বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী মার্কিন চিন্তক গোর ভিদাল একবার গণতন্ত্র সম্পর্কে এমন একটি মন্তব্য করেছিলেন, যা আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আর নিছক ব্যঙ্গ বলে মনে হয় না; বরং মনে হয় এক গভীর ভবিষ্যদ্বাণী। তিনি বলেছিলেন, দৃশ্যত গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কোনো উপযুক্ত ইস্যু ছাড়াই বিপুল অর্থ ব্যয় করে একের পর এক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রার্থী হন মূলত তারাই, যারা খুব সহজেই বিনিময়যোগ্য কিংবা বিক্রি হয়ে যান। এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার নৈতিক দেউলিয়াত্ব, নির্বাচনের বাণিজ্যিক চরিত্র এবং রাজনীতির আদর্শহীনতার পূর্ণ মানচিত্র আঁকা আছে।

গণতন্ত্র শব্দটি উচ্চারণ করলেই আমরা সাধারণত একটি পবিত্র অনুভূতির মুখোমুখি হই। মনে হয়, এটি এমন এক ব্যবস্থা যেখানে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায়, কোনো ব্যবস্থাই কেবল নামের কারণে পবিত্র থাকে না। ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ জাক রুশো বহু আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন, “ইংরেজ জনগণ নিজেকে স্বাধীন মনে করে, কিন্তু তারা কেবল নির্বাচনের দিনটুকুই স্বাধীন; নির্বাচনের পর তারা আবার দাসে পরিণত হয়।” এই কথাটি আজ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ- প্রায় সব নির্বাচনী গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেই অস্বস্তিকরভাবে সত্য।

আদর্শগতভাবে গণতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল নৈতিকতার ভেতর দিয়ে। অ্যারিস্টটল রাজনীতিকে বলেছিলেন মানুষের সম্মিলিত কল্যাণ সাধনের শিল্প। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় রাজনীতি আর শিল্প নয়, এটি একটি শিল্পোৎপাদন- যেখানে অর্থ বিনিয়োগ হয়, প্রচারণা উৎপাদিত হয়, এবং ক্ষমতা হয়ে ওঠে চূড়ান্ত পণ্য। নির্বাচন এখন আর জনস্বার্থের প্রশ্নে মতের সংঘর্ষ নয়; এটি একটি ব্যয়বহুল আয়োজন, যেখানে যে যত বেশি অর্থ ঢালতে পারে, তার তত বেশি সম্ভাবনা থাকে ক্ষমতার দরজায় পৌঁছানোর।

এই অর্থনির্ভর ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো- রাজনীতিকদের চরিত্র বদলে যাওয়া। গোর ভিদাল যে ‘বিনিময়যোগ্য’ রাজনীতিকের কথা বলেছেন, তারা আদর্শ দিয়ে নয়, সুবিধা দিয়ে নিজেদের সংজ্ঞায়িত করে। আজ তারা এক দলে, কাল আরেক দলে; আজ তারা এক নীতির পক্ষে, কাল তার বিপক্ষে। ইতালীয় চিন্তক আন্তোনিও গ্রামশি লিখেছিলেন, “সংকট তখনই ঘটে, যখন পুরোনো মরছে কিন্তু নতুন জন্ম নিতে পারছে না।” আমাদের রাজনীতি ঠিক এই সংকটের ভেতর আটকে আছে- পুরোনো আদর্শ মৃত, কিন্তু নতুন নৈতিক রাজনীতির জন্ম হয়নি।

বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থার দিকে তাকালেই এই সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে নির্বাচন হয়, কিন্তু ইস্যু থাকে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার- এসব মৌলিক প্রশ্ন নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে না। বরং আবেগ, ভয়, বিভাজন ও অতীতের প্রতিহিংসা দিয়ে ভোটারকে প্রভাবিত করা হয়। নাগরিক এখানে আর সচেতন রাজনৈতিক সত্তা নয়; সে হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রিত একটি সংখ্যা। জার্মান দার্শনিক হান্না আরেন্ট একে বলেছিলেন “গণমানুষের রাজনীতি”, যেখানে চিন্তার বদলে প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই বাস্তবতায় ভোটার এক গভীর নৈতিক সংকটে পড়ে। সে জানে, অধিকাংশ প্রার্থীই যোগ্য নন, সৎ নন কিংবা আদর্শনিষ্ঠ নন। কিন্তু সে এটাও জানে, ভোট না দিলে ক্ষমতার খেলাটা আরও নির্বিঘ্ন হয়ে যাবে। ফলে ভোট দেওয়া ও না দেওয়া- দুটোই যেন অপরাধের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে যায়। এই দ্বন্দ্বই আধুনিক গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

যুক্তরাষ্ট্রে এই সংকট আরও পরিশীলিত রূপে উপস্থিত। সেখানে নির্বাচন হয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে, কিন্তু নির্বাচনের নিয়ন্ত্রক শক্তি মূলত করপোরেট অর্থনীতি। অস্ত্র শিল্প, তেল কোম্পানি, প্রযুক্তি জায়ান্টদের অর্থায়ন ছাড়া বড় কোনো প্রার্থী কার্যত অচল। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার একবার বলেছিলেন, “যুক্তরাষ্ট্র আর কার্যত গণতন্ত্র নয়, এটি একটি অলিগার্কি, যেখানে সীমাহীন রাজনৈতিক ঘুষ প্রভাব বিস্তার করছে।” এই উক্তি গোর ভিদালের বক্তব্যকে আরও ভয়াবহভাবে সত্য প্রমাণ করে।

ভারতে নির্বাচন হয় বিপুল জনসমাগম ও বিপুল ব্যয়ের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেখানে গণতন্ত্র ক্রমে সংখ্যাগরিষ্ঠতার আধিপত্যে রূপ নিচ্ছে। নির্বাচন এখানে আর নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন নয়; এটি পরিচয় ও আনুগত্যের পরীক্ষা। জন স্টুয়ার্ট মিল বহু আগেই সতর্ক করেছিলেন, “সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার সংখ্যালঘুর জন্য স্বৈরাচারের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।” আজকের ভারতীয় রাজনীতি সেই সতর্কবার্তারই এক বাস্তব রূপ।

ইউরোপেও গণতন্ত্র সংকটমুক্ত নয়। অভিবাসন, ইসলামভীতি ও ডানপন্থার উত্থান দেখিয়ে দিচ্ছে- নির্বাচন থাকলেই মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা পায় না। এখানে নির্বাচন হচ্ছে, কিন্তু নৈতিক সাহস ক্রমে সঙ্কুচিত হচ্ছে। ভ্যাকলাভ হাভেল বলেছিলেন, “গণতন্ত্র কেবল প্রক্রিয়া নয়, এটি নৈতিক অবস্থান।” সেই অবস্থান দুর্বল হলেই গণতন্ত্র ফাঁপা হয়ে পড়ে।

এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গোর ভিদালের মন্তব্য আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়- গণতন্ত্র আজ অনেকটাই একটি অভিনয়, যেখানে নির্বাচন হচ্ছে মঞ্চ, রাজনীতিকরা অভিনেতা, আর নাগরিকেরা অধিকাংশ সময় নীরব দর্শক। কিন্তু দর্শক হয়ে থাকাই সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ নীরবতা শেষ পর্যন্ত অন্যায়ের সবচেয়ে বড় সহযোগী হয়ে ওঠে।

এই লেখার উদ্দেশ্য গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা নয়, বরং তাকে উদ্ধার করার আকুতি জানানো। গণতন্ত্র তখনই অর্থবহ হবে, যখন নির্বাচন আবার ইস্যুভিত্তিক হবে, রাজনীতি আবার নৈতিক সাহসের জায়গা হবে, এবং নাগরিক আবার প্রশ্ন করতে শিখবে। কারণ প্রশ্নহীন গণতন্ত্র মানেই শাসকের স্বর্গ। গোর ভিদালের তিক্ত সত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়- গণতন্ত্র কোনো উত্তর নয়, এটি একটি প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করাই হলো প্রকৃত নাগরিকত্ব।

কলামিস্ট ও সংগঠক