাড়ানো হয়নি, গ্যাস নিতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে হয়, যন্ত্রাংশের দাম বেড়েছে এরই মধ্যে ৯ মাস অপেক্ষা করেছি। এসব কারণেই তারা বাধ্য হয়েছেন ভাড়া বাড়াতে।

চালক আরিফ বলেন, আমি শ্রমিক দলের সদস্য। আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না।

একাধিক সূত্র বলছে, স্থানীয়ভাবে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কথিত লাইনম্যানদের নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হচ্ছে সিএনজি স্ট্যান্ড। অভিযোগ রয়েছে, যুবদলের কয়েকজন স্থানীয় নেতা অন্তরালে থেকে এই নিয়ন্ত্রণে যুক্ত।

ফুলগাজী সিএনজি স্ট্যান্ডে দায়িত্বপালনকারী তারেক জানান, চালকরা ধর্মঘটের চিন্তা করছে এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়টিও বিবেচনায় আনা উচিত। তবে তিনিও স্বীকার করেন, হঠাৎ ভাড়া বৃদ্ধি যৌক্তিক হয়নি।

অভিযোগ উঠেছে, আগে যেখানে প্রতিটি গাড়ি থেকে দৈনিক ২০ টাকা করে নেওয়া হতো, এখন তা বেড়ে ৩০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ভাড়া বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে চাঁদার অংকও। স্থানীয়দের মতে, এই বাড়তি অর্থ আদায়ের প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে যাত্রীদের ওপর।

যাত্রীদের ক্ষোভ সবচেয়ে বেশি ভাড়ার অসামঞ্জস্য নিয়ে। তারা বলছেন, ফেনী সদর হাসপাতাল থেকে পরশুরাম পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার ভাড়া যেখানে ৪৫ টাকা, সেখানে মাত্র ১৪/১৫ কিলোমিটার দূরের ফুলগাজীতে ভাড়া ৪০ টাকা। এই হিসাব মেলাতে পারছেন না কেউ। মুন্সীরহাট থেকে ফেনী পোস্ট অফিস পর্যন্ত ৩০ টাকা ভাড়া হলে, একই রুটের অন্য অংশে কেন ভিন্ন ভাড়া এ প্রশ্নও তুলছেন যাত্রীরা।

মুন্সীরহাটের যাত্রী আবদুল্লাহ বলেন, আমরা চালকদের কাছে জিম্মি হয়ে গেছি। সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ দরকার।
আরেক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা যেন দুর্ভাগা নাগরিক, যে সরকারই আসুক, ভোগান্তি কমে না।

উপজেলায় কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা নিয়মিত সিএনজিতে আসা-যাওয়া করেন। এই ভাড়া বৃদ্ধির আকস্মিকতায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ফেনী জেলায় নবগঠিত সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি মওদুদ আহমেদ রণি বলেন, মালিকের এই সংগঠনটির বয়স ৬ মাস। ইচ্ছে করলেও কিছু অনিয়ন্ত্রিত লোকজনকে সঠিকভাবে আনা কষ্টকর। পুরো জেলায় সংগঠনটির চিত্র ডিজিটালাইজড করা হবে। তিনি ভাড়া বৃদ্ধির প্রসঙ্গে বলেন, সিএনজি খুচরা যন্ত্রপাতি সহ সবকিছুর দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সহনীয় পর্যায়ে থাকলে সমস্যা নেই। অভিযোগের সূত্র ধরে  মওদুদ আহমেদ রণি ফুলগাজীসহ অন্যান্য সিএনজি স্ট্যান্ড তাৎক্ষণিকভাবে পরিদর্শন করছেন বলে জানান।

প্রশাসন অবশ্য ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। ফেনী বিআরটিএ সহকারী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. আল ফায়সাল বলেন, এই রুটে কোনো নিবন্ধিত শ্রমিক ইউনিয়ন নেই এবং প্রশাসনকে পাশ কাটিয়ে ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ নেই। তিনি জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহরিয়া ইসলামও বলেন, ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়নি এবং কিলোমিটারভিত্তিক ভাড়া নির্ধারণ বিআরটিএর বিষয়।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি যেন নতুন কিছু নয়, বরং পুরনো চিত্রেরই পুনরাবৃত্তি। ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি দৈনিক ফেনী পত্রিকায় প্রকাশিত ‘‘ফুলগাজীতে সিএনজি-টমটম হতে বছরে চাঁদা আদায়ের চিত্র অটোরিকশার মাসোহারা অর্ধ কোটি’’ শিরোনামে সংবাদের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, ফুলগাজীতে সিএনজি ও অটোরিকশা থেকে বছরে অর্ধকোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায়ের অভিযোগ। তখন দেখা যায়, প্রতিদিন প্রায় ৩০০ অটোরিকশা থেকে ২০ টাকা করে আদায় হয়ে দৈনিক ৬ হাজার টাকা, বছরে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ২১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। পাশাপাশি মাসিক ‘মান্থলি’ নামেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ছিল। অথচ কোনো নিবন্ধিত শ্রমিক সংগঠনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

একই বছরের ১২ এপ্রিলের দৈনিক ফেনীর শিরোনামে-ভোগান্তিতে উত্তরাঞ্চলে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ সূর্য অস্ত গেলেই বাড়ে অটোরিকশা ভাড়া’’ এই প্রতিবেদনে বলা হয়, সূর্যাস্তের পরপরই দ্বিগুণ হয়ে যায় সিএনজি ভাড়া। বৃষ্টি, মেঘলা আবহাওয়া, যাত্রী কম বা বেশি যে কোনো অজুহাতেই ভাড়া বাড়ানো হয়। বাস্তবে এখনো সেই চিত্র অপরিবর্তিত। দিনের ভাড়া একরকম, সন্ধ্যার পর আরেকরকম যেন কোনো নিয়ম-নীতির বালাই নেই।