“আমি উপলব্ধি করেছি যে, আমার সত্যিকারের নিয়তি হলো যুদ্ধ- যে যুদ্ধ আমি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছি।” ফিদেল কাস্ত্রোর এই উক্তি কেবল ব্যক্তিগত আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন নয়; এটি বিশ শতকের সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিরোধের ইতিহাসের এক গভীর রাজনৈতিক ঘোষণা। ২০০৪ সালে অলিভার স্টোন নির্মিত তথ্যচিত্র লুকিং ফর ফিদেল-এ কাস্ত্রো যখন এই কথাগুলো বলেছিলেন, তখন স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটেছে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্য কোনোভাবেই প্রশ্নাতীত নয়। কাস্ত্রো জানতেন- যুদ্ধ আর শুধু বন্দুক, বোমা বা সামরিক সংঘাত নয়; যুদ্ধ এখন অর্থনীতি, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, অবরোধ ও ইতিহাসের ব্যাখ্যা পর্যন্ত বিস্তৃত।

ফিদেল কাস্ত্রোর বক্তব্যগুলো পড়ার সময় মনে হয়, যুদ্ধের নীতিশাস্ত্র ও রাজনৈতিক দর্শনের সংমিশ্রণে তিনি একটি মৌলিক বিষয় বারবার উপস্থাপন করেছেন- যুদ্ধকে তিনি পছন্দ করতেন না, কিন্তু যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগও তাঁর হাতে ছিল না। তিনি বলেন, “তারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে; আমরা কেবল আত্মসমর্পণ করতে শিখিনি।” এবং “একটি বিপ্লব ফুলের শয্যায় বসে রক্ষা করা যায় না।” এই বক্তব্যগুলো থেকে স্পষ্ট- কাস্ত্রোর কাছে যুদ্ধ ছিল নৈতিক প্রতিরোধের ভাষা, আক্রমণ নয়, আত্মরক্ষার প্রয়াস। কিউবার বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যে রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো তিনি মোকাবিলা করেছিলেন, তার প্রতিটি মুহূর্তই এই দর্শনের সাক্ষ্য বহন করে।

বিস্তারিত ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায়, কেন কাস্ত্রো বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে তাঁর যুদ্ধের প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। বে অব পিগস আক্রমণ, টানা অর্থনৈতিক অবরোধ, সিআইএ সমর্থিত শতাধিক হত্যাচেষ্টা, কিউবাকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করে রাখার নীতি- এসবই কাস্ত্রোর রাজনৈতিক চেতনাকে যুদ্ধমুখী করে তুলেছিল। তিনি সতর্ক করেছিলেন, “যদি আমরা দুর্বল হই, তারা আমাদের গিলে ফেলবে।” এই সতর্কবার্তা কেবল কিউবার নয়, লাতিন আমেরিকার বহু দেশের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। একইভাবে, বাংলাদেশ নরম হলে ভারত, ইরান নরম হলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল, ভেনিজুয়েলা ও কলম্বিয়া নরম হলে আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগকারী শক্তি কেবল নিজেদের স্বার্থে দেশগুলোকে ব্যবহার করবে।

আজকের বিশ্বরাজনীতিতে কাস্ত্রোর ‘যুদ্ধের নিয়তি’ রূপ বদলেছে, কিন্তু তাত্ত্বিক মূলনীতি একই আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি সেই ধারাবাহিকতার আধুনিক প্রকাশ। ট্রাম্প সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না করলেও তাঁর নীতিতে চাপ, নিষেধাজ্ঞা, অযাচিত শুল্ক আরোপ, হুমকি প্রদর্শনের মাধ্যমে আধিপত্য দেখানো স্পষ্ট। ইরানের ওপর সর্বোচ্চ নিষেধাজ্ঞা আরোপ, ভেনিজুয়েলার নির্বাচিত সরকারের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ, প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক যুক্তরাষ্ট্রে তুলে নিয়ে আসা, ফিলিস্তিন ইস্যুতে একতরফাভাবে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানো- সব মিলিয়ে আধুনিক বিশ্বে এক ধরনের অঘোষিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা বোঝা যায়।

ফিদেল কাস্ত্রো একবার বলেছিলেন, “সাম্রাজ্য কখনো যুক্তি দিয়ে কথা বলে না; তারা কথা বলে শক্তির ভাষায়।” ট্রাম্পের নীতিতে এই শক্তির ভাষা স্পষ্ট। ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে একতরফা সরে আসা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার নতুন ঢেউ সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েলুইরান, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন- সবখানেই যুদ্ধের আগুন আরও উসকে দিয়েছে। কাস্ত্রোর কথাগুলো নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে: “যুদ্ধ কখনো একা থাকে না; তার সঙ্গে আসে দারিদ্র্য, শরণার্থী, ধ্বংস।” এই দর্শন বিশ্বের বহু অঞ্চলের বর্তমান বাস্তবতার সাথে মিলে যায়।
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে কাস্ত্রো ছিলেন স্পষ্টভাষী। তিনি ইসরায়েলের আগ্রাসনকে “জাতিগত নিধনের নিকৃষ্ট উদাহরণ” বলেছিলেন। তাঁর মতে, ফিলিস্তিন কেবল ভূখণ্ড নয়; এটি বিশ্ব বিবেকের পরীক্ষা। আজ গাজা ও পশ্চিম তীরের বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতা গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ সমর্থনে ইসরায়েল যে সামরিক কার্যক্রম চালাচ্ছে, তা কাস্ত্রোর সতর্কবাণীকেই প্রমাণ করে- যুদ্ধ শক্তিশালীর হাতে গেলে ন্যায়ের কণ্ঠ চাপা পড়ে।

ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। হুগো শ্যাভেজকে কাস্ত্রো আদর্শিক উত্তরসূরি বলতেন। যুক্তরাষ্ট্র যখন ভেনিজুয়েলায় অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে, কাস্ত্রোর পুরোনো কথাই প্রতিধ্বনিত হয়- “তারা ভোটে হারলে অবরোধ চাপায়।” ট্রাম্প প্রশাসন ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্যবহার করে আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই যুদ্ধ অর্থনীতি, বাজার ও জনজীবনের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে, যেখানে মানুষই সবচেয়ে বড় শিকার।
কাস্ত্রো যুদ্ধকে কখনো রোমান্টিক করেননি। তিনি জানতেন, যুদ্ধের প্রথম শিকার সাধারণ মানুষ। তবুও তিনি বলেছিলেন, “কিছু যুদ্ধ না করলে আরও বড় পরাজয় অনিবার্য।” এই দর্শনেই কিউবা অবরোধের মধ্যেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। কাস্ত্রোর কাছে যুদ্ধ মানে ছিল- নিজস্ব পথ বেছে নেওয়ার অধিকার রক্ষা করা। আজকের বিশ্বে যুদ্ধের মানচিত্র বদলে গেছে; ইউক্রেন-রাশিয়া থেকে গাজা, তেহরান থেকে কারাকাস-;সবখানেই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলতে দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো নিজেকে বিশ্বের নৈতিক অভিভাবক হিসেবে তুলে ধরতে চায়, কিন্তু বাস্তবতা হলো- এই অভিভাবকত্বের ভাষা প্রায়ই বোমা, নিষেধাজ্ঞা ও ভেটোর মাধ্যমে প্রকাশ পায়। ফিদেল কাস্ত্রো হয়তো আজ বেঁচে নেই, কিন্তু তাঁর কথাগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- যুদ্ধ কেবল রণক্ষেত্রে হয় না; যুদ্ধ হয় ইতিহাসের ব্যাখ্যা, সত্যের সংজ্ঞা ও ন্যায়ের জন্য লড়াই। ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনীতি আমাদের দেখিয়েছে, কীভাবে আধিপত্যকে ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে বৈধতা দেওয়া হয়। কাস্ত্রো সেই বৈধতার বিরুদ্ধেই আজীবন লড়েছেন। তিনি বলেছিলেন, “ইতিহাস আমাকে ক্ষমা করবে।”
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়- যুদ্ধ কি সত্যিই কারও নিয়তি, নাকি এটি ক্ষমতার তৈরি এক অভ্যাস? ফিদেল কাস্ত্রোর জীবন আমাদের শেখায়, কিছু মানুষ যুদ্ধ বেছে নেয় না; যুদ্ধ তাদের বেছে নেয়। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতারা দেখান, ক্ষমতার লোভ কীভাবে সেই যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে কাস্ত্রোর যুদ্ধ-নিয়ে কথাগুলো আর ইতিহাসের পাতায় বন্দী নয়। তা আজও আমাদের সামনে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়- আমরা কি শক্তির ভাষা বুঝতে শিখব, নাকি ন্যায়ের ভাষা রক্ষা করার ঝুঁকি নেব? কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নীরবতাও এক ধরনের পরাজয়। বাংলাদেশের স্বার্থে সীমান্ত থেকে ক্রিকেট, অর্থনীতি, শিল্প, বাণিজ্য, পররাষ্ট্রনীতি- সবকিছুতে পারস্পরিক মর্যাদা বজায় রাখা অপরিহার্য। নতজানু হলে ভারত আজীবন বাংলাদেশের কাঁধে পা রেখে উল্লাস করবে; তাই কাস্ত্রোর যুদ্ধের দর্শন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা রক্ষা করা কখনো আপস নয়, বরং অনিবার্য দায়িত্ব।

কলামিস্ট ও সংগঠক