এক সময় গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি ঘরে বাঁশের তৈরি পণ্য ছিল অপরিহার্য। ডালা, কুলা, চালুন, খইচালা, ঝাঁপি কিংবা মাছ ধরার চাঁই-এসব ছাড়া সংসার ভাবাই যেত না। আধুনিকতার ছোঁয়া ও প্লাস্টিকের সস্তা বিকল্পের কারণে সেই বাঁশশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। তবুও ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার শতাধিক পরিবার পূর্বপুরুষের এ শিল্প আঁকড়ে বেঁচে আছে জীবিকার টানে, পাশাপাশি ধরে রেখেছে বাংলার ঐতিহ্য।

মুন্সীরহাট বাজারে বাঁশের খাঁচা, চালুন, টুকরি সাজিয়ে বসেছিলেন দরবারপুরের আলী মিজি বাড়ির ৬৫ বছরের মোহাম্মদ মোস্তফা। ৪৫ বছর ধরে এ পেশার সাথে যুক্ত। তিনি জানান, তাঁর বাবা-দাদাও একই কাজ করতেন। মোস্তফা বলেন, আগে বিক্রি ভালো হতো। শুকনো মৌসুমে হাটবারে ১০-১২ হাজার টাকা বিক্রি হতো। এখন ৪-৫ হাজার টাকা বিক্রি করতেও পারি না। তিনি বলেন, এখন প্লাস্টিকের জিনিস বাজারে আসায় বাঁশের জিনিসের কদর কমে গেছে। তবুও অন্য কোনো কাজ শিখিনি, তাই এটাই আঁকড়ে আছি।”

একই বাজারে বসে পণ্য বিক্রি করছিলেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক তাজুল হক। অবসরের পর ব্যবসা করতে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়লেও তিনি দমে যাননি। জীবিকার টানে ফিরে এসেছেন বাঁশের দোকানে।

জামমুড়া গ্রাম থেকে আসা চল্লিশোর্ধ্ব পারভীনও বাঁশের তৈরি জিনিস বিক্রি করে সংসার চালান। পরশুরাম পৌরসভার খন্দিকিয়া এলাকার ষাটোর্ধ বশরও মুন্সীরহাট বাজারে বাঁশের শিল্প সাজিয়ে বিক্রির উদ্দেশ্যে বসে রয়েছেন। বললেন, আগের মতো বেচাকেনা নেই।


শুধু পুরুষ নয়, বাঁশশিল্পের সাথে যুক্ত নারীর সংখ্যাও কম নয়। আমজাদহাট ইউনিয়নের ইসলামিয়া বাজারের টিনসেড ঘরে বসে বাঁশ কেটে পণ্য তৈরি করেন ষাটোর্ধ্ব খায়েরের নেছা। ২০ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসার চালাতে এ পেশা শেখেন তিনি। এখন মেয়ে আমেনাকেও শিখিয়েছেন। আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেন, “বাঁশের দাম বহুত, এক জোড়া বাঁশ দি পাঁচ জোড়া লাই বানান যায়। একজোড়া বাঁশের দাম ৫শ টেঁয়া আর এক জোড়া লাইয়ের দাম অইলো ৫শ টেঁয়া”। খায়েরের নেছা বলেন, আগে শরীর ভালা আছিলো রুজিও অইতো অনগা মাসে ৭-৮ হাজার টেঁয়া হাই। বাজারে বেচি, বাড়ী বাড়ী যাই বেচি। এই কাম না জানলে ভিক্ষা করন লাগতো।”

একই কাজ করেন ইসলামিয়া বাজারের শ্যামলা। শ্যামলার স্বামী নাই, এক ছেলে বিয়ে করে শ্বশুর বাড়ি থাকেন। খবর রাখেন না অসুস্থ মা শ্যামলার।

আমজাদহাটের তারাকুচা এলাকার সেলিনা আক্তারও বাঁশ দিয়ে পণ্য তৈরির কারিগর। তিনি বলেন, একসময় গ্রামের অনেকেই ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা হতো। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এ কাজে যুক্ত ছিলো। তবে বর্তমানে মূল্য বৃদ্ধি ও বাজারে বাঁশের চাহিদা কমে যাওয়ায় আমাদের পণ্য বিক্রি করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। জানা গেছে শুধু আমজাদহাটের ফেনা পুস্করিণী, তারাকুচা, পূর্ব বসন্তপুর সহ বিভিন্ন গ্রামে ৫০ জনের মতো বাঁশশিল্পের কারিগর রয়েছে। এদের অর্ধেকের বেশি মহিলা।

দরবারপুরের উত্তর শ্রীপুরের হালিমা বেগম (৬৫) ও তার মেয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এ পণ্য বিক্রি করেন। প্রতিদিন বিক্রি হয় না। হালিমা বেগমের স্বামী রহিম উল্লাহ বলেন, এক জোড়া বাঁশ গ্রাম থেকে কিনে নিয়ে তা খন্ড খন্ড করে কেটে বিভিন্ন পণ্য বানাতে প্রস্তুতি নিতে সময় লাগে ১-২ দিন। তৈরি করতেও একসপ্তাহ লাগে। মাসে ৭-৮ হাজার টাকা আয় করতে অনেক পরিশ্রম করা লাগে। প্লাস্টিকের পণ্যের কারণে বাঁশের পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। আমরা এখনো অনেকেই এ কাজের ওপর নির্ভরশীল।

বাঁশ শিল্পের স্থানীয় কারিগরদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এ পেশার সাথে জড়িত পুরুষরা গ্রামঘুরে বাঁশ ক্রয়ের পর তা আকার অনুযায়ী কেটে নেন। কেটে নেয়া অংশ থেকে বাঁশের পাতলা ও চিকন ছাঁচ তৈরি করে তা দিয়ে ডালা, কুলা, চালুনসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী তৈরি করা হয়।

সরেজমিনে মুন্সীরহাট বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে এখনো বিক্রি হয় খাঁচা ১০০ টাকা, চাঁই ২৫০-৫০০ টাকা, লাই বা কোড়া ৩০০ টাকা, চালুন ১৫০ টাকা, কুলা ২৫০ টাকা, মোড়া ৩৫০ টাকা, টোকরি ১৫০ টাকা, ঝাড়ু ১০০ টাকা। কিন্তু একসময়কার চাহিদার তুলনায় এখন ক্রেতা অল্প।

অন্যদিকে বাঁশের দামও কয়েকগুণ বেড়েছে। আগে এক জোড়া বাঁশে তৈরি পণ্যে ভালো মুনাফা থাকলেও এখন সেই সুযোগ নেই। ফলে অনেকে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

কারিগররা জানান, শতাধিক বাঁশশিল্পের কারিগর উপজেলার জামমুড়া, দঃ তারালিয়া, বালুয়া, কামাল্লা, মনতলা, গাবতলা, দৌলতপুর, বসন্তপুর, বশিকপুর, শরীফপুর, পেঁচিবাড়ীয়া, আনন্দপুরসহ বহু গ্রামে বসবাস করছেন। এদের অর্ধেকের বেশি নারী।

কারিগররা মনে করেন, সরকারি বা স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নিলে এই ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব। ব্র্যাক ইতিমধ্যে এ ক্ষেত্রে কিছু সহায়তা দিচ্ছে।

ব্র্যাকের স্মার্ট স্টুডেন্ট ফিন্যান্সের কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অফিসার মিনু ত্রিপুরা বলেন, “দরবারপুরের উত্তর শ্রীপুর গ্রামের রাজিয়া সুলতানা সুমির মতো অনেকেই ঋণ নিয়ে বাঁশশিল্পকে ধরে রেখেছেন। এ ধরণের সহায়তা বাড়ালে এ শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।”


এ বিষয়ে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) ফেনীর সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ হানিফ বলেন, এখনো বাঁশশিল্পের কারিগরদের কোনো জরিপ নেই। তবে নিবন্ধন করলে ঋণ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করা সম্ভব। প্লাস্টিকের কারণে ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ইচ্ছে থাকলে তা রক্ষা করা যাবে।

ঐতিহ্যের ধারক এই বাঁশশিল্প আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। অথচ এখনো শতাধিক পরিবার জীবিকার পাশাপাশি সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রেখেছে নিজের ঘামের বিনিময়ে। সরকার ও স্থানীয় সহায়তা পেলে হয়তো এই শিল্প নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে। নইলে একদিন বাঁশের জিনিস কেবলই জাদুঘরের প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ হবে।