নিজেকে জানার ক্ষুধা বা কৌতুহল সেই মহামতি সক্রেটিসের থেকে শুরু। আড়াই হাজার বছর পেরিয়ে এখনো কারো কারো ওপর ভর করে সক্রেটিসের দায়। তাইতো তারা ঘুম-নিদ আর খানা-পিনা ছেড়ে শেকড়ের সন্ধানে ছুটে দিগন্ত থেকে দিগন্তে। তেমনই একজন গবেষক আরিফ রিজভী। তিনি তার শেকড়ের সন্ধানে হাতড়ে বেড়িয়েছেন দেড়শ বছরের পেছন থেকে।

প্রশাসনিক কাঠামোগত ফেনীর দেড়শো বছরের পথচলায় একটি সংকলন, সম্পাদনা ও কালের তথ্যভিত্তিক সেতুবন্ধন হলো আরিফ রিজভীর ‘ফেনী: কালের ইতিহাস’ শীর্ষক সম্পাদিত বইটি। 

ফেনীর ইতিহাস কেবল একটি জনপদের প্রশাসনিক বিবর্তনের কাহিনি নয়; এটি পূর্ববাংলার সমাজ-সংস্কৃতি, প্রতিরোধ, ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং লোকজ স্মৃতিরও এক দীর্ঘ চলমান দলিল। অথচ বিস্ময়করভাবে এই অঞ্চলকে ঘিরে সুসংহত ইতিহাসচর্চা খুব বেশি হয়নি। বিচ্ছিন্ন স্মৃতি, দুর্লভ প্রকাশনা আর হারিয়ে যেতে বসা দলিলের ভেতর ছড়িয়ে থাকা ইতিহাসকে একত্র করার যে শ্রমসাধ্য প্রয়াস, তারই উল্লেখযোগ্য ফসল গবেষক আরিফ রিজভী সম্পাদিত গ্রন্থ ‘ফেনী: কালের ইতিহাস’।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ফেনী মহকুমা প্রতিষ্ঠার দেড়শো বছর পূর্ণ হয়েছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখার দায় থেকেই বইটির জন্ম। প্রায় সাড়ে তিনশো পৃষ্ঠার এই সংকলন কেবল তথ্যের সমাবেশ নয়; এটি সময়, স্মৃতি ও ইতিহাসের মধ্যে এক সেতুবন্ধন। গ্রন্থটি তেত্রিশটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত। শুরু হয়েছে ১৭৯৮ সালে ফ্রান্সিস বুকাননের রোজনামচায় বর্ণিত ফেনীকে দিয়ে, আর প্রধান পরিসর বিস্তৃত হয়েছে ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত ‘শতবর্ষে ফেনী’ পর্যন্ত। এর বাইরেও সম্পাদক প্রাসঙ্গিক নানা লেখা যুক্ত করেছেন, যাতে পাঠক একটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ভেতর প্রবেশ করতে পারেন।

গ্রন্থটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সম্পাদনা-দৃষ্টি। সংকলিত লেখাগুলোর মূল বানানরীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ফলে পাঠক কেবল ইতিহাস নয়, বিভিন্ন সময়ের ভাষা ও বানান-চর্চারও একটি বিবর্তন প্রত্যক্ষ করতে পারবেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো প্রতিটি লেখার শেষে যুক্ত ‘প্রসঙ্গ’ অংশ। এখানে সম্পাদক সমকালীন তথ্য, বিশ্লেষণ, রেফারেন্স ও প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে মূল লেখাকে নতুন পাঠপ্রসঙ্গ দিয়েছেন। কোথাও কোথাও তিনি লেখকের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে তুলনামূলক নির্ভুল ও হালনাগাদ তথ্যও উপস্থাপন করেছেন। এই সততা ও নিরপেক্ষতাই বইটিকে সাধারণ সংকলনের সীমা ছাড়িয়ে গবেষণামূলক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

ইতিহাসচর্চায় একটি বড় সংকট হলো দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ভুল তথ্যের পুনরাবৃত্তি। ‘ফেনী: কালের ইতিহাস’ সেই জায়গায়ও সচেতন। উদাহরণ হিসেবে শর্শদির মুঘল নায়েব মোহাম্মদ আলী চৌধুরীকে ঘিরে প্রচলিত ‘খলনায়ক’ তকমাকে সম্পাদক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে খণ্ডন করেছেন এবং তাঁকে নতুনভাবে মূল্যায়নের চেষ্টা করেছেন। ইতিহাসের এই পুনঃপাঠ বইটির অন্যতম শক্তি।

বইটির ভূমিকাজুড়ে যেন এক ধরনের আক্ষেপও কাজ করে—আমরা আমাদের ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষণ করিনি। নবীনচন্দ্র সেন তাঁর আত্মজীবনীতে সমকালীন সমাজকে যতখানি তুলে ধরেছেন, তা মূল্যবান হলেও সীমাবদ্ধ। জমির আহমেদ কিংবা কাজী মোজাম্মেল হকের মতো গবেষকের কাজ ইতিহাসপিপাসুদের তৃষ্ণা মেটালেও সেসব প্রয়াস ছিল বিচ্ছিন্ন। ভাষা আন্দোলনে আলোচিত সাপ্তাহিক সংগ্রাম-এর কোনো কপি আজ আর পাওয়া যায় না; বিলোনিয়া যুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষিত হলেও মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাটের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ অনুপস্থিত। এই অপূর্ণতার বেদনাই যেন বইটির অন্তঃস্রোত।

তবে গ্রন্থটি নিছক অতীতের স্মারক হয়ে ওঠেনি। বরং এটি ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্যও একটি ভিত্তি নির্মাণ করেছে। সম্পাদক বারবার মনে করিয়ে দেন—ইতিহাস কেবল গৌরবের নয়, সংরক্ষণেরও বিষয়। আর সেই সংরক্ষণ যদি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে না ঘটে, তবে বহু গুরুত্বপূর্ণ দলিল সময়ের অতলে হারিয়ে যাবে।

প্রচ্ছদ এঁকেছেন অতিথি নারায়ণ। প্রকাশ করেছে দৈনিক ফেনী। বইটির মুদ্রণ, বিন্যাস ও তথ্যসমৃদ্ধ উপস্থাপন পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখে। ইতিহাসভিত্তিক সংকলন হয়েও এটি নিছক শুষ্ক তথ্যপঞ্জি নয়; বরং পাঠককে বারবার ফিরিয়ে নেয় এক বিস্মৃত ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক স্মৃতির ভেতর।

সব মিলিয়ে ‘ফেনী: কালের ইতিহাস’ কেবল একটি বই নয়, এটি ফেনীর দেড়শো বছরের আত্মকথা। যে কোনো ইতিহাস-অনুরাগী পাঠক, গবেষক কিংবা শেকড়সন্ধানী মানুষের জন্য গ্রন্থটি হয়ে উঠতে পারে এক অনিবার্য পাঠ।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)