ফেনীতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ সংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন গ্রাহকরা। সরকার ঘোষিত দামে বাজারে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার মিলছে না। সরবরাহ কম থাকার সুযোগে ১ হাজার ৩০৬ টাকার এলপিজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। বেশি দাম দিয়েও এলপিজি পাচ্ছেন না কেউ কেউ। অনেকে বিদ্যুৎ-চালিত চুলা কিনে রান্নার কাজ সারছেন। দুই সপ্তাহ ধরে এমন পরিস্থিতি চলছে।

১৯১০ সালে আমেরিকাতে এলপি গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং ১৯১২ সাল থেকে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়, যা মূলত রান্না ও গরম করার কাজে ব্যবহৃত হতে শুরু হয়। পরবর্তীতে এটি যানবাহন ও শিল্পে ব্যবহৃত হতে থাকে, বাংলাদেশে ১৯৭০-এর দশকে এর গার্হস্থ্য ব্যবহার জনপ্রিয়তা পায়। বিশ্বব্যাপী এই গ্যাসের ব্যবহার রয়েছে। গ্যাস উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে, অ্যাঙ্গোলা, আজারবাইজান, ইরাক, মালয়েশিয়া, মোজাম্বিক, নরওয়ে, পেরু এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ জোটের সদস্যভুক্ত দেশগুলো বিশ্বে ব্যবহৃত প্রায় ৭১ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করে। অপর দিকে বিশ্বে গ্যাস রপ্তানির মোট ৮০ শতাংশই জোগান দেয় ১০টি দেশ। ১০ গ্যাস রপ্তানিকারক দেশের শীর্ষ রয়েছে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই দুই-দেশ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন এবং প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্বে নেতৃত্ব দিয়েছে।

এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার সংকটের নেপথ্যে রয়েছে ১৮টি কোম্পানি এলপি গ্যাস বাজারজাত করছে। কিন্তু লাইসেন্স নিয়েছে ৫৮টি প্রতিষ্ঠান। বাকিরা বাজারে নাই। সিলিন্ডার গ্যাসেরও অনেক কোম্পানি আছে, যার মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো বসুন্ধরা এলপিজি, ওমেরা এলপিজি, যমুনা গ্যাস, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি, বিএম এনার্জি, লাউফস গ্যাস, টোটালগ্যাস, নাভানা এলপিজি, এলপি গ্যাস লিমিটেড, মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি, ইন্ডেক্স এলপি গ্যাস লিমিটেড প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য কোম্পানি। কোম্পানিগুলো বিভিন্ন আকারের সিলিন্ডারে (যেমন: ৫ কেজি, ১২ কেজি, ৪৫ কেজি) গ্যাস সরবরাহ করে থাকে। এলপিজি পানির চেয়ে হালকা হওয়ায় ১ কেজি এলপিজি বেশি আয়তন দখল করে, যা প্রায় ১.৮ থেকে ২.০ লিটার। এই সমস্ত কোম্পানি সিন্ডিকেট করে দাম বৃদ্ধি করে সংকট তৈরি করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশের এলপি গ্যাসের বাজার এখন ৩২ হাজার কোটি টাকার। প্রতিনিয়ত পণ্যটির বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে অসম একটা প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বাজারে একধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের সংকট কমাতে সরকার কী পরিকল্পনা নিয়েছে, তা আমরা জানিনা।

বাংলাদেশে এলপিজি নীতিমালা হয় ২০১৬-১৭ সালে। ২০১৬ সালে খসড়া নীতিমালা হয়েছিল। ২০১৭ সালে চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু নীতিমালায় কিছু বিষয় কেউ মানতে চাচ্ছে না। তা হলো, নীতিমালায় আছে কমপক্ষে পাঁচ হাজার টন এলপিজির ইনস্টলেশন করতে হবে। এ পরিমাণ মজুদ না থাকলে সারা দেশে সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যদি এলপিজি সরবরাহ করতে হয়, সব জায়গায় একটা ফ্যাসিলিটি তৈরি করতে হবে। যদি কোনো উদ্যোক্তা এটা না করেন তাহলে এখানে কাজ করা সম্ভব হবে না। এলপিজির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্টোরেজ ও ইমপোর্ট। আমাদের নিজস্ব কোনো এলপিজি নেই। রিফাইনারি থেকে মাত্র ১৫ হাজার টন আসে। বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন এলপি গ্যাস কোম্পানি বিতরণ করে, যা শতকরা ২ ভাগের বেশি না। যেখানে গ্যাসের সিলিন্ডার নেয়া যাবে না, সেখানে লাইনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাইপের মাধ্যমে যে সংযোগ দেয়া হয়- এটাকে বলা হয় ‘রেটিকুলেটেড সিস্টেম’। এখন এ ব্যবস্থায় বেশির ভাগ অ্যাপার্টমেন্টে সংযোগ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু একক বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটা হচ্ছে ইমপোর্ট। এরপর স্টোরেজ, এটা খুব ব্যয়বহুল। এরপর বিতরণের জন্য এলপিজি সিলিন্ডার লাগবে। এখানে বিশাল একটা খরচের ব্যাপার আছে। এরপর বিতরণের জন্য নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। বিতরণের পর আবার স্টোরেজ করতে হবে। আবার রেটিকুলেটেড সিস্টেম করতে হবে। এটা অনেকটাই গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মতো কাজ। স্বল্প মূলধনে এটা করা সম্ভব না।

আমরা দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছি বাংলাদেশে অধিকাংশ ব্যবসায়ী নিজেদের স্বার্থ দেখেন। অর্থাৎ শুধুমাত্র মুনাফার চিন্তায় তাঁরা মশগুল থাকেন। ভোক্তাদের অসুবিধার কথা খুবই কম চিন্তা করা হয়। বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা যখন মন্ত্রী-এমপি হয়, তখন ব্যবসার স্বার্থ দেখেই আইন প্রনয়ণ করা হয়। দেশ ও জনগণের স্বার্থ সেখানে জলাঞ্জলি দেয়া হয়। দুর্নীতি আমাদের নীতি নির্ধারকদের রক্তে মিশে গিয়েছিলো। প্রত্যেক সরকারি প্রকল্প হতে দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করা হতো। এমন কোন প্রতিষ্ঠান নাই, যেখানে দুর্নীতি হতো না। আজকের এলপিজি সংকটের পেছনে দুর্নীতিকেই অনেকে দায়ি করেছেন। এলপিজি নীতিমালাতেই গন্ডগোল বলে মনে করেন অনেকেই। সাথে যুক্ত হয়েছে- অসাধু ব্যবসায়ীদের মুনাফার লোভ। গ্যাস সিলিন্ডার মজুত রেখে ‘সংকট’ দেখিয়ে দাম বাড়ানো হয়েছে। তাছাড়া, গ্যাস সিলিন্ডারে ওজনে কম দেয়ার অভিযোগ সবসময় পাওয়া যায়। আমরা মনে করি, এলপিজি গ্যাস আমদানি, বিপনন, উৎপাদন, ডিলার কমিশন ইত্যাদির জন্য সময়োপযোগি ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি। অসাধু ব্যবসায়ীরা যেনো গ্যাস মজুত করে ভোক্তাদের কষ্ট দিতে না পারেন, যেনো ওজনে কম দিতে না পারেন- সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদেরকে আমদানি পর্যায়ে মূল্য সাশ্রয়ের জন্য বিকল্প দেশ খুঁজে বের করতে হবে। গ্যাস ব্যবসায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং আগামীর নির্বাচিত সরকারের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে, ভোক্তাদের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে দ্রুত গ্যাস সংকট নিরসনের ব্যবস্থা নেবেন।

লেখক: ফেনী প্রতিনিধি, দৈনিক দেশ রুপান্তর ও ইউএনবি