ফেনীর নির্বাচনী রাজনীতিতে এবার সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠেছে তরুণ ভোটাররা। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দলভিত্তিক ভোটব্যাংক ও রাজনৈতিক হিসাব কি এবারও আগের মতো কাজ করবে, নাকি তরুণ প্রজন্ম বদলে দেবে রাজনীতির চিত্র এই প্রশ্নই এখন ফেনীর তিনটি আসনের নির্বাচনী মাঠে ঘুরপাক খাচ্ছে।
দৈনিক ফেনী পত্রিকার সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী জেলায় মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ দশমিক ৬০ শতাংশই তরুণ। সংখ্যায় যা প্রায় ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫০ জন।
এই তরুণ ভোটাররা ভোটকে আর শুধু আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব হিসেবে দেখছে না। তাদের কাছে ভোট মানে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনে অংশ নেওয়ার সুযোগ। তারা বিশ্বাস করে, সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাজনীতিতে নতুন ধারার সূচনা সম্ভব। এই মানসিকতা ফেনীর তিনটি সংসদীয় আসনেই পুরনো দলভিত্তিক ভোটব্যাংকের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
জুলাই মাসে শুরু হওয়া আন্দোলন এবং ৫ আগস্টের রাজনৈতিক তৎপরতা দেখিয়েছে, এই প্রজন্ম কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসী নয়। এসব অভিজ্ঞতা তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা আরও দৃঢ় করেছে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে। তারা শুধু ক্ষমতায় থাকা দলকে নয়, বরং যোগ্য, দক্ষ ও সৎ নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এই তরুণদের কাছে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে, যারা স্থানীয় সমস্যাগুলো বুঝবে এবং সেগুলোর কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করবে। নিজেদের ভোটাধিকার ব্যবহার করে তারা পুরনো রাজনৈতিক হিসাবকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে এবং এমন প্রতিনিধিত্ব চায়, যারা এলাকার সংকটগুলো জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে সক্ষম হবে।
তবে তরুণ ভোটারদের এই আগ্রহ ও প্রত্যাশার পাশাপাশি কিছু উদ্বেগও রয়েছে। অনেক তরুণ মনে করেন, অতীত অভিজ্ঞতার কারণে এখনও ভোটের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। তারা চায় ভোটকেন্দ্রে নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং নির্বাচনের ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা। তরুণদের বড় অংশের মতে, যদি ভোট সুষ্ঠু না হয়, তবে গণতন্ত্রের ওপর আস্থা আরও দুর্বল হবে এবং রাজনীতিতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
অনেক তরুণ ভোটার মনে করেন, এবার ভোটের মাধ্যমে একটি বার্তা দিতে চান রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং জনসেবার দায়িত্ব। তারা এমন জনপ্রতিনিধি দেখতে চায়, যারা নির্বাচনের পর জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে, এলাকার সমস্যায় পাশে দাঁড়াবে এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। এই মনোভাব ফেনীর রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে ফেনীর নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা এখন শুধু পরিসংখ্যানের অংশ নয়, তারা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বাস্তবতা। তাদের সচেতনতা, প্রশ্ন করার সাহস এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নির্বাচনের ফলাফল যেমন প্রভাবিত করতে পারে, তেমনি ফেনীর রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করতে পারে। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে ফেনীর তরুণরা কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগ করছে না, তারা নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে এবং রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে প্রস্তুত হচ্ছে।
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
সদস্য, নিলস ফেনী ইউনিভার্সিটি চ্যাপ্টার
