এসময় যেখানে ছিলো হস্তচালিত তাঁতের কাপড় বুননের খুটখাট শব্দ শোনা যেতো বর্তমানে সেখানে শুনশান নীরবতা। বলছি ফুলগাজীর গান্ধী আশ্রম টাস্ট্রের কথা। চব্বিশের ভয়াবহ বন্যায় তাঁতযন্ত্র ও চরকাগুলো অকেজো হয়ে যায়। যার ফলে হস্তচালিত তাঁতের ফিরেনি ছন্দ। পরিত্যক্ত হওয়ায় এখন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে রূপ নিয়েছে তাঁতযন্ত্র আর চরকাগুলো।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে তৎকালীন সময়ে পাক-ভারত উপমহাদেশে হস্তচালিত কাঠের তৈরি চরকা দিয়ে শুরু হয় তাঁতশিল্পের যাত্রা। ১৯২১ সালে ভিনদেশি তৈরি কাপড় বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী। পরে ১৯২১ সালের ৩১ আগস্ট ফুলগাজীর নতুন মুন্সীরহাট (তৎকালীন বীরচন্দ্র) বাজারের পাশে ১০৬ শতক জায়গায় গড়ে তুলেন খাদি প্রতিষ্ঠান গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট। যা উদ্বোধন করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী নিজেই। তৎকালীন সময়ে হস্তচালিত তাঁত চরকার মাধ্যমে উৎপাদিত ধুতি, লুঙ্গি, গামছা, শাড়ী কাপড় জনপদের মানুষদের চাহিদা পূরণ হতো। পরে এই তাঁতশিল্পকে ঘিরেই অত্র এলাকায় তাঁতিদের বসবাস শুরু হয়।
প্রাথমিক অবস্থায় ১২টি হস্তচালিত তাঁত যন্ত্র মাধ্যমে উৎপাদিত হতো কাপড়। পালাক্রমে এগুলো ২৪ ঘন্টা চালানো হতো। সময়ের সাথে সাথে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল জীবন ব্যবস্থা। এক পর্যায়ে তাঁত শিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছিলো বাজার। পরবর্তীতে এই বাজারের নামকরণ করা হয় নতুন মুন্সিরহাট বাজার।
১৯৪৮ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই তাঁত শিল্পটি বন্ধ হয় যায়। নষ্ট হয়ে যায় সচল হস্তচালিত তাঁত যন্ত্র। যুদ্ধের পর বেশ কিছু তাঁতিরা জীবিকার তাগিদে চলে যায় কলকাতায়। পরবর্তীতে দেশ বিভাজনের পর যেসব তাঁতিরা ফুলগাজীতে থেকে যায় তারাই আবার এই শিল্পটি কে নতুন করে সচল করার চেষ্টা করেন। নোয়াখালী জেলার গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট প্রধান কার্যালয় থেকে সহযোগিতা নিয়ে আবারও চালু করা হয় হস্তচালিত তাঁত শিল্পটি।
২০১৩ ভারতীয় উপ-রাষ্ট্রদূত বাবু সন্দীপ চক্রবর্তী আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এখানে ৮টি তাঁত যন্ত্রের মাধ্যমে আবার চালু করেন এই শিল্পটি। বেশ কয়েকবছর এই তাঁত যন্ত্রে স্থানীয় তাঁতিরা কাপড় তৈরি করে চাহিদা মেটাতো এলাকার সাধারণ জনগণ। বর্তমানে অটো পাওয়ার মেশিনে কাপড় তৈরীর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় কাঁচামাল সুতা ও রং দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকায় ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ে এই প্রাচীন তাঁত শিল্পটি।
চব্বিশের বন্যার আগেও তাঁত শিল্প প্রকল্পের আওতায় ১টি চরকায় ৩ জন নারী শ্রমিক এবং সঞ্চয় ও ঋণ প্রকল্পের আওতায় জনবল ছিলো। দিনপ্রতি পণ্য তৈরির ওপর মজুরি দেওয়া হয় শ্রমিকদের, দুপুরে খাওয়া বাবদ পায় ৫০ টাকা করে। অথচ ট্রাস্ট প্রথম দিকে কথা ছিলো ২০ জন নারী শ্রমিক ৮টি তাঁত ও ১২টি চরকায় কাজ করা হবে। পরবর্তীতে তা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া থাকলেও বৃদ্ধি না পেয়ে বরং বন্ধের উপক্রম হয়ে যায়।
বন্যার পরবর্তীতে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বন্যায় গান্ধী আশ্রম আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্ধ হয়ে যায় তাঁতযন্ত্র ও চরকাগুলো। যার কারণে কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় উপজেলার অনেক গ্রামীণ নারী শ্রমিক বেকারত্ব সময় কাটাচ্ছে। ট্রাস্টে বর্তমানে মানবিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রকল্প (সঞ্চয় ও ঋণ কার্যক্রম) চালু রয়েছে। যেখানে ৬ জনবল রয়েছে। এছাড়াও নভেম্বর মাস থেকে হিউম্যান রাইটস এন্ড গুড গভমেন্ট নামে একটা নতুন প্রকল্প চালু রয়েছে। এটি নতুন মুন্সিরহাট ও দরবারপুর ইউনিয়নে চলমান হয়েছে।
স্থানীয় স্কুল শিক্ষক আবুল কালাম জানান, এই তাঁতশিল্প আমাদের ফেনীর ঐতিহ্য, আমরা চাই এই তাঁত খুব দ্রুত চালু করা হোক। এটা আমাদের প্রাণের দাবি।
গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের নতুন মুন্সিরহাট শাখা ব্যবস্থাপক সুবিমল দাস বলেন, চব্বিশ সালের বন্যায় আমাদের তাঁতশিল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে, যার ফলে আমরা হস্তচালিত তাঁতযন্ত্র ও চরকাগুলো এখনো চালু করতে পারিনি। তবে আমরা চেষ্টায় আছি। আশা রাখছি খুব শীঘ্রই এটির কার্যক্রম চালু হবে।
সুবিমল আরো বলেন, মানবিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রকল্প (সঞ্চয় ও ঋণ কার্যক্রম) চালুর পাশাপাশি বর্তমানে ফুলগাজীর দুটি ইউনিয়নে হিউম্যান রাইটস এন্ড গুড গভমেন্ট নামে একটা নতুন প্রকল্প চালু রয়েছে। ৬ জন অফিসে কর্মরত। তবে নতুন প্রকল্পের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আছে।
ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহরিয়া ইসলাম জানান, তাঁতশিল্পের বিষয়ে উপজেলায় কোনো প্রণোদনা আসেনি। ভবিষ্যতে বরাদ্দ আসল সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরা বন্যাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি।
