‎৫ই আগস্টের পর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি চোখে পড়ছে, তা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং একটি উদ্বেগজনক প্রবণতায় রূপ নিয়েছে। শহর থেকে গ্রাম, প্রায় সর্বত্রই সাধারণ মানুষ এক ধরনের অনিরাপত্তা বোধ করছেন। বিশেষ করে মবের দৌরাত্ম্য, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হচ্ছে।

‎মব সংস্কৃতি এখন একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছোটখাটো সন্দেহ বা গুজবের ভিত্তিতে জনতা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিচ্ছে, যা আইনের শাসনের জন্য মারাত্মক হুমকি। একই সময়ে চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের বিস্তার প্রমাণ করে যে অপরাধীরা আগের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

‎অন্যদিকে, গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত হানছে ফসলি জমির উর্বর মাটি কেটে নেওয়ার প্রবণতা। স্বল্পমেয়াদি লাভের আশায় এই ধরনের কর্মকাণ্ড দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদনকে বিপন্ন করছে। একইভাবে অবৈধ বালু মহল ব্যবসা শুধু পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে না, বরং নদীভাঙনসহ নানা প্রাকৃতিক ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রভাবশালী চক্র সক্রিয়—এমন অভিযোগও নতুন নয়।

‎সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান। অল্প বয়সী তরুণদের একটি অংশ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি। এর পেছনে পারিবারিক অবহেলা, সামাজিক অবক্ষয় এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার বড় ভূমিকা রাখছে।

‎এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি সংবেদনশীল বিষয় সামনে আসে—ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কিছু বিচ্ছিন্ন সুবিধাবাদী কর্মী-সমর্থকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ। যদি কোনো ব্যক্তি দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে আইনের ঊর্ধ্বে থাকার চেষ্টা করে, তবে তা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেই দুর্বল করে না, সরকারের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই এ ধরনের প্রবণতার বিরুদ্ধে দলীয় ও প্রশাসনিক—দুই পর্যায়েই কঠোর অবস্থান নেওয়া অপরিহার্য।

‎সমাধানের পথ একমাত্র কঠোরতা নয়, বরং সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মব সহিংসতার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। তৃতীয়ত, অবৈধ বালু মহল ও ভূমি দখল রোধে নিয়মিত অভিযান এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

‎কিশোর গ্যাং সমস্যার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আইনগত ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সমন্বিত ভূমিকা। তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ বাড়ানো—এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে।

‎একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের ভেতরে শৃঙ্খলা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো সুবিধাবাদী গোষ্ঠী যেন দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অনিয়ম করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর বার্তা দিতে হবে। এতে সরকার যেমন উপকৃত হবে, তেমনি জনগণের আস্থাও বৃদ্ধি পাবে।

‎বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা—তারা যেন দৃঢ়তা, ন্যায়পরায়ণতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। শক্ত হাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। এখন সময় দ্রুত, কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার—যাতে মানুষ আবারও নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে পারে।

‎এতে স্হানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি নির্বাচিত সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক সমাজ, সচেতনত নাগরিক সবাই বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।

‎লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক