একই রাতে ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক সড়কে ফুলগাজী বাজারের ইউনিক ল্যাব, একটি জুয়েলারি দোকান ও একটি মুদি দোকানে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ধারণা, গতকাল শনিবার (১১ জানুয়ারি) মধ্যরাতের কোনো একসময় এ চুরির ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
জানা গেছে, ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক সড়কের পূর্ব পাশে টিএস টাওয়ারের সন্নিকটে খোলা ও নোংরা পরিবেশের কারণে সেখানে মানুষের চলাচল কম। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চোরেরা পেছনের অংশে রাখি জুয়েলার্সের দেয়াল কেটে দোকানের ভেতরে প্রবেশ করে। এসময় তারা আনুমানিক ৩ থেকে ৪ ভরি স্বর্ণ, প্রায় ৫০ ভরি রৌপ্য এবং নগদ ২০ হাজার টাকা চুরি করে নিয়ে যায়। চুরির সময় জুয়েলারি দোকানের ভেতরের সবকিছু তছনছ করা হয়।
এর উত্তর পাশে অবস্থিত জালালের মুদি দোকানের পিছনের গ্রিলের দরজা কেটে ভেতরে প্রবেশ করে চোরেরা মুদি পণ্যসহ নগদ ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা নিয়ে যায়। স্থানীয়রা জানান, সংঘবদ্ধ চোর দেয়াল কাটা ও দরজার অংশে প্লাস্টিকের কালো পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখে।
জুয়েলারি দোকানের মালিক বিপুল বণিক ও মুদি দোকানের মালিক জালাল উদ্দীন জানান, তারা প্রতিদিনের মতো দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যান। গভীর রাতে চুরি হলে সন্দেহ করার মতো কাউকে শনাক্ত করা কঠিন বলে জানান তারা। তারা আরও জানান, থানায় লিখিত অভিযোগ না দিলেও পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
উপজেলা জুয়েলারি কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক সঞ্জয় বণিক বলেন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের চুরি অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক।
ফুলগাজী সদর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মো. আবুল কালাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে মাদকাসক্তরা এ ধরনের অপরাধে জড়াতে পারে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেন, দুর্বল বাজার কমিটি ও পর্যাপ্ত পাহারাদার না থাকায় এমন চুরির ঘটনা ঘটেছে। তাদের ভাষ্যমতে, হাজারো দোকান থাকলেও পাহারাদার মাত্র ৬ জন। প্রতিমাসে পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ চাঁদা দিয়েও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপদ রাখা যাচ্ছে না।
এদিকে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল হোসেন ভূঁঞা ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং খোঁজখবর নেন। আবুল হোসেন ভুঞা বলেন, এসব চোর বাইরের কেউ নয়, ফুলগাজী ভিতরের বাজার ও নদীর পাড়ে জুয়ার আসর বসে। মধ্য রাতে আগুন্তক অপরিচিত বা এলাকার কেউ হলেও পাহারাদারদের থানায় সোপর্দ ও পাহারাদার বৃদ্ধি, ভিতরের বাজার, শ্রীপুর রোড সহ বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোরে উপর গুরুত্বারোপ করেন।
ফুলগাজী বাজার ব্যবসায়ী পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক শহীদুল ইসলাম বলেন, প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করছে। এক্ষেত্রে বাজার পাহারাদারদের গাফিলতি প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, বর্তমানে পুরো বাজারে ৬ জন পাহারাদার রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রায় ৫ শতাধিক দোকানের বিপরীতে পাহারাদার মাত্র ৬ জন হলেও ইউনিক ল্যাব ও ইসলামি ব্যাংকের পিছনের প্রায় ৫০০ ফুট এলাকা সম্পূর্ণ অরক্ষিত। ইসলামি ব্যাংকের সিসিটিভি ক্যামেরা উত্তরমুখী হওয়ায় দক্ষিণ পাশের এলাকা নজরদারির বাইরে রয়েছে। দক্ষিণমুখী ক্যামেরা থাকলে বিষয়টি শনাক্ত করা সম্ভব হতো।
শহীদুল ইসলাম বলেন, অরক্ষিত ওই এলাকায় নিয়মিত তাস খেলা ও সিগারেট সেবনের মতো কর্মকাণ্ড চলে। বাজার থেকে প্রতিমাসে দোকানিদের কাছ থেকে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা আদায় হলেও ৬ জন পাহারাদারের বেতন ৫৪ হাজার টাকা এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীর বেতন ১৫ হাজার টাকা দিতে হয়। এ অবস্থায় এভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হবে না বলে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
ফুলগাজী থানা পুলিশের ওসি তদন্ত নুরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চুরির ভয়ে ভীত মানুষ
ফুলগাজীর রাত এখন আর নিস্তব্ধ নয়, রাত মানেই আতঙ্ক। কখন, কোথায় চোর ঢুকে পড়ে, কী নিয়ে যায় এই অনিশ্চয়তা নিয়েই ঘুমাতে যান মানুষ। সদর বাজার থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত চুরির ভয় সবখানে।
রবিবার (১১ জানুয়ারি) ফুলগাজী বাজারে জুয়েলারি ও মুদি দোকানে দুর্ধর্ষ চুরি সেই আতঙ্ককে আরও বাড়িয়েছে। থানার এক কিলোমিটারের মধ্যেই দেয়াল কেটে স্বর্ণালংকার লুটের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা সাধারণ মানুষের মাঝে। ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক সড়কের ইউনিক ল্যাব ও ইসলামি ব্যাংকের পেছনের অংশটি দিনের বেলায়ও নীরব। রাতে পরিণত হয় অন্ধকার এক গলিতে। নেই পর্যাপ্ত আলো, নেই সিসিটিভি, নেই কার্যকর পাহারা। এই সুযোগেই চোরেরা কালো পলিথিন দিয়ে আড়াল তৈরি করে দেয়াল কেটে দোকানে ঢুকে পড়ে।
বাজার কমিটির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫ শতাধিক দোকানের বিপরীতে পাহারাদার মাত্র ৬ জন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটা পাহারা নয়, এটা দায়িত্ব এড়ানোর নামান্তর।
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাড়ির উঠোন থেকে সিএনজি অটোরিকশা চুরি হয়ে যায় মুন্সীরহাট ইউনিয়নের বালুয়া গ্রামের চালক শাহাজাহানের। দুই সন্তানের জনক শাহাজাহান বলেন, এই গাড়িটাই ছিল আমার সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস। ব্যাংক বা সমিতির ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছিলাম। এক রাতেই সব শেষ। এখন ছেলেমেয়ের পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তিনি আরও বলেন, থানায় অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু দিন যায়, মাস যায়,গাড়ির কোনো খোঁজ নেই। এখন অন্যের গাড়ি ভাড়া চালাবো তা-ও পাওয়া যায় না।
শাহাজাহানের মতো অসংখ্য মানুষের কাছে চুরি মানে শুধু সম্পদ হারানো নয়, জীবন থেমে যাওয়া। ১৪ নভেম্বর শুক্রবার দিবাগত রাতে উপজেলা সদরের বৈরাগপুর গ্রামের তবজলের ছেলে টমটম চালক ছালেহ আহমেদের ঘরে এমন ঘটনায় এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
৩ ডিসেম্বর বুধবার গভীর রাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পানির মোটর চুরি হয়। সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় চোর শনাক্ত করা যায় নি। থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া জানুয়ারির শুরুতেই মুন্সীরহাট দক্ষিণ শ্রীপুরের আতাউল ও আলম ভুঞার বাহিরে থাকা বস্তা বোঝাই ধান নিয়ে যায় চোর। এর আগে দক্ষিণ শ্রীপুর গ্রাম থেকে পানির মোটর চুরি, পাকঘরে প্রবেশ করে গৃহস্থালি পন্য, বৈদ্যুতিক মিটার খুলে নিয়ে যায় চোর।
গত কয়েক মাসে মুন্সীরহাটের দক্ষিণ শ্রীপুর, বৈরাগপুর, আনন্দপুর, নোয়াপুর, ধর্মপুর, বসন্তপুর ও জিএম হাট এলাকায় ধান, পানির মোটর, সোলার ব্যাটারি, মসজিদের মাইক, বৈদ্যুতিক পাম্প ও টমটম চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। এসব নিয়ে থানায় অভিযোগ নেই। অনেকেই থানায় যান না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা বলেন, রাতে ঘুম হয় না। সামান্য শব্দ পেলেই মনে হয় চোর ঢুকেছে।
ফুলগাজী বাজারের এক মুদি দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চাঁদা দিই, পাহারাদার আছে, কিন্তু নিরাপত্তা নেই।
মুন্সীরহাটের এক গৃহবধূ বলেন, পানির মোটর চুরি হওয়ার পর থেকে রাতে একা থাকতেই ভয় লাগে।
জিএমহাট থেকে কয়েকমাস আগে গরু চুরির পর কৃষকরা বলেন, আগে গরু মাঠে রেখে আসতাম। এখন চুরি হয়ে যাবে ভয়ে ঘরেই রাখি। মুন্সীরহাট এলাকার এক তরুণ বলেন, চুরি এখন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে। এটিই সবচেয়ে ভয়ংকর।
১১ জানুয়ারি রবিবার ফুলগাজী বাজারের চুরির পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল হোসেন ভূঁঞা বলেন, এই চোরেরা বাইরের কেউ নয়। বাজারের ভেতরেই জুয়ার আসর বসে, নদীর পাড়ে রাতে সন্দেহজনক লোকজন জড়ো হয়।
তিনি আরও বলেন, মধ্যরাতে আগন্তুক হোক বা স্থানীয় পাহারাদারদের দায়িত্ব চোর ধরে থানায় সোপর্দ করা। পাহারাদার সংখ্যা বাড়াতে হবে। বাজারের ভেতরে, শ্রীপুর রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো জরুরি।পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
